বইয়ের নাম আর প্রচ্ছদ দেখেই অনুমান করা যায় বইয়ের বিষয়বস্তু কি হতে পারে। ঠিক তাই, মন্দ মেয়ে বা বারবনিতাদের জীবন নিয়েই রচিত হয়েছে বইটা। লেখকের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বারবনিতাদের নিয়ে লেখা বারোটি গল্প এবং একটা নভেলা সংকলিত হয়েছে বইটাতে। ভূমিকাতে যেমনটা বলেছেন লেখক, সামাজিক ব্যবস্থার কারনে গৃহস্থ ঘরের মেয়েরা ‘মন্দ মেয়ে' হতে বাধ্য হলেও তারাও মানুষ, তাদের মনেও প্রেম আছে, মায়া আছে, স্বপ্ন আছে, নীতিবোধ আছে। আর এই বিষযগুলোই ফুটে উঠেছে প্রতিটা গল্পে।
‘রাজপুত’ গল্পটা এক বারবনিতা ও রাজপুত যুবকের ভালোবাসার গল্প বা রাজপুত যুবকটার নিজ দ্বায়িত্ব পালন করে ‘রাজপুত’ হয়ে ওঠার গল্প। ‘ জুহু বিচের সেই মেয়েটা' গল্পটা দেখিয়েছে কিভাবে দারিদ্র্য এক মাকে বাধ্য করে শরীরকে বাজারে তুলতে। ‘নরক’ গল্পটা একটু ভিন্ন; নীতিবোধ, দ্বায়িত্বশীলতা আর ভালোবাসার দ্বারা যে ওদের পাড়াও এক স্বর্গ হয়ে উঠতে সেটা বলেছেন লেখক। এভাবে পরের গল্পগুলোতে উঠে এসেছে এক পূর্ব প্রণয়ীর রূপান্তর, এক প্রতারিত মেয়ের আখ্যান, প্রেমিকার জন্য এক প্রেমিকের অর্ঘ্যদান, ‘মন্দ মেয়ে'র কর্তব্যবোধ, এক দালাল যুবকের আত্ম-উপলব্ধি বা ভালোবাসা, এক ভীরু যুবকের ভীরুতার পরিণাম, সমাজের বারবনিতা উৎপাদনের সাধারণ সূত্র, এক স্বাপ্নিক মেয়ের আকাশ ছোঁয়ার বাসনা, ‘মন্দ মেয়ে'দের কৃতজ্ঞতা এবং নভেলাতে উঠে এসেছে দুই আগাছার থিতু হওয়ার ইচ্ছার কথা।
যদি বইটার ভালো দিকটা বলি তাহলে বলব বইটা বারবনিতা সমাজের একটা মোটামুটি চিত্র যেন চোখের সামনে তুলে ধরেছে। কিভাবে সেই নরকে তাদের স্থান হয়, কিভাবে তাদের দিন কাটে, কিভাবে বেশিরভাগের পৃথিবী এক কামরায় সংকুচিত হয়ে পড়ে, কিভাবে কিছু কিছু মেয়ে শিকল ছেড়ে বেড়িয়ে আসার স্বপ্ন দেখে সেসব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। মোটকথা বইটার মাধ্যমে বারবনিতা সমাজের একটা অংশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব বলে মনে হয়েছে।
আর যদি বইটার সীমাবদ্ধতার কথা বলি তাহলে প্রথমেই আসবে একই প্লটে বারবার গল্প লেখা। দারিদ্র কিভাবে এই পথে ঠেলে দেয় সেই প্লটেই দুইযের বেশি গল্প আছে। আর প্রতিটা গল্পে লেখক যেন তাঁর গল্পের উপাদান মেয়েটাকে একইভাবে গড়ে তুলেছেন; পাঁকের মধ্যে থাকলেও সে পরিস্কার, পাড়ায় সেই সবচেয়ে কাম্য, পড়ালেখা জানে, সকল গুণের আধার ইত্যাদি। অর্থাৎ বইটা পুরো উপাখ্যান হয়ে ওঠে নি, সমাজটার বিশেষ একাংশই যেন এতে প্রতিফলিত। আরও বেশকিছু দিক যেন বাদ পড়ে গিয়েছে বইটাতে।
মোটের উপর, সুন্দর একটা বই। বইটা সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে, বারবনিতাদের মানুষ হিসেবে দেখতে, তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করতে বলে, তাদের প্রতি সহমর্মী করে তোলে।