"এই জীবনে বেশির ভাগ কাজই করেছি আমি ঝোঁকের মাথায়। হঠাৎ একটা ইচ্ছে হল, কোনদিকে না তাকিয়ে ইচ্ছেটাকে সম্মান দিলাম। পরে যা হবার হবে।"
এরকম ঝোঁকের ইচ্ছেকে সম্মান দেয়ার ছোট্ট কয়েকটা উদাহরণ দিই। সেসময় সায়েন্সের ছেলেদের ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে ইংরেজী বা ইকনমিক্স পড়া ছিল ফ্যাশন। হুমায়ূন আহমেদও ফ্যাশনমত ইকনমিক্সে ভর্তি হয়ে গেলেন। তাঁর এক বন্ধু পড়বে কেমিস্ট্রি। তাকে নিয়ে গেলেন কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে। হঠাৎ একজন স্যারকে চোখে পড়লো, ভীষণ স্মার্ট, সুদর্শন! সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে ফেললেন, ইকনমিক্স জলে ভেসে যাক, উনি পড়বেন কেমিস্ট্রি! ভর্তি হয়ে গেলেন কেমিস্ট্রিতে! কোন মানে হয়!
পরে পিএইচডি করতে গেলেন ভৌত রসায়নের উপর। দু'বছর কেটে গেছে, কোর্স ওয়ার্ক সব শেষ। একদিন বারান্দায় সিগারেট টানতে টানতে হাঁটছেন, খেয়াল করলেন এক বুড়ো ভদ্রলোককে। ঢুকে গেলেন সেই ক্লাসে। পলিমার রসায়ন বিভাগের প্রধান তিনি। তাঁর লেকচার শুনে তিনি মুগ্ধ! সিদ্ধান্ত জানালেন তাঁকে, তিনি ঐ বিভাগে যেতে চান। ভৌত রসায়নের প্রফেসর শুনে রাগ করলেন, হম্বিতম্বি করলেন, কিছুতে কাজ হলোনা। পিএইচডি করলেন পলিমার রসায়নে।
গুলতেকিনের সাথে তাঁর বিয়ে হয় অমন ঝোঁকের মাথায়। তখন তিনি হতদরিদ্র। লেকচারার হিসেবে ইউনিভার্সিটি থেকে সব মিলিয়ে সাত/আটশ' টাকা পান। বাবর রোডের এক সরকারী বাসায় থাকেন, যেটার এভিকশন নোটিস তখন হয়ে গেছে, ম্যাজিস্ট্রেট নিজে এসে বলে গেছেন বাড়ি ছাড়তে, না ছাড়লে পুলিশ দিয়ে উঠিয়ে দেয়া হবে। নিতান্ত পাগল না হলে অমন অবস্থায় কেউ বিয়ের চিন্তা করে না। উনি করলেন। গুলতেকিনকে একদিন তিন মিনিট সময় দিলেন ভাবার জন্য, কোর্টে বিয়ে করবে কিনা। গুলতেকিন এক মিনিটেই সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন। অথচ তিনি তখন মাত্র ক্লাস টেনের ছাত্রী! কি এক বিস্ময়!
পরে অবশ্য কোর্টে তাঁদের যাওয়া হয়নি। কনের বয়স মাত্র চৌদ্দ বলে। বিয়ের পরদিনই তাদের পুরো পরিবারসহ ঐ বাসা থেকে পুলিশ দিয়ে উঠিয়ে দেয়া হয়।
"আমি এখনো নিশিযাপন করি। মাঝে মাঝে কেমন জানি লাগে। মনে হয় হারিয়ে যাওয়া মানুষরা যেন হারিয়ে যায়নি — আছে, আমার পাশেই আছে। এই তো ভালোবাসা এবং মমতায় তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এমন অনুভূতি কখনো দিনে হবার নয় — তার জন্যে প্রয়োজন চিররহস্যময়ী — রাত্রি। অনন্ত অম্বর।"
হুমায়ূন আহমেদের রাত জাগার অভ্যেস যার মাধ্যমে শুরু, তাঁকে নিয়ে এই লাইনটা, যিনি থ্রোট ক্যান্সারে ভুগে মারা যান।
বইটা হুমায়ূন আহমেদের আত্মজীবনীমূলক, তাঁর অভ্যাস, উৎসাহ, নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, যুক্তি, মুক্তিযুদ্ধের কিংবা চিত্রগল্প বানানোর খন্ড খন্ড কাহিনী নিয়ে লেখা। ২৫শে জুলাই, ২০১২ তে কেনা বই আমার। ১৯ তারিখ মৃত্যুর খবরটা শুনে মনে পাহাড় সমান অভিমান জমে ছিল তাঁর উপর। তাও এক সপ্তাহের মাথায় গিয়ে উনার অনেক বই কিনেছিলাম। পড়িনি তখন, কোন বইই পড়িনি কয়েক বছর, শুধু জমে থাকা অভিমানে।
সেদিন বাতিঘর গেলাম, দেখলাম বইটা অনেকদিন পর। সচরাচর চোখে পড়ে না এসব বই এখন। পড়লাম অল্প ওখানে, বাসায় এসে হাতে লেখা তারিখ দেখে মনে পড়ে গেল সব।
আপনার দর্শন পাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। নিয়তি হতে দিল না।আপনার বই আবার পড়া শুরু করেছি বলে ভাববেন না সব অভিমান জলস্রোতে ভাসিয়ে দিয়েছি। একেবারেই না! সব অভিমান জমে থাকুক। এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে না গেলেও পারতেন! আপনি ছেড়েছেন বলে আমিও আপনাকে ছাড়বো, তা হতে দিই কি করে? এজন্য এখনো অধিকাংশ বই পড়িনি, সিনেমা দেখিনি। থাকুক ওসব পড়ে। হবে না'হয় ক্ষণ।
ভালো থাকবেন ওপারে।