১৯৭৯ বা ১৯৮০ সাল হবে। পুরনো খবরের কাগজের বদলে কটকটি দেয় যে হকার তার কাছে এই বইটা পাওয়া গেলো। বইটা দেখে আমার যে জিভে জল গড়াচ্ছে সেটা কটকটিওয়ালার বুঝতে কোন বেগ পেতে হয়নি। সে সোজা ১০ টাকা দাম হেঁকে বসলো। ১০ টাকা!! অত টাকা পাবো কোথায়। ঈদে সালামী পাই মোটে আট আনা - এক টাকা করে। সেই টাকাও আর থাকে কয় দিন। বাসায় ঘ্যান ঘ্যান করে ৫ টাকা যোগাড় করতে পারলাম। সমবয়স্ক এক প্রতিবেশি আরও ৫ টাকা দিতে রাজী হলো। অতএব বইটা পাওয়া গেলো।
বইটা আমরা ভাইবোনেরা পড়তে পড়তে একাকার করে ফেললাম। এমন সময় একদিন বই কেনার সেই পার্টনার এসে বইটা দাবি করলো। তার দাবি ন্যায়সঙ্গত, অতএব কষ্ট পেলেও বইটা তাকে দিলাম। তার কিছুদিন পর পাড়ার মুদি মমিনের দোকানে ডিম না যেন মুড়ি কিনতে গেছি। দেখি মমিন সওদা দিচ্ছে যে কাগজের ঠোঙ্গায় করে সেটা এই বইয়েরই পাতা যেখানে শীত দাদুর কাছে ফার গাছ চেয়ে লেখা চিঠিটা ছিল সেটা দিয়ে বানানো। কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরলাম। ভাইবোনেরা বইটার এই পরিণতি দেখে শোকস্তব্ধ।
পার্টনারকে গিয়ে ধরলাম। সে নির্বিকার ভাবে বলল, 'তোর তো বইটা পড়া হয়ে গিয়েছিল, তো বইটার আর কী দরকার? তাই মমিনের কাছে ১ টাকায় বেচে দিয়েছি'। কান্নারুদ্ধ গলায় বললাম, 'আমার কাছ থেকে ১ টাকা নিতে পারতি'! তার আরও নির্বিকার উত্তর, 'একবার পড়া বই আবার তোর কাছে বেচবো কেন'? হায়! এমন ১ টাকার লোভে কত কোটি স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গেছে!
তারপর নীলক্ষেত, নিউমার্কেট, স্টেডিয়ামের দোতলায় স্ট্যান্ডার্ড-হাক্কানী, কমলাপুর রেল স্টেশনের স্ট্যান্ডার্ড, পুরনো পল্টন, ফার্মগেট, প্যারি দাস রোড, বাংলা বাজার, হাজী ওসমান গনি রোডের মুখে, মর্গ্যান স্কুলের মোড়ে, প্রকাশ সঙ্গীত বিদ্যালয়ের সামনে, পৌর পাঠাগারের সামনে - কোথায় না খুঁজেছি। এই বইটা আজও আর পাইনি। সাড়ে তিন দশক পরে বইটার নরম কপি পেয়ে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে আবার আদ্যোপান্ত পড়লাম।
আমি সৌভাগ্যবান যে, আমার ছোটবেলায় আমি এমন একটা বই পড়তে পেয়েছিলাম।
রেটিং-এ মোটে পাঁচটা তারা দিতে পারলাম। আমার পক্ষে সম্ভব হলে আকাশের সবগুলো তারা এনে এই বইটাকে দিতাম।
পুনশ্চঃ ২৮ নভেম্বর ২০১৫ - কখনো কখনো অসম্ভবও সম্ভব হয়ে যায়, অথবা অবাস্তবটা বাস্তব হয়ে যায়। গত সপ্তাহের এক ভর দুপুরে পুরনো বইয়ের দোকানভরা এক ফুটপাথ দিয়ে যেতে হঠাৎ দেখি এক দোকানে এই বইটা। একদম সামনে রাখা। শুরুতে তিনটা পাতা নেই, কয়েক জায়গায় 'কচি হাতের কলম থেকে' কিছু লেখা আর আঁকা আছে, কয়েক জায়গায় পোকা টানেল বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু তাতে কী! আমি মুহূর্তের মধ্যে বইটা বগলদাবা করে ফেললাম। দোকানী দাম হাঁকলো ১০০ টাকা। আমি দরাদরি করলাম কিন্তু তিনি তাতে কর্ণপাত করলেন না। তিনি যে কর্ণপাত করবেন না সেটা জানতাম। আমি ১০০ টাকা কেন, ৫০০ টাকা দিতেও রাজী ছিলাম। আর কথা না বাড়িয়ে আমি টাকা দিয়ে ৩৫ বছর পর আবার বইটার মালিক হয়ে গেলাম!