তপনজ্যোতি বড় মেয়ে পৃথাকে অন্যরকমভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। পৃথা রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণের ভাবজগতে থাকতে ভালোবাসে। তপনজ্যোতির পূর্ণ মত না থাকলেও অল্প বয়সে পৃথার বিয়ে হয়ে যায় শিলচরে। স্বামী প্রণবকুমার এয়ারফোর্সের কর্মী, পুণেয় থাকে। বিয়ের পর আচমকা এক সংস্কারগ্রস্থ পরিবাতে গিয়ে বড় মুশকিলে পড়ে পৃথা। বাবা তাকে শিখিয়েছিলেন রবীন্দ্রসংগীতই ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন যে সাহিত্য-সংগীতের সঙ্গে সম্পর্কহীন। স্থুলরুচির স্বামীর প্রণবকুমার যেন শরীরসর্বস্ব জন্তু। অল্প কয়েকদিনেই প্রণবকুমার পৃথাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে কর্মক্ষেত্রে ফিরে যায়। স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার অবসাদ নিয়েই গর্ভবতী হয় পৃথা। শ্বশুরবাড়ির অযত্নে মরণাপন্ন হয় সে, তার বাবা-মা কোনও খবরই পায় না। নানা ঘটনার পর পিতৃগৃহে তার প্রসব হলেও সন্তানকে স্বাভাবিক মায়ের মতো কাছে নিতে পারে না সে। বই আর গানের ভুবনে স্বেচ্ছাবন্দি পৃথার জীবন ছুটে চলে আরও নিষ্ঠুর সত্যের দিকে। সমরেশ মজুমদারের ছায়ার শরীর উপন্যাসটি এক সংবেদনশীল মেয়ের বিষাদময় জীবনের কথকতা।
Samaresh Majumdar (Bangla: সমরেশ মজুমদার) was a well-known Bengali writer. He spent his childhood years in the tea gardens of Duars, Jalpaiguri, West Bengal, India. He was a student of the Jalpaiguri Zilla School, Jalpaiguri. He completed his bachelors in Bengali from Scottish Church College, Kolkata. His first story appeared in "Desh" in 1967. "Dour" was his first novel, which was published in "Desh" in 1976. Author of novels, short stories and travelogues, Samaresh received the Indian government's coveted Sahitya Akademi award for the second book of the Animesh series, 'Kalbela".
সমরেশ মজুমদার-এর জন্ম ১০ মার্চ ১৯৪৪। শৈশব কেটেছে ডুয়ার্সের চা-বাগানে। জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলের ছাত্র। কলকাতায় আসেন ১৯৬০-এ। শিক্ষা: স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ। প্রথমে গ্রুপ থিয়েটার করতেন। তারপর নাটক লিখতে গিয়ে গল্প লেখা। প্রথম গল্প ‘দেশ’ পত্রিকায়, ১৯৬৭ সালে। প্রথম উপন্যাস ‘দৌড়’, ১৯৭৫-এ ‘দেশ’ পত্রিকায়। গ্রন্থ: দৌড়, এই আমি রেণু, উত্তরাধিকার, বন্দীনিবাস, বড় পাপ হে, উজান গঙ্গা, বাসভূমি, লক্ষ্মীর পাঁচালি, উনিশ বিশ, সওয়ার, কালবেলা, কালপুরুষ এবং আরও অনেক। সম্মান: ১৯৮২ সালের আনন্দ পুরস্কার তাঁর যোগ্যতার স্বীকৃতি। এ ছাড়া ‘দৌড়’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার হিসাবে বি এফ জে এ, দিশারী এবং চলচ্চিত্র প্রসার সমিতির পুরস্কার। ১৯৮৪ সালে ‘কালবেলা’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার।
মনে হলো অনেকদিন পরে মনের মধ্যে টাটকা একটা বাতাস ঢুকলো। গল্পের পৃথার সাথে যেকোন বই পড়ুয়া, গান ভালোবাসা মেয়ে রিলেট করতে পারে। সত্যিই তো এই সংসারে বই পড়া, গান জানা বা গান ভালোবাসা মেয়ের যত না কদর, তার চাইতে অনেক বেশি দামি যেসব মেয়ে আপাদমস্তক সাংসারিক। আর পৃথার মা মায়াবতী বা তার শাশুড়ির মতো স্থূল রূচির মহিলারা আমাদের মা, শাশুড়ি, আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যেই ছড়িয়ে আছে। পৃথাকে ম্যারিটাল রেইপ সহ্য করতে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে শ্বশুরবাড়ির অবহেলা। আমরাই পৃথা, পৃথার চেয়ে আমরা আলাদা নই।
সমরেশের সবথেকে পছন্দের। অথচ অনেক আন্ডাররেটেড। চরিত্রগুলোকে ভালোবেসে ফেলার মত। নায়িকা ও তার বাবা দুজনের চরিত্রই খুব পছন্দ। সাহিত্য ও গান পছন্দ এমন যেকোনো মানুষের খুব ভালো লাগবে আশা করি।
পৃথা, তার মা এবং তার শাশুড়ি , তিন নারী চরিত্রের মনস্তাত্তিকতার ধ্রুবতারা-দূরত্ব বিশিষ্ট ব্যবধান, লেখকের লেখনীতে পাঠকের চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে একটি দেয়ালের অস্তিত্ব। মনে প্রশ্ন জাগিয়ে যায়, এই অস্তিত্বের পৃষ্ঠপোষক কি কোন নির্দিষ্ট সত্তা নাকি সমগ্র ব্যবস্থা?
আমাদের সমাজের হাজার হাজার মেয়ের জীবনের গল্প অনেকটা পৃথার মতো। চোখে অনেক স্বপ্ন নিয়ে ছোট থেকে বড় হওয়া, বাড়ির জোরাজুরিতে মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়া, বয়সে অনেক বড় কিন্তু সরকারী চাকরি করা ছেলের সাথে বিয়ে হয়ে যাওয়া, আর তারপর স্বামী শ্বশুরবাড়ির হাতে প্রতি নিয়ত অত্যাচারিত হতে হতে জীবন শেষ হয়ে যাওয়া। এমন ঘটনা অনেক মেয়ের সাথেই ঘটেছে, আজও ঘটছে। পৃথাও তেমনই একটি দুর্ভাগা মেয়ে। তার জীবনের গল্পটাও কিছুমাত্র বাতিক্রম নয়। গতানুগতিক প্লট হলেও সমরেশ মজুমদারের অসাধারণ লেখনীতে ফুটে উঠেছে প্রত্যেকটি চরিত্র। আমার কোন চরিত্রকেই সম্পূর্ণ খারাপ মনে হয়নি। শুধু পৃথার শাশুড়ির চরিত্রটাকে আরেকটু এক্সপ্লোর করলে খুশি হতাম। শেষটাও বেশ হকচকিয়ে দেওয়ার মতো। ভালো লাগল, আবার দুঃখও হল গল্পটা পড়ে।
তপনজ্যোতি একজন ডাক্তার,তিনি তার বড় মেয়ে পৃথাকে আর চার-পাঁচটা মেয়ে থেকে অন্যভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।পৃথা রবীন্দ্রনাথ, শরৎ এর জগতে ডুবে থাকতে ভালোবাসে। কিন্তু পৃথার মা পৃথাকে ১৫ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন শিলচরে, তার চেয়ে বয়সে অনেক বড় এক ছেলের সঙ্গে।পৃথা বাবা এতে রাজি ছিলো না!পৃথার স্বামী প্রণবকুমার পুণেয়, এয়ারফোর্সের চাকরী করেন। পৃথাকে পৃথার বাবা যেভাবে তৈরি করেছিলেন,পৃথার বিয়ে হয় ঠিক তার উল্টো পরিবেশে।পৃথা সেখানে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। . এর মাঝে পৃথা গর্ভবতী হয়ে যায়,কিন্তু পৃথা এর জন্য প্রস্তুত ছিলো না।পৃথার শশুর বাড়ির লোক সব অন্যরকম! পৃথা ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে,কিন্তু এসব খবর তার বাবার বাড়ির কেউ জানে না। এইভাবে পৃথা ধীরে ধীরে দুমড়ে মুচড়ে যায়। পৃথার স্বামী,প্রণবকুমার ও ঠিক পৃথার বিপরীত চিন্তাধারণার।পৃথা ভালোবাসে বই,কিন্তু তার শশুর বাড়ি কেউই বই পড়ে না বা পছন্দ করে না।এমন কী তার স্বামীও না।
পাঠ প্রতিক্রিয়া- কান্না আসতে বাধ্য,বইটি পড়ে।কাউকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়ার আগে,তার সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো।নয়তো বাকি জীবনটা বিষাদে ছেয়ে যাবে। পৃথার মতো এমন কতো মেয়ে আছে,যারা বাধ্য হয়ে নিজের ইচ্ছেগুলোকে বন্দী রেখেছে।