আবুল হাশিম অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের বিভাগপূর্ব শেষ সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, '৪৬ এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের অভূতপূর্ব জয় ও যুক্তবঙ্গ আন্দোলনের তাঁর ভূমিকা অসামান্য। তাঁর বড় ছেলে বদরুদ্দীন মুহাম্মদ উমরও আছেন বইতে ।
কী আছে এই বইটিতে, তার উত্তর আবুল হাশিমের বয়ানে,
"বইটিতে ১৯৩৬ সাল থেকে ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মুসলিম রাজনীতি সেই সাথে সর্বভারতীয় রাজনীতির স্রোত ও অন্তঃস্রোতের ওপর আলোকসম্পাত করে বাস্তব বর্ণনা দেয়ার প্রচেষ্টা করা হয়েছে । "
স্বাস্থ্য খুব বেশি না বইটার। মাত্র ১৫০ পৃষ্ঠা। অথচ ব্যপ্তি বিশাল। তাই আলোচনাও বেশ কঠিন তো বটেই ক্ষেত্রবিশেষে স্পর্শককাতরও বটে।
বঙ্গভঙ্গের সালে বর্ধমানের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মেছিলেন আবুল হাশিম। কতখানি উচ্চ বংশের পোলা লেখক সেই বিষয়ক জ্ঞান বিতরণের লক্ষ্যে নিজের পরিবারের একটি বংশলতিকা দেয়ার চেষ্টা করেই ক্ষান্ত হন নাই,দিয়েছেনও বটে। সেই বংশলতিকা থেকে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। আবুল হাশিমের প্রপিতামহ গোলাম আসগর উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু পেশায় ছিলেন ইংরেজদের অধনস্ত বিচারক।তাঁর মাতামহ ও পিতামহ দুইজনই উচ্চপদস্থ কর্তা হিসেবে অবসর নেন তারাও এন্ট্রান্স পাশ(এসএসসি)এর বেশি শিক্ষা নেননি। অর্থাৎ, ইংরেজ আমলের শুরুতে শিক্ষা নয়, বংশ পরিচয়ের ভিত্তিতে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও অন্য পদস্থ কর্মকর্তা নিয়োগ দিত সরকার।
আইন পাশ করে কিছুদিন প্রাকটিস করেন আবুল হাশিম। এরপর রাজনীতিকেই পেশা হিসেবে নেন। বন্ধুর পথে যাত্রা শুরু করেন। আবুল হাশিম '৩৬ এর নির্বাচনেই জয়ী হন ও পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি হয়। এসময় যোগ দেন মুসলিম লীগে। ১৯৪২ এরপর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে পদত্যাগ করে মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি দলে যোগ দেন। আর এতেই সুযোগ সৃষ্টি হয় আবুল হাশিমের। তিনি নির্বাচিত হন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে
সেক্রেটারি হয়েই হ্যাপা বুঝতে শুরু করলেন আবুল হাশিম। ঢাকার খাজাদের পকেটভুক্ত কমিটি দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল বঙ্গীয় মুসলিম লীগ। খাজাদের রাহুগ্রাস থেকে দলকে বের করতে কাজ শুরু করেই বুঝলেন কাজটা কতো কঠিন। খাজা নাজিমুদ্দীন, শাহাবুদ্দীন, ইউসুফ আলী মোহন মিয়া গংদের সাথে লড়াইয়ে পাশে পাওয়ার লোক নেই বললেই চলে।আর সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে বলা হয় তিনিও আবুল হাশিমের মতো প্রগতিবাদী। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে আবুল হাশিমের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ভিন্ন সাক্ষ্য দেয়। সারা বইতে কখনোই তিনি শহীদ সাহেবকে প্রগতিবাদী মনে করেননি, তাঁকে বরং আবুল হাশিম দেখতেন একজন সুবিধাবাদী হিসেবেই যে নিজের স্বার্থে হন আবুল হাশিমের গ্রুপের লোক, আবার সেই শহীদ সাহেবই কট্টরপন্থী খাজাদের একজন বিশিষ্ট গুণগ্রাহী। অথচ লোকে ভাবে সোহরাওয়ার্দী আবুল হাশিমের কতো আপনজন!
আর হ্যাঁ,সোহরাওয়ার্দী নিজে প্রকৃতই শতভাগ উদারপন্থী রাজনীতিক ছিলেন তার অকুন্ঠ প্রশংসা বারবার আবুল হাশিম করেছেন।
'৪৬ এর নির্বাচনী প্রচারণায় জানপ্রাণ দিয়ে নেমেছিল বঙ্গীয় মুসলিম লীগ। দলের মনোনয়ন নিয়ে ভেতরকার দ্বন্দ্ব চরমে উঠলেও তা বাইরে প্রকাশ পায়নি বলেই দাবি করেছেন। দলের সেক্রেটারি আবুল হাশিম সারা বঙ্গে সফরে বের হতেন। তারই প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামে গেলে এক নেতার দেখা পান যাকে সোহরাওয়ার্দী বহিষ্কার করেছিলেন। সেই নেতা বেশ হম্বিতম্বি করে আবুল হাশিমকে নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দেন। বিরক্ত আবুল হাশিম জানতে পারেন যুবকটির নাম ফজলুল কাদের চৌধুরী ওরফে ফকা। এই ব্যাক্তিটির বিরক্তিকর আরও কিছু কার্যকলাপের বর্ণনা দিয়েছেন আবুল হাশিম।
তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান তখন তুখোর ছাত্রনেতা। তাঁকে নিয়েও কিছু মন্তব্য রয়েছে। যেমন,
"শেখ মুজিবর রহমান আমার রাতের আলোচনায় থাকতেন। কিন্তু তার উৎসাহ ছিল খুবই কম। তিনি প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়তেন এবং সকালে উঠে জিজ্ঞেস করতেন কি করতে হবে। তিনি কাজের লোক ছিলেন কিন্তু চিন্তা-ভাবনা করার লোক ছিলেন না। অবশ্য তাঁর কর্তব্য তিনি ঠিকমতোই করতেন।"
এদিকে দেশভাগের সময়ও চলে আসল। ইতোমধ্যে কলকাতা দাঙ্গায় আক্রান্ত হয়েছে। তার দায় কতটা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘাড়ে চাপে তার নিরপেক্ষ বয়ান দিতে চেয়েছেন আবুল হাশিম। দেশভাগের দায় মুসলিম লীগের দিকে ইঙ্গিত করলেও। অথচ এই দেশভাগের তত্ত্ব নাকি রাজা গোপাল আচারী দিয়েছিলেন- এই তথ্য আবুল হাশিম দেন।
নীতিতে আবুল হাশিম ইসলামি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু ইসলামি সমাজতন্ত্র বলতে আবুল হাশিম কী বুঝতেন তা পরিষ্কার করেননি পাঠকের কাছে। কমিউনিস্ট পার্টি ও শরৎ বসুর সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের জের ধরে হাশিমের বিরোধীরা তাঁকে "কমিউনিস্ট " বলে প্রচার করতেন। মুসলিম লীগের তিনটি পত্রিকা ছিল যথা- কট্টরপন্থী আকরাম খাঁর আজাদ, হামিদুল হক চৌধুরীর মর্নিং নিউজ ও স্টার অব ইন্ডিয়া সবসময় সোহরাওয়ার্দী ও হাশিমের বিরুদ্ধেই লিখত। তাই আবুল হাশিম ও সোহরাওয়ার্দী মিলে প্রথমে মিল্লাত ও পরে ইত্তেহাদ পত্রিকা প্রকাশ করেন।
বঙ্গভাগের বিপক্ষে ছিলেন স্বয়ং জিন্না। তিনি অখণ্ড বাংলাকে চাইলেও কংগ্রেস, মহাসভা বাংলা ভাগকে নিশ্চিত করে তুললো ভোটের মাধ্যমে। গান্ধীও বঙ্গভাগের পক্ষেই মত দেন। আবুল হাশিম, সোহরাওয়ার্দী আর শরৎ বসুর অখণ্ড বাংলার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। এখানে সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আবুল হাশিম লিখেছেন,
"জিন্না বললেন,আলোচনা করার আছে বাংলা এবং পাঞ্জাব বিভাগে? এ বিষয়ের মীমাংসা হয়ে গেছে বলে ধরে নিতে হবে। মাউন্টব্যাটেন রোয়েদাদ হয় সম্পূর্ণভাবে মেনে নিতে হবে নয়ত সম্পূর্ণভাবে নাকচ করতে হবে। বলুন, হ্যা কি না?
হাত উঠিয়ে ভোট নেয়া হল। সুহরাওয়ার্দী ভোট গগণা করলেন এবং বিজয়ীর সুরে বললেন," কায়দে আজম, কেবলমাত্র এগারোজন আমাদের বিপক্ষে ভোট প্রদান করেছেন।" "
আবুল হাশিমের মতে, সোহরাওয়ার্দী শেষটা ভালো হয়নি। তিনি প্রথমে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি নেতা হতে চাইলেন। কিন্তু নাজিমুদ্দীনের কাছে পরাজিত হলেন। আবার একটু পরেই তিনি গিয়ে পশ্চিমবঙ্গে থেকে যাওয়া মুসলিম লীগ সাংসদদের নেতা বনে গেলেন! অথচ একটু আগে তিনি পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হতে চাইছিলেন।
আবুল হাশিমের বইতে অনেক ঘটনার ইঙ্গিত আছে, বর্ণনাও আছে বহু চেনা জানা ব্যক্তির। আত্মকথায় লোকে নিজেকে মহামানব আর অপরকে শয়তানতুল্য হিসেবেই বেশির ভাগ সময় উপস্থাপন করতে পছন্দ করে। কিন্তু আবুল হাশিম তাঁর বইতে অনেকবার স্বীকার করেছেন তিনি ভুল করেছেন, ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং আক্ষেপের সুরে বলেছেন তিনি মানুষ চিনতেন না।আর এই সাক্ষ্যই আবুল হাশিমের আত্মকথা তুল্য বইটি আলাদা মর্যাদা পাওয়ার দাবি রাখে। আবুল হাশিমের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ভালো ছিল তাও বলতে হবে। তিনি খাজা গং, নুরুল আমীন, হামিদুল হক চৌধুরী আর ফকাদের চরিত্রায়ন যেভাবে করেছিলেন পাকিস্তানে তারা সেরূপ কর্মকাণ্ড করেছিল।