মোহাম্মদ নজিবর রহমান (১৮৬০-১৯২৩) বাংলা ভাষার একজন ঔপন্যাসিক যিনি ঊনবিংশ শতাব্দীতে সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে একজন ঔপন্যাসিক হিসাবে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তাঁকে ঊনবিংশ মতাব্দীর বিকাশোন্মুখ মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান সমাজের প্রতিনিধি গণ্য করা হয়। তাঁর আনোয়ারা উপন্যাসটি বিষাদসিন্ধুর পর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জগতে ব্যাপক জনপ্রিয় একটি উপন্যাস।
জন্ম, শিক্ষা, জীবিকা তাঁর জন্ম আনুমানিক ১৮৬০ খ্রীস্টাব্দে অবিভক্ত ভারতের বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার চরবেলতৈল গ্রামে। পরিবারের আর্থিক অবস্খা তেমন স্বচ্ছল ছিল না। শাহজাদপুর ছাত্র বৃত্তি বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে ঢাকা নর্মাল স্কুলে ভর্তি হন। এ সময় তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়। তবে ছাত্র পড়িয়ে নিজ লেখাপড়ার খরচ যোগাতে থাকেন। এভাবে তিনি নর্মাল (বর্তমান এসএসসি) পাস করেন। এরপর তার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তবে স্বঅধ্যয়নের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। কর্মজীবন শুরু হয় জলপাইগুড়ির একটি নীলকুঠিতে চাকৃরি গ্রহণের মাধ্যমে। কিছু দিন পর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রথমে সিরাজগঞ্জের ভাঙ্গাবাড়ি মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি স্খানীয় ডাকঘরের পোস্টমাস্টার পদেও কিছু দিন দায়িত্ব পালন করেন। অকঃপর একই জেলার রায়গঞ্জের সলঙ্গা মাইনর স্কুলের হেড পণ্ডিত হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯১০ খ্রীস্টাব্দে বদলি হয়ে রাজশাহী জুনিয়র মাদ্রাসার বাংলার শিক্ষক পদে যোগ দেন। আমৃত্যু তিনি শিক্ষকতা পেশায়ই ছিলেন।
সমাজ সচেতনতা সে কালের মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের অহৈতুক বৈরী মনোভাব তিনি তীক্ষ্ণভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। অন্য দিকে ১৯০৫ খ্রীস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাও তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা আন্দোলনের ঢেউ তাঁর মনে আলোড়ন তোলে। এ রকম একটি জাতীয় প্রেক্ষাপটে তিনি বিলাতী বর্জন রহস্য নামক একটি পুস্তিকা রচনা করেন। এটি তৎকালীন বিদ্বান মহলে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিল। ১৯০৬ খ্রীস্টাব্দে নওয়াব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে ঢাকায় মুসলিম লীগের যে অধিবেশন বসে, তিনি তাতে অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। অপর দিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধেও ছিলেন অকুতোভয়। সলঙ্গায় শিক্ষকতা করা কালে স্খানীয় হিন্দু জমিদার গরু জবাই ও গো-মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে এমত ধর্মীয় অথধকারহরণের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জনাতে থাকেন। তাঁর সংগ্রামের ফলে সলঙ্গায় মুসলমানদের গরু জবাইয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তদুপরি শিক্ষা বিস্তারের মহতী কাজে তিনি আজীবন সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৮৯২ খ্রীস্টাব্দে তিনি চরবেলতৈল গ্রামে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন; যা পরবর্ততে পূর্ণাঙ্গ বালিকা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
সাহিত্যকর্ম তাঁর রচিত উপন্যাসসমূহ তীক্ষ্ণ সমাজ সচেতনতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে। মোহাম্মদ নজিবর রহমান শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি ২০টির মতো উপন্যাস রচনা করেছেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : আনোয়ারা; চাঁদতারা বা হাসান গঙ্গা বাহমনি; পরিণাম; গরীবের মেয়ে, দুনিয়া আর চাই না; মেহেরউন্নিসা, প্রেমের সমাধি ইত্যাদি। এ ছাড়া বিলাতী বর্জন রহস্য ও সাহিত্য প্রসঙ্গ’ নামে তাঁর দু’টি গদ্য পুস্তিকাও রয়েছে। তাঁর প্রথম রচিত উপন্যাস আনোয়ারা উপন্যাসটি একশত বৎসর পরও জনপ্রিয় ও আলোচিত। গ্রামীণ জীবনের পটভূমিকায় রচিত এ উপন্যাসে সমসাময়িক বাঙালি মুসলমান সমাজের পারিবারিক ও সামাজিক চিত্র উজ্জ্বলভাবে পরিস্ফুটিত হয়েছে। ধর্ম ও সত্যের জয়, অধর্মের পরাজয় এ উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য। এটি আদর্শভিত্তিক একটি অসাধারণ গ্রন্থ হিসাবে পরিগণিত। তাঁর রচনাবলী বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম একটি ভিত্তিপ্রস্তর।