Muhammad Habibur Rahman (Bengali: মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান) was a former chief justice of Bangladesh Supreme Court in 1995. He was the chief adviser of the 1996 caretaker government which oversaw the Seventh parliamentary elections in Bangladesh.
He is an author of seventy books in Bengali on law, language, literature, poetry and religion and five books in English, including two books of verse.
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বহুমাত্রিক পরিচয়ের অধিকারী। বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং ইতিহাসবিদ হিসেবে জনসমাজ তাকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথ এবং বাংলা ভাষায় অভিধান নিয়ে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান অসাধারণ কিছু কাজ করেছেন। কুরানের বঙ্গানুবাদ ভদ্রলোকের একটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি। অর্থাৎ মনযোগকে বিকেন্দ্রীকরণ করেছিলেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। প্রথম আলো'তে বিভিন্ন সময়ে তিনি স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনি, গল্প,কবিতা লিখেছিলেন। ড. আনিসুজ্জামানকে দিয়েছিলেন একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। এসবের অনেকগুলো লেখকের জীবদ্দশায় ছাপা হয়নি। হাবিবুর রহমানের প্রয়াণের পর প্রথমা প্রকাশন তাঁর কিছু প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখা নিয়ে বের করেছে 'হরেক রঙের মানুষ' বইটি।
'১৪৪ ধারা ভঙ্গ' নামে একুশে ফেব্রুয়ারির একটি স্মৃতিকথা লিখেছেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ ক্লাসের ছাত্র। ২০শে ফেব্রুয়ারিতে রাতে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানসহ আরও আট-দশজন মিলে সিদ্ধান্ত নেন ১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে। এই আট-দশজনের মধ্যেই পুলিশের গুপ্তচর ছিল। যে পরিকল্পনা ফাঁস করে দেয়। তখনও কেন্দ্রীয়ভাবে কারফিউ অমান্য করাকে সমর্থন করা হয়নি। হাবিবুর রহমান স্মরণ করেছেন, এত দ্বিধার কারণ মুসলমান সমাজে আইন ভাঙার চল বড় বেশি ছিল না। তবু, তারা ২১ তারিখ কারফিউ ভাঙবেন এমনটাই ঠিক করলেন। পরিস্থিতি বুঝতে তিনি আওয়ামী লীগের অফিসে গেলেন। দেখলেন সেখানে তুমুল আলোচনা চলছে। দলটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক আইন ভাঙার পক্ষে ছিলেন না। মোটকথা, দলীয়ভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে কারফিউ ভাঙতে দলটি একমত হতে পারেনি। এমনকি দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভাঙতে ছাত্রদের নিরুৎসাহিত করেন বলেও ইঙ্গিত করেছেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।
যেহেতু আইন ভাঙার প্রস্তাব তিনি করেছিলেন, সেহেতু ২১ তারিখ দশজনকে নিয়ে পহেলা মিছিলটি তাকেই শুরু করতে হয়েছিল। ভয় পাচ্ছিলেন পুলিশ হয়তো মারবে। কিন্তু, মারেনি। থানায় নিয়ে পরে কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছিল। মাস খানেকের কম কারাবন্দি ছিলেন। এই কারাগারে থাকার কারণে পরবর্তীতে তাকে বিপদে পড়তে হয়। ঢাবির লেকচারের চাকরি পেলেও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকে মহিমান্বিত করেননি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। এমনকি নিজেকে বিরাট ভাষা সৈনিক দাবি করার মতো মানসিকতা এই লেখায় পাইনি। পড়ে মনে হয়েছে বিবেকের তাড়নায় তিনি ভাষা আন্দোলনের একজন অগ্রসেনানি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। কোনো স্বীকৃতি লাভ কিংবা লোকের বাহবা কুড়ানোর আশায় ভাষা আন্দোলনে যাননি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।
কানাডা ও সাজেক ভ্রমণে গিয়েছিলেন লেখক। সাজেক নিয়ে লিখতে গিয়ে সেখানকার নৃগোষ্ঠীদের কথা লিখেছেন। পাংখো ও চাকমাদের রীতিনীতির কথা পড়তে আনন্দ পেয়েছি। কানাডার কথা ভালো লাগেনি। ভ্রমণকথা লেখার উপযুক্ত মানুষ মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান নন।
জীবনানন্দ লিখেছিলেন, সবাই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। আর, দুর্বিনীত কবি রফিক আজাদ বলতেন, সব শালা কবি হতে চায়। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মেধাবী মানুষ। তাকে কেন কবি হতে হবে বুঝিনি। এই বইতে হাবিবুর রহমানের রচিত বেশকিছু 'কাব্য' পড়ার দুর্ভাগ্য আমার হয়েছে।
লোরকা, নেরুদা, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, ট্রান্সটোমারসহ বেশ কিছু নামজাদা পদ্যকারের পদ্য হাবিবুর রহমান অনুবাদ করেছেন। শখের কবিদের মতো শখের অনুবাদকদের নিয়ে বড়ো মুসকিল। এরা যেখানেই হাত দেবে, সেখানেই অপরিপক্বর নিশান রেখে যাবে। রচিত ও 'হনূদিত' কোনো কবিতাই আমার পছন্দ হয়নি।
কবিতার পর মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান আবির্ভূত হয়েছেন গল্পকার হিসেবে। এখানে তিনি কিছুটা স্বস্তি পাঠককে দিয়েছেন। সমারসেট মমের বিখ্যাত গল্প 'সামারায় দেখা'র সুন্দর অনুবাদ তিনি করেছেন। লাটিন আমেরিকার কয়েকজন লেখকের গল্পের বঙ্গানুবাদ আমরা বইতে পাব। পড়ার মতো বলা যায়। নিজের লেখা দুটো গল্পের কোনোটিকেই আমার গল্প মনে হয়নি। কেন ওনার গল্প রচনার ভূত চেপেছিল তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে!
এই বইয়ের একমাত্র আকর্ষণ একটি সাক্ষাৎকার। বিশ বছর আগে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি নিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে খোলামেলা অনেক কথা বলেছেন।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের চরিত্রের বড়ো গুণ নিঃসন্দেহে তার নির্মোহ মানসিকতা ও সততা। রাষ্ট্রের একাধিক উচ্চতম পদে তিনি কাজ করেছেন। স্বভাবতই খ্যাতির প্রতি মোহ থাকবে এবং সেই প্রত্যাশায় গড়পড়তা বাঙালির মতো সাক্ষাৎকারে নিজেকে বিরাট কিছু হিসেবে উপস্থাপন তিনি করেননি। যা এই ভূখণ্ডে বিরল।
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের সন্তান হাবিবুর রহমান। স্কুল-কলেজ দুটোই ওদেশে। আমরা তাকে ভীষণ মেধাবী মানুষ হিসেবে জানি। কিন্তু, স্কুল-কলেজে মোটেও 'মেধাবী' তিনি ছিলেন না। পড়াশোনায় তত মনোযোগ স্কুল-কলেজে দেননি। এই কথা খুব সুন্দরভাবে বলেছেন তিনি। চাননি নিজেকে অসাধারণ মেধাবী ছাত্র হিসেবে প্রমাণ করতে। দেশভাগের কারনে রাজশাহীতে এসে রাজশাহী কলেজে ইতিহাসে অর্নাসে ভর্তি হন। ঢাবির সিলেবাসের অধীনে পরীক্ষা দেওয়ার কারণে অসাধারণ ফলাফল হয়েছিল। তিনি এই নিয়ে বললেন,
' প্রেসিডেন্সি কলেজের বন্ধুরা সবাই অবাক হয়ে গেল। বলল, তুই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হলি কী করে? '
দেশভাগ তাহলে অনেকের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতে ভূমিকা রেখেছে। তাদের তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে উঠে আসতে হয়নি।
দাঙা ও দেশভাগ হাবিবুর রহমানের স্মৃতিতে জাগরূক। তিনি মনে করেন, ব্রিটিশরা তাড়াহুড়ো করে ভারতবর্ষ ত্যাগ করেছে। কারণ এখানকার শাসনব্যবস্থায় ব্রিটিশ প্রবর্তিত নীতি ভেঙে পড়েছিল। লেখকের পিতা মুর্শিদাবাদ জেলা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মুর্শিদাবাদ প্রথমে পাকিস্তানের অংশ পড়েছিল। পরে তা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং খুলনা হয় পাকিস্তানের। মুর্শিদাবাদকে পাকিস্তানে রাখতে লেখকের পিতা চেষ্টা করেছিলেন। তাই তাকে কারারুদ্ধ হতে হয়। পরবর্তীতে লেখকের পরিবার পূর্ববঙ্গে চলে আসেন।
বামপন্থিদের প্যানেল থেকে সলিমুল্লা হলের ভিপি হলেও সরাসরি বামপন্থি রাজনীতি কখনো করেননি। আওয়ামূ লীগের সাথে ঘনিষ্ঠতা তার ছিল না। তবে, দলটিকে তিনি অপছন্দ করতেন এ-ও মনে হয় না। ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে বলেছেন,
' ৭ মার্চ শেখ মুজিব ভাষণ দিয়েছেন। আমি সেদিন রেসকোর্সে ছিলাম। তার শেষ কথাটি আমি শুনেছি। যা পরে বাদ দেওয়া হয়। '
ইয়ে মানে... বুঝতেই পারছেন কোন দুটো শব্দের দিকে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ইঙ্গিত করছেন।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নিয়ে আওয়ামী লীগের সাথে একটি সংযোগ তার ঘটে। কিন্তু, এটা ভাবাদর্শকে প্রভাবিত করেনি। '৭৫ সালের একটি ঘটনা তিনি উল্লেখ করেছেন,
' ১৯৭৫ সালের জুন-জুলাই মাসে আওয়ামী লীগের পাটমন্ত্রী আসাদুজ্জামান আমাকে বললেন, ' আপনি তো আওয়ামী লীগ করেন না। আপনাকে বিচারপতি করা হলে আপনি কী গ্রহণ করবেন। বঙ্গবন্ধু আপনাকে জিজ্ঞেস করতে বলেছেন।' আমি বললাম এ ব্যাপারে পরে কথা বলব। '
অর্থাৎ, তখনও উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে 'মাই ম্যান' হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়কার কিছু কথা তিনি বলেছেন। পড়তে ভালোই লেগেছে।
সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিকথা বাদ দিলে বইটিতে পড়ার মতো কিচ্ছু নেই।