Jump to ratings and reviews
Rate this book

গড় শ্রীখণ্ড

Rate this book
আধুনিক বাঙলা কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাকার অমিয়ভূষণ মজুমদারের ম্যগনাম ওপাস।

392 pages, Hardcover

Published January 1, 2010

2 people are currently reading
92 people want to read

About the author

Amiya Bhushan Majumdar

15 books14 followers
Amiya Bhushan Majumdar (March 22, 1918 – July 8, 2001) was an acclaimed Indian novelist, short-story writer, essayist and playwright. In a writing career spanning over four decades, Majumdar wrote numerous novels, short stories, plays and essays in Bengali. Known as the ‘Writer’s Writer’, Majumdar is considered one of the most noteworthy authors of modern Bengali prose.[1] His works received significant critical acclaim and recognition – including the Sahitya Academi Award for his novel Rajnagar in 1986.

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
5 (22%)
4 stars
7 (31%)
3 stars
8 (36%)
2 stars
1 (4%)
1 star
1 (4%)
Displaying 1 - 9 of 9 reviews
Profile Image for Sohan.
274 reviews74 followers
September 27, 2022
গড় শ্রীখণ্ড পড়া শেষ করে আমি ম’কে ফোন দিই। দেখা করতে বলি ক্যাম্পাসে। ঠিক সন্ধে নামার মুখে ম’য়ের সাথে দেখা, আমি ম’কে আড়ালে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করি—তুমি অমিয়ভূষণ মজুমদারের নাম শুনেছো?
ম’ নিঃসঙ্কোচে জানিয়ে দেয় সে নাম শুনে থাকলেও তার মজুমদারের লেখা পড়া হয়নি।
আমি ম’কে জানিয়ে দিই—তোমাকে দুটো কারনে ডাকতে হল আজ। প্রথমত তুমি বই পড়তে পছন্দ করো আর দ্বিতীয়ত তোমার বাড়ি পাবনার ঈশ্বরদীতে। এই দুটো একত্রে মিলেছে বলে তোমায় ডেকেছি। আসলে হয়েছে কি, লেখক অমিয়ভূষণ মজুমদারের পৈতৃক নিবাস পাবনায় তোমাদের ঈশ্বরদীর সাড়া ইউনিয়নে।
এই শুনে ম’য়ের চক্ষু চড়কগাছ। আমি বলি—আসল কথা বলি নি এখনও। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘গড় শ্রীখণ্ড’ - যা পাবনার প্রেক্ষাপটে রচিত। আজ সেই উপন্যাস নিয়ে আলাপ করবার জন্যই এসেছি।
আমি ব্যাগ থেকে বইটা বের করে ম’য়ের হাতে তুলে দিই। ম’ বইটা নেড়েচেড়ে বলে—বাহ! প্রচ্ছদটা তো সুন্দর!
হ্যাঁ প্রচ্ছদটা সত্যিই খুব সুন্দর। প্রচ্ছদ দেখেই একজন পাঠকের পড়তে ইচ্ছা করতে পারে। আর প্রচ্ছদটি করেছেন পূর্ণেন্দু পত্রী!
ম’ জিজ্ঞেস করে এই বইয়ের বিষয়বস্তু কি।
আমি বলি—আরে সে জন্যই তো আজ এই মঞ্চে তোমার আমার অবতরণ!

গড় শ্রীখণ্ড বইটা চল্লিশের দশকের সময়ের কাহিনী। ভেবে দেখো একবার, যে শহরে তুমি বেড়ে উঠেছ ঠিক সেই শহরে আজ হতে সত্তর আশি বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা, এই ধরো, তুমি দেখতে পাচ্ছ চোখের সামনে—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সৈন্যদের আসা যাওয়া, সেই সাথে পঞ্চাশের মন্বন্তর। পঞ্চাশের মন্বন্তর দিয়েই মূলত শুরু হয়েছে কাহিনী আর শেষ হয়েছে দেশভাগ ও তার পরিণতি দিয়ে। অমিয়ভূষণ মজুমদার এইসব ঘটনা নিজের চোখে দেখেছেন। তিনি সেই সময়ের মানুষ। তাঁর জন্ম কোচবিহারে। মাতুলালয়ে। সেখানেই তাঁর প্রায় গোটা জীবন কেটেছে। ছিলেন কোচবিহারে ডাকঘর কর্মী। সেই সময়ে শিলিগুড়ি থেকে পাবনায় সরাসরি রেল যোগাযোগ ছিল। ওই অঞ্চল থেকে দেশভাগের আগ পর্যন্ত লোকে এই পথেই কলকাতা যেত। যাতায়াত ছিল নিয়মিত। তাছাড়া তাঁর শৈশব ও যৌবনের অনেকখানি সময় এখানে কাটিয়েছেন।

আমি তোমাকে আর কয়েকজনকে নিয়ে এই বইটির আরও গভীরে যেতে চাই। অমিয়ভূষণের লেখনশৈলী নিয়ে পাঠকগোত্রের একটা উদ্বেগ আছে। আমি নিজেও স্বীকার করছি—তাঁর লেখায় ডুব দেয়া কষ্টকর। কতকটা মহাশুন্যে ভাসমান থাকবার মতো। না পারছ ডুবতে না পারছ সাঁতার কাটতে। তবে আনন্দ পাচ্ছ এতে সন্দেহ নেই! সমস্যাটা static তাই এর একটা dynamic সমাধান হতে পারে—ঈশ্বরদীতে গিয়ে বইটা নিয়ে যদি আলাপ করা যায়। বইটিতে যে জায়গাগুলোর কথা আছে সেই চিকন্দি, দিঘা, বুধেডাঙ্গা, সানিকদিয়ার ঘুরে ঘুরে একটু দেখতে আর দেখাতে যদি ইচ্ছে করি?

আমার অভিপ্রায় বুঝতে ম’য়ের দেরি হয়না। দেরি হয়না আমাদের বেরিয়ে পড়তে। হাতে গোনা কয়েকদিন পর এক ছুটির দিনে আমরা বেরিয়ে পড়ি ঈশ্বরদীতে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহত্তর রেল জংশনে নেমে মনে হয় আমরা বোধহয় বেরিয়েছি এক সময় ভ্রমণে। এখনও উজ্জ্বল বর্ণে প্ল্যাটফর্মের কামরাগুলোয় লেখা আছে—প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগার-দ্বিতীয় শ্রেণির বিশ্রামাগার। শ্রেণিভেদের সাহেবি কীর্তিগুলো আজও রেখে দিয়েছে আমাদের দু’চোখ ভ’রে দেখবার জন্য। আমি আর ম’ প্ল্যাটফর্মের কোন এক শ্রেণিহীন বেদিতে বসে পড়ি আর গড় শ্রীখণ্ড নিয়ে আলাপ শুরু করি।

গড় শ্রীখণ্ডের মতো বৃহৎ উপাখ্যান আমরা কয়েকটি বৃত্তে ভাগ করে বুঝতে পারি। প্রথম বৃত্তের নাম দেয়া যাক—The anthropological hoop.
এই চক্রে আছে নৃতত্ত্ব, পঞ্চাশের মন্বন্তর, সমাজের একদম নিচুতলার মানুষ। আর নিচুতলার মানুষদের প্রতিনিধি চরিত্র হিসেবে আছে সুরতুন। সুরুতুন্নেসা। সুরতুন জাতে সান্দার। এখন প্রশ্ন হল—সান্দার জাতি কারা? ম’ তুমি সান্দার জাতির নাম শুনেছ?

—আজই প্রথম শুনছি।

—আমি নিজেও জানতাম না সান্দার জাতের কথা। বাংলাদেশের সমাজসেবা অধিদফতরের একটা জরিপে এদের এক প্রকার যাযাবর জনগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের অনেক সময় বেদে সম্প্রদায় হিসেবেও গন্য করা হয়। এরা চরম অবহেলিত, বিচ্ছিন্ন আর উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীদের অন্তর্গত। গড় শ্রীখণ্ডের শুরুর দিকে এদের সম্পর্কে লেখা হয়েছে। আমি একটু পড়ে শোনাইঃ

“সান্দারদের উৎপত্তির ইতিহাসটা কনকের কল্পনাজাত। সেখানে সে লিখে রেখেছে নিজের মন্তব্য। এরা নাকি কোনোকালে বাঙালির নৌ-সৈন্য ছিলো। বাঙালির যেদিন নৌ-সৈন্য রাখার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল এদের একদল হয়েছিল জলের ডাকাত আর একদল হলো যাযাবর। কিংবা যখন বাঙালির শানিত ইস্পাতের প্রয়োজন ছিলো তখন এরাই শানদার ছিলো।
আর যাই হোক, এরা যে যাযাবর সে বিষয়ে কনক নিঃসন্দেহ হয়েছে।”


বুঝতেই পারছ, লেখক কনক দারোগা চরিত্রের জবান নিজের আইডিয়া তুলে ধরেছেন। আইডিয়াটা চমৎকার। এই কনক দারোগার চোখ দিয়েই আমরা প্রথম বৃত্তের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পঞ্চাশের মন্বন্তর দেখতে পাই। সেই সাথে সান্দার নারী সুরো বা সুরতুনের জীবন সংগ্রামের গল্প। আমি আবার পড়ছি শোনোঃ

“সেই বিশ্বব্যাপী অনাহারের দিনের আগেও সুরোর মতো যারা তাদের অনাহারের দিন ধানের ঋতুগুলির মধ্যেও ইতস্তত ছড়ান থাকতো। পৃথিবীতে সে একা। তার বাবা বেলাতআলির মৃত্যুর পর সে কি করে খুঁট খেয়ে কি করে বারো থেকে আঠারোতে সম্পূর্ণ একা একা পৌঁছেছিল, ভাববার বিষয়।”


সুরতুনের মতো নিম্নশ্রেণীর আরও একজন মানুষকে দেখা যায় সংগ্রাম করতে। তার নাম মাধাই।

“পৃথিবীতে থাকার মধ্যে মাধাইয়ের এক বুড়ি মা ছিল। যতদিন মাধাই গ্রামে ছিলো মায়ের সঙ্গে তার সদ্ভাব ছিল না। বুড়ি যদি ক্ষুধার মুখে ভাতের থালা এগিয়ে দিতে না পারত মাধাই তাকে মারতো ধরে ধরে। আলসের বেহদ্দ ছিল সে। কিন্তু গ্রামে অনাহার এসেছে এই খবর পেয়ে সে গিয়েছিল রেল-কোম্পানির-দেওয়া চালডাল নিয়ে মায়ের জন্য। সংবাদটা কেও তাকে দেয়নি। মায়ের পরিত্যক্ত ভাঙাচোরা থালাবাসন, ছেঁড়াখোঁড়া কাপড়চোপড় ঘটনা রাষ্ট্র করে দিয়েছিলো। ধূলায় আচ্ছন্ন ক্লান্তমুখ চোখের জলে আবিল করে সে ফিরে আসছিলো। পথের ধারে পড়েছিলো সুরো। মায়ের বুভুক্ষু আত্মার তৃপ্তি হয়েছিলো কিনা কে জানে, মাধাইয়ের শুন্যিভূত আত্মা একটা অবলম্বন পেয়েছিলো।”.


কনক দারোগার চোখ দিয়ে দুর্ভিক্ষের ভয়ানক চিত্র দেখতে পাবে তুমি। তুমি মিলিয়ে দেখতে পাবে জয়নুল আবেদিনের স্কেচের সাথেঃ

“সে সময় কনকদারোগা একটা ভুল করে ফেলেছিলো, সে সত্যি তদন্তে বার হয়েছিলো। বুধেডাঙ্গা অবধি ঘোড়া ছুটিয়ে যদি থামতো, তাহলেও হতো। বুধেডাঙ্গা ছারিয়ে চিকন্দির সীমায় পৌঁছে সে ব্যাপারটার মুখোমুখি হয়েছিলো।

-ও বাবা, বাবা, সোনা আমার-
ঘোড়া থামিয়েছিল কনক, তার কানে গেলো—ঐ সোনার মুখে ভাত দিতে পারলাম না রে, বাবা।
থিয়েটার দেখা সংহত শোক নয়, সিনেমায় শোনা মার্জিত বেদনার হেঁচকি নয়, অসংস্কৃত বেদনার বিকৃত উচ্চারন।
কনকদারোগার বুকের গোড়াটা উল্টে উল্টে যেতে লাগল, অশ্রুগ্রন্থিগুলো ফুলে ফুলে উঠতে লাগলো। চোখের জল পুরোপুরি চাপতে পারলো না সে। ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে কনক পালিয়ে এসেছিলো।”


সুরতুন চরিত্র বুঝতে আমাদের পঞ্চাশের মন্বন্তর সম্পর্কে জানাটা জরুরী। জাপানি সৈন্য ১৯৪২ সালে বার্মা দখল করে নেয়। এই ঘটনার কয়েকমাস পর মন্বন্তর শুরু হয়। বার্মা ছিল সেই সময়ে চাল আমদানির একটা বড় উৎস। এই মন্বন্তরে বাংলাজুড়ে প্রায় ৩০ লক্ষ লোক না খেয়ে মারা যায়। ভারতবর্��ের তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক সেনা ও যুদ্ধে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্য মজুদ করায় এই দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। মজুদ করার ক���রণে হু হু করে বেড়ে যায় চালের দাম। একই সঙ্গে বাজারে তা দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে। জাপান ভারত দখল করলে খাদ্য যাতে শত্রুর হাতে না পৌঁছায়, এ জন্য ব্রিটিশ সরকার আগাম কিছু ব্যবস্থা নেয়। বাংলাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নৌকা ও গরুর গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয় নয়তো একেবারে ধ্বংস করে ফেলা হয়। এতে চাল বা খাদ্য বিতরণ-ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে। একে বলা হয় পোড়ামাটি নীতি। অনেকক্ষেত্রে নিজ দেশেও কোন সেনাবাহিনী তাদের নিজস্ব শহর কিংবা গ্রামের সম্পদ ধ্বংস করতে পারে, যাতে করে শত্রুপক্ষ তাদের সেসব শহর কিংবা গ্রাম দখল করে নিলে কোন ব্যবহারযোগ্য সম্পদ না পায়। এতে করে তাদের সংকটের মুখে পতিত হওয়ার একটি সম্ভাবনা থেকে যায়। এটাই হল পোড়ামাটি নীতি। ইংরেজিতে একে বলে Scorched Earth আর চার্চিল সরকার এর একটা ভদ্রস্থ সাহেবি নাম দিয়েছিলো—denial policy.
গবেষকরা দেখেছেন এই মন্বন্তর কোন প্রাকৃতিক কারনে সৃষ্টি হয়নি। এটি পুরোপুরি নৃতাত্ত্বিক অর্থাৎ মানবসৃষ্ট। আরও সোজাসুজি বললে—চার্চিল সরকারের অমানবিক নীতিই এই দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী।
গড় শ্রীখণ্ড উপাখ্যানের শুরুতেই তুমি দেখতে পাবে সান্দার নারী সুরতুন জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে কি করে চালের চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ে। মন্বন্তরের সাথে কি গভীর সম্বন্ধ!
প্রথম বৃত্ত থেকে আমরা বরং বেরিয়ে পড়ি চলো।
চলো অমিয়ভূষণ মজুমদারের আদি নিবাস সাড়া ইউনিয়নে যাই। সেটা হবে আমাদের দ্বিতীয় বৃত্তের আলাপের উপযুক্ত স্থান। আমাদের দ্বিতীয় বৃত্তের নাম গড় শ্রীখণ্ডঃ The Fort of Chandan.

আমরা ক্লান্ত দু’জন হাওয়া খেতে সাড়া ঘাটে যাই। বর্ষার জলে পদ্মা এখন টইটুম্বুর। ঘাটের কাছে আম গাছের ছায়ায় দু তিনটে বুড়ো লোককে ঝিমুতে দেখে আমারও বড্ড ঝিমুনি পায়। দেখি কেও ছিপ বড়শী ফেলে মনোযোগ দিয়ে মাছ ধরে। আমরা গিয়ে হাত পা ছেড়ে ঘাটে গিয়ে বসি। কেও একজন গুনগুন করে বাউল সুর তোলে। আমার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ঘাড় ঘুরিয়ে এধার ওধার বাউল খুঁজি। চেয়ে দেখি নদীর পাড় ধরে এক ফকির একতারা টুং টুং করতে করতে গাইতে থাকেঃ

সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা।
জীবের কি সাধ্য আছে
গুণে পড়ে তাই বলা।।
কখনো ধরে আকার কখনো হয় নিরাকার
কেউ বলে আকার সাকার
অপার ভেবে হই ঘোলা।।

কখন আসে কখন চলে যায়। আমি অপার হয়ে বসে থাকি। ইচ্ছে করে বাউলের পিছু ধরি। ঘুরে বেরাই দ্যাশ বিদেশ। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো সাড়াঘাটের বাউলটাও যেন একতারার টুং টুং সুরে আমায় টেনে নিয়ে যাবে আর কখন জানি টুপ করে করে ফেলে দেবে পদ্মার অতল জলে।

ম’য়ের ধাক্কায় আমার ঝিমুনি ভাঙে। তখনও আবছা ভেসে আসছে বাউলের সুর। ডপলার ইফেক্টে একতারার কম্পন তখন লোহিত সরণে ভাসছেঃ

…ভাণ্ড ব্রহ্মাণ্ড মাঝে
সাঁই বিনে কি খেল আছে।
ফকির লালন কয় নাম ধরে সে
কৃষ্ণ করিম কালা।।

—আচ্ছা ম’ তুমি আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করলে না বইটার নাম ‘গড় শ্রীখণ্ড’ কেন?
—আমি ঠিক এই প্রশ্নটাই করতে যাচ্ছিলাম!
—আক্ষরিক অর্থে ‘গড় শ্রীখণ্ড’ মানে চন্দন কাঠের দুর্গ। তবে, এই বইয়ে একটি জমিদার চরিত্র আছে সেই জমিদার বাড়ির নাম গড় শ্রীখণ্ড। এই জমিদার চরিত্র বুঝতে গেলে আমাদের অমিয়ভূষণের ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে একটু ভাবতে হবে। আমি আগেই বলেছি তাঁর শৈশব কেটেছে এই সাড়া থানার পাকুরিয়া গ্রামে। ঐ বাউলটার পিছু নিলে হয়তো কয়েক মিনিটে তাঁর পৈতৃক ভিটায় পৌঁছে যেতাম। তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, তাঁর পূর্ব পুরুষের নীলকুঠি কিনে নেয়া আর জমিদারি পত্তনের কথা। গড় শ্রীখণ্ড বইয়ের জমিদার চরিত্র আসলে লেখকেরই পূর্ব পুরুষের ছায়াপাত। আর শৈশবে কাটানো সেই দুর্গের মতো নীলকুঠি হয়ে উঠেছে গড় শ্রীখণ্ড।
জমিদার চরিত্রের নাম সান্যাল মশাই আর তাঁর স্ত্রী অনসূয়া। জমিদার বলতে আমাদের চোখের সামনে যে দুর্দান্তপ্রতাপ চেহারা ভেসে ওঠে সান্যালমশাই তার ব্যাতিক্রম। আমি অবাক হব যদি কোন এক জমিদার তাঁর স্ত্রীর সাথে বসে কার্ল মার্ক্স নামক দার্শনিকের লেখা নিয়ে আলোচনা করেন কারণ এযাবৎ কেও এভাবে দেখায়নি আমাকে। অমিয়ভূষণ মজুমদার তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেনঃ

.
“আমার লেখার সঙ্গে যারা পরিচিত, তারা লক্ষ্য করে থাকবে, আমি রাজা, রানী, জমিদার, জোতদার, মধ্যবিত্ত, প্রলেটারিয়েট, লুম্পেন প্রলেটারিয়েট, কারো কথাই অবহেলা করিনি, গোটা সমাজের সকলের কথাই বলেছি, সমান সহানুভূতি দিয়ে সকলের সমস্যা বলতে চেষ্টা করেছি। এমনকি তাদের কথাও বলতে চেষ্টা করেছি যারা ভাষার অভাবে নিজেদের অনুভূতিগুলিকেও প্রকাশ করতে পারে না।”


বলে রাখি এই বৃত্তে সুমিতির কথা। খুব ইন্টারেস্টিং একটা চরিত্র। সান্যাল মশাইয়ের পুত্রবধু। চল্লিশের দশকের আধুনিকমনা নারী। রাজনীতি, সংস্কার, সংস্কৃতি, বিশ্বসাহিত্য, ধর্ম আর পল গঁগ্যার চিত্রকলা নিয়ের তার চিন্তাধারা তোমাকে অবাক করে দেবে।

আমাদের এই দ্বিতীয় বৃত্তে আছে সামন্তপ্রথা, পুঁজিপ্রথার উত্থান, প্রতিসাম্রাজবাদ, বৈষ্ণব সংস্কৃতি, প্রভৃতি। এই বৃত্ত অনেক বেশি জটিল। তোমার চোখের সামনে সামন্তপ্রথা দুর্বল হয়ে যাবে পুঁজিবাদীদের উত্থান ঘটবে। কাঠামোগত মিল পাবে তুমি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামার সাথে।

—এই বইয়ের সাথে খোয়াবনামা!
—হ্যাঁ, স্থানকালের মিল তো আছেই। একই সময়ের উপাখ্যান বলে কথা।


আমরা এই দ্বিতীয় বৃত্ত থেকে বেরিয়ে পড়ি চলো। সাড়া ঘাট থেকে খুব কাছে পাকশি। ওখানে গিয়ে না হয় যবনিকাপাত করি।


অমিয়ভূষণ মজুমদার কোচবিহার থেকে বদলি হয়ে এসেছিলেন পাকশি রেল কলোনি ডাকঘরে। দেশভাগের আগ পর্যন্ত এখানে চাকরী করেছেন। এখান থেকেই তাঁর সাহিত্যিক জীবনের শুরু। প্রত্যক্ষ করেছেন দেশভাগ আর দাঙ্গা। তখনকার সেই ভয়ানক জাতিবিদ্বেষের আঁচ লেগেছিল অমিয়ভূষণের। সে প্রভাব তাঁর উপন্যাসেও আছে।
কতবার এসেছি এই পাকশিতে কিন্তু অমিয়ভূষণ চিনতাম না। এখন তো এখানে এলে এই বইটার কথা মনে হবে। আমার খুব পছন্দের একটা জায়গা, জানো? পাকশি ষ্টেশন থেকে ঐ যে দূরে দেখতে পাওয়া যায় ফুরফুরা দরবার শরিফের সুরম্য গম্বুজ। দরবারের মসজিদটি কিন্তু চমৎকার একটা স্থাপনা। আর স্টেশনের পাশে এই হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কথা তো বলবই না। সাহেবদের স্থাপনার তারিফ না করে পরা যায় না। এখনও এই জায়গাগুলো প্রাচীনত্ব ধরে রেখেছে। খুব সহজেই মেমরি শপিং করা যায়। চোখের সামনে যেন দেশভাগ আর দাঙ্গা দেখতে পাই। দেখতে পাই রামচন্দ্র মণ্ডলের পাবনা থেকে নবদ্বীপে চলে যাওয়া।
রামচন্দ্র মণ্ডলের কথা বলব এবার।
আমাদের তৃতীয় বৃত্তের মাঝে আছেঃ দাঙ্গা, দেশভাগ, স্বাধীনতা। মাত্র তিনটে শব্দ কিন্তু…কিন্তু ভেবে দেখেছ ছোট্ট তিনটে শব্দের মাঝে কত হাহাকার! কত বেদনা! কত বিচ্ছেদ!

আমি ভেবেছিলাম এই বৃত্তের নাম হয়তো দেবো—the birth and rise of capitalism.
একটা জায়গা থেকে পড়ে শোনাই বইটা দাও, এই দেখোঃ
“মেয়ে বলল—এত ধান দিয়ে কী হবি, বাবা?
—বেচবো। রামচন্দ্র বলল
—বেচলা যেন, তারপর?
—জমি কিনবো।
—তারপর কি হবি?
—আরও ধান।
—আরও ধান? তাও যেন বেচবা। তারপর কী করবা?
—আরও জমি নিবো।
মেয়ে হেসে বলল—সব জমি নেওয়া হলি, তারপর?
এবার রামচন্দ্র ভাবল…”

দ্যাখো রামচন্দ্র আর আলেফ সেখ। একজন জোতদার আরেকজনে উদীয়মান বুর্জোয়া। দাঙ্গা আর দেশভাগে রামচন্দ্রকে সব হারাতে হয়। আর স্বাধীনতার পর এই বাঙলায় আলেফ সেখরা হয় নব্য বুর্জোয়া। আর যে রামচন্দ্র মণ্ডল সারাজীবন চাষিদের হয়ে লড়াই করেছে খাইখালাসি কারবারি চৈতন্য সাহা ওরফে এলাকার লোকে কয় চিতিসাপের সাথে সেই রামচন্দ্রকে নাকি চলে যেতে হবে এই দেশ থেকে। রামচন্দ্র মণ্ডলের জন্য কষ্ট হয়। এই বইয়ে সবচেয়ে আবেগের জায়গা কোথায় আমার কাছে জানো? রামচন্দ্রকে যেতে হয় নবদ্বীপে। ভারতবর্ষে এতো দেশ থাকতে নবদ্বীপ কেন? আবেগের লাইনগুলো পড়ে শোনাইঃ

“এমনি সময়ে রামচন্দ্রের কাছে একখানা চিঠি এলো। তাকে কেও চিঠি লিখবে এটা বিশ্বাস করাই কঠিন। অবশেষে ডাকপিয়ন যখন বলল খামে নবদ্বীপের ছাপ আছে তখন মনে হল তার এ নিশ্চয়ই কেষ্টদাসের চিঠি।”


রামচন্দ্র মণ্ডল হল গিয়ে জা��� মণ্ডল। নিজের দেশ নিজের জমিজিরাত ছেড়ে যাবার পরও সেখানে গিয়ে জমির স্বপ্নই দেখে। এই লাইনটা দেখোঃ

“চিন্তা করেও সুখ। তার জমির পাশেই থাকবে গঙ্গা, আর গঙ্গা পাড় হলেই নবদ্বীপধাম। আর কী চাই পৃথিবীতে?
… সনকা বলল—সগগে যায়েও ধান ভানবা?
‘সে-কাম তো তোমার, সুনু। আমি খানটুক জমি পাই, নিবো। সন্ন-বন্ন অস্মিতের দানা ফলবি সে জমিতে। সেখানে আমি দিব চাষ আর তুমি ভানবা ধান।’”


অমিয়ভূষণ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন—একটা কথা কারও মনে আসে না সমগ্র বাংলাদেশ কলকাতার পাড়া নয়। কলকাতা ছাড়া আর সব যেন পাটের জমি, ধানের জমি, তামাকের জমি। ওখানে বোকা লোকেরা থাকে। আমি এদের ব্রাত্যজন বলি।

লেখকের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে এমনিতেই একমত ছিলাম। তবুও, পাবনা-নবদ্বীপ সম্বন্ধটা করবার কারনে তাই বিশেষভাবে নস্টালজিক হয়ে পড়েছি।

একটা ট্রেন আসছে খেয়াল করেছ? ঐ দেখো…
ট্রেনের কামরাগুলো খেয়াল করো, প্রথম শ্রেণির কামরায় রয়েছেন সান্যাল মশাই আর তার স্ত্রী। তীর্থ করবার নাম করে যাচ্ছেন। সত্যিই কি তাই?
আর দেখো রামচন্দ্র মণ্ডল আর তার স্ত্রী। সেও যাচ্ছে নবদ্বীপে। সেও কি তীর্থ করতে যাচ্ছে?
এদের আগে অনেকেই চলে গেছে ওপারে। ওপার এখন ভিনদেশ।

হার্ডিঞ্জ সেতু পেরিয়ে রেলগাড়ির শেষ লেজুরটুকু যখন মিলিয়ে গেলো পদ্মার ওপারে তখনও আমরা চেয়ে থাকি। চেয়ে থাকি পদ্মার ওপারের সূর্যাস্তের দিকে। কয়েক হাজার বছরের পুরনো সে সূর্যাস্ত।

...সমাপ্ত...




GoodScripts:
হ্যাঁ, এখন থেকে আর ‘পুনশ্চ’ না, গুডরিডসের বিশেষ পাঠকদের জন্য বিশেষ স্ক্রিপ্ট—গুডস্ক্রিপ্টস(G.S.)
গড় শ্রীখণ্ড পড়বার মাঝখানে একটা মজার ঘটনা ঘটেছে। গুডরিডসের হারুন ভাইয়ের সাথে মোলাকাত হয়েছে। এক বিশেষ কাজে ঢাকায় যেতে হয় আমাকে। আমি যখন যমুনার তীরে তখন আমাদের রেল গাড়িটা থেমে আছে যমুনার পশ্চিম পাড়ে। সেই সময়ে আমার মনটা একটু খারাপ ছিল। বাড়িতে ফোন না দেয়াতে মা একটু ঝারি দেয় ফোনে। যমুনার তীরে একটা ফোন আসে। ধরে দেখি লিলি। এই প্রথম কথা। মাত্র কয়েক মিলি সেকেন্ডের জ্বে আজ্ঞে কথা শুধু। তবু মনটা ভালো হয়ে গেলো। মনে হল জীবনে যদি একটা স্থাবর লিলি থাকতো (দুজ্ঞা! দুজ্ঞা!)
সন্ধ্যেয় বাতিঘরে ঢু মারবার সময় কেন জানি মনে হচ্ছিল হারুন ভাইয়ের সাথে দেখা হলেও হতে পারে। সত্যি সত্যি দেখি তিনি ঘুরঘুর করছেন। আমাকে তো কোনদিন দেখেননি তাই ভাবলাম একটু মজা করা যাক। আড়াল থেকে একটু ভেঙচি কাটলাম। stalk করলাম কিছুক্ষণ। এক সময় গিয়ে ধাপ্পা দিলাম—আপনে হারুন ভাই না?
—হ্যাঁ 😀 (He just reacted like this emoji)
—আমাকে আপনি চেনেন। আন্দাজ করতে হবে আমি কে।
—আমি সত্যি আন্দাজ করতে পারছি না ভাই প্লিজ বলেন আপনি কে।

আমি যখন পরিচয় দিলাম তখন তাঁর রিঅ্যাকশন দেখবার মতো ছিল। ওটার ইমোজি হয়না। হারুন ভাই ছাড়াও Yeasin Reza আর শবনমের সাথে দেখা হয়েছে। এঁদের সাথে সাক্ষাৎ করে আমার খুব ভালো লেগেছে।

হারুন ভাই বলে—আরে ভাই আপনে মাইয়া না ব্যাটা ছাওয়াল হেইডাই তো বুঝতাম না। কি এক বিলাই দিয়া রাখছেন প্রফাইলে। খারান আপনের একখান ফটো তুলি অরূপরে দেহাইমু।

হা হা হা। হারুন ভাই অস্থির ✌️
Profile Image for Meem Arafat Manab.
377 reviews258 followers
March 29, 2018
আমার ধারণা সম্পাদকেরা অমিয়ভূষণের লেখায় কাঁচি চালাইতে ভয় পান, এই এক বইয়েই যে কি পরিমাণ প্রমাদ। আমার এছাড়া এও ধারণা যে অমিয়ভূষণের লেখা ভালো না, আঁশটে গন্ধ করে, যেনো কেউ উঠানে শুটকি বিছাইছিলো।
কিন্তু এই উপন্যাসের ক্যারেক্টার বলেন, আর পট বলেন, চমৎকারভাবে সাজানো। অবশ্যপাঠ্য, বাংলা উপন্যাসে অসাধারণ একটা জগৎনির্মাণের সাক্ষী হতে চাইলে।
Profile Image for Swajon .
134 reviews76 followers
April 21, 2018
প্রিয় লেখক মাহমুদুল হকের একটা সাক্ষাৎকারের বইয়ে পড়েছিলাম তিনি অমিয়ভূষণের 'গড় শ্রীখণ্ড ' উপন্যাসের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। প্রিয় লেখকের মনে যিনি স্থান নেন, তাকে পড়ে দেখা দরকার। সুতরাং 'গড় শ্রীখণ্ড ' পড়লাম।
পুরোটা পড়ার জেদ যদি ধরে রাখতে না পারতাম, বলা বাহুল্য এই বই শেষ করতে পারতাম না। ভাষা কঠিন না তেমন, কঠিন কঠিন অপ্রচলিত শব্দের আধিক্যও খুব বেশি নেই। কিন্তু সবকিছুই কেমন যেন ভাসা ভাসা। কিছুদূর পড়া হলে যেন বা একটা আবছা দৃশ্য বা লাইন অফ থট হুয়তো পাওয়া গেল, কিছুদূর ছাড়িয়ে যেতেই সেটা মিইয়ে গিয়ে অন্য কোন আবহ তৈরি হলো।
চিকন্দি নামের জায়গাই পরে হয়ে গেল শ্রীখণ্ড। সামন্ততন্ত্র ক্ষয়িষ্ণুতার পথে হাঁটলেও সেটা ঘিরে দীর্ঘদিনের গ্রামীণ রাজনীতি তখনো প্রবল প্রতাপেই বিরাজমান। বিপ্লবী আবহাওয়া অবশ্য লাগে সামন্ত পরিবারের দু'একজনের গায়ে।
দুর্ভিক্ষ, অনাহারে কবলিত মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, এবং তার ভিতরেই ঘটে চলে নিজস্ব সমাজব্যবস্থা, প্রথা, রীতিনীতি, সংস্কার। নৈতিকতা তাদের ভেতরেও আছে। তবে, একদম উদগ্র জীবনপথের সাথে তাল মেলাতে সেই নৈতিকতার এত রকম ডাইমেনশন তৈরি হয় যে, কোন চরিত্রের প্রতিই পক্ষপাত, বিদ্বেষ, বেশি আসক্তি কোনটাই তৈরি হয় না। লেখক দক্ষ হাতে কতিপয় মানুষের জীবনযাত্রাই বলেছেন কোনরকম প্রচলিত ফর্ম কিংবা আইডিওলজির পথে না গিয়ে।
কিন্তু আবারও বলি, অমিয়ভূষণের তৈরি করা এই জগত ভীষণ রকম অচেনা লাগলো। অবশ্য সীমিত পাঠের কারণেও হতে পারে। কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, জগদীশ গুপ্ত - এদের বলা হয় লেখকদের লেখক হিসেবে। সেখানে এই নাদান পাঠক কোন ছাড়!
এই মুহূর্তে 'গড় শ্রীখণ্ড ' কে তিন তারা দিলাম হয়তো। কিন্তু সামনে অমিয়ভূষণের অন্যান্য আলোচিত উপন্যাসগুলো পড়ার ইচ্ছা থাকলো।
Profile Image for Omar Faruk.
263 reviews18 followers
September 23, 2023
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী লেখক অমিয়ভূষণ মজুমদারের প্রথম বই এটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে উপমহাদেশে যে চরম খাদ্যসঙ্কট ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, এই উপন্যাসের শুরুটা ঠিক তখনই।

পদ্মা পাড়ের আধুনিকতা বর্জিত এক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে কাহিনী এগিয়ে গেছে। যেখানে সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের কথা যেমন আছে, সমানভাবে উঁচুস্তরের মানুষের কথাও আছে। দুর্ভিক্ষের কবলে পরে মানুষের দুর্বিষহ দিনযাপন থেকে শুরু করে দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে উঠে সমাজে নিজেদের অবস্থান আবার ফিরে পাওয়ার যে নিরলস সংগ্রামী জীবনযাপন, তা লেখক তার নিজস্ব রঙ্গে লেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। এছাড়াও দেশভাগ, বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের উপর কী ভয়াবহ প্রভাব ফেলে গিয়েছিল তারও একটা স্পষ্ট রূপ লেখক তাঁর নিপুণ হাতে একেঁছেন।

লেখকের বই আগেও একটা পড়েছি। সেসময় বইটা পড়তে বেশ কষ্টই হয়েছে বলা চলে। বিশেষ করে লেখকের লেখনীর স্টাইলে আমার সমস্যা হচ্ছিল। পড়া কিছুতেই আগাচ্ছিলো না। তখনকার মতো মনে করেছিলাম এটা আমারই সীমাবদ্ধতা। কিন্তু এই বইটা পড়ে আমার ধারণা পালটে গেছে বলতে হবে। এই লেখকের লেখা ঠিক আমার ধাঁচের না। পড়া মোটেও আগায় না, সাথে আঞ্চলিক ভাষা অনেক থাকার কারনে কিছু সমস্যা হলেও, সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়েছে প্রায় প্রতিটা চরিত্রের মুখেই দার্শনিকের মতো কথাবার্তা। যা যথেষ্ট অসংলগ্ন মনে হয়েছে আমার।
Profile Image for Preetam Chatterjee.
7,034 reviews379 followers
February 16, 2025
কয়েক বছর আগে অধ্যাপক বিশ্ববন্ধু ভট্টাচার্যর লেখা 'দেশবিভাগ ও বাংলা উপন্যাস : প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি' প্রবন্ধে পড়েছিলাম এই অংশটি"

'বলতে দ্বিধা নেই, দেশবিভাগ অবলম্বনে রচিত বাংলা কথাসাহিত্য সামগ্রিকভাবে সেই উচ্চতায় পৌঁছোয়নি। না পৌঁছোনোর দুটি প্রধান কারণ ছিল। এক, প্রধান প্রধান লেখকদের অনেকেরই উৎস থেকে বিচ্ছিন্নতার বেদনা তেমন ছিল না। তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুজন তারাশঙ্কর ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কেউই জন্মসূত্রে পূর্ববঙ্গের নন....।'

এখানেই অমিয়ভূষণ মজুমদার বাংলা সাহিত্যের এক অনন্যসাধারণ সাহিত্যিক। অমিয়ভূষণ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, পদ্মাই তার কাছে একমাত্র নদী আর পদ্মা-বিধৌত জনপদই একমাত্র স্বদেশ। অমিয়বাবুর লেখনীতে পূর্ববঙ্গের গ্রামবাংলার চিত্র, মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সমাজবাস্তবতা অসাধারণভাবে উঠে আসে।

তাঁর রচিত ‘গড় শ্রীখণ্ড’ উপন্যাস বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, যেখানে ইতিহাস, রাজনীতি, প্রেম, লৌকিকতা ও মিথ এক অপূর্ব মিশেলে উপস্থাপিত হয়েছে। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়, বরং এক গভীর দার্শনিক পর্যবেক্ষণও বটে। উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু হল ‘গড় শ্রীখণ্ড’ নামে একটি প্রাচীন রাজ্য, যা বাংলার এক অখ্যাত ইতিহাসকে বহন করে। এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট মূলত রাজনীতি, সামাজিক পরিবর্তন, এবং মানুষের অস্তিত্বের টানাপোড়েনের উপর দাঁড়িয়ে। লেখক এখানে ইতিহাস ও কল্পনাকে একসূত্রে গেঁথে এক অনবদ্য উপন্যাস সৃষ্টি করেছেন, যেখানে সমকালীন সমাজব্যবস্থা, মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং অতীতের সাথে বর্তমানের যোগসূত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

উপন্যাসে একদিকে যেমন আছে শাসকশ্রেণির দ্বন্দ্ব, তেমনই রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও মানসিক টানাপোড়েনের সূক্ষ্ম চিত্রায়ণ। সমাজের বিভিন্ন স্তরের চরিত্ররা এখানে এসে এক বিশাল ক্যানভাস তৈরি করেছে, যা বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল সংযোজন।

অমিয়ভূষণ মজুমদারের ভাষারীতি সহজ, সাবলীল, কিন্তু গভীর অর্থবাহী। তাঁর গদ্যের মধ্যে এক অনন্য গতিময়তা ও কাব্যিকতা আছে, যা পাঠককে মোহিত করে। তিনি সংলাপ ও বর্ণনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চরিত্রদের জীবন্ত করে তুলেছেন। তাঁর লেখায় প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনাপ্রবাহ একেকটি প্রতীক হয়ে ওঠে, যা পাঠককে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। উপন্যাসের চরিত্ররা কেবল কাল্পনিক নয়, বরং তারা বাস্তবতার একেকটি দিকের প্রতিচ্ছবি। লেখক চরিত্রদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে যে সূক্ষ্মতা দেখিয়েছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। প্রতিটি চরিত্রের দ্বন্দ্ব, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা এবং ব্যর্থতা বাস্তবের মতোই মনে হয়।

দেশত্যাগের বেদনা প্রত্যক্ষ অনুভব না করলে লেখা যায় না। দেশবিভাগের স্মৃতিকে যে যে লেখক তাঁর মনের স্থায়ী ‘ক্ষত’ করে তুলতে পারেন, এবং এই ক্ষত থেকে যাঁদের ক্রমাগত রক্ত চুঁইয়ে পড়ে, একমাত্র তাঁদের পক্ষেই বাস্তুত্যাগীর যন্ত্রণা বোঝা সম্ভবপর।

এমনই এক ‘রক্ত চুঁইয়ে পড়া’ লেখা গড় শ্রীখণ্ড’!!

কিন্তু তার আগে দেশবিভাগের সূচনা পূর্বের বাঙালির মানসিকতাকেও বোঝা দরকার। ভারতবিভাগের সম্ভাবনা দেখা দেবার পর থেকেই সমগ্র এবং পশ্চিম ভারত বিশেষ করে পাঞ্জাবে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও তিক্ততার মাত্রা বাড়তেই থাকে, রক্তপাত আগে থাকতেই শুরু হয়ে যায়। রোয়েদাদ ঘোষণার পর তা এক ভয়াবহ রূপ নেয়। কিন্তু অবিভক্ত বাঙলার স্লোগান প্রাথমিক টেনশন থেকে বাঙালিকে কিছুটা মুক্ত রেখেছিল।

যদিও নোয়াখালি বা ১৯৪৬-এর এহেন সংগ্রামের কাল থেকেই অবিশ্বাসের মাত্রা বেড়ে চলেছিল, তথাপি তা দেশজোড়া গৃহযুদ্ধের আকার নেয়নি। বরং প্রথম দিকে সাধারণ মানুষ দেশবিভাগ ব্যাপারটিকে তেমন গুরুত্ব দিয়ে উপলব্ধিও করেনি।

‘গড় শ্রীখণ্ড’ উপন্যাসের দু-একটি সংলাপে তা ধরা পড়ে—

‘শুনছেন মণ্ডল— দেশ ভাগ হতিছে।’

‘সে আবার কি?’

‘হাঁ, একভাগ হিঁদুর, আর একভাগ মোসলমানের।’

‘ভাগ কে করে? ইংরেজ? তার নিজের জন্য কি রাখবি?’

রামচন্দ্র হো হো করে হেসে উঠল

‘কী আবার রাখবি। মনে কয়, ঘাসের জমি পত্তনি দিতেছে।

মনে কয়, বিলেতে বসি খাজনা পাবি।’


রামচন্দ্র নিজে কিন্তু এক বড়ো চাষি। কেউ কেউ ‘হাঁসুলীবাঁকের উপকথা’-র করালীচরণের সঙ্গে তার তুলনা করেছেন। কিন্তু রামচন্দ্র নিজের জমিজমার পরিমাণ বৃদ্ধি নিয়ে যতটা আগ্রহী, সামাজিক জোট বেঁধে উচ্চবর্গের কাজ থেকে মর্যাদা আদায়ের লড়াইয়ে তাকে দেখা যায়নি।

কিন্তু দেশবিভাগ সম্পর্কে রামচন্দ্রের এই সংলাপের মধ্য দিয়েই অমিয়ভূষণ এদের সন্ত্রস্ত মানসিকতার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে সবার অলক্ষ্যে উপন্যাসে দেশভাগের বৃহত্তর পটভূমিকাও রচিত হয়। গড় শ্রীখণ্ড ওরফে চিকন্দী গ্রামে সান্যাল মশাইকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমানের মৈত্রীর যে প্রচেষ্টা হয় তা কলকাতার দাঙ্গার সংবাদে ব্যাহত হতে থাকে।

শেষপর্যন্ত দেশত্যাগের ব্যাপারে উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের মধ্যে কোনও পার্থক্য থাকে না। সকলেই দেশত্যাগের মহামিছিলে শামিল। অমিয়ভূষণ একে ‘শ্মশানযাত্রা’ আখ্যা দেন।

খুব বড়ো মাপের ঔপন্যাসিকের ব্যাপ্তি নিয়ে তিনি পদ্মার ভাঙন ও দেশের ভাঙনকে এক সূত্রে মিলিয়ে দেন। অমিয়ভূষণ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, পদ্মাই তার কাছে একমাত্র নদী আর পদ্মা-বিধৌত জনপদই একমাত্র স্বদেশ।

তাই তাঁর উপন্যাস শেষ হয় এইভাবে,

‘থেকে থেকে পদ্মার মুখ কালো হয়ে উঠছে, তখনো ফুলে ফুলে উঠছে তার বুক। উপরে ড ড ড করে মেঘ ডাকছে। পুরাণটা যদি জানা থাকে, হয়তো কারো মনে হতে পারে, কেউ যেন অন্য কাউকে বলছে, দয়া করো, দয়া করো।’

আসলে মানুষ যখন দয়া করে না, তখন পদ্মার কাছে দয়াপ্রার্থনা করা ছাড়া উপায় কি? হয়তো এই প্রাকৃতিক এবং রাষ্ট্রনৈতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়েই নতুন গড় শ্রীখণ্ড গড়ে উঠবে। এই পথেই দেশবিভাগকে কেন্দ্রে রেখেও উপন্যাসটি বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে।

‘গড় শ্রীখণ্ড’ বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য রত্ন। এর ঐতিহাসিক পটভূমি, চরিত্রগুলোর গভীরতা, ভাষার সৌন্দর্য ও দার্শনিক ব্যঞ্জনা একে সাধারণ উপন্যাস থেকে অনন্য উচ্চতায় তুলে এনেছে। যারা বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক ও দার্শনিক উপাদানের মিশেল খুঁজছেন, তাদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য।
Profile Image for Mrinmoy.
29 reviews
September 5, 2024
"সেই বিশ্বব্যাপী অনাহারের দিনের আগেও সুরোর মতো যারা তাদের অনাহারের দিন ধানের ঋতুগুলির মধ্যেও ইতস্তত ছড়ানো থাকতো। পৃথিবীতে সে একা। তার বাবা বেলাতআলির মৃত্যুর পর সে কি করে খুঁট খেয়ে কি করে বারো থেকে আঠারোতে সম্পূর্ণ একা একা পৌঁছেছিল, ভাববার বিষয়।"

আক্ষরিক অর্থে ‘গড় শ্রীখণ্ড’ মানে চন্দন কাঠের দুর্গ। গড় শ্রীখন্ড এই উপন্যাসের একটি জনপদের নাম, যা বর্তমান বাংলাদেশের পাবনা জেলায় অবস্থিত। গড় শ্রীখন্ড মানুষের মুখে মুখে হয়ে যায় চিকন্দি এবং চিকন্দির নথিভুক্ত বিশেষায়িত রূপ চিকহডিহি। গড় শ্রীখন্ড চল্লিশের দশকের উপাখ্যান। গোটা উপন্যাসকে মোটাদাগে তিনটি অংশে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে প্রথম অংশে থাকে সুরতুন, ফতেমা, টেঁপির মা, মাধাই প্রভৃতি শহরসংলগ্ন প্রান্তিক গোষ্ঠীর গাথা।
তখন দুর্ভিক্ষ চলছে, কাহিনীর সূত্রপাত বুধেডাঙ্গার সান্দার গোত্রের এক অনাহারী নিরুপায় নারীচরিত্র সুরতুন ওরফে সুরোকে দিয়ে, যে কিনা পেটের দায়ে জড়িয়ে পড়েছে অবৈধ চালের কারবারে। তার মত আরো অনেক দরিদ্র অনাহারী নিরূপায় মেয়েই এই চালের মোকামের অবৈধ কারবারের কৃপায় দ��� মুঠো অন্নে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে পারে। বুধেডাঙ্গা থেকে দিঘা স্টেশন হয়ে আরো নানা দূর দূরান্তের পথ তারা পাড়ি দিয়ে চলে ট্রেনে চেপে, পথে তাদেরকে মুখোমুখি হতে হয় নানান রকমের বিপদের। এই বুঝি পুলিশে ধরলো, নয়তো এই বুঝি টিকিট না কাটার দায়ে চেকারবাবু নামিয়ে দিল ট্রেন থেকে- এই ভয় তাদের সর্বক্ষণ, এই নিরাপত্তাহীনতাকে নিত্যসঙ্গী করেই তারা পাড়ি দেয় বিপদসংকুল পথ, দুটো টাকা রোজগারের আশায়, দু মুঠো ভাতে পেটের জ্বালা নিবারণের নিদারূন আকাংক্ষায়। আমাদের অতিপরিচিত চরিত্র সুরো কিংবা ফতেমা, কিংবা ধরি যদি টেঁপি কিংবা গঙ্গার ঘাটের সেই নাট মেয়েটি- এরা কিন্তু আমাদের সমাজের এক অতিপরিচিত চরিত্র, এদের জীবনকে, নিত্য দিনকার হাসি আনন্দকে অস্বীকার করবার কোনো উপায় নেই। এসবকিছুই অত্যন্ত জীবনসংলগ্ন।
উপন্যাসের একটি আকর্ষণীয় চরিত্র মাধাই বায়েন। সমাজের নিচুতলার পাঁকসর্বস্ব আঙিনায় বাস তার, নিত্যদিনকার জীবন আর তার পারিপার্শ্বিকের সংস্পর্শে জীবনের নগ্নতা নিদারূনভাবে তার চোখে ধরা দেয়, এই বোধটাই চিরন্তন আর সেটাই মাধাইকে উজ্জীবিত করে এই জীবনের আরো সঙ্গলগ্ন হতে।
দ্বিতীয় অংশে আমরা পাই একটি বিস্তৃত গ্রামীণ কৃষক সমাজকে। বুধেডাঙ্গা থেকে চিকন্দি, সানিকদিয়ার, চরণকাশি প্রভৃতি কৃষিপ্রধান গ্রাম্য অঞ্চলজুড়ে তাদের বিস্তার। তাদের প্রতিদিনের জীবন আবার এই কৃষিকে কেন্দ্র করেই। কৃষিই তাদের জীবন-জীবিকা। মাঠের ফসলকে কেন্দ্র করেই তাদের আনন্দ-বেদনা প্রভৃতি সমস্ত অনুভূতি আবর্তিত। জীবন তাদের কাছে ধরা দেয় এক অন্য রূপে, যার খোঁজ কোনোদিন সান্যালমশাই কিংবা সদানন্দ মাস্টাররা জানতে পারেন না। পঞ্চাশের মন্বন্তরের নিদারুণ চিত্র ফুটে ওঠে এই দরিদ্র মানুষগুলোর জীবনের দৈন্যতায়। চারদিকে যখন ফসল নেই, খাবারের অভাবে মানুষ মরছে, তখনই চৈতন্য সাহার মত জোতদাররা কৃষকের দুঃসময়ের সুযোগ নিয়ে গ্রাস করে তাদের জমিজমা। মাঠের ফসলই তাদের সব, তাই দুর্ভিক্ষ নেমে এলে মাঠের ফসলের সাথে সাথে আচমকা উধাও হয় তাদের জীবনধারণের যাবতীয় রসদও। সেই জঠরাগ্নিই আবার চৈতন্য সাহার মত অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জাগিয়ে তোলে মুঙলা , ছিদামদের মত চাষীদের অন্তরে। বিদ্রোহের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তারা বেছে নেয় অভিনব উপায়। তারা গান বাঁধে-
"তিতিসা চিত্তিরসাপ আমন ক্ষেতের বিষ
বিষের বায়ে সোনার দ্যাশে শুকায় ধানের শিষ।
চিতিসাপ চাঁদ শাহে লাগলো বিসম্বাদ
শোনো শোনো দেশবাসী তাহার সম্বাদ
-চাঁদ হেন্তাল হাতে নিলো"

সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় জোতদারদের নিষ্ঠুর কর্মকান্ডে যেমন তারা প্রতিনিয়ত পিষ্ট হয়, তেমনি প্রকৃতিও বাদ সাধে তাদের নিত্যদিনের কর্মকান্ডে। আবার কালের বিবর্তনে নানা ঐতিহাসিক ঘটনাবলীরও সাক্ষী ও শিকার হয় এইসব চরিত্রেরা। জাতিগত দাঙ্গা থেকে শুরু করে দেশভাগ- সবটাই আন্দোলিত করে তাদের আপাত নিস্পৃহ জীবনকে। কিন্তু তবুও তারা এগিয়ে চলে জীবনেরই নিয়মে।
এই অংশে সমাজের নিচুশ্রেণীর মানুষদের দৈনন্দন জীবনের কথা বলেছেন লেখক। এমন সব কথা যা তাদের মনের মধ্যকার আবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, সেই চিন্তাকে ভাষায় প্রকাশ করার মত ক্ষমতা তাদের নেই। এই প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষদের নিত্যদিনকার জীবনের সুখ, দুঃখ, হাসি, আনন্দ সবকিছুকে সুচারুভাবে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক এবং আমি বলবো এক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সফল।
এবার আসি তৃতীয় অংশে। এই অংশে আছে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার সবচেয়ে উঁচুতলার মানুষদের কথা। গড় শ্রীখন্ড বা চিকন্দির জমিদার সান্যালমশায়ের পারিবারিক জীবনের ঘটনাবলীর মাধ্যমে তৎকালীন উচ্চশিক্ষিত ভূস্বামী দের জীবনের চমৎকার একটি আবহ খুঁজে পাওয়া যায়, তবে সান্যাল পরিবার এক্ষেত্রে অবশ্যই অনন্য, অনন্য হিসেবেই লেখক সৃষ্টি করেছেন। আর দশজন কৃষকের রক্তচোষা জমিদারের মত ভূস্বামী নন সান্যাল মশাই। জমিদার বলতে আমাদের চোখের সামনে যে দোর্দন্ডপ্রতাপ চেহারা ভেসে ওঠে সান্যালমশাই তার ব্যাতিক্রম, একজন জমিদারের তাঁর স্ত্রীর সাথে কার্ল মার্ক্স নিয়ে আলোচনা করা নিশ্চয়ই অবাক করা বিষয় আর এখানেই তিনি অনন্য। তাঁর কর্মকান্ডে শিক্ষা ও আভিজাতের পাশাপাশি প্রজাবাৎসল্যও খুঁজে পাওয়া যায়। তাই তো তাঁরই আঙিনায় সাধারণ কৃষকদের সার্বজনীন ভোজনোৎসবের মচ্ছব বসা একটি প্রাত্যহিক ঘটনা। জমিদার সান্যানমশাই ও তাঁর বড় ছেলে নৃপনারায়ণ আদর্শিকভাবে দুটি পরস্পর বিপরীতধর্মী চরিত্র। সান্যালমশাই একদিকে ব্রিটিশ শাসকের আজ্ঞাবহ শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করেন, অন্যদিকে নৃপনারায়ণ ব্রিটিশবিরোধী প্রতিবাদী চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে। আবার শেষদিকে এসে দুজনেরই মেলবন্ধন ঘটে একটি মাধ্যমে , তা হলো আভিজাত্যিক মেলবন্ধন। তাই দেখা যায় নৃপনারায়ণ খদ্দর ছেড়ে গায়ে তুলে নেয় সিল্কের কাপড়। এই অংশে জমিদারের স্ত্রী অনসূয়া একটি গুরুত্‌বপূর্ণ চরিত্র। সংস্কার এবং প্রগতি তাঁর চরিত্রের দুটি মুখ্য দিক। পুথবধূ সুমিতির সংস্কার না মানায় যেমন তিনি ক্ষুণ্ন হন, তেমনি পুত্র নৃপের আদর্শে তাঁর প্রচ্ছন্ন সায় থাকে। রূপনারায়ণের বিলেতে পড়তে যাওয়াকেও তিনি সাদরে গ্রহণ করেন। আবার সন্তানের মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে ফেরাকে অনসূয়া ব্যাখ্যা করেন এভাবে-
"মানুষ যত বৃদ্ধ হয়, মৃত্যুর দিকে এগুতে থাকে, তার বাঁচার প্রবৃত্তি, মৃত্যুকে অস্বীকার করার প্রবৃত্তি প্রবৃত্তি হয় তত তীব্র্য। সে সন্তানের মধ্যে নিজের আকৃতির প্রতিফলন নয় শুধু, মতামতের অনুসরণও খুঁজে পেতে চায়; সে অন্য আধারে মৃত্যুকে অস্বীকার করে থেকে গেলো এই যেন বলে যেতে চায়।"

এই অংশের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র সুমিতি। কলকাতার শহুরে প্রগতিশীল পরিবেশে বিচরণকারী সুমিতি চিকন্দিতে এসে শ্বশুরবাড়িড় ঐতিহ্যবাহী সংস্কারকেও তুচ্ছ করে না। সুমিতি চল্লিশের দশকের আধুনিকমনা নারী। রাজনীতি, সংস্কার, সংস্কৃতি, বিশ্বসাহিত্য, ধর্ম আর পল গঁগ্যার চিত্রকলা নিয়ের তার চিন্তাধারা অবাক করার মত।
উপন্যাসের প্রেক্ষাপট পঞ্চাশের মন্বন্তর থেকে শুরু করে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাকে ছুঁয়ে সাতচল্লিশে দেশভাগ অবধি বিস্তৃত। ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো উপন্যাসের চরিত্রদের জীবনেও সহজাতভাবেই এসে আছড়ে পড়ে। দুর্ভিক্ষে মারা যায় বৈষ্ণব শ্রীকৃষ্টদাসের মেয়ে। হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার ছোঁয়াচ এসে লাগলেও তা পুরোপুরি গ্রাস করতে পারে না এই প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবনকে। এরফান শেখের শ্যালক কলকাতা থেকে এসে দাঙ্গাকে উস্কে দিতে চাইলেও শেষাবধি যুগ যুগ ধরে একসাথে বাস করে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষগুলোর অসাম্প্রদায়িক চেতনাই বিজয়ী হয়। এটি এই উপন্যাসের অত্যন্ত গুরুত্‌বপূর্ণ ও শক্তিশালী দিক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশভাগ এসে পুরোপুরি লন্ডভন্ড করে দেয় মানুষগুলোর জীবনকে, ঠিক যেমনটা করে দিয়েছিল সাতচল্লিশে গোটা বাংলার মানুষদের জীবন। ঘটনার আকস্মিকতায় তারা যেন বুঝতেই পারে না কি ঘটে গেল। তারই প্রতিফলন দেখতে পাই রামচন্দ্র চরিত্রটির মধ্যে।

"উঠে বসে গায়ের ধুলো ঝেড়ে চোখের জলে ভিজে যাওয়া গোঁফজোড়া কাপড়ে মুছে কিছুটা শান্ত হলো রামচন্দ্র। এ কী হলো পৃথিবীর! মানুষের এত কষ্ট কেন? কোনো কোনো রোগে রক্তমোক্ষণ করা নিয়ম ছিল সেকালে। এ যেন তেমনি কোনো চিকিৎসা। কিন্তু রামচন্দ্র গোরুর চিকিৎসা জানলেও নিজে কখনো কোনো পশুর রক্তমোক্ষণ করেনি। এ যেন কোনো অত্যন্ত খুঁতখুঁতে কৃষকের রোয়ার বেছন বাছাইকরা। মাটি থেকে শিকড়সুদ্ধু চারাগাছগুলিকে টেনে টেনে তুলছে। কিন্তু সে কৃষক যেন সাধারণ কৃষকের চাইতে কম জানে কিংবা অত্যন্ত বেশি জানে। চারাগাছগুলিকে বারে বারে তুলছে আর লাগাচ্ছে, আর লাগানোর আগে চারাগুলির কোমলতম শিকড়ে যে মাটিটুকু লেগে থাকে আছড়ে আছড়ে সেটূকুও ঝেড়ে ফেলছে। অহহ। একবার না, তিনবার। সেই দুর্ভিক্ষ, তারপর দাঙ্গা, তারপর দেশভাগ।"

সব মানুষ যেন এপার-ওপারের খেলায় মেতে উঠল। এতদিন যা ছিল নিজের জমি, যক্ষের ধনের মত যাকে আগলে রাখাই ছিল সহজাত ধর্ম- সে সব কিছুকে ছেড়ে পাড়ী জমাতে হলো ওপারে।
এখনও কোনো অপেক্ষমান ট্রেনের প্রথম শ্রেণীর কামরার দিকে তাকালে হয়তো আমরা দেখতে পাব সান্যালমশাই তাঁর পরিবার নিয়ে তীর্থ করতে যাচ্ছেন। সত্যিই কি তাই? আবার রামচন্দ্র মণ্ডল আর তার স্ত্রী। তারাও যাচ্ছে নবদ্বীপে। তারাও কি তীর্থ করতে যাচ্ছে? এদের আগে অনেকেই চলে গেছে ওপারে। ওপার এখন ভিনদেশ।

গড় শ্রীখন্ড অমিয়ভূষণ মজুমদারের প্রথম উপন্যাস। বইয়ে অপ্রচলিত শব্দের আধিক্য খুব বেশি নেই কিন্তু সবকিছুই কেমন যেন ভাসা ভাসা। ক���ছুদূর পড়া হলে যেন বা একটা আবছা দৃশ্য পাওয়া গেল, আবার পরক্ষণেই তা মিলিয়ে গিয়ে সৃষ্টি হলো নতুন আবহ। উপন্যাসের ভাষা এমন যে পড়তে গিয়ে তৎক্ষণাৎ ডুবে যেতে পারবেন না, ঠিক যেন সাঁতার কাটতে গিয়ে জলে ভেসে থাকার মত, না পারা যায় পুরোপুরি ডুবতে না পারা যায় ভেসে থাকতে। লেখার ধরণের কারণেই বইটা শেষ করতে আমার অনেক দিন লেগেছে। তবে পড়ে আনন্দ পাওয়া যায় তাতে সন্দেহ নেই। বইয়ের প্রচ্ছদ অত্যন্ত আকর্ষণীয়, করেছেন পূর্ণেন্দু পত্রী। উপন্যাসের গদ্য সাবলীল না হওয়ায় অনেকে বিরক্তির উদ্রেক করতে পারে। কিন্তু বাংলা উপন্যাসে অসাধারণ একটা জগৎনির্মাণের সাক্ষী হতে চাইলে এই বইটি অবশ্যপাঠ্য।

বই - গড় শ্রীখন্ড
লেখক - অমিয়ভূষণ মজুমদার
প্রকাশনা - দে'জ পাবলিশিং
প্রচ্ছদ - পূর্ণেন্দু পত্রী

রেটিং - ৮.৭/১০
Profile Image for Gain Manik.
355 reviews4 followers
September 2, 2024
পদ্ম বৈষ্ণবী ছিদাম-মুঙলাকে দিয়ে চৈতন্য সাহার বিরুদ্ধে গান লেখায় এবং এই গান এখন গ্রামের সকলের মুখে মুখে। কারণ চৈতন্য একজন অত্যাচারী মহাজন যে অভাবের সময় গরীব চাষীদের অল্প কিছু টাকা,ধান দিয়ে তাদের জমি খাস করে নিয়েছে এরই প্রতিবাদে ব্যাঙ্গাত্মক গান রচিত হয়েছে। আবার যেহেতু নিজে খাস করে নিয়েছে তাই সকল খাজনা তাকেই পরিশোধ করতে হবে এই বাবদ জমিদারের কনিষ্ঠ পুত্র নায়েব মারফত চৈতন্যকে আল্টিমেটাম পাঠিয়েছে। তাই চৈতন্য গেছে জমিদার ও গায়কদের বিরুদ্ধে মামলা করতে কনক দারোগার কাছে। তা কনক অদ্ভুত মোকদ্দমা পেয়ে উৎসাহিত হয়েই জমিদার বাড়ি গেল সুরাহা করতে এবং সেখানে সদানন্দ মাস্টার বলে এই পদ্মা নদী যেমন যেকোনো মুহূর্তে এই জনপদ ধ্বংস করে দিতে পারে তেমনি চাষী সম্প্রদায়‌ও একজোট হয়ে মহাজন শ্রেনীকে সহজেই উৎখাত করতে পারে। এইসব কথা শুনে কনক দারোগা নিজেই বিপ্লবী হয়ে উঠলো এবং মনে মনে হাসলো কারণ বিপ্লবী ধরতে এসে নিজেই বিপ্লবী হয়ে গেছে সে আর সে দারোগা হলেও তার আর্থিক অবস্থা কমবেশি চাষীদের মত‌ই। তা দারোগা যখন ঘোড়ায় চড়ে ফিরছেন তখন দেখলেন রাস্তায় ধুলিঝড় এবং একটি ঝোপ নড়ছে, প্রথমে ভাবলেন বাঘ,পরে জানতে পারলো যে চৈতন্য তাকে দেখে ভয়ে ওখানে লুকিয়েছে। দারোগা অট্টহাসিতে চৈতন্যকে দৌড়ে চলে যেতে বললো।

এটুকু দেখে মনে হবে হাসির উপন্যাস আসলে এই উপন্যাস তার ১৮০° বিপরীত। এই উপন্যাসে তিন 'দ' নিয়ে যথা দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, দেশভাগ আর যা শেষপর্যন্ত চতুর্থ 'দ' দুঃখের দিকে নিয়ে যায়, যেমনটি B3'র অভাবে pellagra তে পাওয়া যায়।
নিজের আঁতলামো এখন বাদ দেই। এই উপন্যাস আমাকে টানা তিনদিন ধরে পড়ে তবে শেষ হলো, উপন্যাসের পটভূমি পাবনাতেই থাকি, বাড়ি ভাল করে কথা বলিনি থ্রুআউট রিডিং পিরিয়ড। লেখকের লেখা কেমন যেন একটু, ছাড়া ছাড়া; এই পড়ার প্রচন্ড জোর পাই আবার একটু পরেই খেই হারিয়ে ফেলি,কার ভাষ্যে আছি? স্যানালের?গোসাইর?সুরতুনের?মাধাইয়ের?রামচন্দ্রের?কনকের?সুমিতির?রূপুর?আলেফ শেখের? অনুসূয়ার?কেমন যেন গুলিয়ে ফেলি, তখন আবার কয়েক স্তবক পিছিয়ে পুনঃপাঠ করি এই কারনেই সময় বেশি লেগেছে।

এটা লেখকের magnum opus, debut novel; লেখক তাই সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন এই উপন্যাসে নিজস্ব ছাঁচ তৈরি করতে। লেখকের জমিদার তার পত্নী অনুসূয়ার সাথে আলোচনা করছে পূজিবাদ বিরোধী দার্শনিক নিয়ে, যে রামচন্দ্র আর চৈতন্য ছিল পরস্পরের belligerent , ধর্ম এক হ‌ওয়ায় দুজনকেই নিজেদের বাস্তুভিটা ছাড়তে হয় অর্থাৎ সৎ অসৎ দুজনের এক‌ই পরিণাম। অন্যদিকে আলেফ শেখ বন্যার অব্যবহিত পরেই বেরিয়েছে জমির পলিমাটি পরীক্ষা করতে,ধান চাষ করতে হবে তো, হিন্দুদের ফেলে যাওয়া জমি (ভাগ্যিস জমি স্থাবর, অস্থাবর হলে আলেফের কপাল খুলতো না)! তবে এরফানের ভাই আলেফ‌ও আসলে একজন ভুক্তভোগী, তাদের দুভাইয়ের একমাত্র উত্তরসূরী ছেলে কলকাতায় ডাক্তারি পড়াকালীন দাঙ্গায় নিহত হয় অন্য একজনকে বাঁচাতে গিয়ে।
লেখক সুনিপুণ ছবি এঁকেছেন, তবে পাঠকের কাছে সহজপাচ্য নাও হতে পারে। আমি কখনো বিরিয়ানি খাইনি, খেলে সুবিধা হত, কোনটি সহজপাচ্য,এই উপন্যাস না বিরিয়ানি? তাই আমার কাছে বেস্ট মাছের ঝোল যাকে আমরা 'সূর্য দীঘল বাড়ী' বলে জানি।
৩/৫
Profile Image for Mahmudur Rahman.
Author 13 books357 followers
December 9, 2023
অনেক অনেকদিন পর একটা বই প্রথম প্যারা পড়ার পরই মনে হলো এই রকম বইই আমি এককালে পড়তাম এবং এখনো পড়তে চাই। কনক দারোগাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, সুরোর স্টেশনে আসা, চালের কারবার আমাকে দুম করে নিয়ে ফেলেছিল সুধীর চক্রবর্তীতে। অথচ অমিয়ভূষণের গদ্য আবার নিয়ে ফেলল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের আঙ্গিনায়। এই সবের মধ্য দিয়ে আখ্যানের ভেতরে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল, 'হ্যাঁ, অমিয়ভূষণ তো আমার বহু আগে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু রাজনগরের (সম্ভবত) কয়েক পাতা পড়ে আর ইচ্ছা হয়নি। কিন্তু সে সময় গড় শ্রীখণ্ড হাতে আসলে ভালো হতো।'

চিকন্দি, চিকনডিহি কিংবা গড় শ্রীখণ্ড নাম যা-ই হোক না কেন, তা মানুষের গল্প। ক্ষেত্রবিশেষে, মানুষের ইতিহাসেরও। আর সে ইতিহাসের সময়কাল ওই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পরের। যুদ্ধকাল থেকে শুরু হয়ে আখ্যান শেষ হয় ভারত ভাগের পরে। সেই সময়ের চিকন্দির সান্দার আর জমিদার সান্যালদের নিয়ে মূলত এই বইয়ের বাইরের কাঠামো। কিন্তু আখ্যানের ভেতরে ছিল এই উপন্যাসের মূল কথা। সেখানে ছিল মানুষের মন, তাদের জীবনের বদলে যাওয়া থেকে শুরু করে ভারতের রাজনীতি। সেই বিষয়গুলো একটা পাতলা স্তরের নিচে রেখছেন অমিয়। ইতিহাসটা না জানলে আর বইটা মন দিয়ে না পড়লে তা ধরা পড়ে না।

অমিয়ভূষণলে অনেক সময়েই 'লেখকদের লেখক' তকমা দেওয়া হয়। আদতেও তেমন কিনা সেটা ভাবার বিষয়। কিন্তু তার নিজস্ব যে একটা স্টাইল আছে তা বুঝতে একটা বই পড়াই যথেষ্ট। মানে স্টাইল যদি অন্য বইয়ে বদলেও যায় সেটা কারো অনুকরণে হবে না, অমিয় নিজের মতো আরেকটা স্টাইল তৈরি করবেন সেই স্বকীয়তার পরিচয় এখানে আছে। আর সে কারণেই হয়ত গদ্য অনেকের কাছে কঠিন লাগতে পারে। কঠিন কিংবা দুর্বোধ্য। বিশেষত সুমিতির গল্পকে ধরে বা অনসূয়ার গার্হস্থ্য থেকে রাজনীতির খবর অমিয় বলেন তা বোঝা কঠিন। একইভাবে সুরো-মাধাইয়ের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যে আরেকটা প্রাগৈতিহাসিক কোথা থেকে এসে পড়ে তাও দুর্বোধ্য।

ব্যক্তিগত একটা অপ্রাপ্তি এই উপন্যাসে, কয়েকটা চরিত্রের হারিয়ে যাওয়া। এর মধ্যে প্রধান হলো কনকের বেড়ে না ওঠা। শুরুটা যেভাবে হয়েছিল, মনে হচ্ছিল কনক একজন জটিল মানুষ হিসেবে সামনে আসবেন। কিন্তু উপন্যাসে এক সময় তিনি হারিয়ে গেলেন। একইভাবে হারিয়ে গেল মাধাই। সুরো যে সম্ভাবনা তৈরি করেছিল শেষ অবধি সুরো নামে চরিত্রটা থাকলেও তার অনেককিছু যেন বাকি রয়ে গেল। তবে আগ্রহজাগানিয়া বিষয় ছিল সুমিতিকে যেখানে আমরা আবিষ্কার করতে চাইব, সেখানে দেখব অনসূয়া হয়ে উঠবেন বিশেষ।

গড় শ্রীখণ্ড কোথায়, স���খানে আদতে ওই মানুষগুলো ছিল কিনা তা জানি না। কিন্তু যে শ্রীখণ্ডের গল্প অমিয় তৈরি করেছেন সেখানে এসেছে একটা ইতিহাস, অনেকগুলো মানুষ, তাদের চাওয়া পাওয়ার পাশাপাশি বদলে যাওয়া সময়ে মাটির খবর। বই পড়তে পড়তে এক সময় হয়ত সচেতন পাঠকেরও মনে হবে সে চাষ দিতে নামছে জমিতে। তার বাড়ির পাশেও ভেঙে গেছে বাঁধ, উঠছে বন্যার পানি। এই অনুভবের মধ্য দিয়ে গড় শ্রীখণ্ড আমাদের দেখাবে, মানুষ এক সময় ভেসে গিয়ে ডাঙা খোঁজে।
Displaying 1 - 9 of 9 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.