পাহাড়, সাগর, প্রাসাদ আর বিপরীত-আবহাওয়ার সেই সহাবস্থান পৃথিবীর খুব বেশি শহরে নেই- যা আছে ইস্তাম্বুলে। এর নাম থেকে শুরু করে ইতিহাস পর্যন্ত সব কিছুতেই বৈচিত্র্যের সমাহার। মনে হয়, এত পরস্পর-বিরোধিতার সমুজ্জ্বল উপস্থিতি দুনিয়ার আর কোন নগরীতে নেই। প্রাচ্যের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী রাজাদের এই রাজধানী যেন স্বপ্নের শহর! বলা হয়, পৃথিবীর ইতিকথা যদি শুনতে চাও-- ইস্তাম্বুলের মাটিতে কান পাতো। যেদিকেই আমি চোখ ফেরাইঃ সেন্ট সোফিয়া কিংবা ব্লু মস্ক, টপকাপি প্রাসাদ কিংবা গ্র্যান্ড-বাজার-- বিমোহিত হয়ে পড়ি। অতীতের দিকে তাকালে দেখি- এখানেই সম্রাট দারিয়ুস, মহামতি আলেক্সান্ডার, ক্লিওপেট্রা, সালাদিন দ্য গ্রেট, মোহাম্মদ দ্য ম্যাগনিফিশেন্ট, অস্ট্রিয়-হাঙ্গেরী-জার্মান-রাশিয়ার দুঁদে সম্রাটেরা এসে ভীড় জমিয়েছেন। ভূগোল জুড়েও কী অপার বিস্ময়-- এটিই পৃথিবীর একমাত্র শহর, যা দুটো মহাদেশে অবস্থিত; দু’দুটো সাগরঃ ব্ল্যাক-সি ও মার্মারাকে যুক্ত করেছে এর বসফরাস-প্রণালী ঝুলন্ত ব্রীজ হবার আগ পর্যন্ত যে বারবার বিচ্ছিন্ন করেছে উচ্চাভিলাষী সেনানায়কদের অসংখ্য ষড়যন্ত্র! বসফরাসের দক্ষিণ প্রান্তে, গন্ডারের শিঙের যে শাখাটি ঢুকে গেছে ইস্তাম্বুলের ইউরোপীয় পেটে--‘দ্য গোল্ডেন হর্ন’- অনাদীকাল থেকে দোলা জাগিয়েছে সৌন্দর্য পিপাসু পর্যটকদের চেতনায়। বিচিত্র মানুষের বহুবিচিত্র রঙ-রূপ-ভাষা ছাড়াও এ শহরে আছে চা-কফি-শরাবের ঢালাও আয়োজন; প্রাচ্য-প্রতীত্যের মিলনের তীব্র চেষ্টা এবং কামাল আতাতুর্কের বিস্ময়কর নিরব উপস্থিতি। পর্দার আড়ালে কিছু ক্রন্দনধ্বনিও আছে, কিন্তু সেগুলো শুনতে চাইলে আপনার চেতনাকে পান্না দিয়ে রাঙাতে হবে।
লেখক ও কবি বুলবুল সরওয়ার পেশাগত জীবনে একজন চিকিৎসক ও শিক্ষক। অসাধারণ কিছু ভ্রমণকাহিনী রচনার জন্য অধিক খ্যাত হলেও গল্প, কবিতা, উপন্যাসেও তাঁর অবাধ বিচরণ। এছাড়া অনুবাদ সাহিত্যে তাঁর শক্তিশালী অবদান রয়েছে।
ভ্রমণকাহিনী খুব একটা পড়া হয় না। কি জানি কেন! কিন্তু যখনই পড়ি মন আর টিকে না। আর এর আগে পড়েছি তো কেবল মুজতবা আলী। আমার পড়া বুলবুল সরওয়ারের এটাই প্রথম বই। অনেকদিন থেকেই শুনছি তিনি খুব ভালো লিখেন। বিসাকের কল্যাণে একেবারে সামনে পেয়ে গেলাম। সত্যি বুলবুল সরওয়ার অসাধারণ একজন লেখক। এত সাবলীল ভাষা। আর একেক জায়গার বর্ণনা শুধু আছে তা না, সাথে আছে গল্পের ছলে ইতিহাস। ভ্রমণকাহিনী তখনই সার্থক মনে হয় যখন তা পড়ে মনে হয় আমিও সেই জায়গায় আছি। সেই হিসাবে ইস্তাম্বুল সার্থক, লেখক সার্থক। আর আমি নানা কারণে ঘুরাঘুরি করতে পারি না। তবে ইচ্ছা আছে টাকাপয়সা জমায় দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াবো। ইস্তাম্বুল আমার ঘুরাঘুরির লিস্টে থাকলো। বিঃদ্রঃ ভ্রমণকাহিনী পড়লে একটা কথা আমাকে খুব খোঁচায়। আমাদের দেশ ঘুরে কেউ কেন এরকম ভ্রমণকাহিনী লিখে না। আমার মনে হয় এটা আমাদের জন্যই খুব দরকারি।
বুলবুল সরওয়ার ২০০৪ এবং ২০০৮ সালে গিয়েছিলেন প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধনকারী তুরস্কে। সাধারণত তার ভ্রমণকাহিনিতে ভ্রমণের চাইতে ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি বেশি থাকে। এই বইতেও তার বিকল্প দেখিনি। তুরস্কের অতীত ইতিহাসের বর্ণনা যত বেশি ছিল ততটাই কম ছিল নিজে কেমন তুরস্ক দেখে এসেছেন তার বয়ান। অন্যান্য বইগুলোর চে' এটি যথেষ্ট বিরক্তিকর ছিল। লেখার কোনো ধারাবাহিকতা ছিল না। হঠাৎ হঠাৎ আজগুবি কিছু ছবি যোগ করেছেন বইয়ের পাতায় পাতায়। এই ছবিগুলোর সঙ্গে বইয়ের বর্ণনার কোনো মিল পাইনি।
মোটকথা বুলবুল সরওয়ারের সবচেয়ে খাপছাড়া, নিকৃষ্ট লেখনীর ভ্রমণকথা 'ইস্তাম্বুল'।
ইস্তাম্বুল । শুধু নাম না, জীবন্ত ইতিহাস । অবস্থানগত কারণে সবার লোভাতুর নজর একবার করে হলেও পড়েছে । নানা ধর্মের, গোত্রের, সংস্কৃতির, পেশার মানুষের চলাচল এখানে ছিল । আর এখনো আছে । দু এক লাইনে ইস্তাম্বুলের বিবরণ, উঁহু । অসম্ভব । বুলবুল সারোয়ারের লেখনীতে কিঞ্চিত পরিচয় উঠে এসেছে বারাঙ্গনা ইস্তাম্বুলের । লেখক ইতিহাসের প্রতিপদে বিচরণ করতে চেয়েছেন । করেছেনও বটে । চোখ ভরে দেখেছেন । আবেগের সাথে স্মরণ করেছেন ইতিহাসকে । ভ্রমণকাহিনী লেখা আর অন্য কাহিনী লেখার বিস্তর তফাত । মনের চোখে দেখে, রসের কালিতে মাখিয়ে, আবেগের কাগজে ফুটিয়ে তুলতে হয় । লেখক কার্পণ্য করেননি । সব মিলিয়ে দারুণ একটা উপাখ্যান ।
ইউরোপ আর এশিয়ার মিলনস্থল এই ঐতিহাসিক ইস্তাম্বুল নগরী। ঐতিহাসিক প্রেক্ষপটে বিবর্তনের পথে আজকের এই ঝমকালো নগরীরর সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন বুলবুল সারওয়ার। বুলবুল সারওয়ারের লেখা পড়লে মনে হবে যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি কি ঘটে চলেছে।