সত্যজিৎ রায়ের লেখা বারোটি গল্প নিয়ে বইটি "বাঃ! বারো"। এবং এই বইয়ে বাছাই করা সত্যজিৎ এর আরো বারোটি গল্প আছে। বই আমার সবসময়ের কমফোর্ট জোন আর যে বইটা পড়তে ভালো লাগে আমি আসলে সেই বইটা শেষ না করে ছাড়ি না।
এই বইটা আমার পড়া হলো মূলত তারিনী খুড়োর জন্য। তারিনী খুড়োর বেশ কয়েকটি গল্প এই বইয়ে স্থান পেয়েছে। কিন্তু এই বইয়ে আরেকটি গল্প আমার দারুন মজার লেগেছে। আমি ভাবলাম বাকিগুলোও পড়ে ফেলা যাক কারণ সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্প একেকটা একেক রকম এবং একেক স্বাদের। মানে এ বলে আমায় আগে পড় ও বলে আমায়। সামান্য ঘটনা নিয়েও গল্প আছে আবার সামান্য ঘটনা নিয়ে দারুণ গল্পও আছে।গোটা বইটাই পড়তে শুরু করলাম। মানে সত্যজিতের গল্প ছাড়া কী যায়!
এই ছোটগল্প সংকলনেও পড়া শেষ করে বিভিন্ন স্বাদের গল্প মোট কথা খুঁজে পেলাম। সত্যজিৎ রায়ের লেখনী নিয়ে নতুন করে কী আর বলবো। আমার প্রিয় লেখকদের মধ্যে অন্যতম। সত্যজিৎ এর তো ছিল বহুমুখী প্রতিভা। তাই সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্প পড়ে সবসময়ই বেশ আনন্দ পাই।
এই বইয়ে "নিতাই বাবুর ময়না" গল্পটা আমার বেশ প্রিয় একটা গল্প। আমি কয়েকবার পড়েছি গল্পটি এবং খুব মজার গল্পের প্লট। নিতাই বাবু বেচারা ময়না পাখি পোষার শখ থেকে ময়না কিনে কীভাবে নাকাল হয়েছেন গোটা গল্পটা জুড়েই হাস্যরসাত্মক বর্ণনায় সত্যজিৎ দারুন লিখেছেন। এছাড়াও এই বইয়ে ফেলুদার একটি গল্প স্থান পেয়েছে "ডঃ মুনসির ডায়রি"। এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অন্য রিভিউতে করবো ইনশাআল্লাহ।
চলুন এবার এই বইয়ের উল্লেখযোগ্য আরো কিছু গল্পের আলোচনা করা যাক:
🧽নরিস সাহেবের বাংলো
তারিণী খুড়ো গিয়েছিলেন ছোট নাগপুর এবং সেখানে গিয়ে নরিস সাহেবের বাংলো দর্শন হলো তার। এবং এই বাংলোকে ঘিরে ভূ*তের গুজব প্রচলিত আছে। নরিস সাহেবের ভূ*ত এখনো নাকি সেখানে আছে। আর তারিণী খুড়োর কৌতুহল আদৌও কী দেখা যাবে নরিস সাহেবের ভূ*ত?
🧽তারিণী খুড়ো ও ঐন্দ্রজালিক
ম্যাজিশিয়ানের স্টেজের নাম ছিল চমকলাল। বাঙালি না, পশ্চিমের লোক। বছর পঁচিশেক আগের কথা। খুব নাম করেছিল। ম্যানেজারের জন্য বিজ্ঞাপন দেয়। তারিণী খুড়ো ভদ্রলোকের ম্যাজিক দেখে নিয়ে তারপর অ্যাপ্লাই করেন। ওনার ম্যাজিক ছিল অন্য মাত্রার। ‘স্টেজ ইলিউশন’ তা ত আছেই, আবার তার সঙ্গে আছে ‘থট রীডিং।’
🧽মহারাজা তারিণী খুড়ো
তাড়িণী খুড়োকে পাঁচ দিনের মহারাজা হতে হয়েছিল একটা নেটিভ স্টেটে, সে গল্প যেমন রোমাঞ্চকর তেমনি তার মধ্যে রয়েছে হরর ভাইব। আর তারিণী খুড়োর গল্পের আসর মানেই জমজমাট।
🧽জুটি
অনেক পুরনো দিনের হিট সিনেমার নায়ক রতনলাল রক্ষিত। তিনি অসুস্থ অবস্থায় সিনেমা থেকে অবসর নেন। তারিণী খুড়ো ছিলেন ওনার সেক্রেটারী। কাজ হচ্ছে রতনলালের পুরনো ছবিগুলোর রেকর্ড খুঁজে বের করে সংরক্ষণ করা। কালেকশনে কী কী নেই খুঁজে বের করা। রতনলালের সময়কার আরেক অভিনেতা ছিলেন শরৎ কুন্ডু। রতন শরৎ ছিলেন সিনেমার জুটি। কমেডি ধাঁচের অভিনয় করতেন। রতনলাল এবার চাইছেন তার জুটির অবস্থান জানতে।
🧽প্রসন্ন স্যার
অর্ধেন্দু গিয়েছিল শিমুলতলা বেড়াতে। সেখানেই স্কুলের স্যারের সঙ্গে দেখা। প্রসন্ন চক্রবর্তী অর্ধেন্দুর ইস্কুলে ইংরিজি পড়াতেন। তাঁর স্মরণশক্তির কথা সকলেই জানে, তিনি পুরোনো ছাত্রদের কখনো ভোলেন না—সে ভালো ছেলেই হোক আর মন্দ ছেলেই হোক। অর্ধেন্দু তাঁকে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পেয়েছিল। সময়ের স্রোতে স্যারের সাথে অর্ধেন্দুর নতুন অভিজ্ঞতা হলো।
🧽অক্ষয়বাবুর শিক্ষা
অক্ষয়বাবু নিজে লেখক নন; তিনি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের একজন মধ্যপদস্থ কর্মচারী। তবে তাঁর বহুকালের শখ ছোটদের জন্য গল্প লেখার। ছেলে অঞ্জন তার একমাত্র প্রুফ রিডার। ভুল ভ্রান্তি ধরিয়ে দেয়। অক্ষয়বাবুর গল্পগুলো ভালো তবুও অঞ্জন বললো আরেকটু ভালো লিখতে। অক্ষয়বাবুর ইচ্ছা তার গল্প জনপ্রিয় শিশু কিশোরদের পত্রিকায় ছাপা হোক। অক্ষয়বাবুর চেষ্টা কী সফল হবে?
🧽রন্টুর দাদু
রন্টুর বয়স পনের, কিন্তু এর মধ্যেই তার গানের গলা হয়েছে চমৎকার। সে সকালে ওস্তাদের কাছে এক ঘন্টা গান শেখে। যে তার গান শোনে সেই বলে, ‘এ ছেলে আর কয়েক বছরের মধ্যেই আসরে গান গাইবে।’ এ গুণটা যে সে কোথা থেকে পেল সেটা বলা শক্ত, কারণ রন্টুর বাবা-মা কেউই গাইতে পারেন না।
তবে কী রন্টুর দাদুর কথা বিশেষ বলা যায় না। ওনার স্মৃতিশক্তি দুর্বল। কিছুই মনে রাখতে পারেন না। তবে হঠাৎ করেই একদিন একটা ঘটনা ঘটলো।
🧽দুই বন্ধু
বন্ধুদের আমরা ছোটবেলায় কত রকমের কথা দেই। সবকিছু কী মনে থাকে? এই দুই বন্ধু কিন্তু নিজেদের কথা রেখেছে। কী সেটা? বরং পড়লে বোঝা যাবে।
🧽শিশু সাহিত্যিক
পত্রিকায় লিখতে হলে সুন্দর নাম কিন্তু জরুরি লেখকের। উদ্ভট নাম যদি বাপ মা রেখেও থাকে বদলে ফেলুন। নাহলে কিন্তু লেখালেখি হবে না। কেন এটা বলছি? পড়ে দেখবেন।
🧽নতুন বন্ধু
নতুন বন্ধুর সাথে আলাপ শান্তিনিকেতনের গন্তব্যে। কিন্তু নতুন বন্ধু লাভের পাশাপাশি বেড়িয়ে এলো একটা ইতিহাস ও। কী সেটা?
সবগুলো গল্পই মোটামুটি ভালো লাগবে। সময় থাকলে কিংবা রিডিং ব্লকে চট করে পড়েই ফেলুন বইটি। সব মিলিয়ে আনন্দে সময় কাটবে।
🧽বইয়ের নাম: "বাঃ! বারো"
🧽লেখক: সত্যজিৎ রায়
🧽 প্রকাশনা: আনন্দ পাবলিশার্স