অমিত গোলকিপার। বড় একটা ম্যাচে নিজের ভুলে গোল খায় সে। সবার ক্ষমা আছে, গোলকিপারের ভুলের কোনও ক্ষমা নেই। শেষ সময়ে ঘটে এক আশ্চর্য ঘটনা। বক্সের বাইরে হঠাৎ বল পেয়ে মরিয়ার মত অমিত ছুটতে থাকে সামনের দিকে। জীবন আর খেলা এভাবেই কখনও একাকার।
উল্লাস মল্লিকের জন্ম ১৯৭১ হাওড়া জেলায়, গাছগাছালি দিঘি ঘেরা এক শান্ত গ্রামে।বাবা সমরসিংহ মল্লিক, মা গীতা মল্লিক। একটু বড় হয়ে সপরিবারে চলে আসেন হাওড়া জেলারই আর এক চমত্কার গ্রাম কেশবপুরে।বাবা ছিলেন সেখানকার বিশিষ্ট শিক্ষক। স্নাতক হবার পর শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু।চাকরি ছেড়েছেন; পেশা বদলেছেন।দুষ্টুমির বাল্যকৈশোর, অনিশ্চিত কর্মজীবন, চেনা-অচেনা, ভাল-মন্দ বাছবিচার না করেই মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, অদ্ভুত সব ঘটনা আর স্নিগ্ধ প্রকৃতি তাঁর লেখা জুড়ে।মনে আনন্দ আর রসবোধ নিয়েই বেঁচে থাকতে চান। ২০০০ সালে লেখালিখির শুরু।বিভিন্ন বছরে ‘দেশ’ হাসির গল্প প্রতিযোগিতায় বিজয়ী।একডজন উপন্যাস, দেড়শোর বেশি গল্প আর রম্যরচনা লিখেছেন।
ছোটবেলায় পুজো সংখ্যায় মতি নন্দীর লেখা পড়তাম। অনেকদিন তার গল্প-উপন্যাস পড়া হয় না, আর এদিকে অনেক খুঁজেও পাইনি কোথাও। তাই ব্রিক লেনের বইয়ের দোকানে এই বইটি যখন চোখে পড়লো, বেশ আগ্রহভরেই কিনে নিলাম। এমনিতেও "আনন্দ নভেলা" সিরিজের বইগুলোর আকার-আকৃতি, প্রচ্ছদ, সর্বাঙ্গীন প্রডাকশন, সবই আমার ভালো লাগে। আর তাই উল্লাস মল্লিকের নাম আগে না শুনে থাকলেও ভরসার উপর বইটা কিনে ফেললাম।
পশ্চিমবঙ্গের এক মফস্বল টাউনের গল্প। নীচের এই বিবরণ থেকেই মফস্বলের চেহারা উজ্জল ভেসে উঠবে পাঠকের মনে।
"গলির মুখে এসে দেখলাম, অন্ধকার। আমাদের বসন্তপুর যতই শহুরে পালিশ লাগাক, অন্ধকার গলি, শাঁখের আওয়াজ, তুলসীমঞ্চ এগুলো থেকে এখনও গ্রাম-গ্রাম গন্ধ ছাড়ে। বসন্তপুরে উঁচু-উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ি হচ্ছে, বিগ-বাজার হচ্ছে, কম্পিউটার সেন্টার, লেডিস পার্লার হচ্ছে, মেয়েরা জিনস পরছে, লোকে শৌখিন কুকুর পুষছে - প্রাণপণে আধুনিক হতে চাইছে এলাকাটা। তবুও সন্ধের পর অন্ধকার থাকে গলিগুলো। এখনও পঞ্চায়েত এলাকা বসন্তপুর। রাস্তায় বোধহয় আলো লাগানোর ব্যবস্থা নেই পঞ্চায়েতের।"
গল্পের ন্যারেটর দুজন। প্রথমে অমিত, লোকাল টিমের তরুণ ফুটবলার। বাপ নেই, পড়াশোনা করেনি তেমন, মা ঠিকে-ঝির কাজ করতো। আর দ্বিতীয় বক্তা শ্রীলেখা - পয়লা নম্বর "হটি", পথ দিয়ে হেঁটে গেলে টাউনের সব ছেলে (আর সব ছেলের বাপও) তার দিকে গোগ্রাসে তাকিয়ে থাকে। চরম কনফিডেন্ট মেয়ে, নিজের দৌড় ঠিক কদ্দুর, খুব ভালই জানে শ্রী।
উল্লাস মল্লিকের গদ্যে রং-বাহারি কারুকার্য খুব একটা নেই। সহজ-সরল গল্প বলেছেন সহজ-সরল ভাষায়। "স্ট্রেইট ডাউন দ্য মিডেল" যাকে বলে, বক্তাদের চরিত্র, বয়স, শিক্ষার সাথে সঙ্গতি রেখে। তবে গল্পের কাঠামো নির্মানে বেশ দক্ষতার পরিচয় আছে - প্রথমে অমিত গল্প বলে ১০-১২ পাতা, তারপর শ্রীলেখা আরো ১০-১২, আবার অমিত, আবার শ্রীলেখা - এভাবে করেই গল্প এগিয়ে যায় নির্দিষ্ট পরিণতির দিকে।
অমিতের জীবনের লক্ষ্য বড় গোলকিপার হবে, মফস্বলের গন্ডি পেরিয়ে কলকাতার বড় ক্লাবে খেলবে একদিন। আর শ্রীলেখার জীবনের মূল সমস্যা পরিবার আর পুরুষমানুষ ঘিরে। অভাবী বাপ-মার অসুখী সংসার, এইসব সীমাবদ্ধতা অসহ্য লাগে ওর, চেহারা-সুরত কাজে লাগিয়েই শ্রীলেখা চলে যেতে চায় আরো সুখকর কোন গন্তব্যে।
এই দুইয়ের একটি কমন পয়েন্ট আছে - তাপসদা। আধুনিক বাংলা সাহিত্য বা চলচ্চিত্রের ক্লাসিক চরিত্র ইনি - শিক্ষিত, মার্জিত, ভীষণ পড়ুয়া, খুব সম্ভবত বামপন্থী। এবং চরম সজ্জনও - মনে মনে ওকেই চায় শ্রীলেখা, কিন্তু শত প্রলোভনেও নির্লিপ্ত থাকেন যে বান্দা, তিনি এই তাপসদা। অমিত আর শ্রীলেখার ভিন্ন ভিন্ন চোখ দিয়ে দেখা, উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। আরো কিছু পার্শ্ব-চরিত্র রয়েছে - ক্লাবের মালিক ভবানীদা, ভোরবেলা অমিতের ব্যায়াম-সাথী বিশাল-বপু কেষ্ট লাহা, অমিতের এককালের দোস্ত বর্তমানে নেশার কারবারী চাটু।
অমিতের ভাগ্যের শিকে কি ছিড়বে? আর শ্রীলেখার হিল্লেই হবে বা কার সাথে?
*
যেমনটা বললাম - কালজয়ী সাহিত্য কিছু নয়, তবুও সীমিত পরিসরে, সীমিত অভিপ্রায়ে উল্লাস মল্লিকের এই উপন্যাসিকা আমার কাছে স্বার্থক লেগেছে। এর মধ্যে নিজের কিছু বায়াস তো কাজ করে অবশ্যই। মনের ভেতর একটা ইচ্ছে পুষে রেখেছি অনেকদিন ধরে। যেদিন বড় হবো, টাকা-পয়সা হবে, নয়টা-ছয়টা রুটি-রুজির জন্যে দৌঁড়াতে হবে না - তখন দুটো জায়গায় থাকতে চাই আমি।
১) হাভানা ওল্ড টাউনে, ক্যারিবীয় সাগরতীরে ঐতিহ্যবাহী "মালেকন" সড়কের উপর একটি উপরতলার ফ্ল্যাটে। সন্ধ্যাবেলায় ব্যালকনি থেকে সমুদ্রের লাল টকটকে সূর্যাস্ত দেখবো দুচোখ ভরে।
২) পশ্চিমবঙ্গের কোন এক ছোট্ট শহরে, হয়তোবা ডুয়ার্স অঞ্চলের পাহাড়ের স্নিগ্ধ ছায়ায়, কিংবা আরো দক্ষিণে - সাগর আর সুন্দরবনের কাছাকাছি, যেখানে নদীর মোহনা এসে চওড়া হতে হতে দুই দিগন্ত ছুঁয়ে গেছে। ইন্দ্রনীলের "ফড়িং" চলচ্চিত্র দেখে ডুয়ার্স-কে ভালোবেসেছিলাম, অপর্ণার "জাপানীজ ওয়াইফ" দেখে মোহনা অঞ্চল। এই ধরনের গল্প পড়লে ইচ্ছেটা বাড়তে বাড়তে অসহনীয় একটা জায়গায় পৌঁছে যায়। পড়তি বিকেলে খেলার মাঠে ছেলেপেলেদের কোলাহল, ফুরফুরে বাসন্তী হাওয়া, গন্ধরাজের সুবাস। মফস্বলে কোনদিন থাকা হয়নি আমার, আগাগোড়া ঢাকার পোলা। আটপৌরে শান্তির জীবনটা খুব টানে। সবসময় মনে হয় যেন ছোটবেলার একটা বড় অভিজ্ঞতা মিস হয়ে গেছে জীবন থেকে।
হয়তো হবে একদিন। কিছুদিনের জন্যে সেই সুযোগ পেলেও আমি হ্যাপি। তার আগ পর্যন্ত বক্সের বাইরে'র মত বই থাকবে সান্ত্বনার সাথী হয়ে।