বুদ্ধদেব বলতেই অনেকগুলো পরিচয় মাথায় ভিড় জমায়। একজন আদ্যোপান্ত গুণী, অভিমানী (ও কিঞ্চিৎ উন্নাসিক) জঙ্গলপ্রেমী মানুষ। যিনি একাধারে ঔপন্যাসিক ও শিকারী, অপরপ্রান্তে একজন কৃতি গায়ক ও চিত্রকর। তবে এসবের মাঝেই ওনার যেই সত্ত্বাটি কিছুটা হলেও আড়ালে রয়ে যায়, তার মধ্যে প্রধান, ছোট-গল্পকার বুদ্ধদেব গুহ। সত্যি বলতে, নিজ-ইচ্ছায় লেখকের ছোট গল্পের প্রতি খুব একটা আগ্রহ কোনোকালেই অনুভব করিনি। এই বইটিও যে আমার খাতিরে কেনা, তা বললে মিথ্যাচার হয়।
কেমন?
আমার শহরে বছরে একবার একটি বৈশাখী মেলা আসে। সেই ছোট মেলাটিতে প্রতি বছর নিয়ম করে এক ভদ্রলোক বইয়ের দোকান দেন। পুস্তক সংক্রান্ত সেই একটিই দোকান। অনেক কটা শহর ঘুরে আসেন, সেটা বোঝা যায়। স্টকেরও খুব একটা পরিবর্তন হয় না কোনোদিনও। তবুও বেশ দাপট নিয়ে ভদ্রলোক চটি বই ও ধর্মগ্রন্থ বিক্রি করে যান বছরের পর বছর। এটা আনন্দের।
আমিও যা। ঢেকি-স্বর্গ-ইত্যাদি-ইত্যাদি। দোকানের একটি কোণ হতে সুলভ মূল্যের এই সাহিত্যমের বইগুলো নেড়েঘেটে দেখাটা, মাঝে একটা বার্ষিক হবি হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার। সামান্য রংচটা, একটু পালিশহীন। তবুও। ঘরে তুলতে দোষ কি? এছাড়াও, আমার মায়ের বুদ্ধপ্রীতির নিরিখে বুদ্ধদেবের কোনো কালেকশন কিনে ফেলতে দ্বিধা করতাম না তখন। কিন্তু মহিলা ভালোই মীরজাফর। এট টু মাদার! কেমন নিঃসঙ্কোচে বলে দিল...
"ছোট-গল্প ভালবাসি না। যা! পড়ব না।"
বাস এটুকুই। ইমিডিয়েট ত্যাজ্যপুত্র। আমি না। বইটা। অগত্যা, এতদিন আমার শেলফে বসে এই সবজে ব্যাটা স্রেফ ধুলোভক্ষণ করে মুটিয়ে গেলো।
যা-ই হোক, সেদিন জন্মদিনের রাতে ম্যান্ডেটরি মন-খারাপের মাঝে হঠাৎই হাতে তুলে নিয়েছিলাম এটা। তরতরিয়ে পাঁচটি গল্প পড়ে কতকটা মিশ্র প্রতিক্রিয়াই হলো যেন। 'বাবা হওয়া'র মতন একটি আইকনিক লেখা পড়ে আনন্দ পেলাম যেমন, তেমনই 'গোসাঘর প্রা লিমিটেড' নামক একটি মহাফালতু, মহা-মিসোজিনিসটিক গল্প পড়ে মেজাজ গেলো বিগড়ে। এই মধ্যম-পন্থাই বইটির মূল্যায়নের একান্ত মাপকাঠি। যা ইন জেনারেল, বুদ্ধদেব গুহর সিংহভাগ ছোটগল্পের ক্ষেত্রেই সমানতালে প্রযোজ্য।
আমি অবশ্য শুরু করেছিলাম, একগুচ্ছ প্রেমকাহিনীর খোঁজে। তবে ছোট-গল্পকার বুদ্ধদেবের পুঁচকে সাহিত্য অনেকটাই প্রেম বর্জিত দেখে বেশ আশ্চর্যই হলাম। সামান্য উদগ্রীবও হলাম, বলা যায়। পটভূমি বাছাইয়েও লেখক এখানে জংলী নন। বরং বইয়ের বেশিরভাগ লেখাই তুলনামুলক ভাবে আর্বান। প্রেম বা পর্যটনের রোমান্টিকতা এড়িয়ে লেখাগুলোতে বারংবার ফুটে ওঠে মূল্যবোধের অবক্ষয়। ঘুরেফিরে আসে বেশ কিছু সামাজিক বিষয়বস্তু। নাগরিক জীবনে দিনবদলের কম্পন।
ফলস্বরুপ বইয়ের পাতায় বিদ্যমান হাহাকার। রাষ্ট্র ও জাতির অবনতি নিয়ে সরব বুদ্ধদেব। কোথাও প্রবীণ প্রজন্মের প্রতি সহানুভূতি জানান তো কোথাও মেশিং লার্নিং নিয়ে ভীতিপ্রদ লেখক। বাঙালির ঠুঁটো সাহেবিয়ানা ও ইংলিশ-প্রীতি নিয়ে উষ্মা প্রকাশও করেন একাধিক গল্পে। বইটি তাই, কোথাও গিয়ে, লেখকের ব্যক্তিগত ম্যানিফেস্টো হয়ে দাঁড়ায়। সাথে, তার ঔপন্যাসিক স্বত্ত্বার (সীমিত) রেঞ্জ নিয়ে ভাবতেও বাধ্য করে, নতুন করে। তবে বিরক্তি বয় অন্য খাতে। পঞ্চাশটি গল্প একত্রে পরিবেশিত হওয়ার দরুন গল্পে আসে পুনরাবৃত্তি। একই থিমে বিভিন্ন গল্প। লেখকও যেন কিঞ্চিৎ পুরনোপন্থী ও প্রগতিবিমুখ। হাঁপিয়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
এছাড়াও রয়েছে অতিকথন। জ্ঞান দেওয়াটা লেখকের গদ্যে নতুন কিছু নয়। এখানেও, তার অন্যথা হয় না যথারীতি। প্রিচি বুদ্ধের বাক্যবাগীশ বয়ানে বেশ কিছু চমৎকার গল্পের ফিনিশিং মার খায় উত্তম-মধ্যম। তবুও, বইটিকে আজ আমি তিনটে তারাই দিচ্ছি। কারণ সেই একই। লেখকের গদ্যশৈলী ও নির্ভেজাল গতিশীলতা। যা মেদবহুল গপ্পেও ছোঁয়ায় কবিতার কাঠি! সবটাই আদতে সুন্দর। মিথ্যে বলে, লাভ কি? মাত্র সাড়ে-চার দিনে পঞ্চাশটি গল্প ঘাড় ধরে পরিয়ে নিলেন লেখক। সাহিত্যিকের বুঝি এখানেই সার্থকতা।
পছন্দের মধ্যে, উক্ত উল্লেখিত 'বাবা হওয়া' বাদে 'কুচিলা খাঁই', 'ছানি', 'সাইকেল', 'প্রজন্ম', 'বনসাইদের গল্প', 'স্বামী হওয়া', 'বাবা মা আমি ও পরমা', 'পরী পয়রা', 'ম্যাথস্', 'বাইয়ানি', 'পরীক্ষা', ইত্যাদি, অনেক গল্পই বিশেষ উল্লেখ্য। (এবং যথেষ্ট উপভোগ্যও!) বইয়ের খান পঁচিশেক লেখা নিয়ে লেখকের 'শ্রেষ্ঠ গল্প' জাতীয় কোনো বাহুল্যবর্জিত সংকলনের সম্পাদনাও করে ফেলা যায়, এটা বলতে পারি। অবশ্য, সাহিত্যমের বই হলে যা হয়। প্রথম প্রকাশ সংক্রান্ত কোনো তথ্যেরই উল্লেখ নেই এতে। তবে, প্রিন্টিং ভালো। ছাপার গলদ নেই বললেই চলে।
তাই, আমার মত যদি হন, লেখকের ছোটখাট লেখা নিয়ে সামান্য আগ্রহ কিন্তু কয়েক হাজার গচ্চা দিয়ে আনন্দের চার খন্ডের সমগ্র(?) কিনতে চান না, তাহলে সুলভ মূল্যে এটি নিতেই পারেন। শ-পাঁচেক টাকায় পঞ্চাশটি গল্প। ভালোই বারগেইন।
(৩/৫ || সেপ্টেম্বর, ২০২৪)