বেশ একটা বই। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, ভারতীয় সাংবাদিক। তৎকালীন পূর্ববাংলায় আয়ূুবখানের সঙ্গে ঢাকা-কুমিল্লা-ফেনি-চট্টগ্রাম-রাঙামাটি-ফরিদপুর-কুষ্টিয়া সফরে আরো অনেক দেশ বিদেশের সাংবাদিকদের সাথে আয়ুবের সফর সঙ্গী হিসেবে সফর করেন। তার ভিত্তিতেই লেখা "আয়ুবের সঙ্গে"। বইটা শুরু হয় পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্র প্রধান ইস্কান্দর মির্জা এবং আয়ুব খানের কথোপকথন দিয়ে। যেখানে এক বাটপার আরেক বাটপারকে ওস্তাদী বয়ান দিচ্ছে। সাংবাদিকদের(পড়ুন বিদেশি) ক্যামেরার তীব্র আলোতে স্বাভাবিক থাকাটাও যে এক ধরনের অভিনয় সে বিষয়ে জ্ঞান বর্ষণের ফরজ আদায় করে ইস্কান্দর মির্জা। সেরের উপর সোয়া সের আয়ুব খান ইস্কান্দর মির্জাকে জানিয়ে দিতে বেশি সময় নেয়না যে সে অভিনয়ে কতটা পারদর্শী।
সেসময়ের ঢাকার বদলে যাওয়া নিয়ে বলছেন নীরেন্দ্র..." আগে যেখানে কলেজ ছিল এখন সেখানে সরকারী দফতর বসেছে..... আগে যেখানে বাড়ি ছিল সেখানে রাস্তা বেড়িয়েছে...বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য আগেও ছিল। কিন্তু হাইকোর্ট ছিল না। ঢাকায় এখন হাইকোর্ট হয়েছে। স্টেডিয়াম ছিল না। স্টেডিয়াম হয়েছে। নিউমার্কেট ছিল না। নিউমার্কেট হয়েছে।..... আর হয়েছে খবরের কাগজ। ঢাকা থেকে এখন একটি- দুটি নয় , সাত-আটটি কাগজ ছেপে বেরুচ্ছে। ছ পাতার কাগজ দশ পয়সা দাম।" কাগজের দাম চড়া হবার কারণ হিসেবে পাকিস্তানী সাংবাদিকের বরাত দিয়ে জানাচ্ছেন , শুধুমাত্র সিনেমা, নিলাম অথবা খুচরো কারবারের বিজ্ঞাপনে কাগজ চালানো কঠিন। যে কারণে মূল্য বেশি না করে উপায় কী? কারণ ঢাকায় তখন বড় কোন শিল্প প্রতিষ্ঠানই ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বারো বছরেও ঢাকায় বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান স্হাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করলেও তাকে শিল্প নগরীর রূপ দিয়ে বাইরের পৃথিবীকে দেখানো আর কী। শ্রেফ ভাওতাবাজি। যে কাজে এরা একজনের চেয়ে আরেকজন সেয়ানা ছিল সন্দেহ নাই। যদিও পুরোনো ঢাকার অন্যান্য এলাকাগুলো ঠিকই আগের অবস্হাতে ছিল। অবশ্য পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে ক্রশমঃ স্পষ্ট হতে শুরু করে যে আদতেই পাকিস্তানের পলটিবাজ শাসকেরা/ ফিল্ড মার্শালেরা পূর্ব বাংলাকে থোরাই কেয়ার করে। মুখেই কেবল বানানো বুলি আওড়ানো... কার্যত পূর্ব বাংলার প্রতি তাদের আচরণ ছিল চরম বিমাতা সুলভ। বাঙালিকে হাইকোর্ট দেখিয়ে বোকা বানানো যে সহজ না, এবং বাঙালি ধড়িবাজ ইস্কান্দর মির্জাদের মত অভিনয় ফর্মুলায় মাতে না তার হিসাব সময় মত পশ্চিম পাকিস্তান ঠিকই পেয়ে গিয়েছিল। সে ভিন্ন ইতিহাস।
লেখকের মতে আয়ূবের পূর্ব বাংলা সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটি। এক. পূর্ববাংলার মানুষকে তার 'বেসিক ডেমোক্রেসি' কাকে বলে সেটা বুঝিয়ে দেয়া। এবং দুই. প্রেসিডেন্ট হিসেবে পূর্ব বাংলার মানুষ তাকে চায় কিনা সেটা জেনে নেওয়া। হাস্যকর বিষয় বটে! যে লোক ক্যু'র মাধ্যমে আরেকজন উর্দিওয়ালার কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনতাই করে সে শেখাতে আসে ডেমোক্রেসির পাঠ! তাও আবার বেসিক!! এবং উল্লেখ করা প্রয়োজন সাধারণ মানুষ সম্পর্কে এইসব উর্দি পরা মানুষের উক্তি ছিল " লটস অব পীপল আর ব্লাডি ফুলস।" এমন কথা যে বলতে পারে সে আর যাইহোক কখনোই গণতন্ত্রের উপাসক না এবং সেটার প্রতি তার বিন্দুমাত্রও শ্রদ্ধা যে নাই এটা বুঝতে রকেট সায়েন্স পড়া লাগে না। ডিক্টেটরশীপ আর ডেমোক্রেসি যে এক বস্তু না এ কথা যে কেউ মানলেও আয়ুব খানের তাতে প্রবল আপত্তি ছিল। যে কারণে সামরিক একনায়কতন্ত্র আর গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার মধ্যে কোনো পার্থক্যই আয়ুবের চোখে পড়েনি। অথবা ঠিকই চোখে পড়েছে স্বীকার করেনি। বরং অন্যদেরও সে বোঝাতে চেয়েছিল ধরনটা একটু ভিন্ন বটে তবে এও এক ধরনের গণতন্ত্রই। সেলুকাস! ব্লাডি ফুলটা কে র্যা???
আসলে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটার রন্ধ্রে রন্ধ্রে তখন দুর্নীতি। উর্দিপরা থেকে শুরু করে উর্দিহীন কেউ বাদ ছিল না তাতে। যে কারণে উর্দির হুংকারে উর্দিহীন ফিরোজ খাঁ নুন(সে সময়ের প্রাক্তন পাকিস্তানী প্রধানমন্ত্রী) জানান দেন ঠাকুর ঘরের কলা তিনিও খেয়েছেন। যার পরিমাণ অতি সামান্য। মাত্র দু' হাজার টন গম তার গুদামে মজুদ করা আছে! শুধু ফিরোজ খাঁই না আরো অনেককের ঠাকুর ঘর থেকে কলা বেড়িয়ে এলো। এহেন ঈমানদার শাসকদের কাছে গণতন্ত্র যে নিরাপদ না সেটা বাঙালিকে চড়া মূল্যে বোঝাতে হয়েছিল তাদের। তবে পরিতাপের বিষয়, আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেইসব ঈমানদার বান্দাদের বৈঈমান আত্মা অনেকের উপরই ভর করে দিব্বি কলাটা মুলোটা সাবাড় করেই চলেছে। যাইহোক, গণতন্ত্রের পুটু মারা নয়া বেসিক ডেমোক্রেসির নন্দন পুত্র আয়ুব খান দুর্নীতি মোকাবেলায় সুপারম্যান তখন। লাল আন্ডু ব্যতিরেকেই ইস্কাপন আর হরতনের টেক্কাপোডো(PODO)এবং এবেডো (EBDO) ছুড়ে দিয়ে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ অফিসার/ব্যবসায়ীদের 'ঠেলা সামলা' রণ হুংকার ছাড়ছে। ঝাটকাটা কাজ দেয় বটে। পোডো, এবেডো ঠিক কী জিনিস খায় না মাথায় দেয় সেটা জানতে হলে পাঠককে পুস্তকটি পাঠ করিতে হবে। সবটা তো আমি কমু না বাপু!
জাতীয় সংসদে কাউমাউয়ের ঘটনা আজের কালে বেশ মামুলি বাত। পিথিমি জুড়েই যে যেমন পারেন সংসদের চেয়ার ভাঙা, এ ওর কলার টানাটানি থেকে চুলাচুলির বিস্তর ভিডিও ক্লিপ দেখি বা ছাপা অক্ষরে পড়ি। সঠিক জানা নাই যদিও এর জন্মস্হান পাকিস্তান কিনা। তবে হইলেও অবাক হবো না। তবে সংসদের মধ্যেই স্পীকারকে হত্যার ব্যাপারে পাকিস্তান এবং তার সংসদীয় ইতিহাস যে বেশ গৌরবময় অর্জনের অধিকারী তাতে সন্দেহ নাই। সেসময়ের বিরোধী দলের আক্রমণে (পেপারওয়েট, ডেস্কের কাঠ, মাইক্রোফোনের ডাণ্ডা ইত্যাদি ছুঁড়ে তাকে মেরে ফেলা হয়) পাকিস্তান সংসদের স্পীকার শহিদ আলি মৃত্যু বরণ করেন। জাতটার জন্মই খুনোখুনির জন্য আসলে!
যদিও আয়ুব বলেছিল গণতন্ত্রের 'রেস্টোরেশন'ই তার লক্ষ্য। আসলে তার মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র নিয়ে ছিনিমিনি করা লোকসকল এবং পার্টিগুলোকে 'রেস্টোর্ড' হতে না দেয়া।
সাচ্চা মুসলমানের মত কথারে কাজে দেখানোর জন্য পার্টিগুলোর সানডে মানডে ক্লোজ করা সহ রাজনীতিবিদদের পুতুলে পরিণত করে। ইহা ছিল আইয়ুবের 'বেসিক ডেমোক্রেসির' নমুনার প্রাথমিক স্তর। আয়ুবীয় পুরো 'বেসিক ডেমোক্রেসি' সম্পর্কে জানতে হলে পড়তে হবে(বইটি)।
হয়ত লেখকের জন্ম পূর্ব বাংলায় বলেই স্পেশাল ট্রেনের কামরায় বসে বসে শান্ত সবুজ গ্রামগুলোর মনকাড়া বর্ণনা দিয়েছেন অকৃপণ ভাবে। সেসব গ্রামগুলোর শান্তভাব, সবুজ অহংকারকে শ্মশানে পরিণত করা হয় বছর দশেক পরেই। আর সেটা সগৌরবে করে সাচ্চা মুসলমান পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামী ব্রাদারহুডের ব্রাদারেরা। গ্রামীণ সৌন্দর্যের বর্ণনা পড়ে '৭১ এ ধ্বংস হওয়া সবুজের জন্য মনটা কেমন হু হু করে যেন....
"আয়ুবের সঙ্গে" বইতে ফিল্ড মার্শালের সাথে ভ্রমণ এবং তদ্বসংশ্লিষ্ট প্রশ্নাত্তোর পর্ব বয়ানের সাথে সাথে আছে লেখকের জন্মভূমি পূর্ব বাংলা ছেড়ে যাবার নিরন্তর হাহাকার। কিছু বিখ্যাত কবির আসর মাতানো গল্প এবং সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাইয়ের ছেলে আলীর সাথে সাক্ষাৎপর্ব বইটিতে ভিন্ন একটা মাত্রা দেয় যেন।
ঢাকা সহ যেসব অঞ্চলে লেখকেরা গিয়েছেন তার প্রত্যকটার বর্ণনা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। আয়ুব সাজানো কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পূর্ব বাংলার মানুষদের নিজেকে চেনানোর এবং চেনার পাট মাত্র দশ দিনে সমাপ্ত করে তার নিজ গন্তব্যে ফিরে যান। লেখকও এক সময় ফিরে যান তাঁর ঠিকানায়। মাঝে কিছু প্রশ্ন রেখে যান সময়ে যার কিছু আশঙ্কা সঠিক প্রমাণিত হয়। কিছু তাঁর প্রত্যাশায় পানি ঢেলে দেয়। তবে একজন পাকিস্তান বিদ্বেষী পাঠক হিসেবে আয়ুব খানের কোনো রকম প্রশংসায় বিরক্তই লেগেছে। নিরপেক্ষতা পালনের এই ব্যর্থতা মেনে নিচ্ছি হাসিমুখেই। পশ্চিম পাকিস্তানের ইংরেজি বিভাগের নিউজ এডিটর আনোয়ার আমেদ যিনি তার জন্মভূমি গয়া থেকে পাকিস্তানে চলে এসেছিলেন। তাঁর নামটি আহমেদ হবার সম্ভাবনাই অধিক। তাকে আমেদ লিখেছেন লেখক, আজো ভারতীয় কিছু পত্র পত্রিকায় বাংলাদেশিদের নামের এই অপভ্রংশটি মুখ তেতো করে দেয়। সব মিলিয়ে ছোট্ট কিন্তু উইটি সমৃদ্ধ বইটি পড়তে বেশ। মাত্র ৯২ পাতার এই বইয়ের প্রকাশক বেঙ্গল পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। প্রচ্ছেদ শিল্পী: সুধির মৈত্র, মূল্য: দুই টাকা।