পৃথিবীর নানা দেশ নানা প্রান্ত ঘুরে বেড়াচ্ছেন মঈনুস সুলতান। সে অভিজ্ঞতা ধরা পড়ছে তাঁর ভ্রমণগল্পগুলোতে। তাঁর জীবনে ঈদ এসেছে নানা দেশে। আফ্রিকা, কিরগিজস্তান, লাওস, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, গণচীন, ইন্দোনেশিয়া—একেক দেশে একেক ধরনের মানুষের সঙ্গে নানা ধরনের নিয়ম আর কেতায় তিনি ঈদ উদযাপন করেছেন। এসব ভ্রমণগল্পে দেখা যাবে বিচিত্র ভাষা আর নানা সংস্কৃতির আদল, মানুষের বঞ্চনা ও সংগ্রাম, তাদের অসাধারণ রসবোধ। এর পাত্রপাত্রী, ঘটনাবলি আপনাকে আনন্দ দেবে, কখনো আপনি মর্মাহত হবেন কিন্তু উৎফুল্ল হবেন মঈনুস সুলতানের চমৎকার, অননুকরণীয় লেখার ধরনে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ ধরনের আনন্দদায়ক ভ্রমণগল্প বাংলাদেশে একমাত্র মঈনুস সুলতানই লিখতে পারেন।
মঈনুস সুলতানের জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেসের। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ‘জিম্বাবুয়ে : বোবা পাথর সালানিনি’ গ্রন্থটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৪ সালে ভ্রমণসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে মঈনুস সুলতানের।
মধ্য এশিয়ার কিরগিজস্থান, আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ আফ্রিকা এবং গণচীন ও ইন্দোচীনা দেশসমূহে লেখকের পরিবারসহ কাটানো কয়েকটি ঈদের ফিরিস্তি এই বইটি। ঈদের বর্ণনা এখানে যতোটা না ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, তারচেয়ে বেশি স্থানীয় সামাজিক রীতিনীতি ও সংস্কৃতির অনুসঙ্গ হিসেবে। ঈদ উৎসবের ধর্মীয় আচার-কেতার সাথে কিভাবে বিভিন্ন দেশের স্থানীয় আনন্দমুখর প্রথা ও ঐতিহ্যবাহী বিনোদনমূলক কার্যক্রমগুলো যুক্ত হয়ে তাকে আরও বর্ণিল ও উপভোগ্য করে তুলেছে তার এক মনোজ্ঞ ইতিবৃত্ত 'ঈদের সোনালি ইগল'।
তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। লেখক ও তাঁর পরিবার এ দেশগুলো ভ্রমণ করেছেন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে। তাঁদের ওঠাবসা সীমিত ছিলো স্থানীয় সমাজের উঁচু কদের মানুষজনের সাথে। তাই তাঁদের যাপিত ঈদের অভিজ্ঞতা কতোটুকু সার্বজনীন- আপামর জনসাধারণের, আর কতোটুকু একটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির বিলাস-ব্যসনের বর্ণনা?
বিভিন্ন দেশের ঈদ উদযাপনের গল্পে যে বিষয়টা আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে তা হলো মহিলাদের ঈদ জামাত। লেখকের স্ত্রী বিদেশীনি ভিন্নধর্মী হয়েও ঈদ জামাতে অংশ নিয়েছেন কিন্তু বাংলাদেশের ৯০ ভাগ নারীর কখনো সৌভাগ্য হয়নি জামাতে নামাজ আদায়ের। আশা করি এই দেশের নারীরাও ঈদ জামাতের অংশীদার হবেন। কিরগিজস্তান, গণচীন, ইন্দোনেশিয়া,লাওস, থাইল্যান্ডে কাটানো বিভিন্ন ঈদ পরবের স্মৃতিচারণ করেছেন লেখক। কিরগিজস্তানের সোনালি ঈগল দিয়ে শিকার করানোর গল্প অত্যন্ত আকর্ষণীয়। লেখকের সুলেখনীতে প্রতিটা গল্পে ঈদ উৎসবের পাশাপাশি সেই দেশে মুসলমানদের অবস্থা, রাজনৈতিক হালচাল ও উঠে এসেছে।