দেশীয় পটভূমিতে আগাথা ক্রিস্টির বিখ্যাত উপন্যাসের সেরা এডাপটেশন, পড়ে মনেই হয় না মূল কাহিনি অন্য ভাষায় লেখা। দুর্দান্ত কাহিনি আর টুইস্ট, পুরো বইতেই টানটান উত্তেজনা, সাথে প্রতিটা চরিত্রই এত জীবন্ত। দুই একটা ছেলেভূলানো টাইপের জোড়াতালি না থাকলে একবারে পাঁচে পাঁচ দেয়া যেত।
বঙ্গোপসাগরের একটা দ্বীপের নাম সালুদা। আনুষ্ঠানিক নাম এটা হলেও লোকে একে গজবের চর হিসেবেই জানে। আর গজবের জায়গা বলবেই না কেন, ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপের সমস্ত মানুষের মৃত্যু থেকে শুরু করে দ্বীপের ইজারা নেওয়া দুই মালিকেরও যে মৃত্যু হয়েছে আকস্মিকভাবে। হামেদ আহমেদ নামক এক ব্যক্তির আমন্ত্রণে এই অদ্ভুত দ্বীপেই এসে হাজির হলো নানা পেশার, নানা বয়সের দশজন নর-নারী। তাদের কাউকে বন্ধুদের সাথে রিইউনিয়নে যোগ দিতে, কাউকে কাউকে চাকরির কথা বলে বা কাউকে কাউকে নিজেদের জীবনের অজানা অধ্যায় সম্পর্কে জানার কথা বলে চিঠি লিখেছিল হামেদ আহমেদ ; শুরতে দ্বিধা থাকলেও দশজনের কেউই উপেক্ষা করতে পারে নি সেই চিঠি।
অদ্ভুত দ্বীপে অদ্ভুত ঘটনার শুরু হলো প্রথম থেকেই। কেননা খোদ মেজবান-ই যে অনুপস্থিত! ধীরে ধীরে যতই সময় এগুতে লাগল ততই একে একে বের হতে লাগল অদ্ভুত সব তথ্য। দশজনের কেউই হামেদ আহমেদকে কখনও দেখে নি, দশজনকেই নানা খুনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ড ঘোষিত রেকর্ড চালু হওয়া ছাড়াও দেয়ালে পাওয়া গেল ‘ হারাধনের দশটি ছেলে ‘ নামক একটা ছড়া আর টেবিলে দশটা পুতুল। প্রথম রাতেই দুইজনের মৃত্যু আর দুইটা পুতুল গায়েব হয়ে যাওয়ার পর আর বাকিদের বুঝতে দেরি হলো না ছড়া আর রেকর্ড অনুযায়ী প্রত্যেকের জন্যই অপেক্ষা করছে হিমশীতল মৃত্যু।
প্রথমেই বলে রাখি, বইটা রহস্যের রানী খ্যাত আগাথা ক্রিস্টির And Then There Were None রহস্যোপন্যাসের অ্যাডাপ্টেশন। অর্থাৎ লেখক বইয়ের মূল থিম অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলাদেশের উপযোগী ব্যক্তি, স্থান ও ঘটনার সৃষ্টি করে গল্পটা সাজিয়েছেন।
এককথায় প্রতিক্রিয়া বলতে গেলে বলতে হয়, অনবদ্য। এক লাইনে বলা যেতে পারে, আমি এমন লেখা আগে কখনও পড়ি নি। পুরো মাথা হ্যাং করা একটা রহস্য ফেঁদেছেন লেখক। হত্যার আগেই ঘোষণা দিয়ে নেওয়া, দশজনের দলের মধ্যেই খুনীর উপস্থিতি ,দ্বীপ থেকে বের হওয়ার সমস্ত রাস্তা বন্ধ – এর থেকে থ্রিলিং আর কি হতে পারে! এই প্লটটা ছাড়াও লেখক যেভাবে প্রতিটা চরিত্রের আত্ম-বিশ্লেষণ দেখিয়েছেন, বাঁচার জন্য প্রত্যেকের আকুতি ফুটিয়ে তুলেছেন তা অনবদ্য। তাছাড়া দলের প্রত্যেকের বাকিদের সন্দেহ করা, আর প্রত্যেকের নিজেকে সন্দেহমুক্ত রাখার যে আপ্রাণ চেষ্টা সেটাও দারুণভাবে এসেছে। সন্দেহ, আশঙ্কা আর বিপদের মাত্রা কতটা ছিল সেটা বোঝা যায় যখন দলের সবাই একত্রে রানাঘরে কফি বানাতে যায়! পুরো বইয়েই লেখক এমন একটা পরিবেশ অসাধারণ দক্ষতার সাথে এঁকেছেন। আর ‘ হারাধনের দশটি ছেলে' কবিতার কি দারুণ ব্যবহার!
আর টুইস্টের কথা কি আর বলব, একেবারে কল্পনাতীত একটা ব্যাপার। আমি নিশ্চিত কেউই বিন্দুমাত্রও অনুমান করতে পারবে না খুনী সম্পর্কে। ‘ মার্ডার ইন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' পড়ে ভেবেছিলাম এটাই ক্রিস্টির সেরা কাজ কিন্তু এই বই সেটাকেও হার মানিয়েছে। মোটের উপর, ক্রিস্টির অসাধারণ এক প্লটের এক পারফেক্ট অ্যাডাপ্টেশন।
এই পাড়া ঘোরাই কিন্তু কাল হল দশ ছেলের জন্যে। শেষ পর্যন্ত কেউ কি আর বেঁচে থাকল? থাকল না তো! মনে হয় হারাধনের দশ ছেলেরই দোষ- কেন রে বাবা যাস এদিক সেদিক ঘুরতে? জানিসই তো মৃত্যু ওঁত পেতে আছে তোদের জন্যে, বিছিয়েছে তাঁর সুনিপুণ হাতে নিশ্ছিদ্র জাল...
হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত লোকের কাছ থেকে চিঠি পেলেন সাবেক বিচারপতি আশরাফ হাসান চৌধুরী। আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কয়েকটা দিন তাঁর সাথে কাটিয়ে আসার বঙ্গোপসাগরের নির্জন এক দ্বীপে, লোক মুখে যা গজবের চর নামে খ্যাত। কিন্তু চৌধুরী সাহেব তাঁর তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তি দিয়েও চিনতে পারলেন না লোকটাকে, এই যা সমস্যা। তবু শেষ বয়সে এক অনাকাঙ্ক্ষিত রোমাঞ্চের জন্যে পা বাড়ালেন অনির্দিষ্ট গন্ত্যবের দিকে।
চিঠি পেয়েছেন ফ্যাশান সচেতন, স্মার্ট, মধ্য তিরিশেও ভরা যৌবনের অধিকারিণী সদ্য বিধবা অধ্যাপিকা জোহরা বেগম-ও। যার জন্ম রহস্য নাকি উন্মোচিত হবে সেই দ্বীপে গেলে। এই আকর্ষণ ছিন্ন করার মত শক্তি তাঁর ছিল না।
হারাধনের তিন নম্বর সন্তানের মতন নিয়তির অমোঘ টানে সুদূর লাহোর থেকে ছুটে আসলেন আলীজান মীর্জা। এইভাবে আরও আসলেন নার্স নূরবানু, উঠতি নায়ক তানবীর হোসেন, শিকারি রাগীব আহসান আর ডাঃ আলী রশীদ। বিভিন্ন পেশার এই সব মানুষদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন একজন ব্যক্তি। তিনি হামেদ আহমেদ। কিন্তু কে এই হামেদ আহমেদ? যার নামও কেউ শোনেনি কোনদিন তবু তাঁর একটিমাত্র চিঠিতে কেন সবাই ছুটে আসছে গজবের চরে? যেমন ছুটে আসে আগুনের দিকে রাতের পতঙ্গেরা?
কথা ছিল গজবের চরেই উপস্থিত থাকবেন হামেদ আহমেদ। কিন্তু কোথায় সে? তাঁর বদলে দেখা গেল চাকর রহম আলী আর তাঁর স্ত্রী করিমনকে। হারাধনের আরও দুই সন্তান। আর এই সবার উপরে নজর রাখার জন্যে হামেদ আহমেদ আগে থেকেই মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ঠিক করে রেখেছেন প্রাক্তন পুলিশের সি আই ডি কর্মকর্তা হারাধনের শেষ সন্তান মহাব্বত আলীকে। কিন্তু কেনই বা দ্বীপে ডেকে এনে নজরদারি করার এই ব্যবস্থা?
প্রথম রাতেই খুন হয়ে গেল দুই জন। পরের দিন আরও একজন। এভাবে প্রতিরাতে খুন হতেই থাকল একের পর এক সদস্যরা। কিন্তু দ্বীপে ওরা দশজন ছাড়া আর কেউই ছিল না। তাহলে কি ওদের মধ্যেই খুনি লুকিয়ে আছে? ওদের মধ্যেই কি একজন হামেদ আহমেদ? আর পুতুলগুলোকেই বা কে ভাঙছে? একজন মরলে সাথে সাথে ভেঙ্গে যাচ্ছে একটা করে পুতুল, কীভাবেই বা তা সম্ভব? তাহলে কি দ্বীপে কোন অশুভ প্রেতাত্মার ছায়া পড়েছে? নাকি তাদের জীবনের কোন অন্ধকার কালো দিকই তাদের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্যে দায়ী? আর শেষ পর্যন্ত কি হল তাদের সবার?
টানটান উত্তেজনার দুর্দান্ত এক সাইকো মিস্ট্রিক্যাল থ্রিলার “দ্বীপ বিভীষিকা”। আগাথা ক্রিস্টির And There were None (বা Ten Dolls) বইটির ছায়া অবলম্বনে রচিত এই বইটি সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। বইটি বেশ দুর্লভ, বর্তমানে দেখা মেলা ভার। আর রিপ্রিন্ট করার সম্ভবনাও ক্ষীণ তাই কেউ হঠাৎ পেয়ে গেলে তাঁকে সৌভাগ্যবানই বলা যায়। আর যারা এই বই পাবেন না তারা আপাতত আগাথা ক্রিস্টির বইটি পড়তে পারেন। সবাইকে ধন্যবাদ।
রিভিউটি লিখেছেন Jannatul Naym Pieal বই লাভার'স পোলাপান (Boi lover's polapan)গ্রুপ থেকে সংগৃহীত ......
দ্বীপ বিভীষিকা ইউসুফ ফারুক
অনেকের কাছেই আগাথা ক্রিস্টির শ্রেষ্টতম সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয় 'And Then There Were None'। আর তারই বাংলা রূপান্তর 'দ্বীপ বিভীষিকা'। এটা নিছকই কোন অনুবাদ নয়। মূল থিম আর প্লটের সবটুকু রূপ রসকে অক্ষুণ্ণ রেখে কাহিনীকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চমৎকারভাবে এডাপ্ট করেছেন লেখক ইউসুফ ফারুক।
জনৈক হামেদ আহমেদের আমন্ত্রন রক্ষা করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দশ অতিথি এসে জড়ো হলেন বঙ্গোপসাগরের এক অভিশপ্ত দ্বীপে, লোকে যাকে ডাকে গজবের চর বলে। দশ অতিথির কেউই কিন্তু চেনেন না হামেদ আহমেদকে। কোনদিন নামও শোনেন নি। তবু বিচিত্র কোন কারণে সাড়া না দিয়ে পারেন নি তার ডাকে। কিন্তু গজবের চরে এসে অবাক হতে হল তাদের। হোস্ট নিজেই অনুপস্থিত। তার বদলে রয়েছে দুই কাজের লোক যারা নিজেরাও কখনো দেখেনি মনিব হামেদ আহমেদকে। অজানা আশংকায় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল অতিথিরা। কিন্তু সাগর উত্তাল, নৌকাও নেই। ফেরার পথ বন্ধ। শুরু হল হারাধনের দশ ছেলের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। কিন্তু তারপরও অদৃশ্য ঘাতকের আক্রমণে মারা পড়তে লাগলো একে একে সবাই। এবং একটা সময়ে এসে, রইল না আর কেউ!
পুরোই মাথানষ্ট করা প্লট। শেষে কি হতে চলেছে তা ইতোমধ্যে জানা সত্ত্বেও যে কোন রহস্য কাহিনী এতটা মন্ত্রমুগ্ধের মত আকৃষ্ট করে রাখতে পারে পাঠককে, এই উপন্যাসটা না পড়লে বোধহয় অনেকেরই জানা হবে না। চোখের সামনে খুনি তবু এত এত ধোঁয়াশা পুরো কাহিনী জুড়ে যে শেষ অব্দি পাঠকের পক্ষে প্রকৃত খুনিকে ঠাহর করা স্রেফ অসম্ভব। ওদিকে কাহিনীও এতই দ্রুতগতির আর টানটান যে, পাঠকের একটা সময় এসে নিজেকেই মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে প্রাণপণ লড়তে থাকা ওই দশ অতিথির একজন বলে মনে হবে।
রূপান্তর নিয়েও দুই এক কথা বলতে হয়। ইউসুফ ফারুকের ভাষা কেবল শক্তিশালীই নয়, মোহনীয়ও। বিদেশী একটা কাহিনীকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা বরাবরই কঠিন। তাও যদি আবার সময়কালটা হয় ষাটের দশক, তবে তো আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভবই। কিন্তু সেই কাজটিই অবলীলায় করে গেছেন তিনি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুই একটা জিনিস হয়ত একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য ছিল না, তবু সেগুলো এতই তুচ্ছ যে ইগনোর করাই যায়। আরও একটা বিষয় হল, মূল উপন্যাসে আগাথা ক্রিস্টি অসাধারণ কাব্যময়তা সৃষ্টি করেছিলেন। বাংলায় সেই একই ভাব বজায় রাখা দুরূহ ছিল। কিন্তু 'হারাধনের দশটি ছেলে' নামের শিশুতোষ ছড়া দিয়েই যে লেখক সমধিক কাব্যময়তা বজায় রাখতে পারেন, তাকে স্রেফ টুপিখোলা অভিনন্দন।
পরিশেষে বলব, 'Death Comes As The End' এর আবদুল হাকিম কর্তৃক রূপান্তরিত 'কামিনী' আমার অলটাইম ফেবারিট (সেবা অনুবাদগুলোর ভেতর)। কিন্তু প্রায় সমপর্যায়ই রাখব 'দ্বীপ বিভীষিকা'কে।
পারফেক্ট অ্যডাপ্টেশন! ইউসুফ ফারুকের শক্তিশালী লেখনীর গুণে জানা না থাকলে কেউ বুঝতেই পারবে না বইটা বিদেশী গল্পের রূপান্তর! 'হারাধনের দশ ছেলে' ছড়াটিকে লেখক যে মুনশিয়ানার সাথে বাংলাদেশী পটভূমিতে যেভাবে ব্যবহার করেছেন তা এক কথায় 'ব্রিলিয়ান্ট'।
কাহিনী নিয়ে বেশি কিছু বলা বাতুলতা মাত্র। ক্রিস্টি সুলভ টুইস্টে শেষেরটুকু হয়ে ওঠেছে অসাধারণ।
1. And Then There Were None - Agatha Christie (Harper Collins and other publishers)
2. দ্বীপ বিভীষিকা - ইউসুফ ফারুক (সেবা প্রকাশনী)
বি.দ্র. : প্রথম বই রিভিউ লিখছি। স্পয়লার থাকতে পারে। তবে আমার নিজের ধারনা সেরকম কিছু নেই। কারন ইংরেজি হার্ডকপির যে এডিশনটি পড়েছি তাতে প্রথম পৃষ্ঠাতেই কাহিনি সংক্ষেপের অনেকটুকুই দেওয়া আছে।
গ্রুপের কল্যাণে অথবা নিজ আগ্রহে অনেকেই এই বই দুটি পড়েছেন। অনেকে এখনও না পড়ে থাকতে পারেন। 'The Queen of Crime' খ্যাত আগাথা ক্রিস্টি (Agatha Christie) -র সর্বাধিক বিক্রিত (100 million copies; সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রিত একক বই হিসাবে ৫ম) উপন্যাস 'And Then There Were None' (First published as 'Ten Little Niggars'; then 'Ten Little Indians') এর সেবা প্রকাশনীর বাংলা এডাপ্টেশন ইউসুফ ফারুকের 'দ্বীপ বিভীষিকা'। নতুন পাঠকদের কাছে রহস্যের জট এবং শিহরণ শেষ পর্যন্ত ধরে রাখার অসীম ক্ষমতা রাখে বইটি।
বইটি সর্ম্পকে আগাথা ক্রিস্টি নিজের অটোবায়োগ্রাফিতে লিখেছেন:
"I had written this book because it was so difficult to do that the idea had fascinated me. Ten people had to die without it becoming ridiculous or the murderer being obvious. I wrote the book after a tremendous amount of planning, and I was pleased with what I had made of it. It was clear, straightforward, baffling, and yet had a perfectly reasonable explanation; in fact it had to have an epilogue in order to explain it. It was well received and reviewed, but the person who was really pleased with it was myself, for I knew better than any critic how difficult it had been."
কাহিনি সংক্ষেপ:
বিভিন্ন পেশার পরস্পরের অপরিচিত ৮ ব্যক্তি তাদের বিস্মৃতপ্রায় কোন এক ব্যক্তির লিখিত আমন্ত্রণে এক অমোঘ আকর্ষণে জড়ো হয়েছে নতুন মালিকানাধীন একটি দ্বীপে। কিন্তু স্বয়ং আমন্ত্রণকারীই তখন অনুপস্থিত। স্বভাবতই বিরক্ত হলেও সেই আমন্ত্রণকারী গৃহকর্তা কর্তৃক মাত্রই নিয়োগকৃত ২ ভৃত্য (স্বামী-স্ত্রী) -এর তদারকিতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। পরদিন ড্রয়িংরুমে সকলের উপস্থিতিতেই ঘটে সেই অপ্রত্যাশিত ঘটনা - রেকর্ডকৃত একটি অনুচ্চ, অথচ স্পষ্ট, অদৃশ্য কণ্ঠস্বর উপস্থিত ১০ জনের বিরুদ্ধে পূর্বে সংঘটিত অপরাধের জন্য অভিযোগ আনে। এর একটু পরেই কোন কিছু বোঝার আগেই খুন হয়ে যায় একজন। তারপর আরও দুজন। পরস্পরের মধ্যে বাঁধতে থাকে সন্দেহ, ভীতি, উৎকণ্ঠা। ৭ জন সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে প্রকৃত খুনি আসলে বাইরের কেউ না, বরং তাদের নিজেদের মধ্যেই একজন। একে একে খুনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সেই সাথে বাড়তে থাকে পারস্পরিক সন্দেহ ও দূরত্ব। ভয়াবহতার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় টেবিলে পাত্রে সজ্জিত ১০টি চীনামাটির পুতুলের ক্রমশ সংখ্যা হ্রাস। শেষ পর্যন্ত দ্বীপে কোন বাসিন্দা বেঁচে থাকলো না। তাহলে খুনি? সে কে? পাঠকবৃন্দ, আগাগোড়া রহস্যে, রোমাঞ্চে, শিহরণে ভরপুর এই উপন্যাসের একেবারে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত যেতে হবে প্রকৃত রহস্য মীমাংসার জন্য। শেষ করার পর হয়ত স্মৃতি আবার ঝালিয়ে নিতে চাবেন যে ওই মুহূর্তে ওই অধ্যায়ের ব্যাপারটি তো এরকমই ছিল, নাকি না..। হয়ত আপনার পড়া সেরা Mystery-Thriller এ যোগ হয়ে যেতে পারে এই বইটি।
বাংলা আগে পড়া থাকলেও মূল ইংরেজিতে এই প্রথম পড়লাম। পড়ার পর আবার 'দ্বীপ বিভীষিকা' পড়লাম। মাঝে মাঝে দুই বইয়ের অধ্যায় অনুযায়ী মিলালাম। অনুভূতি এককথায় অসাধারণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবং বাঙালি পাঠকদের জন্য ইউসুফ ফারুকের নিজস্ব বুদ্বিদীপ্ত কিছু পরিবর্তন এবং লেখনি আমার কাছে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে মূল ইংরেজিকেও ছাড়িয়ে গেছে। ব্যক্তিগত মত অবশ্যই। যদি সম্ভব হয় দুটো বই পরপর পড়বেন। আনন্দ বহুগুণ পাবেন গ্যারান্টি।
জ��বনে পাপ কে না করে না। কেউ কম করে কেউ বেশী করে।কেউ গোচরে করে কেউ অগোচরে করে।জেনে গেলে আপনি অপরাধী না জানা গেলে আপনি ভালো মানুষ। কেউ আবার বাস্তবিকই ভালো মানুষ আবার কেউ ভালো সাজার ভান ধরে বসে থাকে। আবার কিছু অপরাধ আছে যা জানা যায় কিন্তু সেই ব্যাপারে প্রমাণ (???) না থাকায় আপনি অপরাধী হয়েও হবেন নিরপরাধ। পুলিশ আপনার টিকিটি না ছুতে পারলেও আপনি কি কোন সময়েই অপরাধের শাস্তি পাবেন না? কথায় বলে প্রকৃতি কখনো অন্যায় সহ্য করে না!
বঙ্গোপসাগরের ছোট্ট একটা দ্বীপ। দশজন মানুষ। নৌকা ছাড়া যাওয়া আসার কোন উপায় নেই।এই মানুষ গুলো কোন এক বিশেষ মানুষের চিঠি পেয়ে এসে হাজির হয়েছেন।কেউ ডাক্তার,কেউ জজ,কেউ গোয়েন্দা, কেউ আবার পরিচারক। যেন হারাধনের দশটি ছেলে! বিভিন্ন রকমের দশজন মানুষ কিন্তু গৃহকর্তার কোন খবর নেই।হঠাৎ করেই একজন একজন করে মারা যাওয়া শুরু করে।আর তাদের পাশেই হারাধনের দশটি ছেলের মত কবিতা লিখা থাকে।কবিতাটি জানেন না? মজার কবিতা আপনাদের জন্য লিখে দিলাম...
হারাধনের দশটি ছেলে ঘোরে পাড়াময়, একটি কোথা হারিয়ে গেল রইল বাকি নয়।
হারাধনের নয়টি ছেলে কাটতে গেল কাঠ, একটি কেটে দু’খান হল রইল বাকি আট।
হারাধনের চারটি ছেলে নাচে ধিন ধিন, একটি ম’ল আছাড় খেয়ে রইল বাকি তিন।
হারাধনের তিনটি ছেলে ধরতে গেল রুই, একটি খেলো বোয়াল মাছে রইল বাকি দুই।
হারাধনের দুইটি ছেলে মারতে গেল ভেক, একটি ম’ল সাপের বিষে রইল বাকি এক।
হারাধনের একটি ছেলে কাঁদে ভেউ ভেউ, মনের দুঃখে বনে গেল রইল না আর কেউ।
একজন করে মরে আর একজন করে কমতে থাকে হারাধনের সেই ছেলেদের মত! বাইরে থেকে আসার কোন উপায় নেই কারো,লুকিয়েও নেই দ্বীপে কেউ তাহলে হারাধনের ছেলেগুলোকে কে খুন করছে?নাকি পূর্বের অপরাধ গুলো সবার সামনে চলে আসায় মানসিক যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করছে সবাই??নাকি খুনী হারাধনের কোন ছেলে???
দ্বীপ বিভীষিকা আগাথা ক্রিস্টির এন্ড দেন দেয়ার ওয়্যার নানের ছায়া অবলম্বনে লিখা।ক্রিস্টির গল্পটিকেই দেশীয় পটভূমিতে লিখেছেন ইউসুফ ফারুক।এ জন্য বইটা অনেক বেশী উপভোগ্য লেগেছে। এই বইটা আমি বেশ কয়েকবার পড়েছি।অনেক আগের বই।দুঃখের ব্যাপার কোন এক মার্ক টোয়েন বইটা মেরে দিয়েছেন।এইসব বইগুলি নতুন পড়ুয়াদের অনেকেই পড়েননি।যারা পড়েননি তাদের জন্য বইটা অবশ্যপাঠ্য থ্রিলার লাভার হলে।
বঙ্গোপসাগরের ছোট একটা দ্বীপ। আগে নাম ছিল সালুদার চর, এখন পরিচিত গজবের চর নামে। এই নাম এমনি এমনি হয়নি- ১৯৬১ সাল থেকে শুরু করে নিয়মিতভাবে এখানে গজবের বর্ষণ চলছে। দ্বীপটাকে ঘিরে অনেক গুজব, অনেক কুসংস্কারের উৎপত্তি। এখানেই বাস করেন হামেদ আহমেদ নামের রহস্যময় লোকটা। যতটা না রহস্যময় তিনি, তার থেকেও রহস্যময়ভাবে একদিন দশটা আমন্ত্রণ পত্র লিখে পাঠালেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। চিঠিতে সবাইকে বিশেষ দ্রষ্টব্য দিয়ে একই কথা বলা হয়েছে- "কর্ণফুলীর মোহনায় দিলরুবা টি হাউসের সামনে ১৫ই জুন আমরা অপেক্ষায় থাকবো"। যথাসময়ে দশ জন অতিথি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে পৌঁছল সেদিন। কিন্তু হামেদ আহমেদের দেখা নেই। ঠিক যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছেন তিনি। ওদিকে আবার তুমুল ঝড় উঠেছে- উত্তাল তরঙ্গ সাগরে। ফিরে যাবারও কোন উপায় নেই। আসল গজবটা শুরু হলো রাতে। খুন হলো একজন। প্রথম রাতেই প্রথম খুন। তারপর অদ্ভুত ভাবে একজনের পর একজন খুন হতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত কেউ কি বাঁচলো, নাকি থাকলো না আর কেউ? খুনগুলো হচ্ছে কেন, আর করছেই বা কে?- জানতে হলে বইটা পড়তে হবে। চরিত্র এবং খুনগুলোর ব্যাপারে কিছু বলা যাচ্ছে না- স্পয়লারের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে এতে।
ঘটনার সূত্রপাত এক ট্রেন কামরা থেকে। ট্রেনে আলাদা ৮ জন পুরুষ, নারী। প্রত্যেকের কাছে রয়েছে চিঠি। চিঠির লেখক হামেদ আহমেদ। অজানা, অচেনা হামেদ আহমেদ নামের একজন সালুদা চরের মালিক। সালুদা দ্বীপ যাকে সবাই সালুদা চর নামে চিনে কালক্রমে ঘটনাপ্রবাহে এর নাম হয়ে ওঠে গজবের চর। এই চরে কেউ একবার পৌঁছালে আর বের হবার উপায় নেই। হামেদ আহমেদ ট্রেনে উপস্থিত আটজনকেই চিঠিতে আলাদাভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এই অভিশপ্ত চরে ঘুরে বেড়াবার জন্য। সালুদার চরে উপস্থিত হবার পর প্রত্যেকেই এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। প্রত্যেকেই এক ইঁদুরের কলে আটকা পড়ার মত ছটফট করতে থাকেন, অপেক্ষা করেন ভয়াবহ এ দুঃস্বপ্ন অবসানের....
বিখ্যাত লেখক আগাথা ক্রিস্টির এন্ড দেন দেয়ার ওয়ার নান কাহিনি অবলম্বনে এডাপ্টেড থ্রিলার উপন্যাস। আশা করি সবার ভালো লাগবে। শুভ হোক বই পড়া।
বঙ্গোপসাগরের সালুদা নামক দ্বীপে জড়ো হয় একে একে ১০ জন লোক।তাদের প্রত্যেকেই এক অচেনা ব্যক্তির আমন্ত্রণে হাজির হয়েছে এই দ্বীপে; হামেদ আহমেদ নামে অজ্ঞাত সেই ব্যক্তি তাদের প্রত্যেকের খুটি-নাটি বিষয় এমনকি অতীত সম্পর্কেও জানে। তারা যেখানে এসেছে, স্থানীয় রা এই দ্বীপটিকে "গজবের চর" নামেও ডাকে।
যে ১০ জন ব্যক্তিকে বাছাই করা হয়েছে তাদের প্রত্যেকেই কোন না কোন হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ছিল অতীতে। কি লেখা আছে তাদের অদৃষ্টে!! তারা কি কোনো ফাঁদে পড়েছেন শেষমেশ!!আড়ালে কে কলকাঠি নাড়ছে??
তবে কি দেয়ালে লেখা হেয়ালি বা ছড়ার হারাধনের ১০ টি ছেলের মতো একে একে মারা যাবে প্রত্যেকেই!! কে এই অদৃশ্য ঘাতক?কি তার উদ্দেশ্য??
আগাথা ক্রিস্টির লেখা "And Then There Were None" অবলম্বনে আমাদের দেশীয় পটভূমিতে লেখা দারুণ একটি এডাপটেশন।
একেবারে পারফেক্ট অ্যডাপ্টেশন ! প্রথমত লেখকের শক্তিশালী লেখনীর কারণে আমার মোটেও মনে হচ্ছিলনা এটা একটা অ্য��াপশন। অত্যন্ত সুন্দর ভাবে তিনি দেশি একটা ফিলিং দিয়েছেন আর ফিলিংটা আরো কড়া ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে লেখকের ব্যবহৃত হারাধনের ১০টি ছেলের কবিতাটি। কবিতাটি যেভাবে চাপ্টারওয়াইজ ব্যবহার করেছেন লেখক তা অতুলনীয়। প্লটটা ছিল পুরাই মাথানষ্ট। বইটা বলতে গেলে পেজ টার্নার ছিল। দেশি পটভূমিতে এইরকম গল্প পড়ার পর থ্রিলটা যেন আরো বেড়ে উঠছিলো। বইটি পড়ে আনন্দ বহুগুণ পাবেন গ্যারান্টি।