শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এই উপন্যাসের চালচিত্রে এক জেলাশহর, খুনজখম আর বোমাবাজির মধ্য দিয়ে ক্ষমতাদখলের লড়াই যেখানে স্বাভাবিক জনজীবনের এক অঙ্গ। আর এই চালচিত্রের সামনে রয়েছে মায়াময় ভালবাসার অনেকগুলি বিচিত্র প্রতিমা, যার প্রত্যেকটি চেহারায় আলাদা, চরিত্রে অন্যরকম। এ উপন্যাসের মুখ্য দুই চরিত্র — বন্দনা এবং অতীশ; আর এই দুজনকে ঘিরে অনেক ঘটনা, অনেক চরিত্র, নানান সম্পর্কের টানাপোড়েন। সেই টানাপোড়েনে ফুটে উঠেছে অদ্ভুত যেসব নকশা, তার কোথাও বন্দনার ভালমানুষ বাবা মেঘনাদ চৌধুরী আর রোগাভোগা রমামাসি, কোথাও বন্দনার পিসতুতো বোন, দু’বছরের ছেলেকে নিয়ে বিধবা দীপ্তিদি আর মার্কসবাদের দীক্ষা ও যজমানির উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্বে দীর্ণ অতীশ, কোথাও এম.এ., বি.টি. শিক্ষিকা অপরূপাদি আর মাস্তান ল্যাংড়া, আবার কোথাও-বা বন্দনা নিজেই।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
তো, ব্যাপার হচ্ছে এই। পড়া শুরু করামাত্রই বুঝতে পারলাম "অসুখের পরে" শীর্ষেন্দুর আরেকটা তরল প্রেমের উপন্যাস। মানে, পাত্রপাত্রীর মধ্যে প্রেম অস্ফুট থাকবে, তারা যখন নিশ্চিতভাবে নিজেদের সম্পর্ক উপলব্ধি করবে সেখানেই গল্পের সমাপ্তি। বিশেষ কিছু ঘটবে না কিন্তু পড়তে খুব ভালো লাগবে।এককালে যেমন আনন্দবাজার গোষ্ঠীর শারদীয় সংখ্যায় শীর্ষেন্দুর লেখা পড়তাম (বাঁশিওয়ালা, নরনারী কথা, সাঁতারু ও জলকন্যা ইত্যাদি) তার ধারাবাহিকতায় এ বইতেও মধুরেণসমাপয়েৎ। কী হতে যাচ্ছে জানতে পেরেও যে একটানা আনন্দ নিয়ে পড়ে ফেলা যায় সেখানেই লেখকের কৃতিত্ব। বরাবরের মতোই যারা "নিষ্ঠাবান হিন্দু" বা ব্রাহ্মণ নন তাদের চরিত্রহনন করেছেন তিনি। এখানে সেই চরিত্রটা দীপ্তি। স্বামী মারা গেছে। তার অপরাধ সে এখনো রঙিন জামা পরে, মাছ মাংস খায়, হাসে (মানে সে কেন হেসেখেলে জীবনযাপন করবে? বিরাট অপরাধ সন্দেহ নেই।) লেখক তাই দেখিয়েছেন তার গায়েপড়া স্বভাব, সুপুরুষ দেখলেই ঢলে পড়ার ইচ্ছা ইত্যাদি ইত্যাদি। স্বামী মারা যাওয়ার পর যে মাছমাংস খায় সে যে চরিত্রহীন হবে সে ব্যাপারে শীর্ষেন্দু সন্দেহের অবকাশ রাখেননি। গোঁড়া ব্রাহ্মণ বাদে দুনিয়ার আর সবাই নিচু, অধঃস্তন, খল; উঁচু নিচু জাত যারা মানে না তাদের ধ্বংস অনিবার্য, এ মতবাদ নিষ্ঠার সাথে অর্ধশতাব্দী ধরে প্রচার করে যাচ্ছেন লেখক।
অন্যান্য লেখার মত শীর্ষেন্দু বাবুর লেখা এক্ষেত্রেও Resistance-হীন। পড়তে পড়তে কেমন করে বেশ ঘন্টা কয়েক কেটে গেল। গল্পের চরিত্রগুলোর ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকতে বেশ ভালো লাগে।
এই যেমন এখানে অতীশ চরিত্রটি মনের মত। পড়তে পড়তে কিছুক্ষণ অতীশ হয়ে বাঁচলুম। বি.কম পাশ বেকার, সাধারণ মফস্বল, দারিদ্র্য এসব একদিকে আর অতীশের অদম্য ইচ্ছেশক্তি আর একদিকে। আবার অন্যদিকে বন্দনার সারল্য, পারিবারিক হতাশা, সর্বোপরি অসুখ এসবের মাঝেও ভাবনা-চিন্তা, পরিণত কিছু পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে বন্দনাও এক স্বতঃস্ফূর্ত চরিত্র। এই দুই প্রধান চরিত্র ছাড়াও বাকিদেরকেও লেখক এঁকেছেন বেশ।
প্রকৃতির নিয়মেই এই উপন্যাসের রেশও কেটে যাবে একদিন। জীবনের উপলব্ধির শেষ নেই। বেঁচে থাকার জন্য শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা পড়াটা জরুরি।
অসুখের পরে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আনন্দ মম: ১০০/-
গল্পের শুরু বন্দনার অসুখ থেকে সেরে ওঠার পর। তার পুরোনো বিশাল জমিদার বাড়ির আনাচে কানাচে বসে স্মৃতিচারণ করতে থাকে বন্ধনা। উঠে আসে পারিবারিক কেচ্ছা, রাজনৈতিক ঈর্ষার নানা দিক।
বি কম পাস করে অতীশ রিক্সা চালায়, আবার ফি সময়ে পুরোহিতগিরি করে সংসারে টাকা দেয়, মুটে বয়। শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা সত্ত্বেও পাড়ায় আয়োজিত sports এ অংশগ্রহণ করে। প্রাইজে পাওয়া জিনিসগুলো বেচে পয়সা পায় অতীশ।
বন্দনার বাবা-মার জীবনে ঘটে যাওয়া অস্বস্তিকর ঘটনার ছায়া বন্দনা নিজের জীবনেও অনুভব করে। কিন্তু গল্পের শেষে স্বস্তি পায় সে, সবদিক থেকে।
অসুখের পরে বইটা পড়ে মনখারাপ হয়ে আবার ভালো হয়ে গেলো। সরল, আপাত দৃষ্টিতে মারপ্যাঁচহীন আয়তনে ছোটো একটি সামাজিক উপন্যাস, যা একবার পড়তে বসলে শেষ করা যায়।
" মানুষকে ধরে রাখা যে কত কঠিন তা বন্দনার মত আর কে জানে? কেউ মরে যায়,কেউ চলে যায়।কী যে একা আর ফাঁকা লাগে তার! " Hit me hard :3 ! প্রেমের উপন্যাস এর বিশেষ ভক্ত না হলেও,শীর্ষেন্দুর লেখনীতে ভালবাসা আসে খুব subtle ভাবে।পড়তে খারাপ লাগে না।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বড় উপন্যাসগুলো পড়ার পর এমন অল্প পেজের গল্পে মন ভরানোটা খুব কঠিন।তেমনি হাতের কাছে উনার কোন লেখা থাকলে সেটা না পড়ে থাকা আরও কঠিন।প্রিয় লেখক বলে কথা।
উনার লেখনীতে প্রেম, সম্পর্ক, টানাপোড়েন কিংবা সমসাময়িক রাজনীতি সবই আমার ভালো লাগে।
এই বইটা ছোট।কিন্তু গভীর করে ভাববার মতো ম্যাটারিয়ালসের অভাব নাই।আমার মতো যে/যারা উনার লেখার গভীরতা সম্পর্কে জানে তাদের কাছেতো ভালো লাগাটাই স্বাভাবিক।
শেষটা কেনো জেনো মনটা একটু ভারী করে দিল।অতীশ কি শুধুই বন্দনার জন্য কলকাতা গেলোনা? নাকি নিজের ব্যক্তিগত অন্তর্দ্বন্দ্বের মীমাংসা করতে পারল না বলে :)
বন্দনা, অতীশ, প্রদীপ, বিলু, বাবু, ল্যাংড়া, অপরূপা, বন্দনার মা, বাবা, বাহাদুর, রমা, দীপ্তিসহ আরও অনেকে এবং বড় বাড়ি– এইসব মিলিয়ে আরেকটা শীর্ষেন্দু ম্যাজিক! উপন্যাসটা মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে গেলাম। পুরোটা সময় জুড়ে মূল চরিত্র বন্দনার প্রতি একটা করুণ মায়া কাজ করছিল। অতীশ এবং দীপ্তির ব্যাপারটা ভালো লাগে নি। এটা বাদে চরিত্রটা ভাল ছিল। অতীশ এবং পরানের সাঁকো পার হওয়ার দৃশ্যটা ছিল অনবদ্য।
This entire review has been hidden because of spoilers.
জেলাশহরের একটি এলাকা। এলাকা জুড়ে তৈরী হয়েছে নানা রকম গ্যাং। বোমাবাজী, নানা রকম মারামারি চলছেই। এসব করতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছে কেউ কেউ। এর মাঝে বেড়ে উঠছে অনেক পরিবার, তাদের আছে নানা গল্প, কেউ কেউ নিজে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়, পরকীয়ার বলি হয়ে ধ্বংস হয় অনেক পরিবার। কেউ প্রেমে পড়ে, কেউ আবার স্বামী মৃত্যুর কারণ।।