পুরোনো বাড়িটাকে অদ্ভুত মনে হলো রেজা ও সুজার। নতুন যে শহরটায় এসেছে ওরা, সেটাও কেমন ভুতুড়ে। তবে ওদের বাবা-মা সে কথা বিশ্বাস করলেন না। বরং বোঝাতে চাইলেন, নতুন এসেছ তো, থাকতে থাকতে সব ঠিক হয়ে যাবে। যাও, নতুন জায়গায় নতুন বন্ধু জোগাড় করে নাওগে।
রকিব হাসান বাংলাদেশের একজন গোয়েন্দা কাহিনী লেখক। তিনি সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তিন গোয়েন্দা নামক গোয়েন্দা কাহিনীর স্রষ্টা। তিনি মূলত মূল নামে লেখালেখি করলেও জাফর চৌধুরী ছদ্মনামেও সেবা প্রকাশনীর রোমহর্ষক সিরিজ লিখে থাকেন। থ্রিলার এবং গোয়েন্দা গল্প লেখার পূর্বে তিনি অন্যান্য কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি রহস্যপত্রিকার একজন সহকারী সম্পাদক ছিলেন।রকিব হাসান শুধুমাত্র তিন গোয়েন্দারই ১৬০টি বই লিখেছেন। এছাড়া কমপক্ষে ৩০টি বই অনুবাদ করেছেন। তিনি টারজান সিরিজ এবং পুরো আরব্য রজনী অনুবাদ করেছেন। তাঁর প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ ড্রাকুলা। রকিব হাসান লিখেছেন নাটকও। তিনি "হিমঘরে হানিমুন" নামে একটি নাটক রচনা করেন, যা টিভিতে সম্প্রচারিত হয়।
ছায়াশহর তেমন একটি বড় গল্প নয়।একটি বইপ্রেমিকের কাছে কয়েক ঘণ্টা লাগতে পারে বইটি পড়ে শেষ করতে।কিন্তু, এই ছোটগল্পটি আপনার মনে এক অন্যরকম ভূতুরে অনুভূতি জাগাবে এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। পরিবারের সাথে নতুন শহরে পাড়ি দেওয়া,সেখানে ঘটতে থাকা অদ্ভুত ঘটনা আপনাকে একপ্রকার ভাবিয়ে তুলবে।
'আত্মা' বলতে কি আদেও কিছু আছে? উঁহু আত্মা বললে ভুল হবে তারা তো 'জীবন্মৃত'। বেঁচে থেকেও মানুষ কিভাবে মৃ/ত হতে পারে? ছায়াশহরকে ঘিরে রয়েছে অন্ধকার কিছু রহস্য। এ রহস্য নিয়েই গড়ে উঠেছে 'ছায়াশহর' বইটি।
⬛ প্রচ্ছদ এবং নামকরণ -
কোনো বই পড়া শুরু করার আগে সবার প্রথমে চোখ যায় তার প্রচ্ছদে। সেই সাথে বইয়ের ঘটনার সাথে প্রচ্ছদ এবং নামকরণে সামঞ্জস্য থাকাও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 'ছায়াশহর' বইটি তার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নামকরণ এবং প্রচ্ছদ একদম যথার্থ মনে হয়েছে আমার কাছে।
⬛ কাহিনী সংক্ষেপ -
পুরনো বাড়িটাকে অদ্ভুত মনে হলো রেজা ও সুজার কাছে। শহরটিও কেমন যেনো অদ্ভুত। শহরে মানুষ দেখা যায় না বললেই চলে, একেবারে শুনশান। সেই সাথে রেজা স্বীকার হয় কিছু অদ্ভুত ঘটনার। কখনো দেখে তার ঘরের জানালায় একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, আবার কখনো দেখে দরজার আড়ালে কোনো মেয়ে দাঁড়িয়ে, আবার ফিসফিসিয়ে কারো কন্ঠস্বরও শুনতে পাওয়া যায়। ধরতে গেলেই চোখের পলকে উধাও। তবে ওদের বাবা-মা এসব কথা বিশ্বাস করলেন না। বোঝাতে চাইলেন নতুন জায়গায় এসেছে তাই এমন মনে হচ্ছে, থাকতে থাকতে সব ঠিক হয়ে যাবে। যাও, নতুন জায়গায় বন্ধু জোগাড় করো সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু নতুন বন্ধুরাও আজব। কেউ স্বাভাবিক ব্যবহার করে না ওদের সাথে। তারপর ঘটতে থাকে সব ভয়ংকর ঘটনা। প্রথমে ওদের কুকুরটা উধাও হয়ে গেলো। ফিরে আসার পর আর আগের মতো রইল না। ওরা বুঝতে পারলো দুজনে, ওদেরকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে যারা বেঁচে থেকেও মৃ/ত।
⬛ পাঠ প্রতিক্রিয়া এবং পর্যালোচনা -
মধ্যবিত্ত জীবনের প্রত্যেকটা মানুষের জীবনেই আশা থাকে একটা সময় পর একটু আরাম আয়েশে জীবন কাটাবে। খোলামেলা নিরিবিলি পরিবেশে একটু স্বাচ্ছন্দ্য জীবন যাপন। গ্রিন ভ্যালিতে হুট করেই উত্তরাধিকার সূত্রে এক বিশাল বাড়ি পেয়ে সেখানে উঠলো রেজা সুজার পরিবার। একটা বিষয় খেয়াল করলাম, জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যের এতোই তাড়া যে রেজার বাবা ঠিকমতো খোঁজও নেননি বাড়িটার সম্পর্কে।
কুকুর, বিড়াল এই ধরনের প্রাণীদের এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। তারা অস্বাভাবিক জিনিস অনুভব করতে পারে। শুরু থেকেই গ্রিন ভ্যালিতে আসার পর কিটুর অদ্ভুত আচরণে আমার সন্দেহ হয়েছিল এখানেই অস্বাভাবিক কিছু আছে। কিন্তু কি? সেটাই বড় প্রশ্ন। রেজা সুজা চরিত্রটা ভালো লেগেছে তাদের দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটির কারণে। ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের কি প্রগাঢ় যত্ন ভালোবাসা। সেই সাথে খারাপ লেগেছে কিটুর পরিণতিতে। 'রকিব হাসানের' হরর বইগুলোতে ভূতুড়ে কাহিনীগুলো ইউনিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। বাচ্চারা অবশ্যই এই বইগুলো উপভোগ করবে। তবে এই বইয়ের মূল টুইস্টটা ভালো লেগেছে। 'জীবন্মৃত'- কীভাবে তাদের এই অবস্থা? আর তাদের মূল উদ্দেশ্যই বা কি? সমাধান আছে 'ছায়াশহর' বইয়ে।
⬛ চরিত্রায়ন -
বেশ কিছু চরিত্র নিয়ে গল্পটা এগিয়ে গিয়েছে। একটি চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে অন্য চরিত্রের বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মূল চরিত্রের মধ্যে ছিল - রেজা, সুজা, তাদের বাবা-মা, কিটু,গ্র্যাম্পারসন জোনস,টমাস হার্ডি, হ্যারি ব্যানার,এরিকা গারনার সহ আরো বিভিন্ন চরিত্র।
⬛ কিছু অসংগতি -
এক জায়গায় বলা হয়েছে- 'কিটুকে গাড়ির মধ্যে রেখে সবাই বাইরে চলে গেলেও সে চুপচাপ থাকে'। আরেক জায়গায় আবার বলা হয়েছে- 'কিটু গাড়ি থামার সাথে সাথে বাইরে বের হওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে। দুটো কথা মিলছে না।
'জীবন্মৃত' অর্থাৎ গ্র্যাম্পারসন জোনস,টমাস হার্ডি, হ্যারি ব্যানার,এরিকা গারনার এরা আলো সহ্য করতে পারে না। আলো তাদের ধ্বং/স করে দেয়। তাহলে গ্র্যাম্পারসন জোনস কীভাবে দিনের বেলা রেজা, সুজা ও তাদের বাবা-মা কে গ্রিন ভ্যালির বাড়ি ঘুরিয়ে দেখায়? সেই সাথে রেজা ও সুজা যখন টমাস হার্ডি, হ্যারি ব্যানার,এরিকা গারনার এদের সাথে গ্রাউন্ডে খেলতে যায় তখন সময় সকাল ১১টা। দিনের আলো যাদের বিনাশের কারণ তারাই বা কীভাবে দিনের বেলা খেলতে পারে? মূল প্লটটা যেখানে জোয়ালো হওয়া দরকার ছিল সেখানেই দুর্বল হয়ে পড়েছে ।
⬛ প্রডাকশন -
বইটার প্রডাকশনে আমার চোখে কোনো খুঁত ধরা পড়েনি। বাঁধাই থেকে শুরু করে সবদিকই যথেষ্ট ভালো লেগেছে।