উনিশ শ’ পাঁচ সালের প্রথম বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে উনিশ শ' সাতচল্লিশ সালের দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গ পর্যন্ত সময়টুকু নিয়ে রচিত জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি গ্রন্থটি প্রচলিত অর্থে ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং ঘটনার তাৎপর্য। অনুসন্ধানের বিশিষ্টতায় অনন্য। বাঙালীর জাতীয়তাবাদের বিকাশটি ঘটেছিল এই সময়টুকুর মধ্যে, বিশেষ করে প্রথমবারের বঙ্গভঙ্গের প্রতিরােধ যে তীব্র দেশাত্মবােধের আর আত্মােপলব্ধির সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল, তারই হাত ধরে। অন্যদিকে ওই বঙ্গভঙ্গের মধ্য দিয়েই বাংলায় আধুনিক সাম্প্রদায়িকতা বিস্তারের ইতিহাসটিরও শুরু। এই হাত ধরাধরি করে চলা জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আধিপত্যের মাঝেই মানুষের মুক্তির প্রশ্নটি কিভাবে আটকা পড়লাে পরিচয়ের রাজনীতির আড়ালে, কিভাবে তাদের শ্রমিক বা কষক পরিচয়কে ভুলিয়ে ভারতীয় বা পাকিস্তানী, হিন্দু বা মুসলিম পরিচয়কেই সামনে টেনে এনে প্রধান পরিচয় বানিয়ে দেয়া হয়েছিল, সেটাও বর্তমান গ্রন্থের অন্যতম উপজীব্য।
জাতীয়তা ও সাম্প্রদায়িকতা উভয়ের উত্থানের ওই সময়টুকুতে সমাজের সক্রিয় অংশগুলাের মনস্তত্ত্ব ও আকাঙ্ক্ষাকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন একদিকে তাদের ক্রিয়াকাণ্ড, অন্যদিকে সমকালীন সাহিত্যের সাক্ষ্যসহ নানান উপাদান ব্যবহার করে। এক একটা যুগ এবং তাতে ভূমিকা রাখা সামাজিক গােষ্ঠীগুলাের মনােভাবকে। উপলব্ধির জন্য সাহিত্যিক নিদর্শনগুলাের এত গভীর ও বিপুল ব্যবহার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর আগে খুব কমই হয়েছে বাংলা ভাষায়। ১৯০৫-৪৭ কালপর্বের ঘটনাবলীর বীজ অনুসন্ধানের প্রয়ােজনে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেমন অনায়াসে বিচরণ করেছেন এর আগেকার উনিশ শতকের কীর্তিমানদের তৎপরতায়, তেমনি এই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ফলাফলকেই কখনাে কখনাে চিহ্নিত করেছেন আমাদের চারপাশের বাস্তবতায়। জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি রচিত হয়েছে প্রায় দশ বছর ধরে; বাংলাদেশের ইতিহাস বিষয়ে অনুসন্ধিৎসু পাঠকেরা, রাজনীতির বাঁকগুলাে নিয়ে উৎসুক ব্যক্তিরা, এবং অতি অবশ্যই বাংলা সাহিত্যের সমঝদার বহুকাল ধরে এই আকর গ্রন্থটির কাছে আসতে বাধ্য হবেন।
সেই কোন ছোটবেলায়, কোন ক্লাসে পড়তাম মনে করতে পারিনা, মহাভারত পড়ার সৌভাগ্য হয়, তাও সম্পূর্ণটা নয়, বাচ্চাদের জন্য লিখা মহাভারতের মূল কাহিনীর একটা সারসংক্ষেপ মাত্র। যত সংক্ষিপ্তই হোক না কেন, সেই পিচ্চি বয়সের জন্য সেটাই ছিল মহাকাব্য; এত এত কাহিনী, এত চরিত্র, এত রাজনীতি আর ঘটনার মারপ্যাঁচ যে সেটাই যথেষ্ট ছিল ঐ বয়সে মাথা খারাপ করার জন্য। গত সপ্তাখানেক ধরেই যেন সেই ছোটবেলার মত একটা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম পুনরায়। আমাদের এই ভূখণ্ডের যে ইতিহাস, যে জাতীয় জীবন; যার সবচেয়ে উজ্জ্বল সময় হিসেবে আমরা বলি ১৯৭১কে, যার পটভূমিতে রয়েছে ১৯৪৭, আর যার শিকড় রয়েছে ১৯০৫-এ(নাকি ১৮৫৭তে?), সেই জীবন আর তার সামষ্টিক ইতিহাস যে আসলে একটা মহাকাব্য, এরকম একটা অনুভূতি যেন পেয়ে বসল।
হুম, বলতে চাচ্ছিলাম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর “জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি, ১৯০৫-৪৭” বইটা পড়ার অনুভুতির কথা। বইটাকে একটা মহাকাব্য হিসেবে নিঃসন্দেহে আখ্যা দেওয়া যেতে পারে । ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭, ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তাল ৪২ বছর, সেই দিনগুলিকে লেখক নিয়ে এসেছেন বিশাল এক ব্যপ্তিতে, মহাকাব্যের মতই একে একে অসংখ্য চরিত্রের দেখা পাওয়া গেছে, কিন্তু কোন চরিত্রকেই মহানায়ক বানানো হয়নি। কেননা শেষ বিচারে এটা একটা ইতিহাস, কবির কল্পনায় রচিত কোন উপাখ্যান বা বীরোচিত কাহিনী নয়।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দেশভাগ এবং এর পূর্বাপরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন নিরপেক্ষ থেকে নয়, জনগণের মুক্তির পক্ষে থেকে; আর এই কারণে বইটা প্রচলিত ইতিহাসের কাঠখোট্টা বর্ণনা হয়ে দাঁড়ায় নি, বরঞ্চ ঘটনার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করেছে। ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গের ফলে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ তৈরি হয়, দেশজুড়ে যে জাগরণ সৃষ্টি হয়, যে প্রতিক্রিয়ার কাছে প্রবল ব্রিটিশরাজও নতি স্বীকারে বাধ্য হয়, সেই জাতীয়তাবাদই যে কিভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে কেবল বাংলা নয়, গোটা উপমহাদেশকেই বিভক্ত করে ফেলে আর স্তব্ধ করে দেয় জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তার নমুনা আমরা দেখতে পাই এক এক করে।
পুরো বইটিকে ভাগ করা হয়েছে ১৪ টি পরিচ্ছেদে। একদম প্রথম দুটোর নাম ‘বঙ্গভঙ্গ ও তারপর’ এবং ‘জাতীয়তাবাদের ধারণা ও প্রবণতা’। এখানে আমরা দেখতে পাই বাংলাকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দিতে লর্ড কার্জন কিভাবে একে দু টুকরো করে ফেললেন। এর বিরুদ্ধে প্রবল জনমত গড়ে ওঠে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হল এই জনমত ছিল মূলত বাংলার হিন্দু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের যারা বঙ্গভঙ্গের মধ্যে তাদেরকে দুর্বল করে ফেলার ষড়যন্ত্র দেখতে পায়। যে কারণে এই আন্দোলনে মূল স্লোগান উঠেছে ‘বন্দেমাতরম’। বলাবাহুল্য এই স্লোগান মুসলমানদের মধ্যে সাড়া জাগাতে পারেনি, বরঞ্চ তারা এর বিরোধিতাই করেছে। যার প্রমাণ ঐ সমসাময়িক কালেই মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা। তবু পরিস্থিতি তখনও এতটা খারাপ হয়নি, সাম্প্রদায়িকতা তখনও মহামারি হয়নি, যে কারণে মুসলিম লীগকে ঐ সময়ে খোদ মুসলিমদেরই বিশাল অংশ গ্রহণ করেনি, যার মধ্যে প্রথম যে নামটা আসে তা হল- মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। লেখক বঙ্গভঙ্গের সময়কালের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের কার্যকলাপ বিচার বিবেচনা করে দেখিয়েছেন, আর এজন্য এর পূর্ববর্তীদের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে বারবার।
নিঃসন্দেহে দেশভাগের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে যে তিনটি নাম উঠে আসে সর্বাগ্রে সেগুলো হল-গান্ধী, জিন্নাহ আর সুভাষ বসু। এঁদের কার্যকলাপের গুরুত্ব বিবেচনায় লেখক তিনটি আলাদা পরিচ্ছেদ লিখেছেন। আর অবধারিতভাবেই সবার প্রথমে আসেন গান্ধী। মানুষ হিসেবে আর ব্যক্তিত্বের বিবেচনায় গান্ধী যে কত বড় মাপের ছিলেন সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আর তাঁর দেশপ্রেমও প্রশ্নাতীত। কিন্তু রাজনৈতিক আদর্শের ক্ষেত্রেই তাঁর সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে। ভারতে তিনি ‘স্বরাজ’ আনতে চেয়েছেন, কিন্তু সেটা যে কি, তা পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করতে পারেন নি। উপরন্তু তিনি চেয়েছেন সনাতন ভারতের আদলে রামরাজ্য স্থাপন করতে; বলার অপেক্ষা রাখেনা যেটা হিন্দুত্বকেই উপরে তুলে ধরেছে, যার কারণে পথ পেয়েছে সাম্প্রদায়িকতা। আমরা আরও দেখতে পাই গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের কর্মসূচী যেমন সত্যাগ্রহ, ভারতছাড়, অসহযোগ ইত্যাদির আহ্বান তিনিই প্রথম দিয়েছেন, কিন্তু সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে দেখে মাঝপথে তা তুলেও নিয়েছেন; যার ফলে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন পথ হারিয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে গান্ধীর মধ্যে কোন ধরনের সাম্প্রদায়িকতা যে ছিলনা সেটা নিঃসন্দেহ। যে কারণে সাতচল্লিশের পনেরোই আগস্ট দিল্লীতে যেখানে উৎসব হয়েছে, গান্ধী তখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে মহৎ কাজের একটি- বিহারে দাঙ্গা থামানোর কাজে নিয়োজিত ছিলেন, এগিয়ে গিয়েছিলেন বিপন্ন মুসলমানদের বাঁচাতে। অথচ ইতিহাসের নিয়তি এটাই যে, এই মুসলমানরাই এক সময় তাঁকে নিকৃষ্ট শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। আর পরিহাসও এটাই যে মুসলমানদের প্রতি তাঁর এই কর্তব্য পালনই উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে তাঁর প্রাণ হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দেশভাগের ইতিহাসে দ্বিতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যক্তির কথা উঠে আসে তিনি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবনই এঁদের সবার মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত এবং স্ববিরোধী। ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান জিন্নাহ উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিলেত যান। বিলেতের পার্লামেন্টে বিতর্ক শুনে আকৃষ্ট হন, তেমনি থিয়েটারে নাটক দেখে নায়ক হবার ইচ্ছাও পোষণ করেন। কিন্তু পারিবারিক বাধার মুখে নায়ক হবার সাধ ছেঁড়ে ব্যারিস্টারি পড়েন। এরপর দেশে ফেরেন সম্পূর্ণ সাহেব হয়ে, এমনকি পারিবারিক নাম মোহাম্মাদালি জিন্নাভাইকে সংক্ষিপ্ত করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ করে ফেলেন। ব্যারিস্টার হিসেবে জিন্নার সাফল্য আকাশচুম্বী। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি ছিল আরও সুদূরপ্রসারী। যে কারণে কংগ্রেসে যোগ দেন; গান্ধীর দেশে প্রত্যাবর্তন উপলেক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এমনকি সভাপতিত্বও করেন। সে সময়ের জিন্নাহ ছিলেন সম্পূর্ণ ভারতীয় জাতীয়তাবাদী। হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ব্যতীত যে ভারতের উন্নতি হবেনা এমন কথা তখন প্রচার করতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের উগ্রপন্থীদের চাপে পড়ে দলত্যাগে বাধ্য হন। আবার চলে যান বিলেতে। এরপর ফিরে এসে বদলে যান আদর্শিকভাবেই। সম্পূর্ণ মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাজনীতি শুরু করেন, যে কোন প্রকারে পাকিস্তান কায়েমের জন্য লড়াই চালিয়ে যান। অথচ পরিহাসের বিষয় হল ব্যক্তিগতভাবে জিন্নাহ ধর্মকর্মের কাছে দিয়েও যেতেন না। যে কারণে আমরা দেখতে পাই, ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭-এ পাকিস্তানের জন্ম উপলক্ষে বড়লাট মাউন্টব্যাটেনের সৌজন্যে তিনি এক মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন, অথচ তখন ছিল রমজান মাস; শেষ পর্যন্ত বিষয়টা জানাজানি হলে অবশ্য দ্রুত অনুষ্ঠানের সময় পালটে ফেলা হয়।
কেবল গান্ধী, জিন্নাহ আর সুভাষ বসু নয়, সে সময়ের রাজনৈতিক পালাবদলের আরও যারা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন, যেমন নেহেরু, শরৎ বসু, সোহরাওয়ারদি, শেরে বাংলা, মওলানা আজাদ, আবুল হাশিম, শ্যামাপ্রসাদ, চিত্তরঞ্জন প্রমুখ রাজনীতিকদের ভূমিকা ও ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। একটা বিষয় পরিষ্কার উঠে আসে যে, ত্যাগ ও পরিশ্রমে এঁরা কেউই সামান্য নয়, কিন্তু শেষ বিচারে কেউই মধ্যবিত্ত জাতীয়তাবাদের আদর্শ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন নি। ভারতবর্ষ যে এক জাতি নয়, বহুজাতির দেশ সেটা কেউই স্বীকার করতে চান নি। অথচ সর্বভারতীয় যে ঐক্যের কথা তাঁরা বলতে চেয়েছেন, তার ভিত্তি যে কি হবে সেটাও তাঁরা পরিষ্কার করতে পারেন নি। যে কারণে ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে ধর্ম বারবার চলে এসেছে, আর এর ফলশ্রুতিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি আর সবশেষে দেশভাগের মত মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।
লেখকের অবস্থান যেহেতু জনমুক্তির পক্ষে, তাই তিনি দেখাতে চেয়েছেন প্রকৃত স্বাধীনতা আসলে আসেনি। মহাভারতের মতই এক পাশা খেলার যেন আয়োজন হয়েছিল, পার্থক্য হল যেখানে পক্ষ হবার কথা ছিল দুটি, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ আর ব্রিটিশবিরোধী ভারতীয় মহল; সেখানে হয়ে গেছে তিন পক্ষ; ব্রিটিশ সরকার, কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ। তিন পক্ষই আবার নিজেদের স্বার্থে এক হয়ে গিয়েছে। যে কারণে দেখা যাচ্ছে যে জনগণের অধিকারের বিষয়টি তাদের কাছে গৌণ হয়ে গিয়েছে, ব্রিটিশদের বিরোধিতা না করে কংগ্রেস ও লীগ ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারার প্রশ্নে নিজেদের মধ্যে বিরোধ ঘটিয়েছে। সন্দেহ নেই যে এসমস্তই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ‘Divide and Rule’ নীতির অংশ। কিন্তু সে নীতি কার্যকর হত না যদি দেশীয় নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হতেন। তা তো কখনো হয়নি, বরং যত দিন গেছে তত বিরোধ আরও বেড়েছে। কে ক্ষমতার কত বড় অংশ পাবেন এই নিয়ে নেতারা তর্কে জড়িয়ে গেছেন। লাভ হয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের। ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রকেই পুরো স্বাধীনতা না দিয়ে কেবল ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস দিয়ে তারা সম্মানজনক বিদায় নিয়েছে।
সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন এই তথাকথিত স্বাধীনতার মাধ্যমে হয়নি। ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রেই ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম শরণার্থী সমস্যা দেখা গেছে। আর উভয় দেশেই সংখ্যালঘুদের ভাগ্যে নেমে এসেছে ঘোরতর অন্ধকার। যে অন্ধকার থেকে এই উপমহাদেশ এখনও বের হতে পারেনি, বরঞ্চ দিনকে দিন তা আরও গাঢ় হচ্ছে। পাকিস্তান তো ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে; ভারতেও উগ্র হিন্দুত্ববাদীদেরই আধিপত্য চোখে পড়ে। বাংলাদেশেও সংখ্যালঘুদের উপর ক্রমবর্ধমান সহিংসতা দেখে আমরা বুঝতে পারি যে একাত্তরে স্বাধীনতা আসলেও সাতচল্লিশে ঘৃণার যে বীজ বপন করা হয়েছে, তার শিকড় অনেক গভীরে, সেই বীজ ক্রমশ বিষবৃক্ষের আকার নিচ্ছে।
লেখক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কোন পর্যায়ের তা খুব সহজেই বোঝা যায় একাত্তরে আলবদরদের তৈরি তালিকায় তাঁর নামের অগ্রাধিকার দেখে। যে অকল্পনীয় পরিশ্রমের মাধ্যমে দশ বছর সময় নিয়ে তিনি এই বই লিখেছেন, তার একশ ভাগের এক ভাগ করার মত ক্ষমতাও আমাদের এই প্রজন্মের নেই। নীল-সাদা একটা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বেঁড়ে ওঠা অন্তঃসারশুণ্য এই প্রজন্মের জন্য তাই সিরাজুল ইসলামদের মত মানুষের বড় দরকার। এই বই শুধুমাত্র ইতিহাসের পুনঃপাঠ ও বিশ্লেষণ নয়, জাতিগতভাবে আমাদের মূল্যায়নও বটে। আর লেখকের দুর্দান্ত লেখার জোরে সেই মূল্যায়ন হয়ে ওঠে উপভোগ্য, ঠিক মহাকাব্য পাঠের মতই।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর ৮১৫ পাতার মহাকাব্যিক কলেবরের এই বইটি লিখেছেন ধীরেসুস্থে। সময় নিয়েছেন ১০ বছর।যে বইটি দশ দশটি বসন্ত ব্যয় করে লেখা, সেই বইটি চটপট শেষ করে ফেলা ঠিক হবে না বলে বোধ হল।আমিও বইটি পড়েছি আস্তে আস্তে।এক বসন্ত পার করতে পারিনি।সময় লেগেছে ছয়মাস। ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ - বঙ্গভঙ্গ থেকে ভারতভাগ। ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক অতিগুরুত্বপূর্ণ সময়ের ক্যানভাসকে বৃহৎ আঙ্গিকে ধারণ করেছে এই বই। কেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ১৯০৫ সালকে বেছে নিয়েছেন? কারণ এই বছরেই বঙ্গভঙ্গ করা হয়। আর তাতে বেশিরভাগ বাঙালি হিন্দু ক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলন শুরু করে।সেই বাঙালি হিন্দুই ১৯৪৭ সালে প্রবল বেগে বাংলা ভাগ চেয়েছে। কিন্তু কেন? ১৮৮৫ সালে ইংরেজ কর্মকর্তা হিউম মুম্বাইতে প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। তিনি দুইযুগের বেশি এই দলের কর্মব্যাক্তি ছিলেন। ইংরেজ মূলত এই দল গঠনকে প্রথমদিকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে যাতে ভারতবর্ষে আরেকটি ১৮৫৭ সালের উদ্ভব না হয়। কিন্তু কীভাবে কালের বিবর্তনে দলটি ইংরেজ শাসনের বিরোধীতে পরিণত হয়? ১৯০৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগ। দলটির কোনো নেতাকে কস্মিনকালেও জেল ভ্রমণে যেতে হয়নি। অথচ পাকিস্তান দাবি অর্জন করে ফেললেন। কীভাবে? মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। যিনি "বাপুজি" কিংবা মহাত্মা গান্ধী বলে খ্যাত হলেন। বারবার ইংরেজবিরোধী আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিলে বারবার তিনি আন্দোলন প্রত্যাহার করেছেন। অস্পৃশ্যদের স্বীকৃতির জন্য লড়েছেন। অথচ বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাকে কোনোকালেই আশ্রয় দেননি মনে। ইংরেজ সইবেন অথচ বামপন্থী সইতে পারবেন না। সুভাষকে বিতাড়িত করেছিলেন তিনি। আবার দেশভাগ রোধ করতে গিয়ে দেখলেন তার দুই শিষ্য বল্লভভাই প্যাটেল আর নেহেরু আর গান্ধীর সাথে নেই। দেশভাগ হলে সংখ্যালঘু মুসলমান রক্ষায় অনশন করতে গিয়ে উগ্রবাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের হাতে প্রাণ হারালেন। আজীবন সাদামাটা জীবনযাপন করেছেন কিন্তু তবুও ছিলেন জাতীয়তাবাদী বটে মুক্তিকামী নন।কেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই দাবি? সরোজিনী নাইডুর "হিন্দু-মুসলমান ঐক্যদূত" জিন্নাহ কেন জাতীয়তাবাদী থেকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু করলেন? ১৯২৯ সালে জিন্নার ১৪ দফা দাবি কংগ্রেস মেনে নিলে তিনি কী মুসলিম লীগের পান্ডা হতেন? যিনি কোনোকালে ধর্মকর্ম মানেন নি, তিনি কীভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের জাতির জনক হলেন? নেহেরুর নেতৃত্বেই সর্বপ্রথম কংগ্রেস স্বাধীনতার দাবি তোলে। নেহেরু নিজে বাম মতাদর্শকে গ্রহণ করেছিলেন তা নয়। কিন্তু ভালোবাসতেন। তবুও কেন সেই জাতীয়তাবাদীই রয়ে গেলেন? কেন সুভাষ বসু কংগ্রেসে টিকতে পারলেন না? কেনই বা আজাদ-হিন্দ ফৌজের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার কথা বলেছিলেন নেহেরু? বাংলা ভাগ কেন রোধ করতে পারেন নি বাঙালি নেতৃত্ব? কাদের ভুলে কলকাতা, আসামের বৃহৎ অংশ পূর্ববঙ্গের হাতছাড়া হল? পূর্ববঙ্গ আর পাঞ্জাবের কলঙ্কিত দাঙ্গার প্রকৃত দায় কাদের? বারবার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, কংগ্রেস,লীগ নেতৃত্ব ছিল চূড়ান্ত পুঁজিপতি। জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া তুলে কংগ্রেস বিভ্রান্ত করেছে সবাইকে। এগিয়ে গেছে ক্ষমতার পিছু পিছু। লীগ ধর্মের ভিত্তিতে উদ্ভট এক তত্ত্ব দিয়েছে। অথচ সেই তত্ত্বে মোহের খেসারত দিয়েছে ভারতবর্ষের মুসলমানদের। কেন তারা এই মোহে পড়েছে? কারা জনগণকে মুক্তিকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে? এই উপমহাদেশে বাম রাজনীতি কোনোদিন দাঁড়াতে পারেনি।অথচ জনমুক্তির রাস্তা দেখাতে পারত, সাম্যের স্বপ্ন দেখাতে পারত কমিউনিস্ট পার্টি। অথচ তারা দেশভাগের মতো অস্থির সময়টিতে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকাই রাখতে পারেন নি। দায় শুধু কী ব্রিটিশ সরকারের? সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বইটি পড়তে গিয়ে বারবার আটকে গেছি। এতো তথ্যের ভিড়ে পাঠক হিসেবে আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়েছে। তবুও নতুন করে ভাবতে শুরু করেছি দেশভাগ নিয়ে, পরমপূজ্য নেতৃবৃন্দের স্মরণীয় কর্মকান্ডের বিশ্লেষণী রূপ আমাকে বাজারে প্রচলিত মতের বাইরে যেতে সাহায্য করেছে।
অনেকের কাছেই ইতিহাস খুব 'বোরিং' একটা সাবজেক্ট — সাল, তারিখ, ব্যক্তির নাম মুখস্ত করাই যার কাজ।
আমার কাছে ইতিহাসকে তেমন মনে হয় না। ইতিহাস হলো মূলত মৃতদের আখ্যান, পূর্বপুরুষদের কার্যকলাপের যাবতীয় বিবরণ ও বিশ্লেষণ। ইতিহাস আমাদের পরিবর্তনের শিক্ষা দেয় — এটা বুঝতে শিখায় যে ২০-৫০-১০০ আগের পৃথিবীও যেমন এখনের মতো নয় তেমনি আগামীর পৃথিবীও এমন থাকবেনা। ইতিহাস অতীত থেকে আমাদের মুক্ত করে, অতীতের ঘটনা জানায় যে কিভাবে আজকের অবস্থানে আমি দাঁড়িয়ে আছি, বাঁচতে শেখায় মুক্তভাবে।
প্রায় ৯০০ পৃষ্ঠার এই বইটিও তেমন একটি মহাকাব্য, ১৭৯৩ এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে যাতে সুদীর্ঘ ১৫০ বছরের ইতিহাস বর্ণণা করা হয়েছে।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত - ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা - ইংরেজি শিক্ষার সূচন��� যাতে স্থায়ী মিডলক্লাসের উদ্ভব হয় - ১৮৫৭ এর সিপাহী বিপ্লব - আলিগড় আন্দোলন - ১৮৮৫ এ ভারতে স্থায়ী শ্রেণিব্যবধান সৃষ্টিতে ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা - ১৯০৫ এর বঙভঙ্গ - ১৯০৬ এ মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করে আগের আড়াআড়ি বিভাজনের মাঝে খাড়াখাড়ি বিভাজন করা - হিন্দু মুসলমান পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা - ১৯১১ এর লর্ড হার্ডিঞ্জ এবং রাজা ৫ম জর্জের বঙভঙ্গ রদ - লখনো প্যাক্ট - ১৯১৯ এর খিলাফত আন্দোলন - অসহযোগ আন্দোলন - ২৩' এর বেঙ্গল প্যাক্ট - ৩৫' এর ভারত শাসন আইন - ৩৯' এর দ্বিজাতিতত্ত্ব - লাহোর প্রস্তাব - ৪২ এর ক্রিপস মিশন - ৪৬' এর ক্যাবিনেট মিশন হয়ে - দাঙ্গা হয়ে ৪৭ এ সবশেষে দেশভাগে যে মহাকাব্যের সমাপ্তি।
রাজা রামমোহন রায় - ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর - বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত - অরবিন্দ ঘোষ - সুরেন্দ্রনাথ দত্ত - মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ - মহাত্না গান্ধী - আল্লামা ইকবাল - দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস - মতিলাল নেহেরু - জওহরলাল নেহেরু - সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল - নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস - মাওলানা আকরম খাঁ - সিকান্দার হায়াত আলী - লিয়াকত আলী খান - আল্লাবক্স - নাওয়াব সলিমুল্লাহ - লর্ড কার্জন - লর্ড হেস্টিংস - লর্ড কর্ণওয়ালিস - উইলিয়াম বেন্টিংক - এডওয়ার্ড হিউম - লর্ড মাউন্টব্যাটেন - সোহরাওয়ার্দী - শেরে বাংলা - শরৎ বসু ……… এ যেন ইতিহাস নয়, এক মহাকাব্য যার এত এত চরিত্র, দিনশেষে যা জন্ম দেয় ধর্মভিত্তিক দুইটি রাষ্ট্রের। এই মহাকাব্যে বর্ণিত হয় ১৯০৫ এর যেই জাতীয়তাবাদ বাংলার ভাঙনকে ঠেকায়, কিভাবে তা-ই ১৯৪৭ এ দেশভাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ধর্মের ভিত্তিতে দুটি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হলেও — ভারতবর্ষ কখনোই কেবল দুই জাতির দেশ ছিল না। একটা জাতির প্রধান পরিচয় ভাষা, ধর্ম নয়; তা জানার পরেও কিছু রাজনীতিবিদ নিজেদের স্বার্থে রাজনীতি করে গেছেন। ভারতবর্ষ বিশাল; বিভিন্ন ভাষা-ধর্ম-সংষ্কৃতির মানুষের এখানে বসবাস। ভারতবর্ষ হওয়ার প্রয়োজন ছিল আমেরিকা কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ন্যায় — কিন্ত ধর্মের ভিত্তিতে দুই রাষ্ট্রে বিভক্ত করাকে ইতিহাসের কমেডি ব্যতিরেকে আর কিইবা বলা যায়!
৪৭' এর অবাস্তব দেশভাগ ৭১' এর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টিকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলে। ভারত এবং পাকিস্তান দুটোর কোনোটাই স্টেবল স্টেট নয় — ভারতে কাশ্মীর, সেভেন সিস্টার্স; পাকিস্তানে পাঞ্জাব-বেলুচ-সিন্ধি-পাখতু-মোহাজের দ্বন্ধ লেগে রয়েছে প্রতিনিয়তই। পৃথক পৃথক ভাষার ভিত্তিতে আমেরিকা কিংবা ইইউর ন্যায় সিস্টেমই ছিল এর জন্যে যথাযথ সলিউশন।
শেষমেশ জিন্নাহ-গান্ধী-নেহেরু-অবশ্যই ব্রিটিশদের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস এবং কমিউনিস্ট ভীতিই দেশভাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জিন্নাহ ছিলেন স্বার্থপর, যে নিজে নাস্তিক, একসময়ে কংগ্রেসম্যান হলেও ধর্মের আশ্রয়ে রাজনীতি করে গেছেন, নিজের জন্যে। ক্ষমতায় তিনি বসতে চেয়েছিলেন, কিন্ত জানতেন যে ভারতবর্ষে তিনি অবিসংবাদী নেতা হতে পারবেন না — সেজন্য ভাঙনের নীতি খেলেছেন। বিভিন্নজন, এমনকি শেরেবাংলা ও সোহরাওয়ার্দীকে প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন; তারপর ছুঁড়ে ফেলেছেন। এদিকে গান্ধীর অহিংস নীতি, কমিউনিস্ট ভীতি, ব্রিটিশদের আনুগত্য ভারতবর্ষের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনেনি। ভারতীয় রাজনৈতিকরাও জিন্নাহর কবল থেকে বাঁচতে কিছু অংশ পাকিস্তান নামে ছেড়ে দিতে চেয়েছেন। এমনকি নেহেরু তহ ভেবেছিলেন পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র ১০ বছরও টিকবে না, পুণরায় ভারতের সাথে যুক্ত হবে।
যদিও পাকিস্তান টিকে গিয়েছে। কিন্ত জিন্নাহর সুবিধাবাদী আচরণ, মাইনরিটি নিয়ে খেলা আজও ভারতের ২১ কোটি মুসলমানকে ভোগায়। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হয়ে লাভটা হলো কিভাবে যেখানে তৎকালীন মুসলমানের এক-তৃতীয়াংশকে তখনই ভারতে থেকে যেতে হয় এবং আরো কঠোর বৈষম্যের মুখে পড়তে হয়?! জিন্নাহ তা জানতেন — কিন্ত সত্য প্রকাশ করেননি, মাইনরিটি মুসলিম সেসব অঞ্চলে বিদ্বষ জিইয়ে রেখে নিজের স্বার্থে পলিটিক্স খেলেছেন।
দিনশেষে জয় হয় ব্রিটিশদেরই। অল্পের উপরে, মাত্র ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস দিয়েই তারা দেশত্যাগ করতে পেরেছে। তাদের লাগানো বিদ্বেষ জায়গামত হিট করে — এমনকি তাদের প্রত্যাশার তুলনায়ও বেশি। ১৯৩৫ এও কেউ কল্পনা করেনি যে দেশভাগ হবে।
ইতিহাসের আইরনি এই যে, একটা প্রদেশ ভাঙ্গা ঠেকাতে গিয়ে যে রাজনীতির জন্ম হয়, সময়ের সাথে পরিপুষ্ঠ হয়ে তা-ই গোটা দেশকে বিভক্ত করে ফেলে, যে বিদ্বেষ এখনো বর্তমান।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান, এর ক্রমবিকাশ এবং এ সম্পর্কে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্ন মন্তব্য সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা হয়ে যায় এই বইটা পড়ার পর। মার্কসবাদী হওয়ার কারণে লেখকের অনেক বিশ্লেষণ বা উপসংহারেই একটা বামপন্থী সুর পাওয়া যায়, কিন্তু লেখকের যৌক্তিক এবং নির্মোহ অবস্থানের কারণে অনেকক্ষেত্রেই তার সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষণ না করে উপায় থাকে না। উদাহরণস্বরূপ লেখকের একটি সিদ্ধান্তের কথা বলা যায়। তার মতে, ভারত একক জাতিভিত্তিক কোন দেশ নয়, বরং এখানে কমপক্ষে বিশটির অধিক জাতি বাস করে। এই জাতিসমূহের মধ্যে সাংস্কৃতিক পার্থক্য অনেকটা ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্যের মতই। এখানে উল্লেখ্য, একটি জাতির স্বাতন্ত্র্যের পেছনে, অথবা নির্দিষ্ট একগুচ্ছ মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদ এর ধারণা গড়ে ওঠার পেছনে, লেখকের মতে, ‘ভাষা’-ই সর্ব্বোচ্চ এবং/অথবা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনা করে। তাই লেখক সিদ্ধান্তে পৌছান, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ঐতিহাসিকভাবে ধর্মভিত্তিক, জাতিভিত্তিক নয়। বর্তমান পাঠকেরও সিদ্ধান্ত এই।
মাঝখানে ধর্মকে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিশেবে ধরে নিয়ে অনেক জল ঘোলা করে আবার আমরা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাকেই মেনে নিয়েছি, কিন্তু এর মাঝে বাঙলা দুই ভাগ হয়ে গেছে। কেন ভাষার পরিবর্তে ধীরে ধীরে ধর্মই পরিণত হল জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে, আবার পরে কেনইবা ভাষাভিত্তিক একটা দেশ করতে হল, তার একটা বিশ্লেষণমূলক ইতিহাস পাই এই বই-তে। এখানে লেখক মূল কারণ হিশেবে চিহ্নিত করতে চান মধ্যবিত্ত স্বার্থকে। লেখকের মতে মধ্যবিত্তরা সবসময়-ই নিজেদের স্বার্থ দেখেছে। এ কারণেই একটা সময়ে তারা ধর্ম নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদ লাগিয়েছে, আবার একই কারণে ভাষাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে তারা একটা নতুন দেশ এর পত্তন ঘটিয়েছে। ইংরেজ শাসনের শেষদিকে হিন্দু ও মুসলিম এই উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরাই নিজ স্বার্থের কথা ভেবেছেন, তাই তখন ধর্মকে কেন্দ্র করে বিচ্ছিন্নতা এবং পরবর্তীতে বিরোধ দেখা দিয়েছিল। পাকিস্তান হওয়ার পর যখন বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তরা আবার দেখল তারা নতুন দেশে আবারও সেই পুরোনো কায়দায় শোষণের স্বীকার হচ্ছে, তখন হঠাতই তাদের কাছে ধর্ম থেকে ভাষাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল এবং একটা সময় তারা পশ্চিম থেকে আলাদা হতে বাধ্য হল। এক্ষেত্রেও সিরাজুল এর উপসংহারকে মেনে নিতে হয়। প্রকৃতপক্ষে দুইবার এই ভূখন্ড স্বাধীন হলেও একটি বিশেষ শ্রেণী ছাড়া আপামর জনসাধারণের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হতে দেখা যায়নি। গান্ধী, জিন্নাহ এরা যেমনিভাবে কখনোই নিজের শ্রেণীস্বার্থের বাইরে আসতে পারেননি, তেমনিভাবে শেখ মুজিবও নিজ শ্রেণীর স্বার্থই দেখেছেন। গান্ধী বা জিন্নাহরা পারতেন উপমহাদেশের রাজনীতিকে একটা ইহজাগতিক রূপ দিতে, কিন্তু তারা তা না করে বরং রাজনীতিকে ধর্মাশ্রয়ী করে ��ুলেছেন, যে আদিপাপের ফল এই উপমহাদেশের তিনটি দেশই এখনও ভোগ করে যাচ্ছে। পরবর্তীতে শেখ মুজিবও ব্যর্থ হয়েছেন একই জায়গায়।
লেখকের সাথে যে জায়গায় স্পষ্ট দ্বিমত পোষণ করতে হয় তা হচ্ছে লেখকের মতে স্বাধীনতা থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল মানুষের মুক্তি, এবং এই মুক্তি তার মতে একমাত্র সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমেই আসতে পারত। অবশ্যই স্বাধীনতা থেকে মুক্তি অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যাপক, কিন্তু মুক্তির মাধ্যম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কী না এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ থাকে। সমাজতন্ত্র ইতিমধ্যেই প্রায় সব দেশে ব্যর্থ হয়েছে, এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো একটা সময় কর্তৃত্ববাদী সরকারের জন্ম দেয়। পুঁজিবাদের সমস্যা আছে হাজারটা, সবচেয়ে বড় সমস্যা পুঁজিবাদ অমানবিক। মানুষের মধ্যে বৈষম্য জিইয়ে রাখতে পুঁজিবাদ অব্যর্থ হাতিয়ার হিশেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত মনে হয় না পুঁজিবাদ থেকে উন্নততর কোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমরা আবিষ্কার করতে পেরেছি। তাই পুঁজিবাদের ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে তাকে কিছুটা সমাজতান্ত্রিক বানানোর চেষ্টাই বর্তমান সময়ে অধিক যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। কল্যাণবাদী রাষ্ট্রের ধারণা এরকম চিন্তারই ফসল।
এই আদর্শিক ভিন্নতা বাদ দিলে সিরাজুল এর প্রায় সিদ্ধান্তসমূহের সাথেই একমত হতে হয়েছে। ধারাবাহিক ইতিহাস বিশ্লেষণের পাশাপাশি ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে আমাদের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে লেখক সমাজ ও সময়ের উপর বুদ্ধিজীবীদের প্রভাব এবং একই সাথে বুদ্ধিজীবীদের উপর সমাজ ও সময়ের প্রভাব এই দুইটিকেই স্পষ্টভাবে দেখাতে পেরেছেন। দেখতে পাই ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উত্থানের পেছনে রাজনীতিবিদদের অপেক্ষা তখনকার কবি-সাহিত্যিকদের ভূমিকাও কম নয়। বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে জাতীয়তাবাদের উপর আলো ফেলা হয়েছে এই বইতে। দেখা যাচ্ছে হয়ত বিবেকানন্দ একদম সাধারণ মানুষের কাতারে নিজেকে নিয়ে আসতে পারছেন, কিন্তু ঠিকই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী মানসিকতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারছেন না, ফলশ্রুতিতে ইহজাগতিক থাকা সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে। আবার ভারতীয় অপেক্ষা বাঙালী জাতীয়তাবাদকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বঙ্কিম কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি শুধু যে ধর্মনিরপেক্ষ থাকতে পারলেন না তাই নয়, হয়ে গেলেন সাম্প্রদায়িক, এবং ধর্ম নিয়ে বিভক্তিকে উৎসাহিত করলেন। এইভাবে সেই সময়ের রাজনীতিবিদ-কবি-সাহিত্যিক-বিদ্বৎজনদের মধ্যে কাওকেই প্রশ্নাতীতভাবে নির্দোষ বলা যায় না, শুধু একজন মূর্তিমান ব্যতিক্রম বাদে। তিনি রবীন্দ্রনাথ! বাঙালির শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক খুব সম্ভবত সব মিলিয়েই শ্রেষ্ঠ বাঙালি, কারণ আর কেউ যা দেখতে পায় না তিনি তাই দেখতে পেতেন, তাও স্পষ্ট! জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন আঙ্গিকে তার বক্তব্য এখনও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। হয়ত যে দিব্যদৃষ্টি তাকে দিয়ে অমানবিক সব সাহিত্যে সৃষ্টি করিয়ে নিয়েছিল, সেই একই দিব্যদৃষ্টি দিয়ে তিনি চিরন্ততার সন্ধান পেয়ে যেতেন খুব সহজে আর অন্য সবার জন্য যা বলা অচিন্ত্যনীয়, তাই তিনি বলতে পারতেন অবলীলায়। এজন্যই গান্ধী যেখানে ধর্মের সাথে মিশিয়েছেন রাজনীতিকে, সেখানে রবীন্দ্রনাথ আগাগোড়াই ছিলেন ধর্ম আর রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের পক্ষে।
বাঙালী জাতীয়তাবাদের একটি সংক্ষিপ্ত কালানুক্রমের মধ্যে ঘুরিয়ে নিয়ে আসে এই বই। বাড়তি হিশেবে এই বই আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় অনেক বিদ্বৎজন সম্পর্কে একটু বিকল্প চিন্তার যোগান দেয়।
The narration is flawless and that is the best thing about the book. Otherwise reading a book of this mega-size would not have been possible. This book has made me interested about Muzaffar Ahmed, Moulana Abul Kalam Azad and Kazi Nazrul Islam, also Gandhi, may be through Amartya Sen. Lets see...
বইটি পড়ে কেঁদেছি; চরম হতাশায় ক্ষোভে দুঃখে। ইতিহাসের বই মানুষকে কাঁদাতে পারে কি না জানি না; কিন্তু স্যারের লেখার ধার এতই প্রখর যে প্রতিটি মুহুর্তে "জনগণের মুক্তি" ক্ষমতা লোভীদের হাতে ছিনতাই হতে দেখে বিপন্নবোধ করছি। ইতিহাসের নায়কেরা কেউ ছাড় পায় নি বইতে; সবাইকে একে একে কাঠগড়ায় বিচার করা হয়েছে। স্যার খোলাখোলিভাবেই সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বইটি লিখলেও এম এন রায় কিংবা মোজ্জাফফর কাউকেই ব্যর্থতার দ্বায় মুক্তি দেয়া হয় নি। স্বাভাবিকভাবে আমি খুব দ্রুত পড়লেও বইয়ের প্রতিটি প্যারাতে সময় নিয়েছি লেখকের মনোভাবের/উপলব্ধির সাথে একত্ব হতে।
বিপুলায়তন এই বইটি এবং বাঙালির জাতীয়তাবাদ এই দুইটি বই ভালো করে পড়লে ১৯৪৭ এর পূর্ববর্তী রাজনীতি থেকে দেশভাগ পর্যন্ত একটা স্পষ্ট ধারণা হয়ে যাবে৷ বাঙালির জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি ভাষা। এটাকে অস্বীকার করলে সমস্যা হয়, হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের মুক্তি মেলেনি।