মাহমুদুল হক বাংলা কথাসাহিত্যে এক অনন্য নাম সর্বার্থে ব্যতিক্রমী তিনি, যেমন ব্যক্তিসত্তায়, তেমনি লেখক হিসেবে। তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির পরিমাণ খুব বেশি নয়, কিন্তু প্রতিটি লেখাই হয়ে আছে স্মরণীয়। তাঁকে নিয়ে পাঠকদের অনেক খেদ, খ্যাতির মধ্যগগনে এসে কেন তিনি লেখালেখি ছেড়ে দিয়ে নিস্পৃহ হয়ে উঠলেন সাহিত্যসৃজন বিষয়ে, সেটা যেমন বড় আক্ষেপ, তেমনি তিনি চিহ্নিত হন একান্ত স্বল্পপ্রজ লেখক হিসেবে। অথচ সৃজনসাধনায় তাঁর মতো নিবেদিত লেখক খুব বেশি মেলে না এবং যথার্থ সাধকের মতো প্রস্তুতি ও আরাধনা লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে গেছে বেশি। তিনি নিজেও কখনো উন্মুখ হননি সৃষ্টিকর্ম নিয়ে প্রকাশ্য হতে। ফলে তাঁর অনেক লেখা, বিশেষত বিশাল গল্প-সম্ভার সম্পর্কে পাঠক অবহিতি প্রায় নেই বললেই চলে। মাহমুদুল হকের প্রশ্রয়ে ও অনুমোদনে নবীন সাহিত্যব্রতী আবু হেনা মোস্তফা এনাম তাঁর গল্প সন্ধান করে ফিরেছেন বেশ কয়েক বছর যাবৎ। পুরনো পত্রিকার ফাটল ঘেঁটে যত্নসহকারে কপি করেছেন অনেক গল্প, খুঁজে বের করেছেন বিস্মৃত সাময়িকীতে প্রকাশিত রচনা। সেইসব অজানা কিংবা স্বল্পজানা গল্পের সম্ভার নিয়ে প্রকাশিত বর্তমান গ্রন্থ এক প্রধান লেখককে উদ্ভাসিত করবে নতুনভাবে, রূপচ্ছটায় আলোকিত করবে আমাদের গল্পের ভুবন।
Mahmudul Haque (Bangla: মাহমুদুল হক) was a contemporary novelist in Bangla literature. He was born in Barasat in West Bengal. His family moved to Dhaka after the partition in 1947. His novels deal with this pain of leaving one's home.
Mahmud gave up writing in 1982 after a number of acclaimed novels. Affectionately known as Botu Bhai and always seen as a lively figure in social gatherings, the rest of the time he was said to lead a solitary life.
মাহমুদুল হকের লেখার সংস্পর্শে আসা শুধু পাঠের জগত নয়, আমার জীবনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যেন অন্য এক চোখ খুলে গিয়েছিল আমার। জগতের নানা জিনিস নতুনভাবে দেখতে শুরু করি। মায়া আর বিস্ময়ের এক অপলক চাহনি যেন বা তাঁর লেখা থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসে। অন্যান্য উপন্যাস এবং গল্পগ্রন্থ আগে পড়লেও অগ্রন্থিত গল্প পড়লাম দেরিতেই। বইয়ের মলাটে আঁকা মাহমুদুল হকের একটি ছবি। শিল্পী অশোক কর্মকার। বইটি পড়তে পড়তে বহুবার এই ছবিটির দিকে তাকিয়েছি। দেখেছি চোখ দুটো। ভেবেছি ওই চোখ দিয়েই তো তিনি দেখতেন পৃথিবীকে। হয়তো তাঁর গল্পের চরিত্রেরা বাস্তব হয়ে উঠে আসতো আশেপাশেই। তাদের তো ওই চোখ দিয়েই দেখেছেন। কলম নামের তুলি দিয়ে গড়েছেন এক একটা গল্প। সেই তুলিও যেন কখনো হয়ে উঠেছে পিয়ানোর রিড। নানা কম্পোজিশনে গড়ে তুলেছেন কারুকার্যময় ভাষার জগত। তৈরি করেছেন গল্প, পরতে পরতে ইশারাময় করে তুলেছেন শব্দাবলি।
১৪-১৫ বছর বয়সে মাহমুদুল হক যে সব গল্প রচনা করেছেন, পরবর্তীকালের অনেক গল্পের তুলনায় সেগুলো অনুরূপ আবেদনময় না হলেও, আমরা বুঝতে পারি, প্রবল এম্প্যাথি নিয়ে ভবিষ্যতের বাংলা ভাষার একজন অন্যতম সেরা কথাশিল্পী চারপাশের পৃথিবীটাকে দেখছেন এবং সেই দেখার পরিপক্কতা নিয়ে বেড়ে উঠছেন।
জীবনের নানা সময়ে পাণ্ডুলিপি, লেখা সংরক্ষণে মাহমুদুল হকের উদাসীনতা, প্রকাশকদের বারবার তাগাদা সত্ত্বেও লেখা গোছাতে অনাগ্রহ -- পাঠক হিসেবে এসব আমাকে আক্ষেপ জোগায়। ইস, এমনিতেই লিখেছেন কম, প্রকাশ করেছেন আরও কম। গ্রন্থাকারে যা প্রকাশিত হয়েছে বাংলা সাহিত্যে তাকে স্মরণীয় করে রাখতে অবশ্য সেটুকুই যথেষ্ঠ। তবু মনে হয়, আরও কত লেখা না জানি কোথায় কোথায় হারিয়ে গেছে, সেসব কি আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে? যদি খুঁজে পাওয়া যেত!