১৯৭২ সালের ১৩ই অক্টোবর। চিলির আমন্ত্রনে রাগবী খেলায় যোগ দিতে চলেছে উরুগুয়ের একদল তরুণ খেলোয়াড় ও তাদের সমর্থকবৃন্দ। আন্দেজ পর্বতমালার এক দুর্গম অঞ্চলে বিধ্বস্ত হল প্লেন - ফেয়ারচাইল্ড। এক সপ্তাহ ধরে খোঁজাখুঁজির পর উদ্ধারের সব প্রচেষ্টা যখন বাতিল করা হলো, তখনও প্লেনের ফিউজলাজ অংশে বেঁচে আছে ২৬ জন যাত্রী। খাবার নেই, আগুন নেই, পানি নেই। তুষার ডিঙিয়ে বেরোবার কোন পথ নেই। সমুদ্র সমতল থেকে এক মাইল উঁচুতে হিম শীতল তুষারের রাজ্যে আটকে আছে ওরা। শেষে নিহত বন্ধু ও সহযাত্রীদের মাংস খাওয়া ছাড়া উপায় রইল না ওদের। বৈরী প্রকৃতির বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্য এমন আদর্শ সংগ্রামের ঘটনা ইতিহাসে বিরল। শেষ পর্যন্ত টিকল ১৬ জন। প্রায় সোয়া দুই মাস পর বহু কষ্টে দুটি ছেলে বেরিয়ে এসে খবর দিলঃ না, সবাই মরেনি ওরা। চমকে উঠল গোটা বিশ্ব, আঁতকে উঠল ওদের নরমাংস ভক্ষণের বর্ণনা শুনে। গল্পের চেয়েও বিস্ময়কর সত্য ঘটনা।
১৯৭২ সালে আন্দেজে ঘটে যাওয়া বিমান দুর্ঘটনার ঘটনাটা মানুষের মুখে মুখে, বিভিন্ন ডকুমেন্টারি, টিভি শোতে অনেকবার শোনা আর দেখা। বইটা এই প্রথম পড়লাম।
হাসিখুশি, উত্তেজনাকর একটা সময় সমস্ত যাত্রীদের জন্য। কেউ খেলার আমন্ত্রণে যাচ্ছে, কেউ সমর্থক, কেউ নিজের বিয়ের আয়জন করছে, কেউ মেয়ের বিয়েতে যাচ্ছে। আধা ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে কীভাবে সব বদলে যায় মানুষের জীবনে!
বইটা পড়ে কতক্ষণ ভাবলাম গত কয়েক বছরে অনেক কিছু ঘটেছে জীবনে যেখানে বারবার মনে হয়েছে এত প্ল্যান করলাম, আল্লাহর প্ল্যান অন্যরকম ছিল। এখন সব মনে হচ্ছে কত তুচ্ছ বিষয় সেগুলা। নিজেদের জীবনে যাই হোক কারো না কারো আচরণে দোষ খুঁজে পাই বা খুঁজতে চাই। হঠাৎ বুঝলাম এখানে কারো কোন দোষ নাই, কেউ ই অমানবিক না। যারা মারা গেল, যারা সহযাত্রীর মাংস খেয়ে বেঁচে থাকলো, যারা উদ্ধারে গেল, যারা সিদ্ধান্ত নিল মৃতদেহ নামানো হবে না, যেই বাবা ছেলের সমাধি লুট করতে চাইলো, সেসব অভিভাবক যারা জীবিতদের ক্ষমা করতে পারলো না তাদের সন্তানের মাংস খাওয়ার জন্য- তাদের একজনও অপরাধী না। কারো আচরণে দোষ নেই
থ্রিল পাওয়ার আশায় কত বই পড়ি, আর এদিকে জলজ্যান্ত মানুষ বাস্তব জীবন কী ভয়ংকর থ্রিলারে পরিণত হয়।
আমার পড়া অন্যতম সেরা বইগুলোর লিস্টে থাকবে বইটা। বাস্তবতা কখনো এত ভয়ানক হয় এবং বেঁচে থাকার তাগিদে এমন সব কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিতে হয় যা কখনো সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় মেনে নেয়া যায়না। ১৯৭২ সালে বিমান দুর্ঘটনায় সার্ভাইভাল কাহিনী নিয়ে বইটি, এবং ঘটনাটি সত্যিকারের। বীভৎস বাস্তবতায় লেখা বইটি মন কেড়ে নিয়েছে। প্রায় দেড় মাস কয়েকজন মানুষের বরফের মাঝে বেঁচে থাকার কাহিনী, খাবার থেকে শুরু করে যেখানে কিছুই ছিলনা, কোথাও যাওয়ার সুযোগও ছিলনা। শুধু ছিল বিমানের ধ্বংসাবশেষ যা বরফের মাঝে এতগুলো মানুষের থাকার জন্য অপ্রতুল, এবং ছিল বিমান দুর্ঘটনায় সহযাত্রীদের মৃতদেহ। খাবার ছাড়া দুর্গম একটা জায়গায় এতগুলো মানুষ আটকা পড়ে থেকেও বিশ্বাস করেছেন যে কখনো হাল ছাড়তে হয়না অল্পতেই৷ বেঁচে থাকার তাগিদে যেকোন সুযোগ গ্রহণ করতে হয় এবং চেষ্টা চালাতে হয়। কোন অবস্থাতেই হাল ছেড়ে দেয়া উচিৎ না।
এই বছর পড়া সেরা বইয়ের একটা এবং সবসময়ের প্রিয় থ্রিলারের একটা হয়ে থাকবে..... সেরা একটা adventure-thriller ❤️
তবে এটা বলতে চাই, এমন কিছু মাস্টারপিস হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়। সেবার এই বই তো এখন পাওয়া ই যাবে না বলতে গেলে। আমি কেমনে এক দোকানে পেয়ে গেলাম!! বলি কি, পারেন তো pdf থেকে হলেও বইটি পড়ে ফেলুন
সামনে আরো কিছু লিখব দেখি... আপাতত "sudden feelings after finishing the book" হিসেবে নিতে পারেন রিভিউটা
কদিন আগে ব্রাজিলীয় ফুটবল দলবাহী প্লেন বিধ্বস্ত হওয়ার সময় ঝপ করে এই বইটার কথা মনে পড়ে গেলো। মনে দাগ কাটার মত ছিল বইটা। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং যা লেগেছিল, আন্দেজের হিম কারাগারে বন্দী তরুণেরা ক্ষুধার জ্বালায় পাগল হয়ে বন্য ভাবে নরমাংস খেতে ঝাঁপিয়ে পড়েনি, বরং ঠাণ্ডা মাথায় বৈঠক করে আলোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল, যেভাবেই হোক তাদের বাঁচতে হবে।
বাস্তবতা যে গল্পের চেয়ে কোন অংশে কম অদ্ভূত, রোমাঞ্চকর নয় তা আরেকবার প্রমাণ করলো 'আন্দেজের বন্দী'। লেখক সুধাময় কর বাবু অত্যন্ত সাবলীল সহজ ভাষায় বর্ণনা করছেন, আন্দেজের বুকে ৭২ দিন আটকে থাকা একদল হতভাগ্য মানুষের কথা। প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরপুর ৪৫ জন মানুষ থেকে শেষমেষ লোকালয়ের দেখা পেয়েছিলো মাত্র ১৬ জন। আর তারা এসেই যে জিনিস শোনালো তাতে আপনার গায়ের রোমও দাঁড়িয়ে যেতে পারে।
এই বই নিয়ে আরেকদিন গুছিয়ে লিখবোনে। তবে এটুকু বলতে পারি, বইটা পড়তে পারেন নিঃসন্দেহে। কিছু কিছু বই আছে, যা শুধুমাত্র আপনাকে কাহিনী বা সাহিত্যের স্বাদ দেবে না, ভাববার মতো অনেক বিষয়, মানুষের অনেক লুকিয়ে থাকা বৈশিষ্ট্যের সন্ধান দিয়ে যাবে।
অ্যাডভেঞ্চার ঘরানার বই বেশ কম পড়া হয়েছে, তবে এই বই গুলো কখনোই হতাশ করে নি এখনো। মোটামুটি ভাবে বলা যায় , প্লেনের কোপাইলট লাগুরারার কিছু ভুলের জন্য আড়াই মাস আন্দেজের দুর্গম বরফাচ্ছন্নপর্বত এরআড়ালে আটকে থাকা ৪৫ টি তাজা জীবন থেকে বেঁচে ছিলো মাত্র ১৬ জন। লেখক তার বর্ণনায় প্রায় নিরাভরণ ভাবে প্রতিটি মুহূর্ত ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। শুধু আন্দেজের বন্দি দের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, মুহূর্ত গুলো গড়িয়েছে উদ্ধারকারীদের নিষ্ফল তৎপরতা, বার বার আশা জাগিয়ে নিরাশায় ডোবা আন্দেজের জীবিতদের হতাশা, আর তাদের পিতা মাতার প্রচেষ্টার গল্প গুলোকে উপজীব্য করে।
সুপাঠ্য বই! ১৯৭২ সালে উরুগুয়ের রাগবি ইউনিয়নের একটি টিম আর্জেন্টিনায় খেলতে যাবার আমন্ত্রণ পেয়ে পথিমধ্যে আন্দেজ পর্বতমালায় বিমান বিদ্ধস্তের ঘটনা, টিকে থাকার প্রবল সংগ্রাম, কিছু সঙ্গীর মৃত্যু,.... শেষে উদ্ধার টিম দ্বারা বাকিদের উদ্ধারকার্য সম্পাদন....এসবই বইটির উপজীব্য বিষয়।
লেখক সুধাময় কর অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাবে ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। বইটি পড়ে তৎকালীন উরুগুয়ের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা সম্পর্কেও অবগত হওয়া যায়।
১৯৭২ সালের ১৩ ই অক্টোবর। চিলির আমন্ত্রণে রাগবি খেলায় যোগ দিতে চলেছে উরুগুয়ের ওল্ড ক্রিশ্চিয়ান রাগবি দলের একদল তরুণ খেলোয়াড়। এক��ন সমর্থক হিসেবে আমিও তাদের সাথে যাচ্ছি। আন্দিজ পর্বতমালার এক দুর্গম অঞ্চলে ক্রাশ করে আমাদের প্লেন ফেয়ারচাইল্ড। দু টুকরো হয়ে যায় প্লেনটি। সাথে সাথে মারা যায় আমাদের অ নেক বন্ধু ও সহযাত্রী। তাদেরকে বরফচাপা দিয়ে আহতদের সাথে আমরা আশ্রয় নেই প্লেনের ফিউজিলাজ অংশে। অল্প একটু জায়গায় আমরা ছাব্বিশজন মানুষ কোন রকমে গাদাগাদি করে বেচে থাকার চেস্টা করি। আমাদের উদ্ধার করার জন্য মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় উদ্ধারকারী প্লেন কিন্তু আমাদের দেখতে পায়না। হতাশায় ভেঙে পড়ে সবাই। এক সপ্তাহ ধরে ব্যাপক খোজাখুজির পর উদ্ধার অভিজান বন্ধ করে দেয় সরকার। তারা আমাদের ব্যাপারে হাল ছেড়ে দিলেও প্রকৃতি আমাদের ব্যাপারে একদমই হাল ছাড়েনি। ধরনীমাতা তার সমস্ত নির্মমতা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে আমাদের উপর। চারিদিকে উচু উচু বরফ ঢাকা পর্বতশৃঙ্গ সাথে আছে হিম ঠান্ডা তুষারপাত। মাঝে মাঝে কুয়াশায় ঢেকে যায় চারিদিক। ঠান্ডা আর অক্সিজেনের সল্পতা খুব দ্রুতই আমাদের দূর্বল করে ফেলে। এই ভয়ানক হিম শীতল বরফ রাজ্যে বেচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরা। সাথে আছে সামান্য কিছু খাবার। কিছুদিনের মধ্যেই সেই খাবার শেষ হয়ে যায়। ক্ষুদায় পাগল আমরা সবাই। এই যখন অবস্থা তখন সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেই হাতের কাছে থাকা একমাত্র খাবার হচ্ছে বরফে পুতে রাখা বন্ধুদের লাশগুলো। যে কথা সেই কাজ। বরফ খুড়ে লাশগুলো বের করে কুড়াল দিয়ে খাবার উপযোগী অংশ গুলো টুকরো টুকরো করে কাটি। এরপর সেগুলো রোদে শুকিয়ে নেই। অনেকটা ওয়েস্টার্ন কাউবয়দের বিলটং এর মতো। সেগুলো খেয়েই বেচে থাকার চেষ্টা করি। কেউ কেউ স্বজাতির মাংস ভক্ষনে অনিহা প্রকাশ করে। কিন্তু আমরা যারা প্রথম থেকেই মাংস খাওয়া শুরু করি তাদের শরীর সাস্থ্য ফিরতে শুরু করে। কিন্তু এই কয়েকটা লাশে আর কতদিন চলে। তখন প্রকৃতি মাতা আবার আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকান। একদিন বরফধসে চাপা পড়ে আমাদের কিছু বন্ধু মারা যায়। এরফলে আমাদের খাদ্য সংকট কিছুটা লাগব হয়। আমরা তাদের লাশগুলোর সদব্যাবহার করি। অবাক হবার কিছু নেই। এর পূর্বেও আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলে " ডোনার পাস " নামে এক যায়গায় আমাদের মত একদল অভিযাত্রী বরফরাজ্যে আটকে পড়ে নরমাংস ভোজন করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এই খাবারে বেশিদিন যাবেনা। তাই আমাদের মধ্য থেকে দুজন বন্ধু রওনা হয়ে গেল সভ্য পৃথিবীর খোজে। সত্য ঘটনা নিয়ে লেখা একটা চমৎকার বই।