পালরাজ তৃতীয় বিগ্রহপালের মৃত্যুকালে পালরাজ্য বৈদেশিক শত্রুর আক্রমণ ও অন্তর্বিপ্লবে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তৃতীয় বিগ্রহপালের তিন পুত্র ছিল- দ্বিতীয় মহীপাল, দ্বিতীয় শূরপাল ও রামপাল। পিতার মৃত্যুর পর দ্বিতীয় মহীপাল সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু চারদিকে তখন বিশৃঙ্খলা ও ষড়যন্ত্র চলচিল। পারিষদবর্গের উষ্কানিতে রাজা মহীপাল তাঁর দুই ভাই শূরপাল ও রামপালের উপর বিশ্বাস হারান এবং তাঁদেরকে কারারুদ্ধ করে রাখেন। মহীপাল প্রায় পাঁচ বছর রাজত্ব করেন। তাঁর রাজত্বকালের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ঘটনা উত্তর বাংলায় সামন্ত বিদ্রোহ। বরেন্দ্রের সামন্তবর্গ প্রকাশ্যভাবে বিদ্রোহী হয়ে রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বলা হয় কৈবর্ত নায়ক দিব্বোক বা দিব্য ছিলেন এই বিদ্রোহের নেতা। দিব্বোক মহীপালকে হত্যা করে বরেন্দ্রভূমি দখল করে নেন এবং নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
উত্তর বাংলায় দিব্বোক ও তাঁর বংশের শাসন বেশ কিছুকাল অব্যাহত ছিল। দিব্বোকের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই রুদোক এবং তারপরে রুদোকের পুত্র ভীম বরেন্দ্রভূমিতে রাজত্ব করেন। পরে অবশ্য রামপাল পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধার করেন।
সেন, সত্যেন (১৯০৭-১৯৮১) সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিক। ১৯০৭ সালের ২৮ মে মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ি উপজেলার সোনারঙ গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতৃব্য ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব আচার্য।
সত্যেন সেন সোনারঙ হাইস্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস (১৯২৪) করে কলকাতা যান এবং সেখানকার একটি কলেজ থেকে এফ.এ ও বি.এ পাস করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ (ইতিহাস) শ্রেণীতে ভর্তি হন। কিন্তু যুগান্তর দলের সদস্য হিসেবে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তিনি ১৯৩১ সালে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন এবং জেলে থেকেই বাংলা সাহিত্যে এম.এ পাস করেন। জেল থেকে মুক্তিলাভের (১৯৩৮) পর বিক্রমপুরে ফিরে তিনি কৃষক আন্দোলনে যোগ দেন এবং আমৃত্যু বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নির্বাচিত হন। সত্যেন সেন ১৯৪৯, ১৯৫৪, ১৯৫৮ ও ১৯৬৫ সালে রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার হয়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করেন।
সত্যেন সেন ১৯৫৪ সালে দৈনিক সংবাদ-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। এ দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে সত্যেন সেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের সংগঠক এবং উদীচী (১৯৬৯) সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত ও গণসঙ্গীতের সুকণ্ঠ গায়ক এবং গণসঙ্গীত রচয়িতা।
সত্যেন সেন সাহিত্যচর্চা শুরু করেন পরিণত বয়সে এবং অতি অল্পসময়ের মধ্যে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় চল্লিশ। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ: উপন্যাস ভোরের বিহঙ্গী (১৯৫৯), অভিশপ্ত নগরী (১৯৬৭), পদচিহ্ন, (১৯৬৮), পাপের সন্তান (১৯৬৯), কুমারজীব, (১৯৬৯), বিদ্রোহী কৈবর্ত (১৯৬৯), পুরুষমেধ (১৯৬৯), আলবেরুনী (১৯৬৯), মা (১৯৬৯), অপরাজেয় (১৯৭০), রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ (১৯৭৩); ইতিহাস মহাবিদ্রোহের কাহিনী (১৯৫৮), বাংলাদেশের কৃষকের সংগ্রাম (১৯৭৬), মানবসভ্যতার ঊষালগ্নে (১৯৬৯), ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা (১৯৮৬); শিশুসাহিত্য পাতাবাহার (১৯৬৭), অভিযাত্রী (১৯৬৯); বিজ্ঞান আমাদের এই পৃথিবী (১৯৬৭), এটমের কথা (১৯৬৯); জীবনী মনোরমা মাসীমা (১৯৭০), সীমান্তসূর্য আবদুল গাফফার খান (১৯৭৬) ইত্যাদি।
চিরকুমার সত্যেন সেন বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে প্রগতিশীল ও গণমুখী চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহিত্যসাধনা করেন। তাঁর রচনায় ঐতিহ্য, ইতিহাস, দেশের মাটি ও মানুষের শ্রেণী-সংগ্রাম প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি উপন্যাসের জন্য ‘বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার’ (১৯৭০) লাভ করেন।
১৯৮১ সালের ৫ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনএ তাঁর মৃত্যু হয়।
সংগত কারণে প্রত্যেক ধর্মের মৌলিকতা আছে। প্রত্যেক ধর্ম আলাদা আলাদা মৌলিকতা নিয়ে গড়ে ওঠে । অনেকে মনে করে থাকেন বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্ম প্রায় একই রকম । এর এক্টী বিশেষ কারণ হতে পারে গৌতম বুদ্ধের পিতৃকুল ছিলেন হিন্দু ধর্মালর্ম্বী। আর একটি কারণ হতে পারে দুই ধর্মের আচার অনুষ্ঠান প্রায় একি রকম। তবে প্রত্যেকে সতন্ত্র। আমাদের উপমহাদেশে সম্রাট অশোকের বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ এর পর থেকে এই ধর্মের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। এক সময় বৌদ্ধ ধর্ম হয়ে ওঠে রাজ ধর্ম।
ধর্ম সব সময় শাসকের পক্ষে থাকে । ক্ষমতাবান একজন শাসকের ধর্মই সব সময় বেশি মাত্রায় প্রচারশীল। কোন ধর্ম এর ব্যাতিক্রম নয় । শাসকের ক্ষমতা হারানোর সাথে সাথে ভৌগলিক এলাকায় সেই ধর্ম গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।
পাল রাজাদের ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকে বিশেষত বিগ্রহপালের পিতার বিশেষ উদার নীতির ফলে । বিগ্রহপালের পিতার সময় থেকে প্রধান অমত্য সব সময় হিন্দু ধর্মালম্বী হতে হবে এই রীতি চালু ছিল। রাজা বৌদ্ধ এবং প্রধান আমত্য ধর্মালম্বী এতে করে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজাদের মনে কোন অসন্তোষ থাকবে না। কিন্তু রাজা মহীপালের প্রধান আমত্য ছিলেন খুব ভাল একজন কূটনীতিবিদ , যার প্রভাবে রাজা মহীপাল কখন নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেনি । মহীপালের পিতা রাষ্টকূট নন্দিনী শঙ্খ্যা দেবীকে বিবাহ করে নিয়ে আসেন । তিনি হিন্দুধর্মালম্বী থাকায় প্রত্যাহিক পূজা অর্চনা ইত্যাদি পালন করে থাকেন যাহা ভিক্ষূদের মনঃপুত ছিল না কখন । মূল কাহিনী রাষ্টকূট নন্দিনী শঙ্খ্যা দেবী তার পুত্র রামপাল কে রাজা বানানোর জন্যে অন্য ভাইদের সাথে দ্বন্দ জাড়ীয়ে পড়েন। অভ্যান্তরীন রাজদ্বন্দ এবং কৌবর্তদের উপর অত্যাচার এর মাত্রা বেড়ে গেলে বর্বর অশিক্ষিত কৈবর্তরা এক সময় গৌড় দখল করে নেয় যাহা ছিল গৌড়ের মানুষের স্বপ্নের অতীত। এছাড়া রাষ্টকূট নন্দিনী শঙ্খ্যা দেবী ও রাজ বৈদ্য হরিগুপ্তের একটা প্রেমের টুইষ্ট এবং দিব্বোক এর শাসন নীতির ও কাহিণী বর্নিত আছে । এক কথায় অসাধারণ একটী ঐতিহাসিক উপন্যাস
বিখ্যাত কৈবর্ত বিদ্রোহ নিয়ে সত্যেন সেনের এই উপন্যাস। এককালের বিখ্যাত বামপন্থী কর্মী সত্যেন সেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তার পদচারনা পাঠকের অবগত। ‘বিদ্রোহী’ কৈবর্ত তার অন্যতম আলোচিত সাহিত্যকর্ম।
কিন্তু বইটা নিয়ে যতটা আলোচনা হয় বা যতটা ভালো বলা হয় তা বলতে পারছি না। কেননা সত্যেন সেন যা করেছেন তা কিছুটা স্বার্থ উদ্ধারের মতো। একথা এই কারণে বলছি, তিনি যে ভাবে উপন্যাসে বর্ণনা এনেছেন তাতে বোঝাই যাচ্ছে তিনি সেই পালযুগের আখ্যান বলতে উপন্যাস লেখেননি বরং সেই পালযুগের একটি ঘটনাকে উপজীব্য করে কমিউনিস্ট নীতি প্রচার করেছেন।
কিছু জায়গায় লেখক এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন যা পড়লে বোঝা যায় লেখক এই সময়ে দাঁড়িয়ে সেই সময়কে দেখাচ্ছেন। ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে, আমি মনে করি লেখককে সেই সময়ে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। সেই সময়ের আলোকে সে সময়কে বুঝতে হয়। সেন মশাই তা না করে এই সময়ের জীবন, আচারের আলোকে সেই সময়কে উপস্থাপন করেছেন। একথা সত্য যে কৈবর্তরা নিজেদের অধিকার আদায়ে বিদ্রোহ করেছিল। সেই বিদ্রোহকে আধুনিক সমাজতন্ত্রের আলোকে ব্যখ্যা করা যায় কিন্তু সেই তত্ত্বে মুড়ে উপন্যাস হিসেবে প্রচারে আমার কিঞ্চিৎ আপত্তি থাকে।
প্রায় চারশত বছর স্থায়ী পাল সম্রাজ্যে একসময় ঘুন ধরে। শেষদিককার রাজাদের আমলে ক্রমাগত কমতে থাকে রাজ্যের সীমা। ২য় মহীপাল ক্ষয়িষ্ণু ও সমস্যাকীর্ণ রাজ্য পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে। তাঁর আমলে জ্বলে ওঠে কৈবর্ত বিদ্রোহের আগুন।
কৈবর্তদের ব্যাপারে খুব বেশি জানা যায় না। একমাত্র ঐতিহাসিক বিবরণ(তাও অনিরপেক্ষ) পালরাজা রামপালের সভাকবি সন্ধ্যাকর নন্দী রামচরিত। কৈবতরা ছিল বরেন্দ্র (দিনাজপুর) অঞ্চলের বাসিন্দা। মান-মর্যাদায় সমাজের নিচু শ্রেণী। এরা মূলত কৃষিজীবী বা মৎস্যজীবী ছিলেন। কৈবর্ত বিদ্রোহকে উপমহাদেশের প্রথম সফল কৃষক বিদ্রোহ। অবশ্য বিদ্রোহের কারণ ও প্রকৃতি নিয়ে আছে ব্যাপক মতভেদ। যদিও কৃষক বিদ্রোহ বলা হয় তবে বিদ্রোহী নেতা দিব্যক ছিলেন পালদের অধীনস্থ একজন সামন্ত রাজা, যার ডাকে কৈবর্তরা এই বিদ্রোহে সামিল হয়।
কৈবর্ত বিদ্রোহের এই ধোঁয়াশা মাখা পটভূমিকে কাজে লাগিয়েই লেখা বিদ্রোহী কৈবর্ত। গল্পের গতি অত্যন্ত সরল ও একমুখী। টানটান উত্তেজনার আশা নিয়ে পড়তে বসলে হতাশ হবেন। গল্পের পরিণতি টানা হয়েছে ইতিহাসের সাথে সাযুজ্য রেখেই। উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট হচ্ছে দিব্যক। ইনি কৈবর্তদের নেতা। সেসময় গৌড়ের ক্ষমতায় ২য় মহীপাল। তিনি ও তাঁর হিন্দু মন্ত্রী বরাহস্বামীকে বলা যায় প্রতিনায়কের। বিগত কয়েক রাজার আমল থেকেই গৌড়ের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল বরেন্দ্রীয় কৈবর্ত। তাদের কষ্টের ফসলে গৌড়ের শ্রীবৃদ্ধি হলেও, তারা হতো বঞ্চিত। মহীপালের দুর্বলতা ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের সুযোগে দিব্যকের নেতৃত্ব কৈবর্তরা বিদ্রোহী হন। যুদ্ধে মহীপালকে পরাজিত ও নিহত করে পায় শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। মূলপল্টের সাথে থাকা দুটো সাবপ্লটকে বলা যেতে পারে ডিগ্রেসন। দুটো সাবপ্লটের, মূলগল্পের ওপর প্রভাব যৎসামান্য।
ইতিহাসের সহায়তায় প্লট নির্মাণ করলেও কৈবর্ত বিদ্রোহের কারণ আর প্রকৃতি অংকনে সত্যেন সেন ব্যবহার করেছেন তাঁর নিজস্ব দর্শন। এক্ষেত্রে সত্যেন সেনকে নিয়ে দু'লাইন লেখা উচিত। সত্যেন সেন একজন লেখক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক। তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট রাজনীতিতে বিশ্বাসী ও উদীচির প্রতিষ্ঠাতা। উপন্যাসে কৈবর্তদের সমাজ তিনি যেভাবে এঁকেছেন তাতে মাথায় আসে শোষণ ও শ্রেণীবিহীন সমাজের গল্প। গৌড়ীয় ও কৈবর্তদের সংঘর্ষ যেন শ্রেণীসংগ্রাম। কৈবর্তদের গৌড় বিজয় যেন কমিউনিস্টদের চিরকালীন বিশ্বাস শ্রেণীসংগ্রামের মধ্য কমিনিজমের অবশ্যম্ভাবী জয়।
সাল ১০৭২, পাল সাম্রাজ্যের সূর্য স্তিমিত। অনন্তে যাত্রা করেছেন মহারাজ তৃতীয় বিগ্রহপাল। সিংহাসনে এখন দ্বিতীয় মহীপাল, কারাগারে বন্দি অপর দুই ভাই দ্বিতীয় শূরপাল ও রামপাল।
সময় টালমাটাল, চারিদিক বিশৃঙ্খলা আর ষড়যন্ত্র। পরিষদ বর্গ মহীপালের পক্ষে থাকলেও রাজমাতা রাষ্ট্রকূটনন্দিনী শঙ্খদেবী রাজসিংহাসনে বসাতে চান শূরপাল বা রামপালকে। তিনি গোপন এক বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এই দিকে মহীপালের পরিষদ বর্গের উচ্চপদস্থ সকলে হিন্দু কিন্তু রাজ ধর্ম বৌদ্ধ। কিন্তু পরিষদের প্রভাবে রাজ ধর্মের উপর জেঁকে বসছে। এই কারণে বৌদ্ধ মঠের পরিচালকরা মহীপালের বিরুদ্ধে, তারা শূরপাল বা রামপালের দিকে চেয়ে আছে। তারা আসবে, রাজধর্মকে আবার তার নিজ মহিমায় ফিরিয়ে আনবে। ফলে তারা শঙ্খদেবীর পক্ষে।
নগরে যখন এই অবস্থা, ঠিক তখনি বরেন্দ্র অঞ্চলও ফুঁসছে। ফুঁসছে সমগ্র কৈবর্ত সমাজ। …… এখানে ‘কৈবর��ত’ সম্প্রদায় নিয়ে একটু বলা যাক।
‘কৈবর্ত’ বলতে জেলে সম্প্রদায়কে বোঝান হলেও পাল শাসনের সেই সময় আমরা কৃষক সম্প্রদায় এর ‘কৈবর্ত’ পাই, যারা ‘হেলে’ বলে পরিচিত ছিল। হাল চাষ করত বলে হালিয়া>হেলে নামে তারা পরিচিত ছিল।
‘কৈবর্ত’ জাতির উৎপত্তি নিয়ে তাদের নিজস্ব একটা মিথ প্রচলিত আছে। এক ছিল কট্টলি। কট্টলি কে? গরু যেমন সৃষ্টির শুরু থেকেই গরু, ঠিক তেমনি কট্টলি সৃষ্টির শুরু থেকে কট্টলি। একদিন সেই কট্টলি স্বপ্ন দেখল, তার পেট থেকে বেরিয়ে এসেছে এক দামাল ছেলে। সে বিকট সুরে গর্জে উঠে বলল, আমি কৈবর্ত। কট্টলির এই স্বপ্ন সত্যি হয়েছিল। দেবতার কাছে প্রার্থনা করল কট্টলি। তখন আকাশ থেকে নেমে এল এক পাখি, জাপটে ধরল কট্টলি কে। কট্টলিও পাখি হয়ে উড়ে গেল আকাশে। আকাশেই মিলিত হল তারা। এরপর কট্টলি দুটি ডিম পাড়ল, সেই ডিম থেকে বের হয়ে এল ‘হাম্মা’ আর ‘হাম্মি’। এরাই প্রথম কৈবর্ত। ……………
সনাতন ধর্মে শ্রেণি বৈষম্যের কারণে চতুর্বর্ণের সৃষ্টি হয়েছে – ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য আর শূদ্র। শূদ্ররা ছিল পেশাজীবী। শূদ্রদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সৎশূদ্র আর অসৎশূদ্র। ১৭টি পেশাজীবী সম্প্রদায়কে অসৎশূদ্রের অন্তর্গত করেছে তারা। ‘কৈব্যেছ’ এই সতেরোটি সম্প্রদায়ের একটি।
আবার, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে, ক্ষত্রিয়ের পরিণীতা বৈশ্যা পত্নীর সন্তানের নাম কৈবর্ত বলে পরিগণিত হয়েছে। ঋষি মনুর ভাষ্য মতে – ‘নিষাদ নৌকর্মজীবী মার্গব নামক সন্তান উপাদন করে। এদের আর্যাবর্তবাসীগণ কৈবর্ত নামে অভিহিত করেন।’ ……… কৈবর্ত এর উৎপত্তি যাই হোক না কেন, পাল শাসনের সেই সময় বরেন্দ্র অঞ্চলে ছিল হেলে বা ধান চাষী কৈবর্ত। আর এদের বর্বর জাতি হিসেবে অবিহিত করা হত। সেই বর্বর জাতির চাষ করা ধানই কৌশলে পাচার হত রাজধানীতে। এর উপর অন্যায্য কর আরোপ তো ছিলই। এই জন্য সমগ্র কৈবর্ত জাতি ভেতরে ভেতরে ফুঁসছিল।
রাজধানীর সেই ষড়যন্ত্র সফল হওয়ার আগের কৈবর্তরা হামলা করে বসল, আর এই হামলার ফলে নিহত হয় মহীপাল। যা ইতিহাসে কৈবর্ত ‘বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। সেই সময় কৈবর্তদের নেতা ‘দিব্বোক’ বসেন সিংহাসনে, তার মৃত্যুর পর ভাই ‘রুদোক’ ও তার পর রুদোক পুত্র ‘ভীম’ শাসন করে বরেন্দ্রভূমি। পরে রামপাল ভীম কে পরাজিত করে পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধার করে। …
কৈবর্ত বিদ্রোহের এই ইতিহাসের অস্থির উপর উপন্যাসের মাংস চড়িয়ে সত্যেন সেন রচনা করেছেন ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’ উপন্যাস। মূল ইতিহাস ঠিক রেখে ঔপন্যাসিক স্বাধীনতা ব্যবহার করেছেন তিনি। সহজ সরল ভাষায় বর্ণনা করেছেন কাহিনী। ইতিহাসের খুব গভীরে প্রবেশ করেন নি তিনি, যাননি বিদ্রোহ এর বিস্তারিত বর্ণনাতে। তাই, কাঠখোট্টা কোন উপন্যাস না বরং হয়েছে একটা সুখপাঠ্য অথচ ঐতিহাসিক এক উপন্যাস।
বাংলার ইতিহাস ভিত্তিক উপন্যাস পাঠের ইচ্ছা জাগ্রত হয় শওকত আলীর "প্রোদোষে প্রাকৃতজন" বইটি পড়ে। এরপর আহমদ সফার "জাগ্রত সংগ্রাম" বইটিতে সত্যেন সেন এর ইতিহাস ভিত্তিক উপন্যাস এর তারিফ শুনে এই বইটি পড়ি এবং মোটেও নিরাশ হইনি। কৈবর্ত বিদ্রোহ সম্পর্কে আগে শুনে থাকলেও এ সম্পর্কে বিস্তারিত কোন কিছু জানা ছিল না। সেই ইতিহাস প্রেক্ষাপটে লেখক তৈরি করেছেন এই উপন্যাসটি। কৈবর্ত সম্প্রদায় যাকে তখন অন্যান্য রাজ্য শোষণের শস্যক্ষেত্র হিসেবে ভাবত তাদের জেগে উঠার কাহিনী এ উপন্যাসে ফুটে উঠেছে জীবন্তভাবে। সামগ্রিক সংগ্রাম থেকে নানা ঘটনাবলির মধ্যে মানুষের মিথস্ক্রিয়ায় চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে এই উপন্যাসে। যারা ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস পাঠ করতে ভালোবাসেন তাদের জন্য এই বইটি অত্যন্ত উপভোগ্য হবে বলে আমি মনে করি।
আমাদের বাড়ির মাচায় একটা বই পাইসিলাম।ছেড়া-কয়েকটা পাতা। এই বইটা দেখে ভেবেছি সেই গল্পটাই বোধহয়। কিন্তু পুরোটা পড়ে বুঝলাম যে না,সেই গল্পটা না। যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনা নাই। 🥲
বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে জানাশোনা আছে অথচ কৈবর্তদের নাম শোনেনি এমন মানুষ হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। আচ্ছা, কারা এই কৈবর্ত? কৈবর্তরা হল সূর্য আর কট্টলির সন্তান। এই কট্টলি আবার কে? কট্টলি হল কৈবর্তদের মাতৃভূমি, পালরাজারা যার নাম দিয়েছে বরেন্দ্রী। এই কট্টলিই কৈবর্তদের মা, তার মাটি থেকেই কৈবর্তদের জন্ম। মাটি থেকে আবার মানুষ জন্মায় নাকি? মাটি থেকে গাছপালা জন্মায়, কিন্তু মানুষ? মানুষ তো জন্মায় মায়ের পেট থেকে। কিন্তু তখন মা-ই বা আসবে কোত্থেকে? তখন যে কোনো মানুষই ছিল না সেই জনপদে। সারা কট্টলি জুড়ে তখন শুধুই বন, তার মাঝে ঘুরে বেড়ায় দত্যিদানো, দেও দেবতা, পাখপাখালি, জন্তুজানোয়ার, সাপখোপ আরো কত কি! কিন্তু এতোসব পেয়েও কট্টলির মন ভরে না।। একদিন একটা স্বপ্ন দেখে জেগে উঠলেন কট্টলি।উঠে কপালে চাপড় মেরে বললেন, হায় হায়, কোথায় গেল সে? আমার কোল খালি, আমার বুক খালি, আমি কি নিয়ে থাকব? সবাই বলল, সেকি গো? তোমার কোল খালি হবে কেন? এখানে যারা পায়ে হেঁটে বেড়ায়, বুকে চলে বেড়ায়, ডানায় ভর দিয়ে শুন্যে উড়ে বেড়ায়, জলের মধ্যে সাঁতড়ে বেড়ায়, তারা সবাই যে তোমার সৃষ্টি। তোমার অভাব কিসের? কিন্তু না, কট্টলির মনে সুখ নেই। সকল সৃষ্টির যে সেরা সৃষ্টি, সেই যদি না থাকল, তবে থাকল কি? কোথায় গেল সেই দামাল ছেলেটা? কট্টলি যে স্বপ্নে দেখলেন, তার পেট থেকে বেড়িয়েই সে তার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এইটুকু ছেলে, কিন্তু গায়ে অসুরের জোর, ব্যথায় কুঁকড়ে গেলেন কট্টলি। বড় বেদনা, কিন্তু বড় সুখ! জিজ্ঞেস করলেন, কে রে তুই? ওরে দস্যু, তুই কোত্থেকে এলি? তুই কি আমাকে খেয়ে ফেলবি নাকি? সে বলল, আমার যে বিষম ক্ষিদে, আমি তোমায় খাব, নইলে এ খিদে মিটবে না। কট্টলি বললেন, তোর মন যা চায় কর। কিন্তু তোর নাম কী রে? সে গর্জে উঠে বলল, আমি কৈবর্ত। সেই বিকট গর্জনে কট্টলির ঘুম ভেঙে গেল। কোথায় গেল সেই কুচকুচে কালো কোঁকড়া চুলের দুরন্ত ছেলেটি! কট্টলি তখন দেবতাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, ওগো দেবতারা, সে আসুক। আমায় কুড়ে কুড়ে খাক, তবুও সে আসুক। তখন জল-স্থল-আকাশের দেবতারা সমস্বরে বললেন, তাই হোক। তারপর কট্টলির পা বেয়ে রক্তের ধারা নামল, সে রক্ত গড়াতে গড়াতে তৈরি হল কৈবর্তদের লালনদী- যে নদীতে স্নান করলে বন্ধ্যা মেয়ের সন্তান জন্মায়, র জলসিঞ্চনে জমি হয় ফসলভারানত। এরপর কট্টলি উঠে দাঁড়ালেন, আশ্চর্য এক মন্ত্র পড়লেন সূর্য দেবতাকে উদ্দেশ্য করে। অনেকটা সময় কেটে গেল। শেষে সূর্য বিরাট এক পাখি হয়ে নেমে আসল, পাখা দিয়ে জাপটে ধরল কট্টলিকে। কট্টলিও তখন পাখি হয়ে সূর্যকে নিয়ে পুরো আকাশে সাতবার ঘুরে আসলে��। তারপর বাসা বাঁধলেন তাঁরা। কট্টলি পাড়লেন দুটো ডিম, যা ফুটে পাখি নয়- বেরোল দুজন ছেলেমেয়ে – হামমা আর হামমি, কৈবর্তদের পূর্বপুরুষ। ভলকু বুড়ো সন্ধ্যাবেলায় কৈবর্তপল্লীর ছেলেদেরকে গল্পটা শোনাচ্ছিল। সবশেষে বলল, আমরা কৈবর্তরা সূর্যের সন্তান, সব জাতের সেরা জাত। অমনি একটা ছেলে বলে উঠল, তবে সবার লাথি খেয়ে মরছি কেন? সবাই তার কথায় সায় দিল। কারণ ঘটনাটা যে সময়ের, তখন পালদের অত্যাচারে বিদ্রোহ যেন ফুঁসে উঠছে কৈবর্তদের মনে। ওই পালরাজারা চুক্তি অমান্য করে তাদের ফসলের ভাগ কেড়ে নেবে, তাদের প্রেরিত রাজপুরুষেরা ওদেরই জমি কেড়ে নিয়ে কারণে অকারণে অত্যাচার করবে, লোলুপ দৃষ্টি দেবে কৈবর্ত মেয়েদের ওপর- এতো অত্যাচার কী ওদের ফুটন্ত রক্ত সহ্য করতে পারবে? রাগ তো ওদের রাজা দিব্বোকের ওপরও। ওদের এমন বন্ধুটিও কিনা শেষকালে ওই গৌড়ের রাজার গোলাম হল? ওদের অসন্তোষ বাড়তে থাকে, প্রস্তুত হতে থাকে ভবিষ্যৎ বিস্ফোরণের অগ্নিকুণ্ড। অথচ এটি নিয়ে গৌড়রাজ মহীপালের কোনো মাথাব্যথা নেই। তিনি তখন ব্যস্ত ঘরের কোন্দল সামলাতে। দুই ভাইকে জেলে পুরে তিনি তখন সিংহাসনে- যদিও সবকিছু চলে প্রধান অমাত্য বরাহস্বামীর কথায়, তবুও সিংহাসনের মায়া কি সহজে কাটে! তখন সর্বত্র ঘুলিয়ে উঠছে ষড়যন্ত্র, উদ্দেশ্য রামপালকে কারামুক্ত করা। রামপালের মাতা শংখদেবীকে নজরবন্দি করেও পরিস্থিতি বাগে আনা যাচ্ছে না। এমন সময়ে মহাসান্ধিবিগ্রহিক পদ্মনাভ কৈবর্তদের সমস্যা তুলে ধরলেও তা যে যথেষ্ট মনযোগ পাবে না, এতো জানা কথা, বিশেষত বরাহস্বামী যখন সেই “বর্বরদের ওপর দণ্ডনীতি চালাতেই বেশি আগ্রহী, তখন নবিশ রাজা মহীপালের কীইবা বলার থাকে! তবে শুধু কৈবর্তদের নিয়েই নয়, আরেকটি অসন্তোষের ব্যাপারেও তারা উপেক্ষা দেখিয়েছিলেন। রাজা যখন তার টালমাটাল সিংহাসন সামলাতে ব্যস্ত, তখন সারাদেশের বিহারের প্রধানরা সমবেত হয়েছিলেন সোমপুর বিহারে। বৌদ্ধধর্ম চর্চার ক্ষেত্রে শিথিলতা এবং হিন্দুধর্মের বাড়বাড়ন্ত দেখে তারা চিন্তিত হয়েছিলেন বটে। এমন সময় তাদের কাছে আসে দলবদলের প্রস্তাব। কী সিদ্ধান্ত নেবেন তারা? কৈবর্তরা কি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব আবার প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে? প্রাসাদ ষড়যন্ত্রই বা মোড় নেবে কোন দিকে? মোটা দাগে উত্তরগুলো হয়তো আমাদের জানা, কিন্তু পরমাণুর বর্ণালীকে একটি রেখা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা আরো অনেকগুলো সূক্ষ্ম রেখায় বিভক্ত থাকে। ব্যাপারটা শুধু চমকপ্রদই নয়, বিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণও। ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহই ঠিক তেমনি। আর এই সূক্ষ্ম রেখাগুলোকে অবলোকন করার সুযোগ এনে দেবে সত্যেন সেনের “বিদ্রোহী কৈবর্ত” নামক ঐতিহাসিক উপন্যাসটি। জানা যাবে আমাদের তথাকথিক বর্বরদের প্রকৃত রূপ, আর বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজবংশের অন্ধকার দিকগুলোও। দেশপ্রেমের নিদর্শন, রাজনীতির কলুষতা, আদিম সারল্য, মানুষের পরিবর্তন- সবই ধরা পড়বে এই এক মলাটে। পালদের সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। আরো অনেক শাসক এসেছে-গেছে। ইতিহাসও বারবার তার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে। আমরা সচরাচর যা ভাবি, কল্পনা করি, তা প্রায় সময়ই বাস্তবতার কাছে হার মানে। অপাংক্তেয় বলে ছুড়ে ফেলা মানুষগুলোই লেখে নতুন ইতিহাস, খুলে পড়ে তথাকথিত সভ্যদের মুখোশ। লেখক ঠিকই বলেছেন, “ এ আমাদের বর্বর সভ্যতা”।
সভ্যতা বেশিরভাগ সময় অসভ্যতার পরিচয় প্রদান করে থাকে। বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী পাল বংশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এর প্লট। বৃদ্ধ রাজার বিবাহ, উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব, রাজ্য সম্প্রসারণের ইচ্ছা, অসম প্রেম ভালবাসা এবং একজন দৃঢ় স্বাধীনচেতা মানুষের প্রচন্ড ইচ্ছা শক্তি প্রকাশ পেয়েছে এই লেখায়। বাংলায় পাল রাজার ইতিহাস জানার জন্য অনেক বই পাওয়া যাবে। কৈবর্তকে জানার জন্য বই পাওয়া যেতে পারে কিন্তু এর অন্তর্নিহিত বিষয়কে এত সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে এমন বই আর আছে কিনা আমার জানা নেই। পড়াও নেই।