রানা জানতে চাইছে, সিআইএ-র কর্মকর্তা ডক্টর ডেভিড গ্রেবারের রহস্যময় ওই ল্যাবে কী আছে। ওদিকে ওরা জানে, ভয়ঙ্কর হিংস্র, রক্ত-পিশাচ ওই দানব আসছে ধেয়ে। গলা শুকিয়ে গেছে সবার। কেউ জানে না, একশ’ জনেরও বেশি সশস্ত্র সৈনিক ওটাকে ঠেকাতে পারবে কি না। ...প্রাণ বাঁচাতে চলল ওদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি! আবারও কি রাতের অাঁধারে শুরু হবে নিষ্ঠুর গণহত্যা, ভিজে যাবে মাটি অসংখ্য মানুষের তাজা রক্তে? ওই রাক্ষস-বধ করতে এবং সিআইএ-র কুটিল পরিকল্পনা ঠেকাতে গিয়ে শেষে মস্ত ঝুঁকি নিল রানা— দানবের মুখোমুখি হবে বলে চলে গেল আদিম যুগের বিশাল এক উত্তপ্ত মৃত্যু-গুহায়!
কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন। ডাক নাম 'নবাব'। তাঁর পিতা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মাতা সাজেদা খাতুন। কাজী আনোয়ার হোসেন সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে মাসুদ রানা নামক গুপ্তচর চরিত্রকে সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে কুয়াশা নামক আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিলো। কাজী আনোয়ার হোসেন ছদ্মনাম হিসেবে বিদ্যুৎ মিত্র নাম ব্যবহার করে থাকেন।
চমৎকার! প্রচ্ছদ আর নাম দেখে যেমন মনে হয়, সেরকম অবিশ্বাস্য সুপারম্যানীয় কোন কাহিনি না। খুবই বিশ্বাসযোগ্যভাবে সাজানো হয়েছে পুরো প্লট। সম্পূর্ণ নতুন রানার ক্যারেক্টারও বিল্ডআপও হয়েছে খুব সুন্দর করে। সব মিলিয়ে উপভোগ্য।
দানব কি বলা যায়? যায় হয়তো। হয়তো ডায়নোসরের আমলেই ছিল ওরা। আধুনিক বিজ্ঞান ওদের ব্যাপারে অবগত নয় তেমনটাও হতে পারে। বিশাল এক দেহ, আকারে বেশ কয়েকটা মানুষের সমান। স্রেফ দুই হাত দিয়ে আস্ত জলজ্যান্ত মানুষদের... যে সে মানুষ না আবার, কমান্ডো আর্মির অনেক বড় একটা দলকে এক মিনিটেরও কম সময়ে রক্ত, নাড়িভুঁড়ি, মাংসপেশির ঝোলঅলা তরকারিতে পরিণত করে! মানে... রকেট লঞ্চার, গ্রেনেড লঞ্চার, ডিনামাইট, দুনিয়ার সব বিস্ফোরক দ্রব্য, মার্কিন প্রশাসনের দখলে থাকা সবচেয়ে ভয়ংকর সব আগ্নেয়াস্ত্র- কোনও কিছু দিয়েই ওটাকে কিছু করা যাচ্ছে না। ওটা কী? আদম (আঃ) এর জমানার কেউ নাকি? এতদিন বেঁচে থাকে কীভাবে? ক্রিপ্টোজুওলজিস্ট প্রফেসর সিরাজউদ্দিন অদ্ভুত এক থিওরি শোনালেন। সভ্যতার গোড়াপত্তনের সাথে সাথে দূষণ শুরু হয় সমগ্র দুনিয়ায়। দূষণের আগের পৃথিবীতে যারা ছিল তারা সবই পেয়েছে নির্ভেজাল, আবহাওয়া, পরিবেশ, বাতাস আর খাদ্য ফলমূল সহ বহু কিছু। যার কল্যাণে তারা এমন সব অতিমানবীয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা পেয়ে যায় যা এখনকার মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না। তার চেয়েও বড় কথা ওটাকে খুন করা যাবে না কিছুতেই। তবুও রানা কাজটা নিল। বলল- "চাইলে পৃথিবীর যে কোনও কিছুকে খুন করা যায়।" আলাস্কার দিকে চলল রানার দল। আছে প্রাক্তন মেরিন, গ্রেনেডার, বিশাল ভারী ব্যারেট রাইফেলের অধিকারী সুন্দরী নায়িকা এমনকী জাপানি সামুরাইও! কিন্তু মিলিয়ন ডলারের প্রশ্নটা হলো, শটগান, হেভি মেশিনগান, গ্রেনেড, বোমা, ডিনামাইট, বিস্ফোরক, রকেট লঞ্চার, ভারী ম্যাগাজিনের অস্ত্র কোনও কিছুতেই যার কিছু হয় না সে সামান্য একটা ছুরি দেখলে ভয়ে আঁতকে উঠে কেন?
মাসুদ রানা সিরিজের ক্রিয়েচার ফিচারে এক অনন্য সংযোজন পাশবিক। বড় ক্ষুধা, আদিম আতঙ্ক আর অমানুষের মত বইগুলোর সাথে যে নাম উচ্চারিত হবে। বেশ উপভোগ্য একটি বই। যেখানে পছন্দ করার মত অনেকগুলো পার্শ্বচরিত্র পাবেন। সিআইএকে বুড়ো আঙুল দেখানো হ্যাঙ্ক ডিগবার্ট, ওর সাগরেদ ইউ এস মার্শাল টম জেরাল্ড, প্রফেসর আহমেদ সিরাজউদ্দিন বাঙালী(জি, লোকের নামই বাঙালী), নেপালী বিজ্ঞানী টিপা মুই সহ রানার সহযোদ্ধারা। রানা যখন গহীন আলাস্কায় দানব বধের চেষ্টায় ব্যস্ত তখন শহরের ইট কাঠের অরণ্যে সি আই এ-র ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের জট খুলতে ব্যস্ত ছিল ডিগবার্ট আর জেরাল্ড। পড়া না থাকলে শুরু করে দিন।
'পাশবিক' বইয়ের প্রথম খন্ড শেষ হয়েছিল—পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় মাসুদ রানা ও দানবের মুখোমুখি হওয়ার মাধ্যমে। একটা ক্লিফহ্যাঙ্গার রেখে গল্পের প্রথম ভাগ শেষ হলেও কিছু প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত থেকে গিয়েছিল তাতে। দ্বিতীয় খন্ডের শুরুতেই কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। কিন্তু বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার জন্য পড়তে হয় বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত। দ্বিতীয় খন্ড পড়া শেষ করে মনে হচ্ছে—চমৎকার একটা জার্নি শেষ হলো। দুর্দান্ত লেগেছে বইটা। ডক্টর গ্রেবারের রহস্যময় ল্যাবরেটরি,অতিকায় দানবের অতর্কিতে হামলা ও সিআইএ'র কুটিল ষড়যন্ত্রের জাল—সব ঘটনাগুলো এক বিন্দুতে এসে মিলিত হওয়ার দরুন কাহিনীটা বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে আমার কাছে। বিশেষ করে শেষ একশো পৃষ্ঠা ছিল পুরোপুরি অ্যাকশন প্যাকড,হাত থেকে একবারও নামিয়ে রাখতে পারিনি বইটা। ক্লাইম্যাক্সের অ্যাকশন পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল চোখের সামনে বুঝি কোন অ্যাকশন ফিল্ম দেখছি।
সব মিলিয়ে,মাসুদ রানা সিরিজের 'পাশবিক' বইটা আমার ভীষন ভালো লেগেছে।