বড় মানুষের বাড়ির আয়া কমলা নস্কর নিরুদ্দেশ হওয়ার তদন্তের সূত্রে মল্লিক বাড়িতে প্রবেশ ঘটে বেসরকারি গোয়েন্দা দীপেন ঠাকুর ও তার বন্ধু বিজিত রায়ের। বনেদি মল্লিক পরিবারকে কেন্দ্র করে ঘটতে থাকে একের পর এক ঘটনাও অঘটন। দীপেন ও বিজুর সঙ্গে পরিচয় হয় বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষজনের। ঘটনাক্রম বিচিত্র অপরাধের আভাস বয়ে আনে। একটি রহস্যের অন্ধকার ঘনীভূত হয় আরও বহু রহস্যের ছায়ায়। শহরের মাফিয়া গোষ্ঠীর চেনা নাম ও অজানা মুখেরনে তার অস্তিত্ব আশেপাশেই অনুভব করে দীপেন এবং পুলিশ ইনস্পেক্টর উত্তম পাত্র। বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গেই মিলেমিশে থাকে সম্পর্কের সামাজিক জটিলতা। ভালবাসার পাশটিতেই অবস্থান করে ঘৃণা। বিশ্বাসের আড়ালেই কোথাও লুকিয়ে থাকে অবিশ্বাস। বন্ধুত্ব আর শত্রুতার সীমানায় গাঢ় রঙের মিশ্রণ অনুভূতিকে আচ্ছন্ন করে রাখে। করুণাকে ঘাতকের মতো অনুসরণ করেই যেন হঠাৎ হাজির হয় নিষ্ঠুরতা। নিঃশর্ত ও যুক্তিহীন প্রেমের কাছ ঘেঁষে হিসাব কষে চাওয়া-পাওয়া। বিজুরও সন্দেহ হয়, জীবনের মতো জটিল এই রহস্যের কিনারা কি করে উঠতে পারবে বন্ধু দীপেন? ‘গজপতি নিবাস রহস্য’ এক তীব্র গতির উপন্যাস, যা পাঠককে আবিষ্ট করে রাখে শেষাবধি।
শেখর মুখোপাধ্যায়ের জন্ম অক্টোবর ১৯৬৫, রামপুরহাট, বীরভূম। রামপুরহাটের কাছাকাছি গ্রাম বেলিয়ায় পিতৃপুরুষের ভিটে। ঠাকুরদার উদ্যোগে হাতেখড়ি ও পড়াশোনার সূত্রপাত গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে।পিতার কর্মোপলক্ষে বাল্যকাল অতিবাহিত হয় উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে। পরবর্তীকালে পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা হয়েছে শান্তিনিকেতন, লেখাপড়াও বেশির ভাগই সেখানে। অর্থনীতিতে এম এ। কয়েকটি গবেষণা প্রকল্পে কাজ করার পর সরকারি কলেজে অধ্যাপনা— প্রথমে দার্জিলিং গভর্নমেন্ট কলেজ, গোয়েঙ্কা কলেজ অফ কমার্স অ্যান্ড বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, বর্তমানে ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজে কর্মরত।লেখালেখির সূত্রপাত ছাত্রজীবনে স্কুল-কলেজের ম্যাগাজিনে। পরে দীর্ঘ ছেদ। ছোটগল্প ‘প্রোমোটারের লোক’ সেপ্টেম্বর ২০০৫ দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর আবার নিয়মিত সাহিত্যচর্চায় রত।শখ: বই, রান্না, গান।
৩২৫ পাতা! গব্বরের "পুরে পচাস হাজার" বলার মতো করে এই বইয়ের স্থূলত্ব চিহ্নিত করেই লেখা শুরু করতে হল। কেন জানেন? কারণ এই কাহিনিটি আদতে এর এক-দশমাংশে বলে দেওয়া যেত। তা না করে, আটভাট বর্ণনা, আবেগ, সম্পূর্ণ অকারণে তৈরি করা জটিলতা, বুদ্ধিমান গোয়েন্দা ও তার নির্বোধ আপ্তসহায়কের অবান্তর কথোপকথন, রসবোধের অনুপস্থিতি, আদ্যন্ত কৃত্রিম চরিত্রায়ন... সব মিলিয়ে এই উপন্যাসটিকে মেগাসিরিয়াল বানানো হয়েছে। কী নিয়ে এই গল্প? গজপতি নিবাস নামক একটি প্রাসাদোপম বাড়িতে কাজ করা এক মহিলা ক'দিন আসছেন না। তাই মালিকের মেয়ে খুঁজে-খুঁজে গল্পের নায়ক গোয়েন্দার কাছেই আসে, এবং 'পতা করো, দয়া' স্টাইলে সেই মহিলাকে খুঁজে বের করতে বলেন। এই অবিশ্বাস্য প্রেমিসের ওপর লেখক আলোচ্য শব্দস্তূপটি নির্মাণ করেছেন। রবিবাসরীয়-র পাতায় একদা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল সমরেশ মজুমদারের "আট কুঠুরি নয় দরজা", বা তার তুলনায় দুর্বল হলেও উপভোগ্য পলিটিকাল থ্রিলার "জলছবির সিংহ"। 'দেশ'-এ প্রকাশিত আলোচ্য উপন্যাসটিতে সেইসব লেখার নির্মেদ ও টানটান ভাবটাই পাইনি। পেয়েছি শুধু অকারণে হ্যাজানোর প্রবণতা। এর পাশাপাশি রাখুন মোহম্মদ নাজিমুদ্দিন-এর "করাচি" বা রবিন জামান খান-এর "২৫শে মার্চ"। সমকালীন রাজনীতির জটিলতা মাথায় রেখেও একটা রহস্য উপন্যাস কতটা গতিময় ও প্রাপ্তমনস্ক হতে পারে, তার ক্লাসিক উদাহরণ এই বইগুলো। তাদের তুলনায় আলোচ্য উপন্যাসটি গো-সেবা করার আদর্শ উপকরণ ছাড়া কিছু না। তার চেয়েও ভয়াল ব্যাপার, আনন্দ-র লেখক হওয়ার সুবাদে এই রাবিশ পয়দা করেই লেখক এই বাংলায় রহস্য কাহিনিকার তকমা জুটিয়েছেন! জীবন সত্যিই রহস্যময়, তাই না?
মল্লিক বাড়ি থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে বাড়ির পরিচারিকা কমলা। অরুনিমা মল্লিক দ্বারস্থ হন গোয়েন্দা দীপেন্দ্রর কাছে। সহকারী-রুমমেট-বন্ধু বিজিত। বিজিতের দৃষ্টিকোণ দিয়েই এই গল্প।
দীপেন এসে পৌঁছায় মল্লিক বাড়ি। পূর্বতন আইনজীবী-বর্তমান রাজনৈতিক নেতা বলরাম মল্লিক, যৌবনের অসামাজিক মনোভাব ঝেড়ে এখন পারিবারিক ব্যবসায় কর্মরত ভাই গোপাল মল্লিক, যিনি অরুণিমার বাবা, গোপালের বন্ধু হৃষিকেশ চৌধুরী, যিনি মল্লিক বাড়িতেই থাকেন - মল্লিক বাড়ির এই তিন মাথা। এছাড়া রয়েছে বলরামদের মা জগত্তারিণী, সঞ্জীব - যার সাথে মল্লিক বাড়ির সম্পর্ক খুব একটা পরিষ্কার নয়, নতুন পরিচারিকা, গোপালের সহকারী সিদ্ধেশ্বর আর তার স্ত্রী রুবিয়া। এই মল্লিক বাড়ির সদস্য। এছাড়া মালি, কাজের লোক, দারোয়ান তো আছেই।
দীপেন্দ্র একে একে সবার ঘরে উঁকি-ঝুঁকি মারে। অনধিকার প্রবেশের অভিযান চালায়। মল্লিক বাড়ির মন্দিরেও ঢোকে। মল্লিক বাড়ির কুলদেবতা অধিষ্ঠান করছেন।
রহস্য উন্মোচনের মূল কান্ডারি দীপেন্দ্র আর ইন্সপেক্টর পাত্র। দীপেন্দ্রর আগমনের পর মৃত্যুমেলা (অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে) শুরু হয় মল্লিক বাড়িতে। আপাত নজরে রহস্য ছিল একটা, কমলার অন্তর্ধান। একে একে জট খুলতে থাকে। সামনে আসে অ-রাজনৈতিক, অসামাজিক, পারিবারিক নানা কেচ্ছা, কুসংস্কার, বিশ্বাসঘাতকতা, বিদ্বষের কথা। মূল ব্যক্তি এক না একাধিক তা পড়ার অপেক্ষা রাখে।
এবার বইটি পড়ে নিজের অভিজ্ঞতা জানানোর পালা। এতো দীর্ঘ গোয়েন্দা কাহিনী (রহস্য, এডভেঞ্চার নয়) সম্ভবত এর আগে পড়িনি। প্রথম দিকের কিছুটা বর্ণনা রয়েছে দীপেন্দ্র আর বিজিতকে নিয়ে। গোয়েন্দা হিসেবে তাদের পাঠকের কাছে পরিচয় করিয়ে দেবার প্রয়োজনে (আমার পড়া এই প্রথম বই গোয়েন্দা দীপেনকে নিয়ে)। এরপর মল্লিক বাড়িতে প্রত্যেক সদস্যের বিস্তারিত বিবরণ। রহস্য একটা নয়, অনেক। তাই তার clue পেতে হয়েছে এক এক করে। তার জন্য গোয়েন্দাকে আলাদাভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে হয়েছে। গল্প দীর্ঘায়িত হবার সেটা আরেকটা কারণ।
এতকিছু একসাথে হবার ফলে গল্পের গতি শ্লথ হয়ে গেছে। বইটির মাঝে অনাবশ্যক দীপেন্দ্র আর বিজিতের দিনলিপির কথা কিছু জায়গায় বলা হয়েছে। শুরুর দিকের উৎসাহ পরের দিকে হারিয়ে ফেলেছি। গল্পের penultimate অধ্যায়ের পর লেখক আসল তুরুপের টেক্কা গুলো বাঁচিয়ে রেখেছিলেন একদম শেষে গিয়ে পুরো চমকে দেবেন বলে। বলতে বাধ্য হচ্ছি শেষের রহস্য উন্মোচনের তথ্যগুলো চমক লাগলেও উৎসাহ পাইনি, বইটা শেষ করার জন্য পড়া। একা দীপেন্দ্রর পক্ষে এতো রহস্যের জট খোলা (একটু বেশি মনে হয়েছে) হলেও আরো অনেক প্রশ্ন থেকে যায় - অনির্বান দীপেন্দ্রকে গোয়েন্দাগিরি বন্ধ করার জন্য টাকার অফার দেয় কেন? মূল্যবান জিনিস হাতে পেয়েও সুযোগ থাকতে বৃন্দা সেটা মল্লিক বাড়িতে লুকিয়ে পালালো কেন? এতো কিছুর পিছনে রয়েছে মূল এক কাহিনী, গোপাল মল্লিকের আত্মজা অরুনিমা নিজের মেয়ে কিনা সেই সন্দেহে। অথচ গোপাল মল্লিকের মতো চতুর ব্যক্তি DNA টেস্ট করার কথা ভাবেনি, সঞ্জীবের আসল পরিচয়ের ক্ষেত্রেও এক বক্তব্য আমার। জটিল কাহিনী বুননে বেশ ফাঁক- ফোকর থেকে গেছে।
গজপতি নিবাস রহস্য — নামটা শুনলেই মনে হয়, কী একটা জমজমাট, রুদ্ধশ্বাস, দারুণ চমকপ্রদ কাহিনি অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু বইটা খুললেই প্রথমেই যেটা এসে ধাক্কা মারে, সেটা হলো এর অকৃতজ্ঞ মোটা চেহারা — ৩২৫ পাতা! যেন "গোয়েন্দা কাহিনী" নামে একখানা অতিকায় মহাকাব্য হাতে নিয়ে বসে পড়েছি, যার ৮০% লেখা আদতে কোনো মানেই রাখে না।
গল্পটা শুরু থেকে শেষ অবশ্যি বেশ কিছু পুরোনো বিখ্যাত লেখার ছায়ায় হাঁটতে চেয়েছে, কিন্তু একবারও সেখানে পৌঁছতে পারেনি।
আয়া কমলা নিখোঁজ — তাই অরুণিমা মল্লিক ছুটে যান শখের গোয়েন্দা দীপেন ঠাকুরের কাছে। শুনে মনে হয়, যেন একটা পুরনো ফেলুদা প্লটের খসড়া পড়ছি। কিন্তু এই রহস্য কাহিনির আসল রহস্য হচ্ছে—এতখানি কাগজ কেন অপচয় করা হলো?
দীপেন ঠাকুর ও তার ‘চিরকাল কনফিউজড’ সঙ্গী বিজিতের মধ্যেকার কথোপকথনগুলো এমন কৃত্রিম, এমন প্রাণহীন যে, পাঠক হিসেবে মনে হয় আমি যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি। দুজনের মাঝে এমন একটা পলিটিক্যালি কারেক্ট অথচ অসহ্য সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যেটা দেখে শার্লক-ওয়াটসন জুটি সরে দাঁড়াবে বলেই মনে হয়।
গল্প যত এগোয়, ততই লেখক হোঁচট খেতে থাকেন প্লটের ভারে। দুটি খুন, এক টপ সিক্রেট সিডি, মাফিয়া, ড্রাগ কার্টেল, ইত্যাদি ইত্যাদি—এত রকম উপাদান জড়ো করা হয়েছে যেন গল্পটা নয়, একটা থ্রিলার থালি তৈরি করা হয়েছে: সবকিছু মাখামাখি, কিন্তু স্বাদহীন।
তুলনা করতে চাইলে, ইংরেজি সাহিত্যে এর সমতুল্য হতে পারে — The Big Bow Mystery (Israel Zangwill) বা The Limping Man (E.C. Bentley)-এর মতো সেইসব উপন্যাস যেগুলোতে রহস্য নয়, বরং পাঠকের ধৈর্যই প্রধান ভিকটিম। কিংবা কোনো uninspired paperback crime novel, যেটা রেল স্টেশনের বুকস্টলে ৪০% ছাড়ে বিক্রি হয়।
সবচ��য়ে দুঃখজনক হলো—লেখকের স্পষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, তিনি সেই সম্ভাবনাকে গলা টিপে মেরেছেন অহেতুক আবেগ, চরিত্রের ঠাসাঠাসি, এবং ধারাবাহিক নাটকের মতো needless detailing দিয়ে।
সোজা কথা, এই উপন্যাসের নাম হওয়া উচিত ছিল— গজপতি নিবাস: রহস্য নয়, হ্যাজানার ���াউস।
তবে হ্যাঁ, লেখক যেহেতু "আনন্দ"-র লেখক, তাই তকমা পাবেনই।
কিন্তু পাঠক? তাঁদের জন্য রইল শুধু একটাই ট্যাগলাইন— “যারা শেষ পাতা অবধি পড়েছেন, তারা-ই আসল গোয়েন্দা!”
উপন্যাসের সব গুনই বিদ্যমান...কিন্তু ভালো হতে হতেও হয়ে উঠলো না...গোয়েন্দা দীপেন ফেলুদার রোমান্টিসিজম ছেড়ে সাধারণ বুদ্ধিমান গোয়েন্দা হয়ে উঠতে পেরেছে...শেষের চমকে দেবার চেষ্টাটা ছাড়া আমার খুব একটা খারাপ লাগে নি...যারা পড়তে ভালোবাসেন তাদের খারাপ লাগবে না