এখানের প্রত্যেকটি গল্পই ভৌতিক গল্প। তবে ভূত মানেই যে খারাপ তা নয়। এই গল্পগুলি মূলত কিশোরদের জন্য হলেও ছোটো থেকে বড়ো সবারই ভালো লাগবে আশা করি। আর আমার এখানের মধ্যে সবথেকে সেরা লেগেছে - "ধূর্জটিবাবুর প্ল্যানচেট" ও "শ্রাঙ্কেন হেড" গল্পদুটি।
শেষ করে ফেললাম হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তর 'আঁধার রাতের বন্ধু'। শিশু সাহিত্য সংসদ থেকে প্রকাশিত বইটির টার্গেট রিডার মূলত কিশোররা হলেও আমার মত শিং ভাঙা চিরকিশোরদেরও এই বই পড়তে মোটেই খারাপ লাগবে না।
এখন হিমাদ্রিকিশোর তাঁর লেখা ইতিহাসভিত্তিক কাহিনির জন্য পাঠকমহলে বিপুল সমাদৃত হলেও নিজেকে একটি মাত্র ধারায় তিনি আটকে রাখেননি। এই গল্প সংকলন হল তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। প্লট নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিচিত্র বিস্তার পাঠককে রীতিমত ভাবতে বাধ্য করবে। আমার ব্যক্তিগত মতে এটাই হিমাদ্রিকিশোর বাবুর সবথেকে শক্তিশালী জায়গা।
'বিকেলের আলোয়' ভূতের গল্প হলেও মানবিক পেলবতা প্রতি বাক্যে ফুটে উঠেছে। এক্ষেত্রে ভয় লাগার জায়গা আছে বলে আমার মনে হয়নি। বরং বন্ধুত্ব যে মরনের পরেও অমর হতে পারে তা চরিত্রগুলি প্রমাণ করেছে। বাস্তবে মূল্যবোধ জাগাবার জন্য এমন মর্মস্পর্শী গল্প ছোটদের পড়া খুব দরকার বলেই মনে করি।
দ্বিতীয় গল্প 'শ্রাঙ্কেন হেড'। এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ কাহিনি। লেখক যে কী নিখুঁত ভাবে ডিটেলিং করেছেন তা গল্পটি না পড়লে বোঝানো সম্ভব নয়। তাপস নামের এক যুবক চাকরি করে ক্যুরিয়র কোম্পানিতে, সে এক গ্রাহকের কাছে নিয়ে চলেছে বহু বছর গোডাউনে পড়ে থাকা একটি ক্যুরিয়র প্যাকেট। কী ঘটবে সেটা সাসপেন্সে না রাখলে গল্প, গল্পের পাঠক এবং লেখকের প্রতি অন্যায় করা হবে। 'হরর' বলতে মোটামুটি ৯৯% বাঙালি 'ভূত' বোঝে, এখানে এক ভূত আছে বটে, কিন্তু ঠিক হরর এলিমেন্ট বলতে যা বোঝায় তা ভরপুর। গল্পটা পড়ে আমি হিমাদ্রিকিশোর বাবুকে হরিফিকিশোর বলে ডাকব ঠিক করেছি। ৮ থেকে ৮০ সবার জন্য, পড়ুন।
'সাত নম্বর খাদান' বেশ স্টিরিওটাইপড। এই গল্পগ্রন্থের দুর্বলতম গল্প বলে আমার মনে হয়েছে। তবে ছোটদের জন্য চলনসই বলা যায়।
'জগবন্ধুর হারমোনিয়াম' গল্পে আবার ভয় ভাব ফিরে এসেছে। ভীতির দ্রুত ওঠা পড়াকে কাজে লাগিয়ে লেখক বাধ্য করেছেন বইয়ের পাতায় চোখ সেঁটে রাখতে। টার্গেট রিডারদের জন্য একদম পারফেক্ট স্টোরিলাইন।
'ধূর্জটিবাবুর প্ল্যানচেট', 'মৃত্যুযোগ' অনেকাংশে সত্যজিৎ ঘরানার গল্প। বাঁধুনি বেশ ভালো। আর ঘুরে ফিরে হিমাদ্রিদার প্লটের তারিফ না করে পারছি না। হরর ব্যাপারটা ছেলে বুড়োর মধ্যে সংক্রামিত করা বাঁ হাতের খেলার মত দেখিয়েছেন লেখক। 'শ্রাঙ্কেন হেড' যদি হিরে হয়, তবে 'মৃত্যুযোগ' হল মাণিক। শুধু এই দুটি গল্পের জন্যই বইটি পড়া যায়।
বলার অপেক্ষা রাখে না 'আঁধার রাতের বন্ধু' গল্পের সূত্রে বইটির নামও আঁধার রাতের বন্ধু হয়েছে। ভৌতিক প্লটের থেকেও এখানে সামাজিক এক সমস্যাকে তুলে ধরা হয়েছে। লেখা নির্বাচনের সময় এক পত্রিকা সম্পাদকের পক্ষপাতিত্বের কাহিনি। শুরুটা যেমন মুল্যবোধের গল্প দিয়ে ছিল, শেষটাও তা-ই।
পাঠ অভিজ্ঞতা বেশ ভালো বলা চলে। প্রচ্ছদ আমার পছন্দ হয়নি। গল্পের মানানুসারে আরও যত্নবান হয়ে ইলাস্ট্রেশন করা যেত হয়ত, তবে আমি আর্ট ব্যাপারটা কম বুঝি।
শিশু সাহিত্য সংসদ স্বল্পমূল্যে যেভাবে নামজাদা লেখকদের গল্প দুই মলাটে আনছে সেটা কাবিল - এ -তারিফ!
এই গল্প-সংকলনটিতে যেসব গল্প আছে তারা হল: o বিকেলের আলোয় o শ্রাঙ্কেন হেড o সাত নম্বর খাদান o জগবন্ধুর হারমোনিয়ম o ধূর্জটিবাবুর প্ল্যানচেট o মৃত্যুযোগ o আঁধার রাতের বন্ধু
ভূত আর রহস্য মেশানো এই গল্পগুলো বিভিন্ন শিশু-কিশোর পত্রিকায় প্রকাশের সময়েই পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছিল| পরবর্তী সময়ে এর মধ্যে কয়েকটি রেডিওতে গা-ছমছমে নাটকের রূপে পরিবেশিত হয়েছে| সেই লেখাগুলো এই সুমুদ্রিত এবং অবিশ্বাস্য-রকম সস্তা হার্ডকভারের মাধ্যমে আমাদের কাছে তুলে ধরার জন্যে শিশু সাহিত্য সংসদ-কে কৃতজ্ঞতা জানাতেই হয়|