꧁ আদর্শ, আইডিয়াল শুধু দু’চারজনের জন্যেই, তাই তার দাম, তাকে সাধারণ্যে টেনে আনলে সে হয় পাগলামি, তার শুভ ঘুচে যায় তার ভার হয় দুঃসহ।꧂
বিভিন্ন কর্ম বা অর্থ উপার্জন করার লক্ষে ভারতের আগ্রা শহরে কয়েকটি বাঙ্গালী পরিবার বসবাস করছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ভবঘুরে, কেউ ব্রাহ্ম ধর্ম প্রতিষ্ঠায় ব্যাস্ত আবার কয়েকজন প্রফেসর। সকলের মধ্যে একটা বন্ধু সুলভ আত্বীয়তা বিদ্যমান। সেই বন্ধু সুলভ পরিবেশে হটাৎ একদিন একটি নতুন পরিবার যুক্ত হয়। শারিরীক অসুস্থতার কারনে বায়ু পরিবর্তনের জন্য আগ্রায় আসেন আশুবাবু। সাথে এসেছেন একমাত্র মেয়ে মনোরমা। উচ্চ শিক্ষিত। স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে বহুকাল আগে। যদিও এখনও আশুবাবু প্রান দিয়ে ভালোবাসেন তাকে। আরো আছেন অবিনাশ মুখার্জি। তার ১০ বছরের ছেলে আর শালিকা নীলিমা'কে নিয়ে তার ছোট্ট পরিবার। আছেন হরেন্দ্র, রাজেন্দ্র, অজিত, অক্ষয়, শিবনাথ আর কমল। শিবনাথ কলেজের প্রফেসর ছিলেন। কিন্তু চাকরি হারিয়েছেন চরিত্র দোষে। আগের রুগ্ন স্ত্রীকে রেখে বিয়ে করেছেন দাসীর মেয়ে কমল কে। শিবনাথের কথা মতো তিনি কমল কে বিয়ে করেছেন শুধু তার রূপের জন্য। যাকে তিনি ভালোবেসে ডাকেন শিবানী বলে। হরেন্দ্র শিক্ষিত এবং অবিবাহিত মানুষ। ধ্যান মন সব ব্রাহ্ম ধর্ম প্রতিষ্ঠার দিকে। নিজের বাড়িতে এনে রেখেছেন অসহায় কিছু যুবক ছেলেদের। কঠোর ভাবে ব্রাহ্মধর্ম পালন করানো হয় তাদেরকে দিয়ে। রাজেন্দ্র তাদের ভেতরই একজন। অক্ষয় মানুষটা রগ চটা। কথায় কথায় গন্ডগল আর মানুষকে সামনা সামনি অসম্মান করতে তার বাঁধেনা। এদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন থেকে শুরু করে ধর্মীয় গোড়ামি অবদি সকল কিছু সুক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই উপন্যাসে। বরাবরের মতোই এটিও একটি নারি কেন্দ্রিক উপন্যাস। যাইহোক এটুকু ছিলো শুরুর দিকের কিছু সারাংশ।
উপন্যাসটির প্রত্যেকটি চরিত্র অনেক শক্তিশালী। সবাইরে একেকটা বিদ্যাসাগর বলে মনে হইছে আমার। সেই সমাজে কেউ কিছু জানেনা এমন লোক খুব কম। সবাই সব বিষয়ে পারদর্শী। এবং বক্তব্য গুলোই খুব উচ্চমানের। মাঝে মধ্যে মাথার উপর দিয়ে হামাগুড়ি খেতে খেতে চলে যায়। হরেন্দ্র,অবিনাশ, নীলিমা, সতীশ, অক্ষয়, অজিত, শিবনাথ প্রত্যেকটি চরিত্রই এত উজ্জ্বল। রাজেন চরিত্রের বিস্তার উপন্যাসে তেমন না হলেও তার স্বল্প সময়ের উপস্থিতি এবং আকস্মিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পাঠকের হৃদয়ে তার ছায়া বিস্তার ঘটায়।
এটি শরৎচন্দ্রের অন্যান্য উপন্যাসের নারী চরিত্রের মতো ভাবলে ভুল হবে। অন্য চরিত্রের নারীরা যেমন মমতাময়ী, চিরায়ত হয় তেমন কিছুর ছিটেফোটা এই চরিত্রে নেই। এখানে চরিত্রটি সবল, দুর্বার, ক্ষমতাশালী, স্বকীয় গুনে গুণান্বিত। আশুবাবুর মেয়ে মনোরমাকে প্রথমে প্রোটাগনিস্ট মনে হলেও আসলে পরে দেখা যায় কমল ই প্রাধান চরিত্র। মনোরমা উচ্চ শিক্ষিত হলেও তার মধ্যে থেকে সংকীর্ণতা, অহংকারবোধ এখনো যায়নি। হিংসা অহংকার এসব নিয়েই তার দিন কাটে।
উপন্যাসে কমল চরিত্রটি দিয়ে লেখক প্রচলিত সমাজ ব্যাবস্থার ব্যবচ্ছেদ করেছেন। ধর্মীয় গোঁড়ামি, নারীদের ছোট ভাবা, অল্প বুদ্ধির ভাবা আর দুর্বল চিত্তের ভাবা এসব বিষয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন এই কমল চরিত্রের মাধ্যমে। কমলের ভেতর না ছিলো ভয় না ছিলো সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার চিন্তা না ছিলো মানুষ কি বলে তা নিয়ে কোন ভাবনা। রাতের অন্ধকারে অপরিচিত কারোর সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে যেমন তার বাধতনা তেমনই সারা রাত অপর একজন পুরুষের সাথে এক ঘরে কাটাতেও তার সামান্য তম দ্বিধা হতোনা। এই ব্যাপারে কমলের কথা ছিলো যদি আমি নিজেকে আগলিয়ে রাখতে পারি তবে এক ঘরে না, এক বিছানাতেও কোনো সমস্যা নাই ( এমনই কিছু, ঠিক মনে নেই এখন)।
যেই শিবনাথ কমলের রুপের জন্য তাকে বিয়ে করেছিল সে আজকে আশুবাবুর মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। ব্যাপার জানাজানি হলে সবাই যখন শিবনাথকে শাস্তি দেবার কথা ভাবছিলো তখন কমল ছিলো নিরব।
꧁ দুঃখ যে পাইনি তা বলিনে কিন্তু তাকেই জীবনের শেষ সত্য বলে মেনেও নিইনি। শিবনাথের যা দেবার ছিলো তিনি দিয়েছেন, আমার পাবার যা ছিল তা পেয়েছি। আনন্দের সেই ছোট ছোট ক্ষণগুলি মনের মধ্যে আমার মণি মাণিক্যের মত সঞ্চিত হয়ে আছে। ꧂
এই সামন্য এটুকু কথায় তার বলার ছিলো। না কেঁদেছিলো অন্যান্য বাঙ্গালী মেয়েদের মতো না নালিশ করেছিলো কারোর কাছে। এখানে আমারও খটকা আছে যে সে কি চাইতো শিবনাথ তাকে ছেড়ে যাক বা সে স্বাধীন থাকুক। নাকি সে ভেবে নিয়েছিল যে এমনিতে বন্ধনে থাকবেনা তাকে কষ্ট করেও রাখা যাবেনা। সে যাইহোক তার মধ্যে না ছিলো শোক না দুঃখ।
পুরো উপন্যাস জুড়ে কমলের কথা, দৃঢ় থাকা, সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার গুলো তোয়াক্কা না করা সবই ছিলো অনুকরণীয়। উপন্যাসের মধ্যে দেখা যায় অক্ষয়, হরেন, অবিনাশ সবারই চোখের বিষ ছিলো কমল। এমন কি সেই সমাজের মেয়েরাও তাকে খারাপ চোখে দেখত। হরেন্দ্র'র ব্রাহ্ম চর্চার ব্যাপারে কঠোর কথা বলা, যে কারোর মুখের উপর কড়া কথা বলা কোনো কিছুই বাদ যায়নি কমলের চরিত্রটি থেকে। এজন্য কতো কথা তাকে শুনতে হয়েছে। কিন্তু শেষে এসে সবাই তাকেই দেবী তুল্য করে ফেলেছিলো। এছাড়াও উপন্যাসে আরো চরিত্র গুলোর বিন্যাস, কমলের না খেয়ে থাকা, সমাজের সাথে না মিশতে পারা এসব ছিলো হৃদয় ঝলস���নোর মতো। ভেতরের আরো উত্থান পতন, সমাজের ঘৃনার পাত্রী থেকে সবার ভালোবাসা পাওয়া এসব সহ আরো অনেক কাহিনি নিয়ে এগিয়েছে গল্প। হয়তো সামান্য ব���রক্তিবোধ আসে সবার অতি উচ্চমানের কথা গুলোর জন্য কিন্তু একসময় শুধু পড়ে যেতেই ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে তারপরে কি হবে তার জীবনের সাথে। অনেক ভালো লাগার একটা উপন্যাস। পড়ে ফেলতে পারেন যে-কোন সময়। ❤