লেখক ও কবি বুলবুল সরওয়ার পেশাগত জীবনে একজন চিকিৎসক ও শিক্ষক। অসাধারণ কিছু ভ্রমণকাহিনী রচনার জন্য অধিক খ্যাত হলেও গল্প, কবিতা, উপন্যাসেও তাঁর অবাধ বিচরণ। এছাড়া অনুবাদ সাহিত্যে তাঁর শক্তিশালী অবদান রয়েছে।
অসাধারণ বললেও কম হয়ে যাবে । একেবারে হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছে । ভালো লাগার আরেকটি কারণ হয়তো যথোপযুক্ত স্থানে ফার্সি আর বাংলা কবিতার ব্যাবহার। যে জায়গায় যেমনটি দরকার লেখক সেখানে তেমনি কবিতা ব্যাবহার করেছেন। যা মোগল স্থাপনার সাথে খুব ভালোভাবে মিলে গিয়েছে। আর লেখনিতে তো যাদু আছেই। ভ্রমণ কাহিনী ও যে এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায় জানা ছিল না। খুব সুন্দরভাবে উঠে এসেছে কাশ্মীরের ইতিহাস আর মানুষের আশা আকাঙ্খার সুখ দুঃখ আর নীপিড়নের কথা। একটি অবশ্য পাঠ্য বই।
অনুপমা কাশ্মীর প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে লেখকের সুস্বাদু লেখনীতে। কাশ্মীরের আকর্ষণীয় জায়গাগুলোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিপুণ বর্ণনার পাশাপাশি বোনাস হিসেবে আছে জায়গাগুলোর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। বইয়ের আকর্ষণ বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে জায়গামতো পরিবেশ বুঝে উর্দু, ফারসি, আরবি কবিতার ব্যবহার। সেই সাথে উঠে কাশ্মীরের মানুষের বঞ্চনা আর অত্যাচারিত হবার খণ্ডচিত্র। শক্তিশালী লেখনীতে রোমান্টিক, স্বপ্নাতুর এক আবহ ছড়িয়ে আছে পুরো বইজুড়ে।
ভ্রমণকাহিনীর ভক্ত নই আমি। তবে এ বই পড়ার পর এ ধরনের বইয়ের প্রতি বদলে গেছে আমার দৃষ্টিভঙ্গি। যে এক ঘোর সৃষ্টি করেছে 'ঝিলাম নদীর দেশ' তা থেকে বের হতে পারিনি এখনও, বের হতে পারব না আরও বহুদিন।
দীর্ঘসময় পর চমৎকার একটা ভ্রমণকাহিনী পড়লাম। 'ঝিলাম নদীর দেশ' নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভ্রমণকাহিনী। লেখকের অন্যান্য বই পড়ার জন্য মুখিয়ে আছি।
ঝরঝরে ভাষায় প্রাঞ্জল বর্ণনা। কাশ্মিরকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখার মাঝে। বইলা মূলত ভ্রমন কাহিনী হলেও নিয়ে এসেছেন সংস্কৃতি, সমাজের বাস্তব চিত্র, রাজনৈতিক অবস্থা। ইতিহাসের রেফারেন্স এনে বেশ কিছু আর্গুমেন্ট এনেছেন। আর প্রকৃতির বর্ণনা ছিলো মোটামুটি, কাশ্মির হিসেবে যতোটা আশা করেছিলাম তারচেয়ে বরং ইতিহাস এবং রাজনীতি নিয়েই আলোচনা অনেক বেশি করেছেন। বন্ধু স্থানীয় কিছু চরিত্র লিখেছেন সাবলীল ভাবে। নায়িকা বা নারী চরিত্রটাকে বর্ণনা করেছেন ঝিলাম নদীর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু বাতাসের মতো কিংবা ঝরতে থাকা সফেদ তুষারের মতো পবিত্র মোড়কে জড়িয়ে। প্রকৃতি উপস্থাপনে একটু পিছিয়ে থাকলেও মানুষ উপস্থাপনে পারদর্শিতার প্রমাণ রেখেছেন। সব মিলিয়ে বেশ ভালোই লেগেছে বলতে চাই, সুখপাঠ্য।
কিছুদিন ধরেই একটা ভ্রমণ কাহিনী পড়ার জন্য মনটা আকুপাকু করছিলো। তারই ফলশ্রুতিতে পড়ে ফেললাম সুলেখক বুলবুল সরওয়ার এর বেশ আলোচিত ভ্রমণকাহিনী 'ঝিলাম নদীর দেশ'। ঝিলাম নদী, সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ভ্রমণ কাহিনীটা হতে যাচ্ছে ভূ-স্বর্গখ্যাত কাশ্মীরকে নিয়ে। বিশ্ব ঘুরে দেখতে চায় কিন্তু জীবনের অর্ধেক পার হলেও দেশের বাইরে তো দূরে থাক দেশের ভেতরেই দুয়েকটা জায়গা ছাড়া কোথাও ঘুরে দেখার সুযোগ যার হয়নি, তার জন্য কাশ্মীরের ভ্রমণ কাহিনী পড়ার সুযোগটা যে আসলে কতটা রোমাঞ্চকর তা হয়তো বলে বোঝানো যাবেনা। সুতরাং না বুঝিয়ে যা বলতে চেয়েছি, তাই বলে যাই।
'ঝিলাম নদীর দেশ'কে আসলে একচেটিয়া ভাবে ভ্রমণকাহিনী বলা যাবে না। কারণ বুলবুল সরওয়ার কাশ্মীরের অপরুপ সৌন্দর্যের বর্ণনা যেমন দিয়েছেন তেমন তুলে ধরেছেন এ সৌন্দর্য সৃষ্টির পেছনের ইতিহাস। আবার এ মুলুকের নিরীহ মানুষের বুকের ভেতর স্বাধীনতা পাবার যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা, তা ও বুলবুল সরওয়ার এর শক্তিশালী লিখনশৈলীতে উঠে এসেছে এ বইতে। বই পড়তে পড়তে আমি মুগ্ধ হয়েছি ডাল লেক, চেশমা শাহী, নিশাত বাগে আর সেই সাথে জেনেছি নিশাত বাগের পেছনে মোঘলদের ইতিহাস, এক পরমাসুন্দরী নারী নূরজাহানের শিল্পের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। সেই সাথে জেনেছি নৈসর্গিক এই সৌন্দর্য, এ মুলুকের মানুষের মাঝে যতটা না মুগ্ধতা ছড়াতে পেরেছে তার চেয়ে এই ভূ-স্বর্গের ওপর শাসকের চাবুক তাদের কাঁদিয়েছে বেশী। 'কাঁদিয়েছে' না বলে আসলে 'কাঁদাচ্ছে' বললেই বেশি ভালো হবে। একটা মুলুকের মানুষ যারা আসলে কোন দেশের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই, যাদের নেই স্বাধীনতা, নেই ভোট দেবার অধিকার, যাদের স্বাধীকার আদায়ের বীর নেতা রাতারাতি হয়ে যায় ক্ষমতালোভী হায়েনা আর শুষে নেয় জনগণের স্বপ্ন তাদের জন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর কতটাই বা ম্যাটার করে? তাইতো আমরা দেখতে পাই হাসিখুশি মানুষগুলোর মুখের আড়ালে রয়েছে একটা বিষণ্ণতার ছাপ, যে জানেনা তার অনাগত সন্তান কি স্বাধীনতার স্বাদ পাবে? নাকি তারমতনই ধুঁকে ধুঁকে পুরো জীবনটা কাটবে?
সুলেখক বুলবুল সরওয়ার ওপরের ব্যাপারগুলো বেশ ছোট্ট পরিসরে তুলে ধরেছেন তার 'ঝিলাম নদীর দেশ' ভ্রমণকাহিনীতে। শুধু তাই না, প্রতিটি পর্বের শুরুতে এবং পর্বের মাঝে মনের ভাব প্রকাশ করতে লেখক সাহায্য নিয়েছেন বিশ্বখ্যাত কবিদের পংক্তিমালার। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে সেখানে স্থান পেয়েছে লোকগীতি, কবি হেলাল হাফিজ, আরো ছিলো বিখ্যাত শায়ের মির্জা গালিব, কাশ্মীরের ইতিহাসের সাথে জড়িত হাব্বা খাতুনসহ আরো অনেকে। কবিতা আমি বিশেষ বুঝি না, তা সত্ত্বেও ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কবিতাগুলো আমাকে মুগ্ধ করেছে। তবে সবচাইতে অবাক হয়েছি লেখকের সাহিত্যজ্ঞানের পরিধির নিদর্শন স্বরুপ বইয়ে কবিতার ব্যবহারে। নিজের কিছু দর্শনও বইতে মলাটবন্দী করে বুলবুল সরওয়ার পাঠককে দিয়েছেন জীবন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে একজন মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে ভাববার খোরাক। সবকিছু মিলিয়ে আমার ৩ টা দিন বেশ ভালো কেটেছে ঝিলাম নদীর দেশে।
বইটি ভ্রমণকাহিনী হলেও আমার লেখাটিতে আমি কাশ্মীরের সৌন্দর্য নিয়ে কিছু লিখব না। কারণ সব ভ্রমণ গল্পতেই প্রায় একইরকম ভূ-স্বর্গ কাশ্মীরের সৌন্দর্যের বর্ণনা পাওয়া। আমি রাজনীতি নিয়েও কিছু লিখব না। কারণ ওসব নিয়ে আজকাল প্রচার মাধ্যমগুলো অতিরিক্ত সরগরম। বরং কাশ্মীরিদের নিয়ে কিছু বলি।
কাশ্মীরি মানুষ চিন্তা চেতনায় শত শত বছর ধরে আমাদের (বাঙালিদের) থেকে এগিয়ে আছে। আমরা যে তথাকথিত প্রগতিশীলতার বুলে আওড়ে গর্ব করি লেখক বুলবুল সারওয়ারের এই ভ্রমণকাহিনী আমার সেই চেতনায় বেশ জোরে একটা আঘাত করেছে। শিক্ষিত আর প্রগতিশীল মানুষের মাঝে আজও এদেশে রয়ে গেছে বিস্তর ব্যবধান। একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চাই।
কাশ্মীরের প্রধানত দুই কবির নাম হলো হাব্বা খাতুন এবং লাল দাদ। কাশ্মীরি সংস্কৃতিতে এই দুজনার প্রভাব বেশ প্রাচীন এবং খুব গভীর। এদের প্রথমজন মুসলিম এবং দ্বিতীয়জন হিন্দু।
কাশ্মীরিরা কয়েকশত বছর ধরে তাদের প্রধান কবি হিসাবে দুজন নারীকে গ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে আবার দুইজন দুই ধর্মের। আচ্ছা আমরা কি আমাদের সাহিত্যের আকাশে এক নারীর কবির প্রাধান্যতা আগামী ১০০ বছরেও মেনে নিতে পারব? সামান্য ধর্মীয় দূরত্ব এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থকে পুঁজি করে আমরা বাঙালির শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সন্তান কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে নীচ করার কোন সুযোগই ছাড়তে চাইনা। বাংলাসাহিত্যের বিস্ময় প্রতিভা নজরুলের হিন্দুদের শ্যামাসঙ্গীত আর ইসলাম সংস্কৃতির গজল দুটোই রচনা করার অপরাধে তার দিকে আমরা তীর্যক দৃষ্টিতে তাকাতে ছাড়িনা। সেখানে একজন নারী কবি!!
সেখানে আমি কাশ্মীরিদের চিন্তা-চেতনায় কি বলব? আধুনিক?? না, কাশ্মীরিরা বরং আরও বেশি কিছু। কাশ্মীরিরা কাশ্মিরকে ভালোবাসে। সেই ভালোবাসা একদম নিখাদ। তীব্র জাতীয়তাবাদের দূষিত মিশ্রণ নেই সেই ভালোবাসায়।
কাশ্মীরের আধুনিক শিক্ষায় মেয়েরা পড়াশোনা করে আবার পাহাড়ী কঠিন জীবনেও তারা অভ্যস্ত। ছয় মাস শ্রীনগর আর ছয় মাস জম্মুতে বাস করা এই অধিবাসীদের জীবনযাত্রা কখনো মসৃণ নয়। কিন্তু জীবনের এই কঠোরতা তাদের স্বভাবের নমনীয়তায় চিড় ধরাতে পারেনা একটুও।
কাশ্মীরের রূপ আর কাশ্মীরীর নারীর সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় যাত্রী, অভিযাত্রী খেই হারিয়ে ফেলে। লেখকের কাশ্মীরি নারীদের নিয়ে বলেছেন, যেন তুর্কি মুখে বসানো পারস্য রমণীর চোখ। কাশ্মীরি নারী যেন এই ভূ-স্বর্গের বুকে নদী, লেক, পাহাড়ে মতই আরেকটি স্বতন্ত্র অলঙ্কার।
কাশ্মীরেও আছে ইংরেজী মিডিয়াম স্কুল। ছেলেমেয়েরা ক্লাস করে ঠিক সময় এসে সালাতও আদায় করে। আধুনিক শিক্ষা সেখানে ধর্মের পথে অন্তরায় হয়নি। ধর্মও আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য থেকে কাউকে চ্যুত করেনি।
আসলে লেখকের "ঝিলাম নদীর দেশ" ভ্রমণ গল্প হিসাবে বইটি লিখেছিলেন ১৯৮৭ সালে। সাথে দিয়েছেন বোনাস হিসাবে কিছু কাশ্মীরি টুকরো ইতিহাসের গল্প। আর গল্পগুলোই আমাকে তুলনামূলক ভালভাবে কাশ্মীর সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট করেছে।
ডাললেক, নাগিন চেক, শালিমার, নিশাতবাগ, চিনার গাছ পাহাড়, ঝিলাম এবং লীডার নদী এসব পড়ে আমি যতটা মুগ্ধ হয়েছি তাঁর থেকে বেশি মুগ্ধ হয়েছি কাশ্মিরীদের সরল জীবনযাত্রায়। দুটোর একটাও দেখিনি। একদিন হয়তো সুযোগ হবে মিলিয়ে দেখার কে বেশি সুন্দর কাশ্মীর নাকি কাশ্মীরি?
বইটাকে অসাধারণ বললেও যেনো কম হয়ে যায়। ভূসর্গ কাশ্মীরের এতো অসাধারণ বর্ণনা, পড়ার সময় সবকিছু চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো। তাছাড়াও কাশ্মীরের তৎকালীন রজনৈতিক অবস্থা, বিভিন্ন পর্যটন এলাকার প্রাচীন ইতিহাস আর মাঝে বিখ্যাত কবিদের কবিতা সবমিলিয়ে চমৎকার একটা অনুভূতি। বইটা পড়ে শ্রীনগর, ডাল লেক, ভাসমান হাউসবোট, গুলমার্ক, চশমা শাহী, ঝিলম নদী, মানস সরেবর, শালিমার বাগ, নিশাত বাগ, পেহেলগাম, নাগিন লেক, লিডার নদী, এমনকি কাশ্মীরী তরুনী নাজনীনেরও প্রেমে পড়ে গেছি, সুযোগ থাকলে এখনি ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে কাশ্মীরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যেতাম।
১৯৮৬ সালের দিকে বুলবুল সরওয়ার গিয়েছিলেন কাশ্মীর।সেখানে ছিলেন বেশ কিছুদিন। তারই অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা ঝিলাম নদীর দেশ।
বইটা বেশ আন্তরিকভঙ্গিতে লেখা। তবে বারংবার অপ্রাসঙ্গিকভাবে ধর্ম টেনে আনা ভালো লাগে নাই। ধর্মীয় বিষয়আশয় না এনেও বুলবুল সরওয়ার এই ভ্রমণকাহিনী লিখতে পারতেন বলেই আমি বিশ্বাস করি।
ভ্রমনে গিয়ে মানুষ নতুন কিছু দেখে বা জানে। কিন্তু অনুভব করে কতজন? লেখক কাশ্মিরকে শুধু দেখেন নাই। অনুভব করেছেন। সেই অনুভুতি বইয়ের পাতা হয়ে হৃদয়ে মিশে যায়।
ঝিলাম! কাশ্মীরিদের প্রাণ যাকে ঝেহলাম বলে। কাশ্মীরের প্রধান নদীর নামে এই বইয়ের নামকরণ। লেখক আশির দশকে ভ্রমণের বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন এমনভাবে যেন চোখের সামনে গুলমার্গ, পেহেলগাঁও, নিশাত বাগ দেখতে পাচ্ছিলাম। সাথে সাথে লেখক বর্ণনা করেছেন প্রত্যেকটা দর্শনীয় জায়গার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। প্রেম, কবিতা, ইতিহাস আর ভ্রমণ সব মিলে যেন জমে একেবারে ক্ষীর। আহা যদি যেতে পারতাম, The Paradise on the earth!💙
এক অলস বিকেলে আড্ডা দিতে দিতে, যারপর-নাই-তার বইয়ের রিকমেন্ডেশন চালাচালি হল নাফিসের সাথে। চালাচালি বললে ভুল হবে, একগাদা বই আমিই রিকমেন্ড করলাম, তার বদলে নাফিস আমাকে ছোট্ট একটা বই রিকমেন্ড করল। ঝিলাম নদীর দেশ।
ছোট্ট বইটা দ্রুতই খুঁজে পেলাম অনলাইনে, আর অর্ডার করলাম। হাতে পেয়ে খুব খুশি, ছোট্ট হার্ডকভার—যেকোনো ব্যাগের মধ্যে অনায়াসে ঢুকিয়ে ফেলা যাবে। কিছু বই থাকে যেগুলো হাতে নিয়ে ধরলেই অর্ধেক ভালো লাগা চলে আসে, সেরকম। কয়েক পাতায় চোখ বুলিয়ে মনে হল, লেখাটা ভালো না হয়ে যাবে না। ভাবলাম এটা জমিয়ে রাখি, ছুটি কাটাতে গিয়ে বেশ জমবে। একবার ভাবলাম কাশ্মীরের জমিনে বসে এই বইটা পড়লে কেমন হয়। তারপর যা হয়, একটা ভালো বই আর কয়দিন জমিয়ে রাখা যায়, নিজেকে অজুহাত দিলাম এই যে—একটা সুন্দর জায়গায় গেলে তো এমনিই ভালো লাগবে, কর্মব্যস্ত সপ্তাহান্তে একটু চিল করা আবশ্যক।
শুরুতেই লেখক জেএন্ডকে ট্যুরিজমের বাসে করে কাশ্মীরে পৌঁছানোর বৃত্তান্ত দেন। প্রথম দর্শন, প্রথম ভালোলাগা, অপরিসীম সুন্দর এই ভূখণ্ডের মোহ লেখককে গ্রাস করার সময়, খানিকটা বিষাদও ছুঁয়ে দেয়। এ যেন অনেকটা রূপকথার গল্পের মত—ভীষণ সুন্দর রাজকন্যা কিন্তু কি জানি একটা অসুখ তাকে ঘিরে রেখেছে।
প্রত্যেকটা দৃশ্যের বিবরণী মনে হচ্ছিল চোখের সামনে ভাসছে। হু ঠিক, মহাত্মা গান্ধী পার্ক পেরিয়ে গুলমার্গের রাস্তা, আর পাম্পোর দিয়ে যেতে হয় পেহেলগাম। আমার কেন জানি ঝিলাম নদীটা খুব বেশি মনে নেই, তবে লিডার নদী চোখ বুজলে স্পষ্ট দেখতে পাই। পুরো পেহেলগামে সব জায়��ায় মনে হয় লিডার নদী দেখতে পাওয়া যায়। আমি যখন বুলবুল সরওয়ারের লেখায় দ্বিতীয়বার কাশ্মীর ভ্রমণ করছি, অনেক ইতিহাস জানলাম প্রথমবারের মতো। ভ্রমণ কাহিনীটা সমৃদ্ধ হয়েছে তার এই ইতিহাসের বিবরণী ও আশেপাশে লোকালদের সাথে আড্ডা গুলো নিয়ে। ইতিহাসের গল্পে বেশি উঠে এসেছে কাশ্মীরের প্রথম দিকের কবি লাল দেদ, হাব্বা খাতুন ও মুঘল সাম্রাজ্যের স্থাপনা। বাংলাদেশী ও বাঙালি মুসলিম হিসেবে ভারত ভ্রমণের নানা রকম অভিজ্ঞতাও শেয়ার করেছেন লেখক।
লেখার টানে বারবার মুজতবা আলীর একটা ফ্লেভার পাচ্ছিলাম। তবে পার্থক্য এখানেই যে—মুজতবা আলী তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন ম্যাচুউরড স্টাইলে। ধর্ম, কালচার এসব নিয়ে মানুষের দ্বিমত থাকতেই পারে। মুজতবা আলী একজন মাতালের সাথে আড্ডা দিলে, আড্ডাটাই গল্পের মুখ্য থাকে। মদ্যপান নিয়ে তার পার্সোনাল কি মতামত, সেটা লিখে তিনি গল্প জটিল করেন না। বা পাঠককে চিন্তায় ফেলে দেন না। এই কমফোর্টটা কিছুটা মিস করেছি বুলবুল সরওয়ারের লেখায়।
অফিসের প্রতিদিন কোনো না কোনো কলিগ জিজ্ঞেস করে, হোয়াটস ইয়োর প্ল্যান। আমি আমতা আমতা করে বলি, না কোন প্ল্যান নেই, এইতো চলতেছে। মুখ ফুটে বলতে পারিনা—প্ল্যান হলো, যে কাজটা করছি সেটা এনজয় করা, আর সময় পেলে ঘুরে বেড়ানো। উইকেন্ডে বই পড়ি আর ট্রাভেল ভিডিও দেখি। একদিন ইউটিউবে একটা গ্রামের ভিডিও দেখলাম—চারপাশে গাছ-গাছালি, পাহাড়, ফুল। ঠিক করলাম এখনই যেতে হবে ওই দেশে। সমুদ্র আর আমি রাত একটায় শেয়ারট্রিপে ফ্লাইট প্রাইস দেখলাম। এক মাস চলল সেই ক্রেইজ। আমরা বাকু যাচ্ছি। ট্রাভেলগ দেখা, ফ্লাইট প্রাইস দেখা। তারপর আরেক উইকেন্ডে আরেকটা জায়গা নিয়ে মাথা খারাপ করি। আমার এই উইকেন্ডে রোমান্টিক ফ্যান্টাসির সাথে ভালো একটা ভ্রমণের বই যোগ দিলে যা হয়—জম্পেশ!
আর হ্যাঁ, তৃতীয়বার কাশ্মীর যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু করছি।
How shall I write its praise? Kashmir is a garden of eternal spring. One might say that it was a page that the painter of destiny had drawn with the pencil of colours.
-Emperor Jehangir
রিডার'স টেবিল - Reader's Table. - এ আজকে বুলবুল সরোয়ারের ঝিলাম নদীর দেশ।কাশ্মীরকে বলা হয় ভূ-স্বর্গ। বরফের টুপি মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়, স্ফটিক স্বচ্ছ ডাল লেক,সাদা ফেনা তুলে বয়ে চলা লিডার নদী, দুরন্ত ঝর্ণার কল্লোল, চিনার বৃক্ষের শোভা এই সবই এতো সুনিপুণভাবে সাজিয়ে তুলেছে কাশ্মীরকে।সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদপুষ্ট প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কাশ্মীর যেনো কোনো শিল্পীর আঁকা ছবি। মোঘলদের তৈরি শালিমার বাগ, নিশাত বাগ, চেশমা শাহীর মতো দারুণ সব মনুষ্য সৃষ্টি বাগান একে করে তুলেছে আরো অনন্য।
বুলবুল সরোয়ারের বর্ণনায় আমার চোখেও যেন ভেসে ভেসে উঠছিলো কাশ্মীরের সৌন্দর্য।ঐ একটা কথা আছে না,শুধুমাত্র বই পড়ার মাধ্যমেই আপনি পায়ে না হেঁটে পুরো বিশ্ব ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।লেখক শুধু কাশ্মীরের অসাধারণ সৌন্দর্যের বর্ণনায় দেননি গিয়েছেন আরো গভীরে এইখানকার মানুষের পরাধীনতার কথা, কতটা কষ্ট বুকে চেপে এরা হাসতে শিখেছে তার কথা, এখানকার মানুষের দুঃখ বেদনার কথা সবকিছু তুলে ধরেছেন তিনি।সংক্ষিপ্তাকারে লিখেছেন এখানকার জায়গাগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস।
১৯৪৭ এ ব্রিটিশরা এই উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় তথা দেশ ভাগের সময় দেশীয় রাজ্যগুলোকে নিজস্ব সিদ্ধান্তে ভারত অথবা পাকিস্তানে যোগদান কিংবা স্বাধীন থাকার সুযোগ দিয়েছিল। ফলে বেশিরভাগ রাজ্য ভারতে এবং কিছু পাকিস্তানে যোগ দিলেও হায়দ্রাবাদ, জম্মু ও কাশ্মীর এবং সিকিম স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু হায়! কাশ্মীর তার স্বাধীনতা আর পেলো কই! রাজনীতির কুটিল চালে ক্ষত- বিক্ষত হয় এই অপার্থিব! সৌন্দর্যের কাশ্মীর।
লেখকের এই ভ্রমণে তিনি সেখানকার দারুণ সব মানুষের সঙ্গে মিশেছেন।নাজনীন, আবদুল আজীজ, নয়ীম গিলানী,আর্জুমান্দ,সাব্বির আহমদ,খুরশিদ আহমদ, গাইড আব্দুল্লাহ্। এছাড়াও মিসরকন্যা তাবাসসুম এবং বরুণ চক্রবর্তী।বুলবুল সরোয়ার সার্থক! তার বর্ণনার দরুন তার অনুভূতিকে তিনি পাঠকের মাঝে সঞ্চারিত করতে পেরেছেন।
বুলবুল সরওয়ারের লেখা ভ্রমণকাহিনী "ঝিলাম নদীর দেশ"। লেখক যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন, তখন তিনি কাশ্মীর ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁর কাশ্মীর ভ্রমণের স্মৃতিকে তিনি কাগজ-কলমে তুলে এনেছেন "ঝিলাম নদীর দেশ" বইটিতে।
ঝিলাম পাঞ্জাবের পাঁচটি বড় নদীগুলোর মধ্যে একটি। এটি ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এর উৎপত্তি ভারতের জম্বু ও কাশ্মীরে। "ঝিলাম নদীর দেশ" বলতে লেখক কাশ্মীরকে বুঝিয়েছেন। বইটিতে লেখক ভূস্বর্গ কাশ্মীরের নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও ইতিহাসের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।
লেখক প্রতিটি দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের শুরুতে বিভিন্ন লেখকের উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন যা বইটিকে আরো আকর্ষণীয় করেছে। প্রত্যেকটি স্থানে কোন না কোন ব্যক্তির সাথে লেখকের দেখা হয়েছে। তাদেরকে তিনি এত চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন যে মনে হবে তারা কোন গল্প বা উপন্যাসের চরিত্র। শুধু তাই নয়, কাশ্মীরের রাজনৈতিক অবস্থা ও এ নিয়ে স্থানীয় মানুষের মতামত জানাতেও ভুল করেননি লেখক বুলবুল সরওয়ার। এর বেশি কিছু বলছি না, তাহলে স্পয়লার হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে।
#ভালোলাগা_লাইনগুলোঃ ১. বিশ্বাসের আলাদা একটা ভূগোল আছে, যা রাজনৈতিক সীমানার চেয়েও বহু বিস্তৃত।
২. জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতের আসলে কোনো তাৎপর্য নেই, যদি না তার সঙ্গে যুক্ত হয় দেশপ্রেম ও মাতৃভূমির মর্যাদার অনুভূতি।
৩. পাহাড়ে ওঠার নিয়ম হচ্ছে ধীরে চলো- যে যত তাড়াহুড়া করবে সে তত আগে ক্লান্ত হবে। শক্তির চেয়ে হেকমতের মূল্য এখানে বেশী। জমিনের খুঁটি কিনা!
৪. চূড়ায় উঠতে চাওয়ার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা মানুষকে এতটা নির্বোধ তরে দেয় যে সে পায়ের নিচের মাটিশূন্যতাও আন্দাজ করতে পারেনা।
৫. ভক্তি ও শ্রদ্ধা যখনই যুক্তিকে অতিক্রম করে, বিচ্যুতির পথ তখনই সুগম হয়।
৬. দুঃখ, যন্ত্রণা, হতাশা- এসব তো জীবনেরই অংশ। তাকে বরণ করে নেয়ার মধ্যে কোনো পরাজয় নেই। পরাজয় হচ্ছে তা থেকে জেগে ওঠার বাসনা ও চেষ্টাকে পরিত্যাগ করা
#পাঠ_প্রতিক্রিয়া ভ্রমণকাহিনী পড়তে যে এতটা ভালো লাগবে এই বইটি না পড়লে বুঝতাম না। এটি শুধু ভ্রমণকাহিনী নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। নাজনীন, আর্জুমান্দ, আবদুল আজীজ, নয়ীম প্রতিটি মানুষের আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। কাশ্মীরের ইতিহাস ও সংস্কৃতি যেমন ভালো লেগেছ, আবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক ততটাই কষ্ট দিয়েছে।
বইটি পড়ে এত ভালো লেগেছিলো যে পরবর্তীতে এটি বইমেলায় কিনে লেখকের সিগনেচারসহ (সিগনেচার না বলে ক্যালিগ্রাফি বললেও ভুল হবে না) প্রিয় একজনকে উপহার দিয়েছি। যারা এখনো পড়েননি তাদেরকে বলবো, এটি এমন একটি বই যা পড়ে আমার মতো আপনারও একবার কাশ্মীর দেখে আসার সাধ জাগবেই :)
পাক্কা ভ্রমণ কাহিনীর স্বাদ পুরোটা কলেবর জুড়ে। সাথে লেখকের সাহিত্যিক ছোঁয়া, নজরুল-হাফিজ-ইকবাল প্রীতি নিঃসন্দেহে পাঠে ছড়িয়েছে নিগূঢ় রস আর আনন্দ। কাশ্মীরের উপর লেখকের জ্ঞান আর সম্যক দর্শনের অনুভূতি বর্ণনা পাঠককে একবার হলেও সেখানে যেতে প্রলুব্ধ করবে। নাটকীয়তা আনতে বহু কাহিনীর সমাবেশ যেমন করেছেন, তেমনি রেখেছেন কিছু চমক। লেখকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি বেশ কিছু স্থানে দৃশ্যমান হলেও ঔদার্যনীতির সুস্পষ্ট রেখা বিরাজমান অনেক খানে। লেখার ভঙ্গিমা যেকোন ভ্রমণপিপাসুর মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে শেষ পর্যন্ত। শর্ত একটাই, পাঠকের পাঠাভ্যাসের সাথে ভ্রমণ ও সাহিত্যপ্রীতি থাকতে হবে। জিহ্বায় মিষ্টি-মধুর স্বাদ নিয়ে আসা গল্পকার এই বুলবুল সারওয়ার।
ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু বৃষ্টি বাধা হয়ে এল । তাই সংগ্রহে থাকা একটা ভ্রমণ কাহিনী বের করলাম । পড়তেও বেশ লাগছিল । কিন্তু এখন পড়া শেষে মনে হচ্ছে রোমান্টিক ............
ঝিলাম নদীর দেশ বইটিতে ঝিলামের সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার বাসিন্দাদের সৌন্দর্যের চিত্রও অঙ্কিত হয়েছে। কোনো অচেনা জায়গায় ভ্রমণ তখনই পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয় যখন সেই স্থানের প্রতি ও তার মানুষের প্রতি মনে আবেগ ও ভালোবাসার সঞ্চার হয়।
লেখক এখানে তার ভ্রমণ বৃত্তান্তের মাঝে মাঝে সংযোগ করেছেন আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য, শৈলী, রীতি, স্থাপনা ও সংস্কৃতির গল্পের। কখনো লোকগীতি, ছড়া, কবিতা, কখনো বা লোককাহিনী। করেছেন কাশ্মীরের স্বনামধন্য কবিদের গল্প। বইটি পড়ে লেখকের ইসলাম ও মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি অনুরাগ স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। লেখক মাঝে মাঝেই হারিয়ে গেছেন সেইসব ইতিহাসে। বর্ণনা করেছেন নানা বিতর্কিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের। এর মাঝে বিতর্কিত বিষয়গুলোর বর্ণনার জন্য ইতিহাসবেত্তাদের রচনার আশ্রয় নেয়া শ্রেয় বলে আমি মনে করি। কারণ লেখক তার কথার প্রেক্ষিতে কোনো রেফারেন্স উল্লেখ করেননি। লেখকের লেখনী শুধু তার ব্যক্তিগত অভিমত ও দৃষ্টিকোণ হিসেবে দেখলে অনেকটা সহজভাবে নেয়া যায় বইটিকে।
বইটিতে যুক্ত হয়েছে ভ্রাতৃত্ববোধ ও বন্ধুত্বের গল্প। কাশ্মীরের মানুষ কতটুকু আন্তরিক ও আবেগী তা লেখকের বন্ধুদের বর্ণনা থেকেই বুঝা যায়। সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে যেই বিষয়টি তা হলো - কাশ্মীরের নারী পুরুষেরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবার পরেও নিজের শেকড় ভুলেনি। আমরা আধুনিকতার নামে যাকে আদিম ভেবে এড়িয়ে চলি তারা সেগুলোকে আকড়ে ধরে রেখেছে। উদাহরণ স্বরূপ - সেখানের নারীরা ঘোড়া চালনায় পারদর্শী। পুরুষেরা রান্না করতে অভ্যস্ত। এখানে ছেলেমেয়েরা ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়েও যুহরের নামায আদায় করে একসাথে।
এখানে তিনি স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতা নিয়েও কিছু প্রশ্ন রেখেছেন। লেখকের কিছু উক্তি তাই মনে বেশ দাগ কেটেছে। আমরা আসলেই কি প্রকৃত দেশপ্রেমিক হতে পেরেছি? - এই প্রশ্নই মাথায় ঘুরেছে বইটি পড়তে গিয়ে।
একজন পঞ্চম বর্ষের মেডিকেল শিক্ষার্থী যেখানে লেকচার, ওয়ার্ড, আইটেম, টার্ম, প্রফের চিন্তায় পাগলপ্রায় থাকে সেই হিসেবে লেখক যে সাহস দেখিয়েছেন তা আমার পক্ষে অচিন্তনীয়। উনি এতো দুশ্চিন্তা আর যান্ত্রিকতা ফেলে যে ভারত ভ্রমনের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন শুধু তাই নয়, কাজটি করেছেন সম্পূর্ন একাকী। কোনো সঙ্গী সাথী ছাড়া। তবে একজন প্রকৃত মুসাফিরের সঙ্গী জোটাতে সময় লাগেনা সেইটাই লেখক বারবার প্রমাণ করেছেন তার গল্পে। একই সাথে তিনি ওই বয়সেই যে পরিমাণ বই পড়েছেন ও জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন সেইটাও রীতিমত অবাক করার বিষয়। প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে লেখক কিছু গদ্য বা পদ্যের অংশ জুড়ে দিয়েছেন। তন্মধ্যে সবচেয়ে পছন্দেরটি দিয়ে শেষ করছি -
প্রত্যেক মানুষের দুঃখই তার স্বভাবের অনুগামী; কেউ একাকীত্বকে ঘৃণা করে, কার কেউ তাকে আমৃত্যু খুঁজে বেড়ায়। -মির্জা গালীব
বুলবুল সরওয়ারের 'ঝিলাম নদীর দেশে' বইটি পৃথিবী-গোলকের ওপর স্থাপিত উঁচু বাটি কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে লেখা। নিজ প্রয়োজনে এক বসন্তে লেখক ভারতে এসে হুট করে সিদ্ধান্ত নেন তিনি কাশ্মীর ভ্রমণ করবেন৷ এক সপ্তাহের জন্য ঘুরবেন ঠিক করলেও অবশেষে যা কয়েক সপ্তাহে গিয়ে ঠেকে৷ ভূ-স্বর্গখ্যাত কাশ্মীর যাওয়ার পথে পেহেলগাঁওয়ের নাজনীনের সাথে পরিচয় হয় লেখকের। কাশ্মীরের প্রতি ভালোবাসা বোধহয় সেখান থেকেই শুরু। বইটি কাশ্মীরের নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন মানসপটে সাজাতে সাহায্য করে, ঠিক তেমনি ইতিহাসের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি সামনে আনে। টিপু সুলতানের পতনের পর পাক-ভারত-বাংলাদেশের আযাদীর পতাকা দেড়শ বছরের জন্য বিক্রি থেকে শুরু করে মুসলমানদের দূরদর্শিতার অভাব, বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনি পরতে পরতে ডাল-নাগিন, তখ্ৎ-ই-সুলায়মান, চেশমা শাহী, শালিমার বাগ, নিশাতবাগসহ আরও ইতিহাসসমৃদ্ধ বিভিন্ন জায়গার চমৎকার বর্ণনার সাথে উঠে এসেছে, যা মুহুর্মুহু আমাকে সেই যায়গাগুলোতে নিয়ে যাচ্ছিলো। প্রসঙ্গ কাঠামোর বাইরে থেকে আমি যেন ইতিহাসের পাতায় পাতায় 'টাইম ট্রাভেল' করছিলাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে ইতিহাসের ঘটনাবলি... পিজ্জায় 'এক্সট্রা চিজ'-এর মতন লেয়ার যোগ করছিল, তথা পুরো আবহকে যেন আরও সৌন্দর্যমন্ডিত করছিল! এতদসত্ত্বেও একথা বলা অনস্বীকার্য বলে মনে করি... বন্ধুর পরিবেশে লড়াই করে আজও কাশ্মীরের জনতা পরাধীনতার যে গ্লানি বয়ে বেড়াচ্ছে, তা আমাকে সত্যিই কষ্ট দেয়, মনকে কাঁদায়, বিশ্ব রাজনীতির প্রতি থুথু নিক্ষেপ করতে ইচ্ছা পোষণ করায়৷
তবে লেখক পার্টিকুলারলি একটা জায়গায় লেখার ফ্লো হারিয়ে ফেলেছেন বলে আমার ধারণা। আসলে ইতিহাস নিয়ে এতো ছোটো পরিসরে খেলা করা চাট্টিখানি কথা না। তাই একটা ছোট্টো অংশ বাদে লেখক প্রায় পরিপূর্ণ 'টাচ'-টা করতে সক্ষম হয়েছেন। বইটি ভ্রমণ-পিপাসুদেরকে এক ধরনের মোহগ্রস্ততায় আচ্ছন্ন করার মাধ্যমে কাশ্মীরের প্রতি ভালোবাসা জাগানিয়া হতে সাহায্য করবে।
প্রিয় লাইন:
ইংরেজরা বাইবেল হাতে প্রবেশ করে, আর তরবারি হাতে বিদায় নেয়। আর এমন কিছু জারজ সন্তান রেখে যায়, যারা মানসিক গোলামীতে জাতিকে অনন্তকাল আটকে রাখতে চায়।
কাশ্মীরের শান্ত রূপালী নদী ঝিলাম। চওড়ায় আমাদের বুড়িগঙ্গার চেয়ে সমান্য বড়। দু'পাশে খেজুর ও বাবলার সারি। তারই তীর ঘেঁষা পীচ ঢালা পথ চলে গেছে।
ভূস্বর্গ নামে পরিচিত কাশ্মীর ভূখন্ডটি এখন ভারতের অংশ। বাকি অংশ যার নাম আযাদ কাশ্মীর। এটা পাকিস্তানের দখলে। তবে পুরো কাশ্মীর এখনও পরাধীন।
এই বইয়ের কাহিনীটা পরাধীন কাশ্মীরের ভারত অংশের ভ্রমণ কাহিনি।
লেখক বুলবুল সরোয়ার ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবস্থায় লেখা এই হৃদয়নিংড়ান ভ্রমণকাহিনী।
ভ্রমণ শুরু থেকে লেখক দেখেছেন কাশ্মীরের মানুষ, প্রকৃতি, স্থাপত্য, শিল্প, লোকগাথা। মানুষের সাথে মিশে জেনেছেন তাদের হৃদয়ের বেদনা, পরাধীনতার যন্ত্রণা।
তারপরও পরাধীন দেশের মানুষ হয়েও বিদেশীদের সমাদরের কোন ঘাটতি দেখেননি কোথাও।
সবকিছু মিলেমিশে লেখক সৃষ্টি করতে চেয়েছেন একটি পথভ্রমণ কাহিনি। কিন্তু লেখকের সকল সৃষ্টি কর্ম ছাড়িয়ে "ঝিলাম নদীর দেশ " হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের এক রোমান্টিক ক্ল্যাসিক। ঝিলাম এখানে শুধু একটা নদী নয় প্রেম আর ইতিহাসের এক মিলবন্ধন।
ভ্রমণ সাহিত্য খুব পছন্দ হলেও পড়েছি অল্প তবে এটা না পড়ে এতোদিন ভুল করেছি। লেখক বুলবুল সরোয়ার এর চোখদিয়ে দেখে নিলাম কাশ্মীর। কাশ্মীরের দর্শনীয় স্থান ও প্রাচীন স্থাপত্য।
"কাশ্মীরের অনির্বচনীয় সৌন্দর্য্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য আর কাশ্মীরি মানুষ" - সবকিছু নিয়ে এই বই পরিপূর্ণ! তার উপরে লেখকের কবিতা আর কলম কাশ্মীর তথা ঝিলাম নদীর দেশের সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে দিয়েছে আরও অনেকখানি।
ভ্রমণকাহিনীর সাথে ইতিহাস আর ধর্ম-রাজনীতি বিষয়ক কড়চা আবার রোমান্টিকতার হালকা পরশ-এমন কিছু আগে কখনো পড়িনি।কাশ্মীরের অপরূপ সৌন্দর্য যেন দেখতে পাচ্ছিলাম চোখের সামনে।