মোগল শাহজাদা সুজা পালাচ্ছেন। রাজমহল থেকে টেকনাফের দিকে। এই তাঁর আখেরি সফর। একদিকে তাঁর অন্তরে চলছে হরেক ভাবনা।
টানাপোড়েন—ক্ষমতার টানা অর তা থেকে পিছনে যাওযার পরিণতির, শরীরে প্রবাহিত তৈমুরের রক্তের তার আর পালায়নকারী বাস্তবতার, দৌলত আর কিসমতের। তিনি যাচ্ছেন। পেছনে চলছে কাফেলা। বাংলার দীর্ঘ পথজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর পলায়নের স্থায়ী চিহ্ন—সড়কে, স্থাপনায়, মানুষের মুখে তৈরি হয়ে ওঠা গীতে।
শাহ সুজার পেছনে চলেছে এক প্রেমিকও। পেশায় কলমচি, আচরণে উভকামী। পথে পথে কত কিসিমের মানুষের সঙ্গেই না তার মোলাকাত—পর্তুগিজ জাহাজের লশকর, শোলক-কাটা জেনানা, মাতাল, হিজড়া-পানের আড়তদার, মক্তবের মিয়াজি। তাদের ধূলিমাখা কাহিনি এসে পৌঁছায় রোহিঙ্গাদের এ সময়ের রক্তাক্ত ইতিহাসে। এ কাহিনি যোগের—রাজাপ্রজা-নির্বিশেষে মানুষের সঙ্গে মানুষের, ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের। শাহীন আখতার লোকগান থেকে বের এনেছেন সামন্তযুগের চাপা পড়া সাধারণ মানুষের কথা। তুলে ধরেছেন মানুষের চিরন্তন কুহকী মন।
Shaheen Akhtar is the author of six short story collections and four novels. She has also edited the three-volume Soti O Swotontora: Bangla Shahitye Nari, about the portrayal of women in Bengali literature, and Women in Concert: An Anthology of Bengali Muslim Women's Writings 1904-1938.
Akhtar's second novel Talaash won the Best Book of the Year Award for 2004 from Prothom Alo, the largest-circulation daily newspaper in Bangladesh. The English translation of the novel was published by Zubaan Books, Delhi, India in 2011.
Novels:
1. Palabar Path nei (No Escape Route), Mowla Brothers, 2000
2. Talaash (The Search), Mowla Brothers, 2004
3. Shokhi Rongomala, Prothoma, 2010
4. Moyur Shinghashon (The Peacock Throne), Prothoma, 2014
শাহজাদা সুজা পালাচ্ছেন। রাজমহল থেকে টেকনাফের দিকে। হেরে যাওয়াই তার নিয়তি। তার সাথে গল্পে ঢুকে পড়ছে বাঁদি আতরজান, শাহজাদি গুলরুখ বানু, শাহজাদা সুলতান মুহম্মদ, কাতিব। গল্পে ঢুকে পড়ছে ১৬৬০ এর অজস্র সাধারণ মানুষ ও তাদের জীবনপ্রবাহ। ইতিহাসে সাধারণ মানুষের মূল্য নেই; মূল্য নেই তাদের আবেগের। অথচ রাজারাজড়াদের সাথে তাদের কপালও অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। মুহূর্তে পালটে যাচ্ছে জীবন, মুহূর্তে রাজপ্রাসাদের নরম ফুলেল বিছানা থেকে ঠাঁই হচ্ছে কারাগারে, কতো অনায়াসে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে একেকটা গল্প! এরই মাঝে বয়ে চলেছে জীবন, সাথে হাসি, প্রেম, ঈর্ষা, ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা। সবকিছু ঘটে যাচ্ছে সময়ের সাথে সাথে, মহাকাব্যের মতো নিরুচ্চার হাহাকার নিয়ে। কী জীবন ছিলো মানুষের! আর কী নিস্পৃহভাবে এদের গল্প বলে গেলেন শাহীন আখতার!
শাহ জাহান ছিলেন বাবর, হুমায়ুন, আকবর, এবং জাহাঙ্গীরের পরে পঞ্চম মুঘল সম্রাট। শাহজাদা সুজা(শাহ সুজা) বাংলার সুবাদার মোগল সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় ছেলে। যার শরীরে বইছে তৈমুর লং এর রক্ত। তিনি বাংলার সুবাদার ছিলেন ১৬৩৯ থেকে ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। তিনি আপন ভাই শাহ জামানকে সরিয়ে সাত বছর ধরে মসনদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তবে এক সময় শাহ সুজা পালিয়ে যান রাজমহল থেকে টেননাফের দিকে। পাইলে যেতে যেতে শাহ সুজার মনে চলতে থাকে নানা দ্বন্দ্ব। ক্ষমতার টান আবার তা থেকে পিছিয়ে যাওয়ার পরিনতি।
বিশাল কাফেলা জুড়ে চলে রাস্তা, পথে রেখে যান পলায়নের নানা চিহ্ন। সড়ক, স্থাপনা ও মানুষের মুখে মুখে শাহ সুজাকে নিয়ে তৈরি হয় নান গীত।
লেখিকা শাহীন আখতার সেই সেই গীত ও লোকগান থেকে তুলে এনেছেন এই বইয়ের উপাদান। " ময়ূর সিংহাসন " এ তাই তিনি মোগল সম্রাটদের থেকে সাধারন মানুষের কথাই বেশী করে তুলে এনেছেন। তিনি এই বইয়ে রাজা প্রজা নির্বিশেষে মানুষের সাথে মানুষের, ইতিহাসের সাথে বর্তমানের যোগ করেছেন। উঠে এসেছে সে সময়ের রক্তাক্ত ইতিহাস।
লেখিকার প্রথম কোন বই পড়লাম। "ময়ূর সিংহাসন" বইটা বাংলার পাঠশালা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০১৪ ও আইএফআইইসি ব্যাংক পুরস্কার ২০১৪ তে ভূষিত হয়।
ইতিহাস বিবেচনা ও বইয়ের গুরুত্বের দিক দিক দিয়ে অসাধারণ একটা বই তাতে কোন সন্দেহ নাই। বইটাতে লেখিকা চরিত্রের মুখ থেকে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বেশীর ভাগই ক্ষুদ্র চরিত্র ই বেছে নিয়েছেন। শিরোনামে চরিত্রের নাম ও আলাদা ভাবে সময় ও স্থান ভাগ করে লেখিকা ঘটনা গুলো সাজিয়েছেন।
তবে আমার কাছে মনে হয়েছে বইটাতে প্রাঞ্জলতার বড়ই অভাব। অত্যাধিক বিদেশি শব্দের ( আরবি, ফারসি) ব্যাবহারের কারনেই হয়তোবা লেখার মাঝে সাবলীলতা খুজে পেলাম না। শব্দের মানে খুজে গিয়ে খেই হারাতে হয়েছে বার বারই।
তাছারা সব পুরস্কার পাওয়া বইগুলো আমার কঠিন লাগে। এ পর্যন্ত যতোগুলো পুরস্কার পাওয়া বই পড়লাম সববগুলোর ক্ষেত্রেই এমনটা মনে হয়েছে, এটার ক্ষেত্রেও তাই। তবুও একটা ইতিহাস নির্ভর পুরস্কার প্রাপ্ত বই পড়লাম এটা ভেবে ভালো লাগছে। অসাধারণ একটা ভালো বই, কষ্ট করে হলেও পড়া যেতেই পারে।
উপন্যাসের শুরু শাহজাদা সুজার পরাজয়ের কাহিনী থেকে। শাহ্ জাহানের দ্বিতীয় পুত্র, বাংলার সুবাদার শাহ্ সুজা, দারার পুত্র সুলেমান শুকোর কাছে মার খেয়ে পিছিয়ে গেলেন। ওদিকে আগ্রা ততদিনে আওরঙ্গজেবের হাতে। এমন অবস্থায় আওরঙ্গজেবের ছেলে সুলতান মুহম্মদ, পিতার শিবির ছেড়ে পালিয়ে আসেন সুজার কাছে। কেন?
সুজার কন্যার সাথে ছেলের বিয়ে ঠিক করেছিলেন আওরঙ্গজেব নিজেই। কিন্তু, তারপর সিংহাসনের লড়াইয়ে ভাই হলেন ভাইয়ের শত্রু। তাতে কি? প্রেয়সীর টানে মুহম্মদ পৌঁছে গেলো পিতার শত্রুর শিবিরে। সেই পক্ষে যুদ্ধের সেনাপতিও হলো। কিন্তু তার প্রেয়সী কি করে?
সুজার কন্যা এদিকে জড়িয়ে আছে এক সাধান দপ্তর কর্মী কেরানির সাথে। সেই কেরানি শাহজাদীর প্রেমে পাগল। তাদের দেখা হয় ভাঙা কবরস্থানে। শাহজাদী সত্যই কি তাঁকে ভালোবাসে, নাকি কেবল ব্যবহার করে? অথচ সে প্রেমিক অনেক পথ পাড়ি দিয়ে আরাকান মুলুকে পৌঁছে যায় প্রেমিকাকে উদ্ধারের জন্য।
প্রথম আলোর এক ঈদ সংখ্যায় 'সখী রঙ্গমালা' নামে একটা উপন্যাস পড়েছিলাম। লেখিকা শাহিন আখতার। ভাষার এক অদ্ভুত ব্যবহার নজরে পড়েছিল। সেই একই জিনিস আছে এই উপন্যাসে। কখনও সুজা, কখনও শাহজাদী, কখনও মুহম্মদ, কখনও কাতিবের ভাষায় বর্ণিত এই আখ্যান। একেক বার একেক জবানে কাহিনীর বয়ান দিল্লী আগ্রা হয়ে আরাকানে গিয়ে শেষ হয়।
সুজাকে নিয়ে লেখা তেমন কিছু চোখে পড়েনি। সেই হিসেবে এই উপন্যাস সম্পর্কে জানার পর থেকেই পড়ার ইচ্ছে ছিল। 'মোগল ইতিহাস' হিসেবে পড়ি নি। তবু ২০০ পাতা পর্যন্ত মোটামুটি ইতিহাসের অনেক কাছাকাছিই ছিলেন লেখিকা। এরপরের কাহিনী পুরোটাই বলা যায় কল্পিত। কল্পিত কাহিনীতে আপত্তি নেই, কিন্তু এখানে এসে একটু বোধয় ঝুলেও গেলো।
তবু, মোগল কাহিনী লিখতে গিয়ে অন্য অনেকের মত 'গল্পের গরু গাছে চড়ানো'র কাজটি থেকে লেখিকা বিরত। ইতিহাসের কঙ্কালে মাংস জুড়ে, বেশ উপভোগ্য এক উপন্যাস বলা চলে।