জন্ম ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৫০। প্রথম জীবনে কবিতা লিখতেন। উভয় বাংলার শ্রেষ্ঠ পত্রপত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তারপর সিনেমার বিষয়ে উৎসাহী হয়ে উঠলেন এবং এপর্যন্ত বেশ কিছু তথ্যচিত্রসহ ‘তথাগত’ নামে গৌতম বুদ্ধের জীবনের উপর ভিত্তি করে একটি হিন্দি কাহিনিচিত্র তৈরি করেছেন। তাঁর রচনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষকরা তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং করছেন। ‘ব্যাস’ উপন্যাসের মাধ্যমে নতুন করে সাহিত্যযাত্রা শুরু হয়। তাঁর উপন্যাস নিয়ে প্রখ্যাত সমালোচক পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় ‘শাহ্যাদ ফিরদাউসঃ উপন্যাসের সন্দর্ভ’ নামে একটি গ্রন্থ লিখেছেন। স্বপ্না পালিত ও স্বপন ভট্টাচার্য ‘মুখোমুখি শাহ্যাদ ফিরদাউস’ নামে একটি সাক্ষাৎকার ভিত্তিক গ্রন্থ তৈরি করেছেন। ‘অ-য়ে অজগর’ পত্রিকা তাঁর প্রথম নয়টি উপন্যাস নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। সাহিত্য এবং চলচ্চিত্র ছাড়াও তিনি সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। কলকাতার রুশ দূতাবাসের সংস্কৃতি দপ্তরের সহযোগিতায় পরিচালিত সাহিত্য সংস্থা ‘প্রগতি সাহিত্য সংবাস’-এর সম্পাদক। শান্তি সংগঠন ‘কলকাতা পিস মুভমেন্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের শিক্ষা দেওয়া ও নেওয়ার প্রতিষ্ঠান ‘পিস স্কুল’-এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক।
'দুনিয়ার একটা লোকও যদি খিদেয় কাতরায় আর কেউ যদি তা জেনেও ভাতের দলা মুখে পোরে তো সে হলো খুনি!'
এই লোকের ব্যাপারটাই এরকম - উপন্যাসের দুই-তৃতীয়াংশ প্রায় ৪-৫ তারা লেভেলের। এরপর পরে একদম যাচ্ছেতাই৷ তবে খুব অল্প যে লেখকের ব্যাপারে উচ্চাশা রাখতে পারি, শাহযাদ ফিরদাউস এখনও সেই শর্ট লিস্টে থাকবেন।
মানুষের আদিচাহিদা হলো খাদ্য— ক্ষুধা নিবারণ৷ সেই চাহিদা মেটাতেই মানুষ পা পিছলে পড়ে যায় আদিপাপ লোভের নেশায়৷ লোভের নেই শ্রেণিবিভাগ, নেই সীমা৷ অন্যায় কাজে হাত নোংরা করে লোভের চরম চাহিদা মেটাতে অন্ধকারে শরীর ডোবাতে প্রশান্তি মেলে৷ লোভকে তখন আর প্রবাদের নিয়মে বন্দী কোনো পাপ মনে হয় না৷
ভুনোর বয়সের তুলনায় শরীর বড় হওয়ায় তার খাদ্যর চাহিদাও বেশি৷ গামলাভর্তি মউ মউ ভাতের লোভে ভুনো মহানন্দে দিশেহারা হয়ে পড়ে৷ সেজন্যেই বেশি ভাত গিলার সময় দূর সম্পর্কের চাচা নিতাই কুণ্ডুর প্রচন্ড লাথিটা উড়ে আসা টের না পেয়ে বারান্দায় ছিটকে পড়ে৷ রাগে অভিমানে ভুনো বাড়ি ছেড়ে চলে যায় এবং নানা জায়গা থেকে অপমানে সমাজ থেকে আলাদা হয়ে আদিমপুরুষের রূপে ঘাস মূল খেয়ে বেঁচে থাকে৷
মফিজকে গ্রামের সবাই 'কুণ্ডু-বলদ' বলে চেনে৷ কারণ সে নিতাই কুণ্ডুর জন্য সারাদিন বলদের মত খাটে৷ কিন্তু একদিন কুণ্ডুর পুকুরে মাছ ধরার সময় মফিজ একটি অমূল্য হাতিমার্কা প্রাচীন মুদ্রা খুঁজে পায় এবং কল্পনায় নিজের আসন্ন দিনের প্রভাবশালী ক্ষমতার কথা ভাবতে থাকে৷ মানিক দালালের সাথে মুদ্রার দর কষাকষিতে মফিজের লোভের জিহবা আধ হাত বের হয়ে আসে৷ ফলে লোভের জিহ্বার পরিণতি কয়েকদিন পর ইছামতীর ঘোলাজলে ভেসে উঠে৷
এইদিকে পুরো বিষ্ণপুর গ্রামে নিতাই কুণ্ডুর পুকুরে স্বর্ণমুদ্রা প্রাপ্তির খবর চাউর হয়ে যাওয়ায় আরো মুদ্রা আদায়ের আশা নামক লোভে বিষ্ণুপুরবাসীরা কঠিন শীতের রাতেও বুড়ো মেয়ে নির্বিশেষে বস্ত্রহীন হয়ে কুণ্ডুর পুকুরে নেমে পড়ে৷ কিন্তু সবাইকে ফিরে আসতে হয় নিতাই কুণ্ডুর হাতে নিজেদের নগ্ন শরীরের ও গোপনাঙ্গের সম্ভ্রম আত্নসমর্পণ করে৷ এই সমস্ত ঘটনা কিংবা লোভের ফলে নিতাই কুণ্ডুর বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণির সংঘাতের সূচনা হয়৷ ভুনো পরাণ মকবুল হয়ে উঠে নিম্নশ্রেণীদের প্রতিবাদী কন্ঠ৷ এইভাবে ঘটনার ধারা এগিয়ে যায় সমাপ্তির দিকে৷
গল্পটি হয়ত লোভ, ক্ষুধা অথবা স্বার্থপরতা নিয়ে সেই চিরচেনা গ্রামীণ সমাজের একাংশ৷ তবুও শাহযাদ ফিরদাউসের ভিন্নরকমের লেখার কৌশলের দরুন অন্যরকম লেগেছে৷ কথোপকথন কম, বর্ণনামূলক লেখা৷ সেই বর্ণনা মানুষের কলুষিত ভাবের, জাগরণের অথবা সুযোগ-সন্ধানী মনের।
বিবর্তনবাদ বলে মানুষের পূর্বপুরুষ ছিল বানর গোত্রীয় প্রাণী। এই তত্ত্ব কম বেশি সবাই জানি। এই নিয়ে আছে বিতর্ক। বিতর্কের কারণ, বিষয়টা আদতে বোঝা অনেকের জন্য কষ্টকর। সোজা করে বললে বলতে হয় মানুষ আদিম অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে উন্নত হয়ে এই পর্যায়ে এসেছে। প্রযুক্তির উন্নতির দিকে তাকালে কিন্তু সেটাই দেখা যায়। অর্থাৎ, উন্নতি হয়েছে সেটা স্বীকার করতে হবে, মানদণ্ড সেখানে যা-ই হোক। কিন্তু কথা হলো উন্নতি যেমন হয়েছে, অবনতি কি হতে পারে না? সমগ্র মানব জাতির না হোক, একটা অংশের তো হতে পারে।
শাহযাদ ফিরদাউসের 'পালট মুদ্রা' উপন্যাসের ভুনো হয়ত সেই অংশের প্রতিনিধি। ভুনো হচ্ছে সেই ছেলে যে কিনা নয় বছর বয়সে অতিরিক্ত খাওয়ার দায়ে চাচার লাথি খেয়ে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে একা একা বাস করতে শুরু করে। বয়সের তুলনায় শরীরে বড় ভুনোর কাজের অভাব হয় না কিন্তু ঠকায় তাঁকে সবাই। একটা সময়ে ভুনো আলাদা হয়ে যায় সমাজ থেকে। ভাতের আর তার প্রয়োজন থাকে না, তার খাদ্য হয়ে ওঠে দোআঁশ মাটি আর ঘাসের মূল।
ভুনোর চাচা নিতাই কুণ্ডু গ্রাম্য মহাজন। তার চাকর মফিজকে সে এক শীতের রাতে মাছ ধরতে পাঠায় পুকুরে। এই মফিজ ছিল ভুনোর বন্ধু। গায়ে গতরে অনেকটা ভুনোর মতোই শক্তিশালী। কিন্তু শক্তি থাকলেও সাহস নেই। কেননা গরীব মানুষের সাহস থাকতে নেই। তাকে কেবল খেটে খেতে হয়। মালিকের কথা মতো কাজ করতে হয়। মফিজও তা-ই করে, আর লোকে তাঁকে বলে 'কুণ্ডু বলদ'।
এই কুণ্ডু বলদ, নিতাইয়ের পুকুরে খুঁজে পায় 'হাতী মার্কা' একটা মুদ্রা। প্রাচীন মুদ্রা। এই মুদ্রার নাকি অনেক দাম, শুনেছে গ্রামের সবাই, মফিজও। বড়লোক হওয়ার বাসনায় সে ছুটে যায় মানিক দালালের কাছে। পাঁচ, দশ হাজার থেকে দর বাড়ে লাখ পর্যন্ত। লোক জানাজানি হলে এলাকায় মফিজের কদর বাড়ে। কিন্তু কথায় বলে, 'লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু'।
মুদ্রার প্রাপ্তি স্থান নিতাই কুণ্ডুর পুকুর। তাই সে রাতে বিষ্ণুপুর গ্রামের অনেক মানুষ গিয়ে নামে সেই পুকুরে। সবার উদ্দেশ্য, সেই হাতী মার্কা আরেকটা টাকা পাওয়া। কিন্তু পায়নি কেউ। শীতের অন্ধকার রাতে নগ্ন নারী পুরুষ একই পুকুর হাতিয়ে বেড়ায়। সমুদ্র-মন্থন শেষে দেবতারা অমৃত পেয়েছিলেন কিন্তু এই মানুষদের কপালে কেবলই লাঞ্ছনা। এক এক করে নারী পুরুষ সকলের শরীরের গোপন অংশে তল্লাস করে নিতাই কুণ্ডু স্বয়ং।
এই উপন্যাসে শাহযাদ ফিরদাউস ক্ষুধার কথা বলেছেন। সেই ক্ষুধা, খেটে-খুটে আধপেটা খেয়ে বেঁচে থাকা মানুষের ক্ষুধা। লোভের কথা আছে বইয়ের পাতায় পাতায়। সেই লোভ অর্থের প্রতি নিতাই কুণ্ডুর, ভাতের প্রতি ভুনোর লোভ, একটু স্বচ্ছন্দে বাঁচার জন্য হাভাতে মানুষের লোভ। আছে মানুষকে ধ্বংস করে দেওয়ার লোভ।
বইয়ের শেষে এসেছে বিপ্লবের কথা। পিঠ যখন দেওয়ালে থেকে যায়, তখন মানুষ রুখে দাঁড়ায়। আদর্শ নিয়ে অনাহারে থাকা মকবুলেরা তখন চুরি করতে বাধ্য হয়। কিন্তু তীব্র অপমান আর লাঞ্ছনার স্বীকার মানুষেরা তখন প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। হয়ত বুর্জোয়াদের মাঝেও থাকে কিছু বিপ্লবী, যেমন নিতাইয়ের ছেলে গোপাল। যে কিনা হাভাতে মানুষদের বাঁচাতে নিজের বাড়িতেই আগুন দেয়। কিন্তু নিতাইয়ের বিরুদ্ধে বিষ্ণুপুরের বাসিন্দাদের সেই বিপ্লব কি দীর্ঘজীবী হয়?
শাহযাদ ফিরদাউসের 'পালট মুদ্রা' আমাদের ভাবতে বাধ্য করে মানুষের বেঁচে থাকা নিয়ে। বেঁচে থাকা বলতে এখানে survival. মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, কিন্তু লাঞ্ছনা গঞ্জনা আর ঠকে ঠকে কতদিন বাচবে তারা? ক্ষুধার জন্য তার যে লড়াই, সেই ক্ষুধা মেটানোর জন্য আজ 'উন্নত মানুষ' যে রসনা বিলাস করে, তা তো এই মানুষদের পক্ষে সম্ভব না। তাহলে কি তারা সহজ খাবার খুঁজে নেবে? খেয়ে বেড়াবে ঘাসের মূল, লতাপাতা? হাঁটবে আবার চার পায়ে? ফিরে যাবে জঙ্গলে? এই কি মুদ্রার অন্য পিঠ?
'পালট মুদ্রা' আমাদের এইসব কথা ভাবতে বলে, কিংবা ভাবনা জাগায়। উপন্যাস কিংবা বই হিসেবে চমৎকার। লেখনী, ভাষা খুব সহজ, কিন্তু বলিষ্ঠ। এমন নয় যে এই বইয়ে লেখক যেসব কথা বলেছেন, তা আগে কেউ বাংলা সাহিত্যে বলেনি, কিংবা তিনি এর কোন সমাধান দেখিয়েছেন। বরং, সত্য অবস্থা তুলে ধরেছেন আরও অনেক লেখকের মতোই। পড়তে পড়তে কিছু জায়গায় মুগ্ধ হতে হবে। আবার যখন নিতাইয়ের পুকুরে মুদ্রার খোঁজ এবং নিতাই কর্তৃক নারী পুরুষের গোপনাঙ্গ তল্লাসের ঘটনা পড়বো, তখন শহীদুল জহিরকে খুব মনে পড়বে। ভুনো চরিত্রটা সবচেয়ে আলাদা, সেই ন��ুন বনবাসী মানুষের প্রতীক, সে আমাদের অনেককে হয়ত হাসান আজিজুল হকের কন চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দেবে।
সকাল থেকে থর থর আবেগে শব্দের ইন্দ্রজালে মুগ্ধ হয়ে, গ্রামীণ সতত জীবন ও ক্ষুধার করাল রূপের এক উম্মোচিত আখ্যান পড়ে যারপরনাই বিস্মিত ও হতভম্ব হলাম। মোটেমাটে ৯০ পাতার এক উপন্যাস, বা বড় গল্প বা বলা চলে ‘দাস্তান’, যে গল্পের শেষ নেই, বা হয় না, হাজার হাজার বছর ধরে শোষক ও শোষিতের এই গল্প আবহমান এবং ক্ষুধার এই সর্বগ্রাসী রূপ টিকেই থাকে দুনিয়াতে।
‘পালট মুদ্রা’র জন্য লেখক শাহ্যাদ ফিরদাউসকে অসংখ্য কৃতজ্ঞতা ও ভালবাসা।
বইটা সংগ্রহে আছে ৫ বছর ধরেই, কিন্তু সকল দোষ গ্রন্থকীট নজরুল ভাইয়ের, তিনিই এই বইয়ের ও লেখকের সন্ধানে দিয়েছিলেন, জানিয়েছিলেন শাহ্যাদ ফিরদাউসের সকল বইই তাঁর পড়া, এবং সেই সাথে জানিয়েছিলেন যে ‘পালট মুদ্রা’ পড়ে তিনি হতভম্ব হয়ে ছিলেন বেশ কিছুটা সময়। তা নজরুল ভাইয়ের মত নিবিড় পাঠক যখন কোন বই নিয়ে এই কথা বলেন, তার মানেই সেই বই আলাদা মনোযোগের দাবীদার। তাই বইটি সংগ্রহের পরও এতোদিন হাতের কাছেই ছিল, কিন্তু পড়া হয় নি, সেই সময় ও পরিবেশের অপেক্ষায়ই ছিলাম হয়তো! যাক, সেই ক্ষণগণনা আজ শেষ হল, লেখকের ‘সাইলকের বাণিজ্যবিস্তার’ সংগ্রহে আছে, আশা করি সেটাও পড়া হবে এবার।
‘শীতের মলিন মরশুম। ঘন কুয়াশার মতো নেমেছে আকাল। কনকনে হাওয়ার মতো পর পর ঝেঁপে আসছে অনটনের প্রবল প্রবাহ। চলছে অনাহার। শীতার্ত বৃদ্ধার করুণ কাতরানির মতো চারিদিকে দারিদ্রাপীড়িত মানুষের অস্ফুট হাহাকার। সুজলা সুফলা ভূখন্ডের যাবতীয় সুজল সুফল কতিপয় পরিবারের ভোগের দখলে। বাকি সব ভূখাশুখা মানুষেরা ঘোরে দোরে দোরে, চায় ভাত, চায় কাজ। কাজ নেই। কাজের তুলনায় উদ্বৃত্ত মানুষ। চতুর্দিকে তাই বৃত্তিহীন বেকার স্রোত, অভুক্ত মানুষের উদভ্রান্ত চলাচল।‘
-এইই ছিল বইটির প্রথম কয়েক লাইন, এরপর নেমে আসে আবহমান গ্রামবাংলার চিরচিরায়িত রূপ, ভুখা মানুষের ভাতের স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘাসের মূল তুলে খায়, গ্রামের জোতদারের বাড়িতে হানার দেবার চেষ্টা করে মার খায় বেশুমার, জনপদ চলে আবেগ ও গুজবের ভিত্তিতে, জোর যার মুল্লুক তার-এর জগতে এঁদো পুকুরে পাওয়া এক হস্তী মুদ্রিত রূপার পয়সা নেমে আসে অলৌকিক জ্যোতিঃময় হিসেবে, যার স্পর্শে দূর হবে সকল অভাব, মিটবে মউ মউ গন্ধ ওঠা ভাত মুঠো ভরে খাবার স্বপ্ন।
ঘটনা চলতে থাকে, ডালপালা গজাতেই থাকে, একের অন্যের সাথে জড়িয়ে, শেষ অবধি বোঝায় যায় না যে কোনদিকে চলছে গ্রামটির ঘটনা, কোন পাল্টা দিকে চলছে জনপদের জনস্রোত।
এর বেশী এখন আর নয়, বইটি পড়ুন, মুগ্ধ হবেনই।
১৯৯৬ সালে প্রথম প্রকাশিত বইটি ঢাকায় ২০১১ সালে নতুন ভাবে প্রকাশ করেছে ‘কবি’ প্রকাশনী। মলাটমূল্য ১৫০ টাকা।
দারিদ্র, ক্ষুধা, ক্ষুধার জ্বালা, লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা, বিশ্বাসহীনতা, মানবিক পাশবিকতা এগুলোকে একটা একটা রঙিন সুতো মনে করে নিতে পাড়লে শাহ্যাদ ফিরদাউস এর "পালট মুদ্রা" একটি দারুন নকশিকাঁথা। প্রতিটা সুতোর প্রয়োজনীয় ফোঁড় পালট মুদ্রা কে করে তুলেছে দারুন।
পালট মুদ্রার কাহিনী চিরায়ত গ্রামীণ বাংলার শোষণের গল্প। সামন্তবাদী শোষকের নিপীড়নের গল্প। ক্ষুধার তীব্রতার গল্প। লোভের গল্প। কেন্দ্রীয় চরিত্র ভূনো কে সমাজে খুব একটা না পাওয়া গেলেও নিতাই কে পাবেন অহরহ, তেমনি পাবেন মফিজ,কানাই, হামজা বা মানিক দালাল কে। এরা সমাজের পরতে পরতে লেপ্টে আছে। ছোট একটা উপন্যাস, এর বেশি কিছু বলবো না, বলা উচিৎ হবে না। শুধু লেখকের দুটো উক্তি তুলে ধরবো।
”দুনিয়ার একটা লোক ও যদি খিদেয় কাতরায় আর কেউ যদি তা জেনেও ভাতের দলা মুখে পোরে তো সে হল খুনি"
"মানুষকে একবার স্বপ্ন দেখাতে পারলে তাকে দিয়ে যে কোনো দুষ্কর্ম করিয়ে নেয়া অসম্ভব নয়। আর একবার যদি কেউ অন্যায় কাযে হাত নোংরা করে তো তাকে টেনে চুরান্ত অন্ধকারে নামিয়ে আনা খুব সহজ। লজ্জা-ভয় থাকে প্রথম প্রথম, ওটা যদি একবার কাটানো যায় তো ব্যাস, তারপর মধু আর মধু"।
❛এক থালা গরম দুধ সাদা ভাত আহারের জন্য আমাদের কত সংগ্রাম। ভাতের কষ্ট সেই বুঝে; যে দিনশেষে ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত লোকমা দিয়ে খেতে পারে না।❜
সমাজ শোষিত আর শাসকের শোষণে চলছে। কেউ খবরদারি চালাচ্ছে, আর কেউ সেই খবরদারির শিকার হয়ে জীবন কাটাচ্ছে। এখানে নিপীড়িতের কোনো ঠাঁই নেই।
ভানু পাল থেকে কবে যে সে ভুনো-শুয়োর হয়ে গেল তার হিসাব নেই। বাবা-মা জন্ম দেয়ার কাজ সেরে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। অনাথ ভুনো কেমন এক সম্পর্কের কাকা নিতাই কুন্ডুর কাছে থাকতো। লোভী সেই লোকের কাছে একটু ভাত বেশি খাওয়ার উপহার হিসেবে জুটেছিল কষে লাথি। সেই যে সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে মাটির সাথে সম্পর্ক তৈরি করলো। মনুষ্য খাবার আর তাকে আকৃষ্ট করে না। সে জানে পেট পুড়ে খাওয়ার প্রতিদান লাথি। তাই সে দোঁআশ মাটি, মূল খায়। সাথে শূকরদেরও খাওয়ায়। মাটির সাথেই সম্পর্ক তৈরি করেছে। কারণ কথায় আছে,
❛আপনের থেকে পর ভালো, পরের থেকে জঙ্গল ভালো।❜
মফিজকে কেউ মানুষ হিসেবে গণ্য করে না। তবুও সে ভুনোর থেকে বেশি মানুষ। যদিও লোকে তাকে ❛কুন্ডুর ব ল দ❜ বলে। নিতাইয়ের পুকুরে কাজ করে সে। অভাব, আধপেটা খাওয়া, অসুস্থ মা, বোন নিয়ে পীড়িত সে। কপাল খুলতেই নাকি কুন্ডুর পুকুরে সে হাতিমার্কা মুদ্রা পায়। যার দাম একশ থেকে বারো লাখ উঠে গেছে। এখন গরীব মফিজ কি জমিদার বনে যাবে? মুদ্রার এপিঠ তো তার সুখের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পালটে কী আছে?
পরান মন্ডল পরিবার নিয়ে অভাবের সাথে সখ্যতা গড়েছে। অভাবে পেট খালি রাখলেও পরানের নীতি তাকে খারাপ কাজ করতে সায় দেয় না। সবাই অসৎ পথে কামালেও সে ঐ পথ বাছে না। কিন্তু কত? সব জরা ক্লিষ্টতা কেন গরীবের? কুন্ডুর মতো লোকেরা কেন গোলা ভরা ধান নিয়ে সুখে ঘুমাবে আর লোকের সর্বনাশ করবে? একটা নিষ্পত্তি হওয়া দরকার।
কুন্ডুর পুকুরে আসলেই অনেক মুদ্রা আছে? ছেলেবুড়ো, যুবতী, কিশোরী নিজের সম্ভ্রম বিকিয়ে তবে ছুটলো সেই পালট মুদ্রার খোঁজে।
গাঁয়ে কাজ নেই, পেটে খবর নেই, মাঠে ব্যস্ততা নেই। প্রয়োজন থেকে গতর খাটার লোক বেশি। আছে অন্যায়, লোভ আর একেক অন্যকে ঠকিয়ে উপরে উঠার প্রতিযোগিতা। এইভাবেই কি ধরার শেষ দিন পর্যন্ত চলবে? নেই পরিবর্তন।
পরান, মফিজ, ভুনো,গোপাল কিংবা মকবুলদের জেগে ওঠা কতটাই পরিবর্তন আনতে পারে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝পালট মুদ্রা❞ শাহ্যাদ ফিরদাউসের লেখা ছোটো কিন্তু মুগ্ধ করার মতো এক উপন্যাস।
মাত্র ৯৬ পৃষ্ঠার মেদহীন একটা বইতে অদ্ভুত বোধ আর গভীর মমার্থের গল্প এভাবে তিনিই বলতে পারেন। আগেও পড়েছি উনার লেখা। গম্ভীর অথচ ভাবতে বাধ্য করে এমনসব কথা তিনি তার লেখায় আনেন। এই উপন্যাসে ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষুধার তাড়না জেনেও যারা লোকমা ভর্তি ভাত কোনো অপরাধবোধ ছাড়াই গিলতে পারে তাদের খু নি আখ্যা দেয়াটা অনেকগুলো গুঢ় অর্থ প্রকাশ করেছে।
আ��ের বইয়ের সাথে এই বইয়ের গল্পের ধরনে কোনো মিল নেই। তবে গল্প বলার যে সহজাত গুণ তার উপস্থিতি ছিল বেশ।
সমাজের কিংবা ছোট্ট এক গাঁয়ের মধ্যেও ক্ষমতার যে খেলা চলে, শোষিতের হাহাকার, শাসকের অট্টহাসির যে নিদারুণ বিস্বাদের গল্প তিনি বলেছেন তাতে পাঠক অবাক হবে।
মুদ্রার ওপিঠে কী থাকে?
একটা হাতিমার্কা মুদ্রা মাটির থেকে এসে কী অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির তৈরি করে গেল! আর এতেই মানুষের ভেতরকার লোভ-লালসা, অন্যের জিনিস ছিনিয়ে নিয়ে লাভবান হওয়ার প্রবৃত্তি কি দিনের আলোর মতো পরিষ্কারভাবে ধরা দিলো।
লেখক কোনো লুকোছাপা না করে সরাসরি ন��র্জলা সত্যকথাগুলো পাঠকের সামনে উন্মোচন করেছেন।
আমরা সুবিধাবাদী। যতক্ষণ নিজে বিপদে না পড়ি ততক্ষণ আমাদের পক্ষ বিপক্ষ থাকে না। মধ্যমপন্থা মেনে চলি। আবার লাভের গন্ধ পেলে এই আমরাই ভোল পাল্টে ফেলতে সময় নেই না।
উপন্যাসের প্রতিটা অধ্যায় যেন নানাভাবে সেই লাভের গুড়ভোগী মানসিকতার প্রমাণ দিয়েছে।
এক মুঠো ভাতের জন্য কত হাহাকার। মনে আছে ❛ভাত দে❜ চলচ্চিত্রের কথা? ভুনো কিংবা পরানের এক মুঠো ভাত খাওয়ার হাহাকার যেন চলচ্চিত্রে ঐ দৃশ্যগুলোকে বাস্তব করে দিয়েছে। অনাহারী মানুষগুলোর লজ্জা ভুলে সম্পদ পাওয়ার বাসনা যেন একটু সুখের আস্বাদনে থাকা সত্তার গল্প বলেছে।
আমাদের আশপাশে জুড়েই আছে নিতাইয়ের মতো মানুষ। তার থেকে বেশি আছে ভুনো কিংবা পরানের মতো মানুষ। তারপরেও আমরা কি সেই দলে ভিড়ে নতুন কোনো দিগন্তের সূচনা করতে পারবো? যেখানে সব শুরু হয়েছিল সেই পালট মুদ্রার পিঠে করে আবার সেই সূচনার দিকে গিয়ে নতুন পথের সন্ধান করলে সুখ কি আসবে? নিতাইয়ের মতো মানুষ থাকবে, আবার থাকবে ভুনোর মতো অর্ধেক মানুষ। এভাবেই এই বিশ্বচরাচর চলবে।
মুদ্রা ঘুরতে ঘুরতে কখনো সাদা আনবে তো কখনো কালো। থাকবে লোভ, আবার থাকবে সৎ সত্তা।
❛ভালো-মন্দের মিশেলে আমাদের এই চরাচর। এখানে কেউ নির্যাতিত হচ্ছে মানে তার উপর অবস্থান করে নির্যাতক। এভাবেই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের গল্পগুলো আমাদের তাড়িয়ে যাবে। আর আমরা ছুটতে থাকবো অনন্তের দিকে।❜
"দুনিয়ার একটা লোকও যদি খিদেয় কাতরায় আর কেউ যদি তা জেনেও ভাতের দলা মুখে পোরে তো সে হল খুনি!"
"যতক্ষণ নিজের ঘাড়ে বাড়ি না পড়ে ততক্ষণ বেশ নিরপেক্ষ নিরপেক্ষ খেলাটা চালানো যায়। নিজের ঘাড়ে একখানা ওজনদার লাঠির বাড়ি পড়লে নিরপেক্ষ থাকার বায়বীয় ব্যাপারটা এক ফুৎকারে শেষ।"
লেখনীর বা শব্দের যে কি শক্তি তা সেই রকম লেখার সামনে পড়লে সঠিকভাবে অনুধাবন করা যায়। আপনি লেখকের মতের সাথে একমত না হতে পারেন, তার বক্তব্যে ভুল ধরতে পারেন কিন্তু তার পরেও যখন দেখা যায় সেই লেখা মাথায় ঘূণপোকার মতো নিত্য উপস্থিতি জানান দিচ্ছে, তখন লেখকের কৃতিত্ব স্বীকার করে নিতেই হয়।
শাহযাদ ফিরদাউস - স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে এই বইটি পড়ার আগে কখনো তাঁর নাম শুনিনি। কিন্তু পড়ার পর লেখক অথবা এই বইয়ের কথা আর কখনো ভুলবো বলে মনে হয় না।
বইয়ের বিষয়বস্তু গ্রামবাংলার নিতান্ত সাধারণ দরিদ্র শোষিত হতভাগ্য ক্ষুধার্ত মানুষের জীবনের গল্প। এ বিষয়ে যদি কারো অনাগ্রহ থাকে তাহলে এই বই থেকে তার দূরে থাকাই শ্রেয়। অতিরিক্ত সতর্কীকরণ, বইটি দূর্বলচিত্তদের জন্য নয়।
'ভুনো সারাক্ষণ বীরের মতো লড়ে শেষ মুহূর্তে সাপে-মানুষে গোলমাল করে নিজের সর্বনাশ ঘটায়। ওকে সঙ্গিদের দিকে ফিরে যেতে দেখে নিতাইয়ের ঘোর কাটে। সে ভাবছিল, ইতোমধ্যে তার মৃত্যু ঘটেছে। এখন, এইমাত্র বুঝল, সে মরেনি, আগের মতোই বহাল তবিয়তে আছে। বহাল তবিয়তে যখন আছে তখন ভবিষ্যতে আরো বহাল তবিয়তে থাকার ব্যবস্থা পাকা করতে হবে। ভবিষ্যতে হাল ফেরাতে গেলে ভুনো আবার গোল পাকাতে পারে। ভুনো যখন এত কিছু পারে তখন তার পক্ষে গোল পাকানো খুব স্বাভাবিক। সুতরাং এই সুযোগে ভুনোকে সরাও। সামনা সামনি না পারলে পেছন দিক থেকে সরাও।'
কে একজন বলেছিল, মানুষের প্রথম এবং সবচেয়ে বড়ো সমস্যা ক্ষুধা। পেটে ক্ষুধা থাকলে পৃথিবীর সবকিছুই তুচ্ছ মনে হয়, ক্ষুধাটাকেই সবচেয়ে বড়ো সমস্যা মনে হয়। পেটে খাবার পড়লে তারপর অন্য সব সমস্যা চোখে পড়ে, এর আগে অব্দি একটাই সমস্যা।
পৃথিবীতে যতো ঝগড়া, কলহ, মারামারি সবকিছুর মূলেই থাকে মানুষের লোভ। কারো লোভ পেটপুরে খাওয়া, কারো আবার অন্যের পাতের খাবার কেড়ে নেওয়া। পালট মুদ্রা উপন্যাসে উঠে এসেছে এমনই দুই বিপরীত শ্রেণির মধ্যে লড়াইয়ের গল্প। ভুনোদের গ্রামের এই লড়াইটার শুরু হয় মফিজের মুদ্রা পাওয়ার মধ্য দিয়ে। নিতাই কুণ্ডুর বাড়ির চাকর মফিজ, মাছ ধরতে যেয়ে পেয়ে যায় অত্যাশ্চর্য এক মুদ্রা। এই মুদ্রার দাম তার ধারণাও বাইরে, তবে সে ধারণা করতে পারে তার ভাগ্য ফেরাতে পারে এই মুদ্রা। মফিজের ভাগ্যে যদি হাতিমার্কা মুদ্রা জোটে, বাকিদের কপালে দোষ কী? অথবা কপালের দোষ দেওয়ার আগে অন্তত চেষ্টা করতে দোষ কোথায়? সুতরাং মাঝরাতে দলে দলে মানুষ এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিতাই কুণ্ডুর পুকুরে। মুদ্রা না জুটলেও, তাদের কপালে জোটে অপমান।
অন্যদিকে পেটের দায়ে চুরি করতে যেয়ে ধরা পড়ে মকবুল। একের পর এক মার খেয়ে মকবুল হয়ে ওঠে একটা দল। যে দলে আছে সব ক্ষুধার্ত মানুষ, এই মানুষেরা বুঝে না খাবার না পেলে তারা চুরি করবে না তো কী করবে? ভুনো এসে কাঁধ মেলায় এই ক্ষুদার্ত মানুষদের সাথে। শুরু হয় একটা লড়াই। এক দিকে ক্ষুধার্ত ভুনোর দল, অন্যদিকে ক্ষুধার্তদের সম্পদ জমিয়ে রাখা নিতাই কুণ্ডুর দল। এ লড়াই যেন যুগ যুগ ফহরে চলে আসা ধনী-গরিবের অসম লড়াই। যেখানে অবধারিতভাবেই জিতে যায় ধনীরা। যেকোনো উপায়ে জিততেই হয় তাদের। সামনে থেকে না হোক পেছন দিক থেকে আঘাত করে ভুনোদের হারিয়ে দিতে চায় এই ধনীরা, নাহয় আবার কখনও হয়তো মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে তারা।
একসময় এই ভুনোরা পেটে ক্ষুধা আর অভাব নিয়ে মানুষের সভ্যতা থেকে পিছিয়ে যেতে থাকে প্রাচীন দিনগুলোর দিকে। যেসময় মানুষের লড়াই ছিল শুধুই ক্ষুধার বিরুদ্ধে!
শাহযাদ ফিরদাউসের লেখার প্রশংসা শুনেছি অনেক বোদ্ধা পাঠকের কাছ থেকেই, এবারই প্রথম তার লেখা পড়া হলো। পড়ে চমৎকৃত হয়েছি, দারুণ ঝরঝরে লেখা আর অসাধারণ প্লটের এই উপন্যাস মনে দাগ কেটেছে বেশ গভীরভাবে।
প্রথমদিকে পড়ে আগ্রহ পাচ্ছিলাম না। মানুষ আবার ঘাসের মূল খায় নাকি! কেমন জানি এলেমেলো লাগছিলো। পুরোটা শেষ করার পর থ হয়ে বসে আছি। যান্ত্রিক এ জীবনের লালসা, প্রতিহিংসার পাশ কাটিয়ে মানুষ কেন তার পূর্বের জীবনে ফিরে যেতে বাধ্য হবে তার ছক একে দেখিয়েছেন লেখক।
এমন কি হতে পারে! এমন কি হওয়া সম্ভব! কীভাবে সম্ভব! মনে হতে পারে এসব বইটি পড়ার পর। আবার মনে হতে পারে, কেন সম্ভব নয়! অযৌক্তক তো নয়! সত্যি বলতে বইটির চরিত্র, প্রেক্ষিত, কাহিনির গতিবিধি; সর্বোপরি, গল্পের বিন্যাস অভিনব বলে ঠেকে। শুকরের সঙ্গে মনুষ্যজীবনকে সমান্তরাল দেখানো চমকপ্রদ বৈকি। ভুনো চরিত্রটা প্রথম পর্যায়ে 'তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত' উপন্যাসের বাঘারুকে মনে করায়।
কিছুটা নাটকীয় লেগেছে বটে। কোনো কোনো সংলাপ হৃদয়গ্রাহী হলেও মুখে তুলে দেয়া সংলাপের মতো লেগেছে। তবে চূড়ান্ত কথা হলো, ভালো লেগেছে, একরকমের বিস্ময়মুগ্ধতা আর কি।
মানুষের জীবন মুদ্রার মতো, যে মুদ্রার একদিক হয়তো সবার নজর কাড়লেও পালট মুদ্রায় কেউ নজর দেয় না। কেউ কেউ দেখেও না দেখার ভান করে। এই জনমে মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুগে সম্ভবত ক্ষুধার যন্ত্রণায়। এই যন্ত্রণাটা ভাতের অভাবে থাকা লোকগুলো ছাড়া কেউ বুঝে না। এদের আমরা দেখেও না দেখার ভান করি। আর তাই তো দুনিয়ার একটা লোকও যদি খিদেয় কাতরায় আর কেউ যদি তা জেনেও ভাতের দলা মুখে পোরে তো সে হলো খু*নি।
ভুনোর কথা বললে বিষয়টা একেবারেই মিলে যায়। আপনাদের হয়তো মনে আছে সুকান্তের সেই কবিতার লাইন দুটো,
ভুনোর কাছে চাঁদকে কখনো ঝলসানো রুটি মনে হয়নি। তার পেটে আজীবন ঝলেছে দুটো ভাতের খুদা। সেই খুদা তাকে মাটি, ঘাস, লতাপাতা কলা গাছের ঐ কলার মোচাকে সাদা সাদা গরম গরম ভাতের মতো মনে হয়েছে। গ্রামের বয়সের চেয়েও সবচেয়ে বড়োসড়ো গায়ে গতরে শরীর হওয়ায় প্রয়োজন মতো পেট ভরা ভাত তার কপালে কখনো জুটেনি।
বাবা-মা'র কথা ভুনোর মনে নেই। তারা ভুনোর জন্মদানের ব্যাপারটা কোনোক্রমে শেষ করে বিশ্বজগতের মায়া কাটিয়ে ফিরে গেছে। সে মানুষ হয়েছে (যদি তাকে এখনো মানুষ বলতে কারো আপত্তি না থাকে) নিতাই কুণ্ডুর কাছে। নিতাই নাকি ডালপালার সম্পর্কে ওর কাকা। কাকা শব্দটা শুনতে যেমন নিজের নিজের গন্ধ আসে এক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক তেমন গন্ধ মাখা নয়।
তাই হয়তো গরম গরম ভাতের লোভ তাকে লাথি হয়ে ঐ কাকার বাড়ি থেকে শামিল করে দিয়েছিলো শূকরদের পালের সাথে। এখন তার দিনের অধিকাংশ কাজই হলো ভুনো শূকরদের সাথে ঘাসের মূল খাওয়া আর শুয়োর ছানাদের সাথে খুনসুটি করা। শূকরদের সাথে থাকতে থাকতে এখন তাকে লোকে ভুনো শুয়োর নামেই বেশি চিনে। দিনে এখন সে ঘাসের মূলের খোঁজ করে আর রাতে নিতাই কুন্ডের পুকুর পাড়ে ঘুমায়। কাকা নিতান্তই দয়া করে জায়গা দিয়েছে ওখানটাই বিনিময়ে পুকুরটা পাহারা দিলেই হয়। জীবনে ভুনোর কোনো নেশাই নেই কেবল একটা নেশা ছাড়া, আর তা হলো বেঁচে থাকার নেশা।
ভুনোর সমবয়সী মফিজের ধারণা এই তল্লাটে তাকে কেবল ঐ ভুনো ছাড়া কেউই পাল্লা দিতে পারবে না গায়ে গতরে। কিন্তু বাপরে হারানোর পর সেই বল এখন পেটের জ্বালায় খরচ করতে হয় নিতাই কুন্ডের মনমতো। এক সময় ভুনোর সাথে ছুটে বেড়ানো মফিজ এখন কুন্ডর বলদ হয়েই খেটে জীবন পার করে। হদ্দ গরিব মফিজ, যে গ্রামজুড়ে পরিচিত নিতাই কুণ্ডুর ‘বলদ’ নামে, একদিন কুণ্ডুর পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে হঠাৎ ভাগ্যই তাকে এনে দেয় হাতিমার্কা এক প্রাচীন মুদ্রা। এই অমূল্য ধাতব টুকরোকে ঘিরেই তার মনে জাগে স্বপ্ন-বাসনার উঁচু প্রাসাদ। কিন্তু মফিজকে সেই মুদ্রা নয়, বরং তার চকচকে লোভই শেষ পর্যন্ত অন্য লোভাতুর মানুষের হাতে ডেকে আনে তার করুণ পতন।
এদিকে কুণ্ডুর পুকুরে মহার্ঘ্য মুদ্রা পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই শীতের গভীর রাতে গ্রামের হতদরিদ্র মানুষ দলে দলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বরফঠাণ্ডা পানিতে কেউ মুদ্রা পাবার আশায়, কেউ ভাগ্য ফেরানোর অন্ধ লালসায়। অন্যদিকে মকবুল আর পরান কুণ্ডুর বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে প্রথমে এক বস্তা চাল পেয়ে সন্তুষ্ট হলেও, যখন দ্বিতীয় বস্তায় হাত বাড়ায়, তখনই ঘটে তাদের বিপদ।
এই সব লোভের ছোটো বড়ো ঘটনাপরম্পরাই ক্রমে জন্ম দেয় সংঘাতের নিতাই কুণ্ডু পক্ষের সঙ্গে ভুনোর মতো সর্বহারা শ্রেণির দ্বন্দ্বে। যে দ্বন্দ্বের সামনের সারিতে দাড়িয়ে মুটো মুটো ভাতের খুদায় জ্বলতে থাকা পেটের মালিকদের দ্বন্দ্বের সাথে সঙ্গ দেয় ভুনো। আর সেই দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়েই শাহযাদ ফিরদাউস তার পালট মুদ্রা উপন্যাসে তুলে এনেছেন লোভ, সংগ্রাম আর মানবিক সংকটের ভেতর থেকে ভেসে ওঠা এক ইতিবাচক ইঙ্গিতময় কাহিনি।
প্রতিটি মানুষের মনের গহীনে লুকিয়ে থাকে লোভ। এই লোভের আবার আকার, প্রকার কিংবা প্রকাশের ধরনের যেমন শেষ নেই তেমনি এর মাত্রারও সীমা নেই। প্রতিটি শ্রেণির মানুষ তার অন্ত চেতনায় একে লুকিয়ে রেখে যেন পরম যত্নে লালন করে। বাইরে থেকে অনেক সময়ই তা বুঝে ওঠা যায় না। সময় আর সুযোগই মাঝে মাঝে তা বের করে প্রকাশ করে দেয় সবার কাছে।
পলাট মুদ্রা 'শাহযাদ ফিরদাউস'রই একশ পৃষ্ঠাও অতিক্রম করে না যাওয়া একটা উপন্যাস। যে উপন্যাসের শুরুর ক'টা পৃষ্ঠাতেই লেখক ভুনোর গল্প বললেন, বললেন খুদার কথা আর সমাজের সেই সব মানুষের কথা যারা অন্যের ভাগেরটাও বন্দি করে রেখেছে সিন্দুকে। জীবনের পালট মুদ্রার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এ গল্পে কোনো মেদ নেই, কোনো অতিরঞ্জিত নেই আছে কেবল চাকচিক্যহীন নির্মোহ সত্য জীবন।
এই পৃথিবীর সকল সম্পদের মালিক সবাই, সবারই সমান অংশ পাওয়া উচিত খোদার সৃষ্টিতে। কিন্তু সমাজের কিছু মানুষ এতোটাই অবহেলিত যে একটা পশুর ভাগে যা জুটে তাও জুটে না তাদের।
শাহযাদ ফেরদৌস সে খুদা পেটে জীবন পার করা মানুষের সাথে সর্বগ্রাসী লোকদের দ্বন্দ্বের গল্পই দেখিয়ে দিয়েছেন আঙুল তুলে। জীবন মুদ্রার পালট দিকে নজর কাড়ার চেষ্টা করেছেন পাঠকদের। যে দিকটা আমরা বরাবরই অস্বীকার করার চেষ্টা করি। লেখক মাত্র ৯৬ পৃষ্ঠায় যে গল্প ধারণ করেছেন এ এক অখন্ডনীয় সত্য। যে সত্যর মুখোমুখি হতে মানুষ ভয় পায়।
জীবনের কিছু সত্যকে জানতে চাইলে বইটি পড়া শুরু করে দিন। এমন সুন্দর হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটার মতো গল্পই যদি না পড়েন তাহলে আর পড়ার রইলো কী। কী দারুণ একটা গল্প অথচ কত অল্পতেই না সমাপ্ত হয়ে গেলো। আর এই অল্পতেই লেখক শাহযাদ ফেরদৌস আমাকে মুগ্ধ করে দিলেন। ভাতের আর খুদার জন্য জীবন যুদ্ধের গল্প শুনিয়ে করে দিলেন বিমর্ষ, মনের আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে এক মন খারাপের আবেশে ভাসিয়ে দিলেন।
আপনারা যারা কমদামের মধ্যে চমৎকার বই খুঁজেন তাদের জন্য এই বইটা আসলেই চমৎকার হবে। মাত্র ৯৬পৃষ্টায় যে গল্প লেখক ধারণ করেছেন তা পড়ে মনে হবে পৃথিবীর সব মানুষের গল্প এক নিমিষেই লেখক লিখে ফেলেছেন।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বলে গিয়েছিলেন ক্ষুধার্ত মনের এক আর্তনাদ। এই পৃথিবীতে কত মানুষ প্রতিদিন অনাহারে ঘুমোতে যায় কেউ হিসাব রাখি না। নিজেরা পেট ভরে খাচ্ছি, হয়তো তাঁদের কপালে এক ফোঁটা পানির ও সন্ধান মেলা ভার। এই পৃথিবীতে কেন এমন বৈষম্য মানুষের মাঝে ?কেন এমন থাকে পার্থক্য ? এটা কি সৃষ্টিকর্তা তৈরি করেছেন? নাকি এটা কি সমাজের স্বার্থপর মানুষের তৈরি?
উত্তর অবশ্যই পাওয়া যায়। স্রষ্টার কাছে কোনো জাতের অবকাশ নেই। স্রষ্টার কাছে সবাই সমান। এই পৃথিবী বানিয়েছে নিয়ম একদল ক্ষুধার্ত হয়ে ঘুমোবে, একদলের পেট ভর্তি থাকবে আবার তারা খাবার অপচয় করবে। এই ক্ষুধার্তময় পৃথিবীতে কিছু মানুষ দলিত হয়ে জন্মায়। তাঁদের অন্যের উপর নির্ভর করে বাঁচতে হয়। কিন্তু সেখানেও তাঁরা নিজেদের ন্যায্য অধিকার পায়না।
তাঁরা শোষিত হয় শোষকের কাছে। তাঁরা পায় না তাঁদের ঘামের মজুরি। তাঁদের সবার অবহেলায়, ক্ষুধার্ত জীবনে এগিয়ে চলতে হয়। কিন্তু সেটা কতদিনের জন্য? তাঁরা কী সব সময় চাইবে ক্ষুধা পেট নিয়ে ঘুমাতে ��েতে? সাদা ফুলের মতো ভাতের দানা তাঁদের স্বপ্নে বারবার এসে হানা দেয়। তাই সহ্য করা যায় না। সহ্য করা যায় না ক্ষুধার্তের কষ্ট, তাই অনেক সময়েই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা এই ক্ষুধার্ত হাহাকার।
দশাই চেহারার ছেলেটির নাম ভুনো। গাঁয়ের লোক বলে ভুনো শুয়োর। আচ্ছা একটা মানুষকে শুয়োরের সাথে কেন তুলনা করা হবে? ছেলেটির ক্ষুধাতুর পেট বেশি খেতে চায় বলে নাকি শুয়োরের পালের সঙ্গে মাঠে ঘাটে ঘুরে ঘাসের মূল খাওয়ার জন্য?
কিন্তু ছেলেটি ঘাসের মূল কেন খাচ্ছে? সাথে সে আবার মাটিও খায়। এসব না খেয়ে যে বাঁচার কোনো উপায় নেই ভুনোর কাছে। কাকা নিতাই কুন্ডুর বাড়িতে আশ্রয় সে ঠিক পেয়েছিল বাবা মা মারা যাবার পর। কিন্তু তখন আট নয় বছরের ছোট্ট ভুনো একটা অপরাধ করে ফেলেছিল একদিন। ভাতের গামলা সুদ্ধ খাওয়া শুরু করেছিল। ভুনোর কী দোষ, তাঁকে দিয়ে নিতাই মাঠে যে অমানুষিক পরিশ্রম করাতো, বেচারার ক্ষিদে তো পাবেই।
ভুনোর খাওয়া দেখে সেদিন নিতাই সজোরে লাথি কষিয়েছিল বুক বরাবর। ভুনো তারপর আর ওখানে থাকেনি। কাজ পেয়েছিল দোকানে সেখানেও ক্ষিদের জ্বালায় দোকানের সব পাউরুটি এক নিমেষে সাবাড় করেছিল। সেখানেও ভাগ্যে জুটেছে লাথি। এরপর আর ভুনো খাবারের জন্য হাত পাতেনি কখনো। বাপের একটু জমি ছিল ওখানে ছাপড়া করে সে নির্ভরশীল হতে শুরু করলো প্রকৃতির ওপর।
মফিজের কপালে সুখ নেই। সবাই তাঁকে বলে কুন্ডুর বলদ। নিতাই কুন্ডুর ফাইফরমাশ খেটে নিজের বুঝি ভালো সুনাম হয়েছে। গিয়েছিল এক রাতে নিতাইয়ের পুকুরে মাছ ধরতে নিতাইয়ের আদেশে। এমনিতেই শীতের রাত, মফিজের ভালো লাগছে না কাজটা। কিন্তু উপায় নেই। জাল ফেলতে গিয়ে হঠাৎ পায়ের কাছে কী যেন একটা ঠেকল। উঠিয়ে দেখে এ যে হাতিমার্কা কয়েন। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে বাজারে এখন লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এই কয়েন। আল্লাহ বুঝি এইবার রহমত দিলেন মফিজকে। খুশিতে আত্মহারা সে। আচ্ছা শেষমেশ কপালে সইবে তো হঠাৎ পাওয়া সুখ?
মফিজের হাতি মার্কা টাকা পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছে গোটা গ্ৰামে। রাতের অন্ধকারে বুভুক্ষু গ্ৰামবাসী ছেলে, মেয়ে, বাচ্চা, বুড়ো সবাই এসে এক যোগে নিতাই কুন্ডুর পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাতি মার্কা টাকা খুঁজতে। যদি আরো কয়েকটা পাওয়া যায়! আশায় বাঁচে জীবন। এই মানুষগুলো গরিবের মধ্যেও আরও গরিব, অসহায়ের মধ্যেও বেশি অসহায়। তাই নিজেদের ইজ্জতের চিন্তা না করে এরা খুঁজে চলেছে পুরো পুকুর। সবাই নগ্ন শরীর, মনে শুধু পাওয়ার লোভ। কিন্তু নিতাই কুন্ডু জানলে এত সহজে ছেড়ে দেবে এদের?
পরানের সংসারে অভাবের শেষ নেই। দুবেলা নুনভাত ও ঠিক করে জোটে না। আজ সবাই মিলে যখন নিতাই কুন্ডুর পুকুরে হাতি মার্কা টাকা খুঁজতে গেছে, পরান ফন্দি করে মকবুলকে নিয়ে নিতাই কুন্ডুর বাড়িতে চুরি করবে। এক বস্তা করে চাল পেলেও শান্তি কয়েকদিন। পুকুর পাড়ের ঝামেলায় কেউ বোধহয় বাড়ি নেই নিতাইয়ের। পরান এবং মকবুল চলেছে উঃ চুপি চুপি। ধরা না পড়লেই হলো।
নিতাইয়ের ছেলে গোপাল বাবার করা অধ্যায়গুলো সহ্য করতে পারছে না। গোপাল ঠিক করেছে এই অসহায় গরিবদের পাশে থাকবে সে। বাবার মতো রক্তচোষা হবে না সে।
বিষ্ণুপুর গ্রামের এরপর কী হবে রয়েছে মনে প্রশ্ন। পালট মুদ্রায় পাল্টে যাবে কার কার ভাগ্য দেখা যাক তবে।
🧺পাঠ প্রতিক্রিয়া:
শাহযাদ ফিরদাউসের লেখার সাথে এই প্রথম পরিচয় আমার। এর আগে ওনার বইগুলো সম্পর্কে শুনেছি বটে কিন্তু পড়ার সুযোগ হয়নি তাই ধারণা ছিল না ওনার লেখনী কেমন হতে পারে। তবে যারা বইটি পড়তে সাজেস্ট করেছিল তাঁরা বলেছিল লেখার গভীরতা খুঁজে পাবো। ধৈর্য্য ধরে পড়তে হবে।
বইটি পড়ার পর আসলেই মনে হয়েছে লেখনীতে গভীরতা আছে। শব্দচয়নে ভারিক্কি গোছের ভাব আছে। শুরুতে প্রবন্ধ টাইপের লেখা মনে হবে। তবে এই বইয়ে লেখক যেভাবে শাসন এবং শোসনের কথা তুলে ধরেছেন বেশ ভালো লেগেছে। একটা প্রিয় লাইন আছে এই বইয়ে এখন আমার।
"দুনিয়ার একটা লোকও যদি খিদেয় কাতরায় আর কেউ যদি তা জেনেও ভাতের দলা মুখে পোরে তো সে হলো খুনি"
কী গভীর একটা কথা ভাবুন তো! আমরা প্রতিদিন কত খাবার নষ্ট করি। খেতে না পারলেও বেশি করে নিয়ে প্লেটে এঁটো করে রাখি। আমরা কী সেইসব ক্ষুধার্ত মানুষদের চোখে খুনি নই? অবশ্যই খুনি। আমরা খুন করি তাঁদের রিজিক। যেটুকু তাঁরা হয়তোবা কোনো এক উপায়ে খেতে পেত।
ভালো লেগেছে বইটি। গভীরে অনেক নিগুঢ় কথা চাপা পড়ে যায়। চাপা পড়ে যায় ক্ষুধার্তদের আর্তনাদ। পেটের ক্ষুধার কাছে বিক্রি হয় সম্ভ্রম। আচ্ছা কিছু মানুষদের জন্য বেঁচে থাকাটা এমন লড়াই করা কেন?
২০২৫ রিভিউ বিষয়: বই রিভিউ: ৭৮ বই: পালট মুদ্রা লেখক: শাহ্যাদ ফিরদাউস প্রকাশনী: কবি প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা জঁরা:
লোভ আর লালসা মানুষকে ঠিক কোথায় নামাতে পারে? জমি কেড়ে নেয়া, ন্যায্য মূল্য না দেয়া, খাঁটিয়ে মেরে ফেলা, একবেলা পেটপুরে খেতে না দেয়া, আরো কত হিসাব আছে। সে হিসাবের মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠে কী বদলে যায় কিছু?
“দুনিয়ার একটা লোকও যদি খিদেয় কাতরায় আর কেউ যদি তা জেনেও ভাতের দলা মুখে পুরে তো সে হলো খু\\নি”। এই হিসেব করলে আমরা প্রত্যেকেই খু\\নি।
ক্ষুধায় কাতর ভানু পাল, ঠিক কবে আর কীভাবে ভুনো-শুয়োর হয়ে গেল, সে হিসাব কেউ কোনদিন করতে পারবে না। কারন তার দায় একজনের নয়, অনেকের। পূর্ণিমার চাঁদ ভুনোর কাছে ঝলসানো রুটি মনে হয়নি, সেই ৯ বছর বয়সে দুইবার কষে লাথি খাবার পর থেকে মানব খাদ্য তার কাছে অচ্ছুৎ কিছু। মুঠো মুঠো দোআঁশ মাটি আর চাপড়া ঘাসের মূল তার আহার। নিজে খায়, গাঁয়ের শূকরদের ও তুলে তুলে দেয়। বাবা মা, সেই কবেই জন্ম দিয়ে পরপারে গেছে, কোন এক সম্পর্কের নিতাই কুন্ডুর আশ্রয়ে আসে দুমুঠো ভাতের আশায়। কিন্তু আশার বদলে লাথি খেতে হয় তাকে... একবার হুট করে বছর দুয়েক, তার ভাগ্য ফিরেছিল। কিন্তু ওই যে হিসাবের মুদ্রা উলটে যায়। ও পিঠে কী আছে, কেউ জানিনা। ভুনোর ভাগ্য কবে ফিরবে আবার?
শোষক নিতাই এর পুকুরে মাছ ধরছে গিয়ে একটা খুব দামী মুদ্রা পায় মফিজ। ১০০ টাকা থেকে সেই মুদ্রার দর উঠে যায় বারো লাখ। এই বারো লাখ টাকার বদৌলতে সে কি এবার নিতাই এর চেয়েও বড় জমিদার হয়ে যাবে? ক্ষুধাক্লিষ্ট মকবুল আর পরাণ, ক্ষুধার তাড়নায় আর ভুনোর মত বুনো হতে না পেরে সিদ কাটার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু আনকোরা এই দুই জন ধরা পড়ে গেল। এর পরের গল্প? ঘর শত্রু বিভীষণ বলে একটা কথা আছে, নিতাই এর খুব কাছের কেউ তার ঘরে আগুন দেয়। গোপাল, নিতাই এর ছেলে, এম এ পাস, এই ছাই পাশ বই পড়ে, বই পড়ে কবে আর কী হল? তাই না?
মুদ্রার এপিঠে সুখ, ওপিঠে দুঃখ। এ পিঠে অনাহার ক্লিষ্ট মানুষকে ব/লা।তকার করতেও যেমন নিতাই এর বাঁধে না, শ শ মানুষের সামনে উলঙ্গ হয়ে লাভের আশায় আর লোভের আশায় পুকুরে নামে, নারী পুরুষ অন্য পিঠে। ঠিক কোন পিঠে আছে সুখ?
টস করার জন্য মুদ্রা বা পয়সা আমরা কে না ব্যবহার করেছি, করি? বিন্যাস সমাবেশের অংকেও সেই এ পিঠ ও পিঠের হিসাব। কিন্তু জীবনের ক্ষেত্রে কোন পিঠেই হিসাব মেলে না, ও পিঠে দুঃখ থাকলে, এ পিঠে সুখ থাকবে? ও পিঠে সুখ খুঁজতে গিয়ে, আগুনে পুড়তে দেখে নিজের ঘর কেউ, এ পিঠে ঘাসের মূল খেয়েও দিব্য বেঁচে থাকে ভুনোর মত মানুষেরা।
বইটা বেশ ছোট্ট, কিন্তু এর নিগুঢ় অর্থ বড়। কল্পিত গল্প হলেও সত্যি এরকম ঘটনা ঘটে আজো, অতীতেও ছিল, ভবিতব্যও এই। নিতাইয়ের মত শোষকের কো�� বিনাশ হবে না, আবার ভুনোদের মত মানুষও বেঁচে বর্তে থাকবে দিব্য। খেয়ে হোক না খেয়ে হোক। মুদ্রার ঘটনাটা অনেক বড় সময় ধরে নাই আবার পুরো বই জুড়েই আছে। এই ব্যাপারটা অসাধারন ছিল। বইয়ের নামকরণের মত মুদ্রা গল্পের শুরু থেকেই আসে নি, বা হুট করে শেষ ও হয়ে যায় নি। এ পাশ থেকে হিসেব করলে মুদ্রার ওপাশে পালট মুদ্রা।আবার উল্টোটাও ঘটা সম্ভব। বইটাতে অতিরিক্ত কোন বর্ণনা ছিল না, কোন কিছু লুকানো না, যা বলার লেখক একেবারে সোজাসাপ্টা বলে দিয়েছেন। বর্ণনা করেছেন, পালট ওলট দুই পাশের মুদ্রারই গল্প বলে গেছেন সমান তালে।
শেষ অংশটার শক্তি অনেক, প্রতীকী হিসেবে ধরলেও এক, না ধরলেও এক অন্য গল্প বলে ঐ অংশটা। চমকে ওঠার মতই।
বইটা ২০১৭ সালের মুদ্রণ, কিছু মুদ্রণ প্রমাদ ছিল, বানানে টুকটাক ভুল ছিল, এইগুলো বুঝে নেয়া যায়, সমস্যা হয়নি। সব মিলিয়ে অসাধারণ এক গল্প আর লেখার কী সুন্দর ধাঁচ।
যেকোন উপন্যাসের সুন্দর নামকরণে লেখকের জুড়ি নেই তা বরাবরের মতই প্রমাণিত। গল্পের বিষয়বস্তুতে দরিদ্র শোষিত শ্রেণির ধনীদের কাছে বারবার অত্যাচারিত হওয়া, শোষিত হওয়াকেই তুলে ধরেছেন। কিছুটা গতানুগতিক গল্প বলে মনে হলেও গল্প বলার ধরণই একে আলাদা করে দিয়েছে অনেকভাবে।
ক্ষুধার কষ্ট, দারিদ্র্য আর নির্যাতন মানুষকে কখোনো কখোনো পশুদের কাতারে নিয়ে যেতে পারে। পশু যেভাবে ক্ষুধা মেটায় সেভাবে একজন মানুষও ক্ষুধা মেটাতে পারে। সেখান থেকে উঠে আসতে পারে বিপ্লব। বিপ্লব কী সত্যিই আসে? গরীব জনতা কী কখোনো একজোট হতে পারে? তাদের উপর চলমান নির্যাতন কী কখোনো বন্ধ হয়? মুদ্রা কি পাল্টে যেতে পারে? কারো ধন-সম্পদ কী মুহূর্তে আরেকজনের হাতে চলে আসতে পারে রাতারাতি? নাকি গরীব মানুষ দিন শেষে গরীবই থেকে যায়? খালের ঘোলা জলে লাশ হয়ে ভেসে উঠাই কী নিয়তি? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে উপন্যাস এগিয়ে যায় কখোনো ভুনো, কখোনো গোপাল, নিতাই, মফিজ, মানিক, মকবুল, পরাণ আবার কখোনো অন্যান্য চরিত্রের হাত ধরে।
সবকিছুরই হয়তো শেষ থাকে গল্পে বা উপন্যাসে। সব অনাচারের শেষ হতে পারে? তবু কী “মানুষের বাঁচতে চাওয়া ছোটখাট একটা অন্যায়?” হতে পারে? এই একটা বাক্য কিংবা একটা প্রশ্নই পাঠককে থমকে দিতে পারে। আর পুকুর চুরি ধরবার সময় নারী এবং পুরুষদের উপর চালানো নির্যাতন নিদারুন বিবমিষার জন্ম দেবে নিশ্চিত। দিন শেষে মাথায় বারবার বাজবে “দুনিয়ার একটা লোকও যদি খিদেয় কাতরায় আর কেউ যদি তা জেনেও ভাতের দলা মুখে পোরে তো সে হল খুনী।”
বিত্তবান গরীবের সমস্ত কিছু কেড়ে নিলে সেটা চুরি হয়না, কিন্তু সেই চুরির সম্পদে গরীবের হাত পড়লে চুরির দায়ে শাস্তি হয়।গরীব, দুর্বল মানুষের বেচেঁ থাকা কি ছোট মত অন্যায়? কিন্তু মরাটা আরো বড় অন্যায়। সভ্যতার এই অন্যায় নিয়ম ভাঙতে কি উল্টো পথে যেতে হবে মনুষ্যত্বকে?