Jump to ratings and reviews
Rate this book

ডানাওলা মানুষ

Rate this book
প্রচ্ছদ - গৌতম দাশ

Awarded the Sahitya Akademi Yuba in 2011,this book is a collection of 15 short-stories where the main theme is the loneliness prevalent among mankind nowadays. A compelling view focussing on the darker aspects of life

240 pages, Hardcover

First published January 1, 2009

5 people are currently reading
71 people want to read

About the author

Binod Ghoshal

38 books26 followers
বিনোদ ঘোষাল-এর জন্ম ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ হুগলি জেলার কোন্নগরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। মফস্‌সলের মাঠঘাট, পুকুর জঙ্গল আর বন্ধুদের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা আর অভিনয়ের দিকে ঝোঁক। গ্রুপ থিয়েটারের কর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। কর্মজীবন বিচিত্র। কখনও চায়ের গোডাউনের সুপারভাইজার, শিল্পপতির বাড়ির বাজারসরকার, কেয়ারটেকার বা বড়বাজারের গদিতে বসে হিসাবরক্ষক। কখনও প্রাইভেট টিউটর। বর্তমানে একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত। নিয়মিত লেখালেখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ২০০৩ সালে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্প। বৃহত্তর পাঠকের নজর কেড়েছিল। বাংলা ভাষায় প্রথম সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার প্রাপক। ২০১৪ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমির সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার। তাঁর একাধিক ছোটগল্পের নাট্যরূপ মঞ্চস্থ হয়েছে।

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
14 (41%)
4 stars
11 (32%)
3 stars
4 (11%)
2 stars
3 (8%)
1 star
2 (5%)
Displaying 1 - 13 of 13 reviews
Profile Image for Ësrât .
515 reviews89 followers
June 11, 2021
পুরস্কারপ্রাপ্ত গল্পের গালভরা সব প্রশংসা বানীতে ভোলার মতো বয়স পেরিয়ে আসার আত্মতুষ্টি মূলক অহংকার আমার যখন মাঝেমধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তক্ষুনি এমন কয়েকটা দাগা খেয়ে ধরনীতে দ্রুতই ফিরে আসি।

ডানাওলা মানুষ পড়তে বেশি না,গুনে গুনে পনেরোটা গল্প শেষ করেছি ছয়টি মাস ধরে পড়ার পরে।

কিছুটা কাবি‍্যক,কিছুটা অবাস্তবের সাথে বাস্তবতার মিশেল,রোজকার জীবনযাত্রার অলিগলি ঘুরে ঘরে এসে ভাতঘুম দেওয়ার পর সেই নয়টা পাঁচটার জীবনে অভ্যস্ত হওয়া সমাজের গল্প বিনোদ ঘোষাল কলমের কালি দিয়ে বিনি সুতার মতো বুনেছেন।

পড়ে প্রাপ্তির ভরে বেশ বলার আগেই শেষ পর্যন্ত যে এ বিষয়ে শেষ হয়েছে এতেই এ অভাগা অশেষ আনন্দিত।

রেটিং:🌠🌠🌠
11/06/21
Profile Image for Gourab Mukherjee.
164 reviews23 followers
April 7, 2021
সোজা কথা বলি আপনার "#জীবনমুখী গল্প" ভালো লাগল হয়তো খানিক ভালো লাগবে। আমি sci-fi, fantacy এই সেই ভেবে কিনেছিলাম। কিছুই হল না।

🌀 আর্ট ফিল্ম দেখলে যেমন হয় এই বই তেমন অনেকটা। Girlfriend এর সাথে Leonardo DeCaprio র Revenant দেখতে গেছিলাম। সে কি অভিনয়, বিশাল অভিনয়, একদম অস্কার লেভেলের। কিন্তু এক ফোঁটা ভালো লাগেনি, উল্টে বিরক্ত হয়েছিলাম। কারণ গল্প সেই একদম সাদামাটা কিছুই নেই।

🌀এই বইও তাই। কিছু গল্প একটু একটু আধটু ভালো লেগেছে। তবে এমন কিছু অসাধারণ না।
("সাধারণের ভিতরেও অসাধারণ খুঁজে নিতে হয়" ধরনের ফ্রী জ্ঞান কেউ দিতে এলে বই ছুঁড়ে মারবো বলে রাখলাম।) বেশির ভাগই সেই কিরকম কি একটা হয়ে গিয়ে শেষ হয়ে গেল। হয়তো গল্পের বিশাল ভাবার্থ, রূপক অর্থ হ্যানা ত্যানা আছে, আমি মুঃখু মানুষ বুঝতে পারিনি। মোদ্দা কথা ভালো লাগেনি। এই অ্যাওয়ার্ড সেই অ্যাওয়ার্ড কত কি পেয়ে বসে আছে বই এদিকে।

🌀বাংলার ক্লাসে সেই "পর্দার রং নীল" দিয়ে কবি কি বোঝাতে চেয়েছেন? ধরনের প্রশ্ন যেন। আরে আমি কি করে জানবো কি বলতে চেয়েছেন?🤷🏻‍♂️
না, উত্তর হল "এর মাধ্যমে কবি তার একাকীত্ব বোঝাতে চেয়েছেন।"
আরে এ কি করে হয়? এ আবার কেমন কথা। পর্দা থেকে একাকীত্ব? আরে চলছে কি?
উত্তরে আঁতেলরা বলবেন "না, তোমার আসলে কল্পনাশক্তি খুব কম।" 🥸🥸
আরে ধুর মশাই, আমার কল্পনা আপনার হাজার গুণ,😮‍💨 আমি শুধু আপনার মত আনাড়ি নই যে নিজের অনুমান টাকেই ঠিক ঘোষণা করে দেব।
আমি যদি বলি কবি বলতে চেয়েছেন "আমি একাকীত্ব কে লটকে দিয়েছি। আমি জিতে গেছি।" বা "একাকীত্ব আমার দর্শনকে আবছা করে দিলে তাকে আমি টেনে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখি।" 🙄🙄 তাহলে? কোন ব্যাখ্যাটা এর মধ্যে ভুল? না, স্যার যেটা বলেছেন ওটাই লিখতে হবে। 🤷🏻‍♂️
আমি হাজারটা সম্ভাবনার মধ্যে কনফিউজড থাকা বেশি পছন্দ করি। একটা random event কে একদম sure ঘোষণা করে দেওয়ার ঔদ্ধত্য আমার নেই, তাই ওই গল্পের মানে বোঝাও আমার হল না। 🙏🙏 কি সব অং বং চং। 😒😒
Profile Image for Nisha Mitra.
141 reviews40 followers
April 8, 2021
কিছু কিছু গল্প পাতি বাংলায় মাথার ওপর দিয়ে গেল। যেমন ডানা গল্পটা। আমার বোঝার অক্ষমতা বোধ হয় নয় তো .. আচ্ছা যাক। প্রতি গল্পের শুরুটা আশাব্যঞ্জক হলেও শেষ গুলো কেমন হতাশাজনক। বুঝতে না পারলে বোধহয় হতাশ বেশি লাগে। ছোটগল্পের টুইস্ট নামক বস্তুটিও অনুপস্থিত। আমার ভালো লাগেনি। যে কটি গল্প মনে থাকবে তার মধ্যে "একটি প্রলাপের জন্ম " আর "শূন্যস্থান" থাকবে।
Profile Image for Preetam Chatterjee.
7,232 reviews391 followers
July 7, 2025
অবশ্যপাঠ্য এক গদ্যসংকলনের অন্তরঙ্গ পাঠপ্রতিক্রিয়া
বই: ডানাওলা মানুষ
লেখক: বিনোদ ঘোষাল
প্রকাশক: পত্রভারতী


“There are books full of great writing that don't have very good stories. Read sometimes for the story... don't be like the book-snobs who won't do that. Read sometimes for the words—the language. Don't be like the play-it-safers who won't do that. But when you find a book that has both a good story and good words, treasure that book.” ― Stephen King

"গল্প বলতে জানেন?"—এই প্রশ্নের জবাবে যদি কেউ নিঃসঙ্কোচে বলেন ডানাওলা মানুষ, তাহলে বিনোদ ঘোষালের নাম উঠে আসে সেই বিরল সাহিত্যিকদের তালিকায়, যাঁরা গল্পের দেহে প্রাণ সঞ্চার করেন, আবার সেই প্রাণের ভিতরে রেখে দেন এক বর্ণিল, বেদনার্ত, জীবন্ত গল্পছাপ। তাঁর কলমে কাহিনি শুধু বাঁধা থাকে না—তা হাঁটে, ভাবে, নিঃশ্বাস নেয়।

পনেরোটি গল্পে গঠিত এই সংকলন যেন পনেরোটি আয়না—যার প্রতিটির কাচে কখনও সময়ের মুখ প্রতিবিম্বিত হয়, কখনও উঠে আসে শহরের ছেঁড়াফাটা গলি, কখনও আবার একেবারে গোপন কোনো অন্তর্গত ব্যথা, যে ব্যথা আমরা বলি না, কিন্তু লেখকের কলমে ঠিক ভাষা খুঁজে পায়।

এই গল্পগুলি এমন এক ভাষার গায়ে ভর করে চলে, যেটি স্পষ্ট অথচ কাব্যিক, মাটি ছোঁয় কিন্তু আকাশ চায়। যা ভাবায়, কখনো কাঁদায়, কখনো শুধুই স্তব্ধ করে দেয়। এগুলির চরিত্ররা আমাদের আশেপাশের মানুষ—বাসে, শ্মশানে, পার্কে বা অফিসে দেখা হয় যাঁদের সঙ্গে, কিন্তু আমরা যাঁদের চোখের গভীরে উঁকি দিতে পারি না। ঘোষাল সেই উঁকিটা আমাদের দিয়ে যেতে পারেন। এবং একবার দেখা হয়ে গেলে, আর ভোলা যায় না।

ডানাওলা মানুষ সেই বিরল বই, যেটি স্টিফেন কিংয়ের সংজ্ঞায় অনায়াসে উত্তীর্ণ হয়—চমৎকার ভাষা এবং অসামান্য গল্প, দুয়েরই মহামিলন।

এমন বই শুধু পড়ার জন্য নয়, —এমন বই লালন করতে হয়।

শিরোনামেই ইশারা

ডানাওলা মানুষ—এই নামটাই যেন পাঠকের মনে একরকম কল্পনার পালক লাগিয়ে দেয়। ডানা তো চিরকালই এক বহুরূপী প্রতীক—স্বাধীনতার, পলায়নের, উড়াল-ইচ্ছের কিংবা সীমা-ভাঙা কল্পনার। কিন্তু বিনোদ ঘোষালের গল্পে ‘ডানাওলা’ মানুষ মানে কেবল পরাবাস্তব নয়, বরং সেইসব মানুষ—যারা খুব সাধারণ ঘেরাটোপে থেকেও অসাধারণভাবে বাঁচে।

ওরা ঠিক আমাদেরই মতো—বাস ধরে, অফিস করে, দুপুরে ভাত খায়। কিন্তু কোথাও একটা ওদের ভিতরে এক রকম অতিরিক্ত জাগরণ থাকে—যা ওদের আলাদা করে তোলে। হয়তো ওরা সবার চোখে পড়ে না, কিন্তু একবার চোখে পড়লে আর এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

এই ডানাওলা মানুষেরা সমাজের একান্ত চেনা চৌহদ্দিকে অচেনা করে তোলে, দৈনন্দিনতার ক্যানভাসে এক টান দিয়ে বলে—"দ্যাখো, এইখানেও একটা অন্যরকম জীবন ঘটছে, জ্বলছে, উড়ছে।"

ঘোষালের গল্পগুলো তাই কেবল গল্প নয়, প্রতিটি যেন এক নিজস্ব জ্যোতির্বিজ্ঞান—যেখানে ডানার মানে পালানোর নয়, বরং ভেতরে থাকা স্বপ্নটাকে আকাশে ছুঁড়ে দেওয়ার সাহস।

একটু জীবনের বর্ণনা: শোকের শরীররেখা

বিনোদ ঘোষালের ‘একটু জীবনের বর্ণনা’ শুধু একটি গল্প নয়—এ এক নিঃশব্দ শোকযাত্রার ভাষ্য, যেখানে প্রতিটি বাক্য যেন শোকের শরীরে এঁকে দেয় অদৃশ্য অথচ তীব্র রেখাচিত্র। গল্পটি শুরু হয় এক অভূতপূর্ব স্বরে—"খাটে শোয়ানো মাকে কাঁধে নিয়ে..."—এ যেন কেবল একটি ক্রিয়া নয়, বরং জীবনের সমস্ত না-পাওয়ার ভার তুলে নেওয়ার এক অনুপম প্রতীক।

মাতৃবিয়োগের মুহূর্তকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আখ্যান যেন পাঠককে রমিতের ভিতরে প্রবেশ করিয়ে দেয়—তাঁর শোক, অসাড়তা, এবং সেই চোখের কোণে জমে থাকা অ���্রকাশিত কান্নার মধ্যে। লেখক এখানে আত্মস্মৃতি ও পরাবাস্তবতাকে এক অপূর্ব ব্যালেন্সে মিশিয়ে দেন। ‘একটি অচেনা মেয়ে’—যার চোখে জল নেই, মুখে কথা নেই, কিন্তু তার উপস্থিতি যেন এক নিরেট কাব্য। শ্মশানযাত্রার ছায়া আর সেই মেয়েটির নিঃশব্দ সঙ্গ সারা গল্পজুড়ে একটা রহস্যময় অতলতা তৈরি করে দেয়।

এই গল্পটি শুধুমাত্র মায়ের মৃত্যুর কথা বলে না, বলে হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে কীভাবে আমরা নিজের ভিতরকেও খুঁজে পাই—যেন কেউ আমাদের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কান্নাটিকে হাত বাড়িয়ে বলে, "তোমার চোখে জল নেই? আমিও কাঁদিনি।"

একজন পাঠক গভীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে লেখেন—“যে কান্নাটা সেদিন থেকে আটকে ছিল, সেটা এই গল্পটা পড়ে বেরিয়ে এসেছিল।” এই উক্তি কেবল পাঠ-প্রতিক্রিয়া নয়, বরং সাহিত্যের চূড়ান্ত পরিণতি—যেখানে লেখা পাঠকের অভ্যন্তরের বন্ধ দরজা খুলে দেয়।

এটি সেই ধরনের গল্প, যা পড়ার পর কোনোভাবেই সঙ্গে সঙ্গে অন্য গল্পে ঢোকা যায় না। এটা "একটু জীবনের" নামে শুরু হলেও আসলে জীবনের সেই গভীরতম স্তর যেখানে ভাষা থেমে যায়, এবং অনুভব একমাত্র ভাষা হয়ে ওঠে।

এমন গল্প বহুদিন মনে থেকে যায়—নির্বাকভাবে, ছায়ার মতো।

শূন্যস্থান: ভাসমান বাস্তবতা, অথবা ‘পায়ের নিচে মাটি কোথায়’

এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, আপনি আর ঠিকমতো মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই—আক্ষরিক অর্থেই ভাসছেন। শুধু আপনি নন, গোটা পৃথিবী যেন মাধ্যাকর্ষণের নিয়ম ভুলে গেছে, কিংবা নতুন এক নিয়মে আপনাদের ওজন মেপে দেখছে।

বিনোদ ঘোষালের ‘শূন্যস্থান’ গল্পটি প্রথমে পড়তে বিজ্ঞানের অলীক সম্ভাবনার মতো মনে হলেও, কিছুদূর যেতেই বোঝা যায়—এ আসলে সমাজের জড়িত ও জটিল মানচিত্রে এক সাহসী স্যাটেলাইট ভিউ। কে বেশি ভাসছে? কে কাছাকাছি মাটির? কেন?

এই "উচ্চতা" কেবল শারীরিক নয়—এ এক মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত। গল্পটি যেন নিঃশব্দে প্রশ্ন তোলে: আমরা যারা সমাজে একটু নিচুতে ভাসি—আমরা কি বেঁচে আছি বেশি ওজন নিয়ে? আর যারা ওপরে—তাদের কি হালকা, দায়মুক্ত, নৈতিকতাহীন হয়ে ওঠার সুবিধা আছে?

এখানে মাধ্যাকর্ষণ এক রূপক—নির্ভরতা, জড়তা, কিংবা বাধ্যতামূলক সংযুক্তির। আর তার উল্টোদিকে, ‘ভেসে থাকা’ মানে হয়তো মুক্তি নয়, বরং বিচ্ছিন্নতা।

গল্পটি ঠিক যেমন বাস্তব, তেমনই বিমূর্ত। এখানকার চরিত্রেরা আমাদের চারপাশেই থাকে, কিন্তু আজ তারা ওজন হারিয়েছে, মাটি ছুঁতে পারছে না। পাঠকের মনে প্রশ্ন জন্মায়—আমাদের সমাজ কি এমনই এক শূন্যস্থান, যেখানে সবাই ভাসছে, কিন্তু কেউই জানে না, নিজের অবস্থান কোন লেয়ারে?

এ গল্পটি শুধু কল্পবিজ্ঞান নয়। এ এক গভীর সংস্কৃতি-নির্মিত প্রশ্নপত্র, যেখানে পাঠকের উত্তর দেওয়ার কোনো সময়সীমা নেই—শুধু ভেসে থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

এক মানুষ, ছাই: চুল্লির ভেতর থেকে আত্মবিশ্লেষণের আততায়ী ভাষ্য

গল্পের শুরুতেই চরিত্রটি মৃত। সে শুয়ে আছে ইলেকট্রিক চুল্লির ভেতরে—জীবনের শেষ ও শেষতর স্তরে। অথচ গল্প শেষ হতে হতে বোঝা যায়, এ মৃত্যুর চেয়ে কত বেশি জীবন্ত এক স্বর! যেন মৃত্যুর আগুনে না পোড়াচ্ছে সে, বরং পোড়াচ্ছে তারই মধ্যকার অতীত, অপরাধবোধ, আত্মগ্লানি, নীরব অভিমান আর জমে থাকা না-পাওয়ার দীর্ঘ হিসেবপত্র।

গল্পটি পড়তে পড়তে মনে হয়, আমরা প্রত্যেকেই সেই চুল্লির ভিতরের মানুষ—যে চুপচাপ শুয়ে আছে, কিন্তু মনের ভেতর চলছে প্রবল বিশ্লেষণ, একরাশ কথার দাবানল। যেন আগুনের থেকে বেশি জ্বলছে এই আত্মকথন। তার পাশের চুল্লিতে শুয়ে আছে বাবাও—আর তাই গল্পটি হয়ে ওঠে জীবনের এবং উত্তরাধিকারের মধ্যকার একটি জ্বলন্ত সংলাপ।

এই গল্পে মৃত্যুর আগে ভেসে ওঠে ছোট ছোট মুহূর্ত:

কোনো অভিমানের কথা, কোনো বলার সুযোগ না-পাওয়া বাক্য, কোনো অসমাপ্ত ভালোবাসা, আর সেই চিরকাল বকে যাওয়া হিসেব— “কে কাকে কতটা ভালোবাসলো, কে কাকে বুঝলো না।”

গল্পটি মনে করিয়ে দেয়—প্রতিটি জীবন, যত নিস্তরঙ্গই হোক, তার শেষ লগ্নে এসে হয়ে ওঠে এক মহাকাব্য। আর সেই মহাকাব্যের সবচেয়ে জরুরি কাজ: নিজেকে বুঝে ফেলা।

শেষ মুহূর্তের সেই সংলাপ—জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানের ধোঁয়ার মতো ধূসর—তাতে লেখক যে আবেগ, ভাষা আর তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি এনেছেন, তা বাংলা ছোটগল্পে এক অনন্য সংযোজন।

এই গল্প পড়ে মনে হয়, মৃত্যুর আগেও যদি এত কথা বলার থাকে, তাহলে বেঁচে থাকতে কেন এতটা চুপ করে থাকি আমরা?

ডানাওলা মানুষ: স্বাধীনতার ডানায় ঈর্ষার ধোঁয়া

চন্দ্র—সে চাকরি করে না, জীবনকে নিয়মে বেঁধে রাখে না, নিজের মর্জিমাফিক চলে। অথচ ঠিক এই মানুষটাই—যাকে তথাকথিত সমাজ "অপ্রয়োজনীয়" ভাবতে পারে—বন্ধুদের পরিবারে নায়কের আসন পেয়ে যায়। তার গল্পের ঝুলি, তার সহজাত মুগ্ধতা, তার হালকা হওয়া—এসবই ধীরে ধীরে অন্যদের ‘সুশৃঙ্খল জীবনের ভিত’ কাঁপিয়ে দেয়।

এই গল্প নিছক চার বন্ধুর সান্দাকফু-ভ্রমণ নয়। এ আসলে স্বাধীনতা ও স্থিতাবস্থার এক স্নায়ুযুদ্ধ।
চন্দ্রের স্বাধীনতা যেন একটা আয়না—যেখানে তার পুরনো বন্ধুরা নিজেদের জীবনকে দেখে ফেলে। এবং ভয় পায়।

সে কি ঈর্ষা? নাকি অপরাধবোধের ছদ্মবেশে লুকোনো ক্ষোভ?
আমরা কি রেগে যাই চন্দ্রের উপর, নাকি রেগে যাই নিজের বেছে নেওয়া জীবনের সীমাবদ্ধতার উপর?

গল্পটি প্রশ্ন তোলে— “যে স্বাধীন, তাকে কি শ্রদ্ধা করতে পারি আমরা? না কি আমাদের সমাজে স্বাধীনতা মানেই ‘অবিশ্বস্ত’?”

“আমরা কি নিজেদের বন্দিত্ব ঢাকতে গিয়ে, অন্যের উড়ানকে ছাঁটাই করতে চাই?”

‘ডানাওলা মানুষ’ আসলে এক ধরনের বিপ্লব—শব্দের চেয়ে নিঃশব্দে উচ্চারিত।
চন্দ্র নিজে কিছু প্রমাণ করতে চায় না। কিন্তু তার অস্তিত্বই প্রশ্ন তোলে প্রমাণ-ভিত্তিক সমাজের অর্থহীনতার উপর।

গল্প শেষে পাঠকের মনে রয়ে যায় অদ্ভুত এক অনুভূতি—চন্দ্র কি শুধু একটা চরিত্র? নাকি সে প্রতিটি পাঠকের অবদমন করা ইচ্ছের প্রতিমূর্তি?

সে যে উড়তে পারে—এই সত্যটিই হয়তো সমাজ সহ্য করতে পারে না।

চক্ষুদান, দৃষ্টিবদল, প্রতি রবিবার: ঘরোয়া অথচ গভীর

এই তিনটি গল্প—আলো ঝলমলে কোনো ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছায় না, বরং একটা জানলা খুলে দেয়—সোজা মধ্যবিত্ত বাঙালির ঘরের ভিতরে। ডাইনিং টেবিল, বারান্দার তুলসিতলা, পুরোনো ক্যালেন্ডারের পাশে ঝোলানো প্লাস্টিক ফুল—এই গল্পগুলো সেই সমস্ত জায়গায় দাঁড়িয়ে শোনে নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসের ভাষা।

‘চক্ষুদান’-এ পুরোনো রিষড়ার বাড়ি ছাড়তে না চাওয়া এক মা—যার স্মৃতি আসলে তার সংসারের শেষটুকু আঁকড়ে থাকা—লড়ছে আধুনিক জীবনের প্র‍্যাকটিক্যাল চাহিদার সঙ্গে। মা আর ছেলের মধ্যেকার ওই সূক্ষ্ম টানাপোড়েন, গৃহত্যাগ বনাম গৃহমায়ার দ্বন্দ্ব—পড়তে পড়তে মনে হয়, আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে একটা করে ‘পুরোনো বাড়ি’ রয়ে গেছে।

‘দৃষ্টিবদল’ যেন এক গৃহস্থ নাটক, যেখানে ভালোবাসা নেই, নেই প্রকাশ, নেই আলো। আছে শুধুই ক্লান্ত এক নারী—মিতা—যে ধীরে ধীরে জীবনের ভেতরে কেমন করে একা হয়ে গেছে। এই গল্পে কোনো বিস্ফোরণ নেই, কিন্তু নিঃশব্দ বিসর্জনের শব্দ শোনা যায় বারবার।

‘প্রতি রবিবার’ একটু ব্যতিক্রমী গঠনের গল্প। বিভিন্ন দম্পতির দৈনন্দিনতা—একেকটা জীবনের কোলাজ। কেউ রেসিপি-ভিত্তিক ভালবাসায় আটকে, কেউ আবার টিকে আছে নিছক অভ্যেসে। এখানে ‘রবিবার’ মানে শুধুই ছুটির দিন নয়—এ এক স্থির বিষণ্নতার প্রতীক, যেখানে সম্পর্কগুলো নিঃশব্দে ফেটে পড়ে, আবার জোড়া লাগে… অথবা লাগেও না।

এই তিনটি গল্পের মধ্যে কোনওটিই চমকে দেওয়ার জন্য লেখা নয়। কিন্তু তারা যে বাস্তবতায় মোড়া, তা পড়তে প��়তে পাঠকের নিজের ঘরের আলো-আঁধারিতে প্রতিধ্বনি তোলে।

এরা ‘ছোট গল্প’ নয়—এরা ‘নিজের গল্প’।

আত্মবিষ, একটি প্রলাপের জন্ম, যে জীবন আমা��ের: সমাজের ক্যানভাসে চরিত্রচিত্রণ

ঘুষ, বিকৃত স্বপ্ন, ভাঙা সম্পর্ক, আর প্রান্তিকতায় ঠেলে দেওয়া মানুষ—এই তিনটি গল্প একত্রে যেন এক পরিত্যক্ত দেয়াল, যেখানে সমাজ তার ছায়ামূর্তিগুলো আঁকে।

‘আত্মবিষ’-এ ঘুষের টাকায় ফুলে ওঠা এক আত্মসন্তুষ্ট বাবা, যার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে তার নিজের সন্তানের ছত্রভঙ্গ জীবন। টাকা যখন হয়ে ওঠে নেশা, তখন সেই নেশার বিষ কোথা থেকে ছড়ায়—উত্তর খুঁজতে পাঠককে যেতে হয় ছেলেটির বাইক দুর্ঘটনার আগে-পরের সুনসান মুহূর্তে।

‘একটি প্রলাপের জন্ম’ কোনো সোজাসাপ্টা কাহিনি নয়। এ এক মানসিক বিপর্যয়ের ডায়েরি, এক নগরবন্দি ভাই-বোনের পাগলামো, যারা নিজেরাই জানে না—কে বেশি ভাঙা, কে বেশি বেঁচে। শব্দের ভিতর শব্দ, এককালের শিশুকান্না আজ শব্দহীন লেখায় রূপ নেয়।

‘যে জীবন আমাদের’ গল্পটি যেন মধ্যবিত্ত দাম্পত্যের সেই ঘরে ঢোকে, যেখানে দীর্ঘশ্বাস জমে রক্ত হয়ে যায়। সন্তানহীনতার দায়, পুরুষের অহং, আর এক পরিতক্ত ভদ্রলোকের নিঃসঙ্গ শিল্পপ্রেম—এই গল্প যেন দু’জোড়া সম্পর্কের দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে পড়ে একই প্রশ্ন তোলে:
ভালোবাসা মানে কি শুধু চাহিদা, না কি সম্মানও?

এই গল্পগুলো ভাষার গয়না পরে না—এরা কাঁচা চামড়ায় লেখা।

শব্দ নয়, চরিত্ররা যেন আত্মা দিয়ে কথা বলে। এবং কথা শেষ হলে, বুকের ভিতরে রেখে যায় কিছু না-পড়ানো বাক্য, কিছু না-বলা হাহাকার।

ভাষায় সিনেমার পর্দা: বিনোদ ঘোষালের চিত্রনির্মাণ

Flannery O’Connor বলেছিলেন, “the ability to create life with words is essentially a gift.” বিনোদ ঘোষাল সেই বিরলদের একজন, যাঁর কলম শব্দকে রঙ করে, বাক্যকে ফ্রেমে বাঁধে, আর গল্পকে ক্যামেরার চোখে পাঠকের মনে পেঁচিয়ে দেয়।

ঘাসে গা মাখা লিলি, শূন্যে ভেসে থাকা মানুষ, বা শ্মশানের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নিঃশব্দ কিশোরী—ঘটনা নয়, এ যেন স্ন্যাপশট, একেকটা স্থিরচিত্র, যার পেছনে আবেগের আবছা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর বাজে।

ঘোষালের বর্ণনায় জায়গা শুধু ‘লোকেশন’ নয়—তা হয়ে ওঠে মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট। যেমন, ‘একটি দ্বীপে দু-চারজন’ গল্পে সাগরদ্বীপের সেই নির্জনতা একা নয়—সে দাম্পত্যের নিঃসঙ্গতাকেও প্রতিধ্বনিত করে।

আবার, ‘শূন্যস্থান’-এ মানুষজন মাটির থেকে একেকজন একেকটা উচ্চতায় ভাসছে—এ তো শুধু এক বৈজ্ঞানিক কল্পনা নয়, বরং এক সামাজিক অলঙ্কার! কারো জীবনে ভার, কারো জীবনে শূন্যতা।

আর সেই শ্মশান—‘একটু জীবনের বর্ণনা’য় যে শ্মশান আছে, তা কোনো নিছক মঞ্চ নয়। সেখানে প্রতিটা চরিত্র যেন একেকটা ট্র্যাকিং শটে ধরা পড়ছে। রমিতের চোখ দিয়ে আমরা দেখি মেয়েটিকে, আবার মেয়েটির চোখে রমিতের বেদনা জেগে ওঠে।

ঘোষালের গদ্যে কখনো মনে হয় ক্যামেরা স্থির, long take চলেছে—হালকা লং শট, বাইরের দৃশ্য। আবার কোথাও হঠাৎ এক ক্লোজ-আপ, “মাকে কাঁধে করে গেটের সামনে দাঁড় করানো”—আর ওই একটিই চিত্র হৃদয়ের ভিতর পুরো একটা ছবি এঁকে দেয়।

এগুলো পাঠের সময় সিনেমার মতোই হৃদয়স্থ অনুভব হয়—না, শব্দে নয়, পশ্চিম দিকের হাওয়ার মতন অনুভূতিতে।

তাঁর গল্প মানে দৃশ্যপট।

তাঁর বর্ণনা মানে অ্যাঙ্গেল।

আর তাঁর ভাষা—সে যেন এক অনলাইন ক্যামেরা, যা পাঠককে নিয়ে চলে এক অদৃশ্য ডলিতে করে, এক গল্প থেকে আরেক গল্পে।

পাঠশেষে অনুভব: শব্দের ঘোরে নিমগ্নতা

‘ডানাওলা মানুষ’ পড়ে এক পাঠক বলেছিলেন—“একটা গল্প পড়ে সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় গল্পে প্রবেশ করতে পারলাম না, এতটাই ঘোর কাজ করল।” এই-ই তো শিল্পের সেরা মুহূর্ত—যখন গল্প শেষ হয়, কিন্তু পাঠক থেমে যেতে বাধ্য হয়।

বিনোদ ঘোষালের গল্পগুলো ঠিক সেইরকম—পড়ার পরে তারা বুকের মধ্যে ঢুকে বসে থাকে। তারা চিৎকার করে না, কিন্তু তাদের নিঃশব্দে বলা কথাগুলো পাঠককে চুপ করিয়ে দেয়। কিছু গল্প যেমন ‘একটু জীবনের বর্ণনা’—চোখের কোণে একদম নীরব জলের রেখা এনে দেয়, আবার কিছু গল্প পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয় আয়নার সামনে—নিজেকে নতুন করে দেখার এক ভয়ংকর, কিন্তু গভীর অভিজ্ঞতায়।

প্রতিটি গল্প যেন পাঠকের মনের ভেতর একটা afterimage ফেলে রেখে যায়—একটা আলো-ছায়ার খেলা, যা কাহিনির চেয়ে বেশি টিকে থাকে অনুভবের স্তরে।

এ বই পড়া মানে শুধু গল্প পড়া নয়—এ এক মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা, যেখানে প্রতিটি পৃষ্ঠা আপনাকে প্রশ্ন করে—"তুমি কি সত্যিই দেখছো, নাকি শুধু চোখ মেলে রেখেছো?"

উপসংহার: পাঠ্য নয়, অনুভব

‘ডানাওলা মানুষ’ দিয়ে বিনোদ ঘোষাল যেন প্রমাণ করে দেন—ছোটগল্প আসলে শুধু সাহিত্য নয়, তা এক প্রকার মানববিদ্যা। শব্দের চাতুর্যে নয়, তিনি হৃদয়ের স্পর্শে গল্প বলেন—এমনভাবে, যেন আপনার পাশের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে যায় আর দেখা যায় গল্পটা সেখানেই ঘটছে।

এই বই আপনি পড়বেন, ঠিকই। কিন্তু তারপর?

আপনি হয়তো বইটা বন্ধ করবেন, কিন্তু গল্পগুলো থাকবে খুলেই—আপনার স্মৃতিতে, নিঃশ্বাসে, হঠাৎ কোনও ট্রেনের জানালায় দেখা এক চেনা মুখে।

এটি শুধু একটি অবশ্যপাঠ্য সংকলন নয়—এ এমন এক গ্রন্থ, যাকে বইয়ের তাকে রাখলে ভুল করবেন। এ বই রাখতে হয় বুকের ভেতরে, একদম হৃদয়ের কাছে।

আর শেষে শুধু এটুকু বলি— বিনোদ ঘোষাল আসলে এক ডানাওলা মানুষ, যাঁর গল্পের প্রতিটা পালকে ভর করে পাঠকেরাও একটু-একটু করে ওড়ার সাহস পায়।

অলমতি বিস্তরেণ।
Profile Image for Pusparghya Das.
10 reviews
June 22, 2021
🔯 বিনোদ ঘোষাল মহাশয়ের লেখা কোনো গল্প সংকলন এই প্রথম পড়লাম আমি। আর বইটা শেষ করে বুঝলাম, উনি আমার প্ৰিয় লেখকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেন। বেশ কিছু গল্প অসাধারণ লেগেছে। ভবিষ্যতে অবশ্যই ওনার লেখা আরও পড়তে চাই। 🙂
ব্যক্তিগতভাবে আমার গল্পগুলো খুব বেশি ভালো লাগা থেকে কম ভালো লাগার ক্রমানুসারে রাখলাম -
ডানাওলা মানুষ
অচিন্ত্য, ভানু, গৌর আর চন্দ্র - চার বন্ধু, একসময় হরিহর আত্মা ছিল। কলকাতায় বসবাসকারী প্রথম তিনজন এখন জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও চন্দ্র কলেজ জীবনের মত এখনও মফস্বলে থাকে, বাড়ী বাড়ী টিউশন পড়ায় আর নিজের ইচ্ছেমত বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। যখন বিজয়া দশমীর পর সপরিবারে সবাই মিলে সান্দাকফু যাওয়ার প্ল্যান হয়, তখন অচিন্ত্য, বৌয়ের কথায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও চন্দ্রকে ওদের সাথে যেতে বলে। ট্রেকিং এ গিয়ে চন্দ্রের উৎসাহ, তার গল্পের ঝুলি ইত্যাদি দেখে সবার বৌ বাচ্চা চন্দ্রের ন্যাওটা হয়ে পড়ে - এই ব্যাপারটা বাকি তিনজন কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। কিসের রাগ ওদের চন্দ্রের ওপর? আমাদের মতো স্বাভাবিক(?) চাকুরীজীবি লোকেদের সত্যিই কি ঈর্ষা হয় না চন্দ্রের মতো লোকেদের ওপর যারা নিজের ইচ্ছেমত "কুছ পরোয়া নেই" বলে জীবন কাটাচ্ছে? আমার কাছে এই বইয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ গল্প মনে হয়েছে মনস্তাত্বিক এই গল্পটি।
ডানা
লাঞ্চ টাইমে অনুষ্কা আর কৃষ্ণেন্দু একটা অদ্ভুত খেলা খেলে। কৃষ্ণেন্দু কম্পিউটারে ওর বেড়ানোর বিভিন্ন ছবি একের পর এক দেখাতে দেখাতে, নানান বর্ণনা করতে থাকে সেইসব জায়গার। বর্ণনা শুনতে শুনতে অনুষ্কা আর কৃষ্ণেন্দু দুজনেই যেন সশরীরে উপস্থিত হয় ওই জায়গাগুলোয়। এইভাবে লাঞ্চ টাইমে অফিসে বসেই ভারত ভ্রমণ চলতে থাকে দুজনের। কৃষ্ণেন্দু যাকে বলে একেবারে টো টো কোম্পানি। কিছুদিন ছাড়া ছাড়াই ঘুরতে না বেরোলে পেটের ভাত হজম হয়না ওর। ও যেন একটা ডানাওলা মানুষ। ওর সাথে থাকতে থাকতে অনুষ্কারও কি ডানা গজাবে? পড়তে পড়তে চমকে উঠেছি। চিমটি কেটে দেখেছি, সত্যিই পড়ছি তো। গল্পের শেষে এসে দেখি, আমারও ডানা গজিয়েছে, ঠিক কৃষ্ণেন্দুর মতন।
দুই-পুরুষ
অতনু বহু চেষ্টা করার পর অনেক ধরাধরি করে একটা চাকরি জোগাড় করেছে বড়বাজারের সুতোপট্টিতে। প্রথমদিন কাজে গিয়ে কাজ করার জায়গা দেখে ওর তো পেটের ভাত উঠে আসার জোগাড়, এতো নোংরা চারিদিকে। সেখানে আবার সমীর নামের একজন গত নয় বছর ধরে কাজ করছে। সমীর ওকে বলে, এখানে কোনো ভবিষ্যৎ নেই, পান থেকে চুন খসলে হাজার কথা শোনাবে, এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কেটে পড়াই মঙ্গল। অতনুরও কিছুতেই মন বসে না কাজে। ওদিকে বাড়িতে ওর বাবা, মা, দিদি সবাই ওর দিকেই তাকিয়ে বসে আছে। অতনু কি পারবে এই কাজ চালিয়ে যেতে?
মানুষীর কথা
কলেজ জীবন থেকে হরিহর আত্মা পাঁচ বন্ধু, এখন সবাই প্রৌঢ়া, পুরী চলেছে জগন্নাথ এক্সপ্রেসে। কামরায় কম বয়েসি দুটো ছেলে-মেয়েকে দেখতে পায়, মনে হয় সদ্য বিয়ে হয়েছে। তখন বেশ রাত। হঠাৎ মেয়েটা ওদের ডাকাডাকি শুরু করে, ছেলেটা নাকি খাবার জল নিতে স্টেশনে নেমেছিল, আর উঠতে পারেনি। এই গল্প বন্ধুত্বের, এই গল্প ভালোবাসার, এই গল্প স্মৃতি রোমন্থনের। গল্পের শেষে অদ্ভুত একটা ভালোলাগার রেশ থেকে যায়।
চক্ষুদান
রিষড়ার পৈতৃক বাড়ী ছেড়ে বরুণ সপরিবারে দমদমের মেট্রো স্টেশনের ঠিক পাশে ঝাঁ চকচকে একটা ফ্ল্যাটে ওঠার প্ল্যান করেছে। প্ল্যানটা অবশ্য ওর আর ওর স্ত্রী শতাব্দী দুজনেরই। আসলে প্রতিনিয়ত চাকরি করতে ওদের দুজনকেই কোলকাতায় আসতে হয়। লোকাল ট্রেনের ঝক্কিটা আর পোষাচ্ছে না। সপরিবার মানে বরুণ, শতাব্দী, ওদের ছেলে নীল আর বরুণের মা। বরুণের বাবা গত হয়েছেন। নীল তো বাড়ী ছাড়ার কথা শুনে একটুও রাজি নয়। আর বরুণের মাও স্মৃতি আঁকড়ে এই বাড়িতেই থাকতে চান, ওনার স্বামীর স্মৃতি বলতে ওইটুকুই তো সম্বল। বাবার প্রতি ভালোবাসা, বাবার স্বপ্ন ইত্যাদি আর নিজেদের স্বাছন্দ্য এই দুইয়ের টানাপোড়েন নিয়ে অদ্ভুত সুন্দর একটি গল্প।
একটু জীবনের বর্ণনা
আমাদের সবার সারাটা জীবন জুড়ে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকে মা। ছোটবেলা থেকে শয়ে শয়ে কত স্মৃতি জমা হতে থাকে মায়ের সাথে। আর এই গল্পে রমিত নামের চরিত্রটির মায়ের শেষযাত্রার বর্ণনা। পড়তে পড়তে রমিতের জায়গায় নিজেকে রাখলে বুকের ভেতরটা বারবার কষ্টে দুমড়ে মুচড়ে ওঠে। কেমন একটা ভয় বুকে সাঁড়াশির মত চেপে ধরে।
শূন্যস্হান
ঘুম থেকে উঠে বিজন হঠাৎ করে আবিষ্কার করে যে, শুধু মানুষের ওপর পৃথিবীর মাধ্যকর্ষণ শক্তি স্বাভাবিকের তুলনায় কুড়ি ভাগের এক ভাগ হয়ে গেছে। সবাই শূন্যে ভাসছে। কিন্তু মাটি থেকে সবার পায়ের দূরত্ব সমান নয়। আচ্ছা ঝামেলা তো। আজ আবার বিজনের, রোজি পাত্রের সাথে হোটেলে রাত কাটানোর কথা। এইরকম একটা প্রেক্ষাপটে গল্পটা শুরু। আর তারপর তরতরিয়ে এগিয়েছে গল্প। কেনই বা শুধু মানুষের ওপর থেকে পৃথিবীর g এর প্রভাব কমে গেছে, আবার কেনই বা বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন উচ্চতায় ভাসছে? "মাটিতে পা পড়ে না" কথাটা কি আক্ষরিক অর্থেই শেষপর্যন্ত সত্যি হতে চলেছে?
একটি দ্বীপে দু-চারজন
শৈবাল আর জয়ন্ত দুই বন্ধু সস্ত্রীক পনেরোই আগস্টের ছুটিতে সাগরদ্বীপে বেড়াতে গেল। জয়ন্ত দাঁত উঁচু, কুঁজো একটা লোক। জয়ন্তের স্ত্রী কাজরীর গায়ে শ্বেতি। আগে খুব ভালো গান গাইত, কিন্তু রোগটা ধরা পড়ার পর একদম চুপ মেরে গেছে। শৈবাল আর শিউলিকে কিন্তু বাইরে থেকে দেখে বেশ perfect couple মনে হয়। কিন্তু সত্যি কি তারা সুখী? সুখ-দুঃখ, ঈর্ষা-অসহায়ত্ব ইত্যাদি পরতে পরতে ফুটে উঠেছে এই গল্পে।
যে জীবন আমাদের
একটা অসুখী দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করে চলেছে শ্রেয়া। অনেক চেষ্টাতেও কোনো সন্তান আসেনি। নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষার পর শ্রেয়া জানল যে সমস্যাটা ওর নয়। কিন্তু ওর স্বামী কোনো টেস্ট করাতেই রাজি নয়। গায়ের জোরে বলতে থাকে, ওর টেস্ট করানোর কোনো দরকার নেই। ও confirmed জানে যে ওর সবকিছু ঠিক আছে। ওদিকে শ্রেয়ার অফিসে মাঝবয়সী রোগা পাতলা একটা অ্যাংলো ভদ্রলোক মাঝেমাঝেই আসে। লোকটার ড্রয়িং এ হাত খুব ভালো। ওর নেশাভাঙের কারণে ওর স্ত্রী, বাচ্চা ওকে ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু লোকটা ওর স্ত্রীকে এখনো দারুণ ভালোবাসে। এই গল্পে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুই দাম্পত্যের কথা পড়তে বেশ অন্যরকম লাগে।
ডানাকাটা পরি
পরিদের ডাকার জন্য মন্ত্র আছে। আর এই গল্পের মুখ্য চরিত্র এরকম অনেক মন্ত্র জানে। কিন্তু একজন পরি আছে, যাকে ও বারবার করে ডাকে। তার নাম লিলি। তার বাড়ীর পাশে অনেক বড়ো জঙ্গল। তার গায়ে ঘাসের গন্ধ। আর ওই গন্ধের জন্য পাগল এই গল্পের নায়ক। কিন্তু লিলিকে সবসময়ের জন্য থাকার কথা বলতেই সে একেবাররে উড়ে গেল, আর ফিরল না। কেমন আছে লিলি? ও কি এখনও পরি আছে? ডানাদুটো অক্ষত আছে তো ওর? যদি থাকে, তাহলে এতো করে ডাকলেও আসে না কেন?
দৃষ্টিবদল
এই গল্প মিতার একাকীত্বের। স্বামী আর শাশুড়ি কারও কাছেই ভালোবাসা না পেয়ে পেয়ে, এমনকি নিজের গর্ভে কোনো সন্তান ধারণ করতে না পেরে মিতা যেন মাড়াই করা আখের মতো ছিবড়ে হয়ে গেছে। মিতার অসহায়ত্বের কথা পড়তে পড়তে একসময় গা গুলিয়ে ওঠে।
এক মানুষ, ছাই
ইলেকট্রিক চুল্লির ভেতর শুয়ে শুয়ে সারা জীবনের হিসেব। মান-অভিমান, ভালোবাসা, পালিয়ে বেড়ানো - সবকিছুর হিসেব। পুরোটা পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্ত অবধি দেনা-পাওনা-প্রত্যাশা সব হিসেব মেটাতে বদ্ধপরিকর এই গল্পের মূল চরিত্র। পাশের চুল্লিতে ওর বাবা শুয়ে। বাবার সাথেও যে ওর অনেক হিসেব বাকি।
আত্মবিষ
এক্সসাইজ ইন্সপেক্টর হওয়ার সুবাদে ঘুষের টাকায় ফুলে ফেঁপে উঠেছে ব্রজ। টাকার পেছনে ছুটতে ছুটতে নিজের ছেলে সজল কখন যেন নাগালের বাইরে চলে গিয়ে রীতিমতো উশৃঙ্খল জীবনযাপন আরম্ভ করেছে। এরকমই চলতে চলতে মদ্যপ অবস্থায় সজল একদিন বাইক অ্যাক্সিডেন্ট করে। টাকার পাহাড়ে চড়তে চড়তে মানুষের অহংকার কোথায় যেতে পারে আর সেটার প্রভাব তার আশেপাশের মানুষের ওপর কিভাবে পড়ে তার একটা ছোটো হিসেব রয়েছে এই গল্পে।
একটি প্রলাপের জন্ম
ছেলেটার বাবার সুইসাইড করেছে। মা চলে গেছে তার প্রেমিকের সাথে। ওর দিদিটাও পাগল। এই শহরে পাগল দিদি আর ও - এই ওর জগৎ। অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে করে ছেলেটার - শেষে এই ইচ্ছে থেকেই একটি প্রলাপের জন্ম হয়।
প্রতি রবিবার
গল্পের শুরুটা বেশ অদ্ভুত। বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে উঠে আসা দম্পতিদের বর্ণনা। আর কিছু বলব না এই গল্পটি নিয়ে, বেশি বললে সবকিছুই বলা হয়ে যাবে।
Profile Image for Monolina Sengupta.
131 reviews21 followers
August 26, 2023
✨পাঠ প্রতিক্রিয়া
📕ডানাওলা মানুষ
✍ Binod Ghoshal
🖨 Patra Bharati
💰349/-


"কার যে কোন জীবন ভালো লাগে? কে যে কেমনভাবে ঠিক বাঁচতে চায়?"

◻️ লেখক বিনোদ ঘোষালের পরিচয় দেওয়া অত্যন্ত বাতুলতা। সম্প্রতি শেষ করলাম তার অন্যতম সৃষ্টি 'ডানাওলা মানুষ'। বইটিতে মোট ১৫টি গল্প আছে, এবং সবকটিই কোনো না কোনো পত্রিকাতে আগে প্রকাশিত হয়েছে। লেখকের বেশ‌ অনেকগুলো বই-ই আমি আগে পড়েছি, কিন্তু এই বইটি যেরকম ভাবে ভাবায়, মনের ভেতর নাড়া দিয়েছে সেই অনুভূতি একদম অন্যরকম।

◻️জীবন মানেই ওঠা পড়া ,ভাঙা গড়া, ভালো মন্দ..এই সারসত্যটাই লেখক এই ১৫টি ছোটোগল্পের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।সোজা কথা সোজা ভাবেই তিনি বলেছেন বাস্তবের প্রেক্ষাপটে।গল্পগুলোর প্রতিটি চরিত্রই যেন খুব চেনা, আশেপাশেই তাঁরা ঘুরে বেড়ান কিন্তু আমরা যেন দেখতেই পাই না। পাঠক এবং চরিত্রগুলোর মধ্যে সেতু বন্ধনের কাজটিই অত্যন্ত নিপুণভাবে করেছেন লেখক।

◻️প্রত্যেক মানুষের জীবনের চাওয়া-পাওয়া,
প্রাপ্তি -অপ্রাপ্তি, সফলতা-ব্যর্থতা, আদর-সোহাগ-প্রেম-বিরহ-বন্ধুত্ব-একাকীত্বের রঙে আঁকা এক একটি গল্প। প্রত্যেকের জীবনই এক একটি গল্প উপন্যাসের জন্ম দেয়। তাই ঘরে ঘরে আমৃত্যু প্রতিধ্বনিত হয়ে চলে আত্মতৃপ্তির বা কখনো আত্মশ্লাঘার শব্দজাল , অতিরঞ্জিত বা অতিপ্রাকৃত চিন্তাভাবনা, শোকস্তব্ধতা বা আলেয়ার ধাঁধা। বাস্তবের পটভূমিতে দাঁড়িয়েও অজান্তেই তৈরি হয় ফ্যান্টাসি। সেই ফ্যান্টাসিগুলোকেও বাস্তবের সাথে সুনিপুণ ভাবে মিশিয়ে লেখক রচনা করেছেন প্রত্যেকটি গল্প।

◻️এবার আসি কয়েকটি বিশেষ গল্পে -
১. খুব কাছের কোনো প্রিয়জনকে হারিয়ে থাকলে যে নিস্তব্ধতা হয়তো কেউ বোঝেনি সেটা লেখক বুঝেছেন, "একটু জীবনের বর্ণনা"-র রমিত বুঝেছে।
২. 'শূন্যস্থান' গল্পটি ফ্যান্টাসির মোড়কে মনুষ্যত্বের এক বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়।
৩. "এক মানুষ, ছাই" গল্পে বাবা-ছেলের কথোপকথন, নিজেদের না পাওয়া নিয়ে বাবার প্রতি ছেলের অজস্র প্রশ্ন, অভিযোগ আপাতদৃষ্টিতে হয়তো সাধারণ, কিন্তু কথোপকথনের পরিস্থিতি ও বর্ণনা একটা আলাদাই ঘোর তৈরী করে। আমার বিশেষ প্রিয় লাইন "আলো কিংবা অন্ধকার কিছুই নয়। সবটাই অভ্যাস।"
৪. 'ডানা' ও 'ডানাওয়ালা মানুষ' .... বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দুটি গল্প। যদিও দ্বিতীয়টি থেকেই সংকলনটির নামকরণ হয়েছে, তবে সেক্ষেত্রে আমার পার্সোনালি মনে হচ্ছে প্রথমটিও নামকরণের যোগ্য। দুটো গল্প সম্পূর্ণরূপে আলাদা হ���েও কোথাও না কোথাও মিশে গেছে। মুক্তির ইচ্ছে, উড়তে গিয়ে হারিয়ে ফেলার ভয়, পিছুটান, অপ্রাপ্তি থেকে জন্মানো ক্রোধ, ঘৃণা.... জীবনের কোনো না কোনো মুহূর্তে এই ইমোশনগুলো আমাদের আসেই, আসবেই।
৫. 'চক্ষুদান' বোঝায় যে কোনো মানুষের শুধু শারীরিক উপস্থিতিই সব নয়, তথাকথিত জড়বস্তুর মধ্যেও কারোর কারোর প্রাণ থাকে, থেকে যায়।

◻️বলা যায় গল্পগুলোর মূল কথা আলো নয় অন্ধকার। সুস্পষ্ট ভাবে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন আমার আপনার সবার মনের কথা বলা এই গল্পবলয়। মনে হয় সত্যিই যদি আমাদের একটা ডানা থাকতো, সেই ডানায় ভর করে পাড়ি দেয়া যেত মুক্তির আনন্দে....। পরিশেষে লেখককে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম ও পত্রভারতীকে ধন্যবাদ জানিয়ে এবং সকল পাঠককে বইটি পড়ার অনুরোধ জানিয়ে আমার পাঠ অনুভূতি এখানেই শেষ করছি।
Profile Image for Sanket Mitra.
21 reviews
February 13, 2021
ডানাওলা মানুষ

লেখক : বিনোদ ঘোষাল

প্রকাশনা : পত্রভারতী

#পাঠ_প্রতিক্রিয়া

মানব জীবনে সামাজিক নানান টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে ১৫টি ভিন্ন স্বাদের গল্প দিয়ে লেখক সাজিয়ে তুলেছেন এই বইকে যেগুলো পড়লে এক গভীর উপলব্ধির জন্ম নেয় মনে, কোনো না কোনো গল্পের সাথে কেউ না কেউ ঠিক জুড়ে ফেলতে পারে নিজের জীবনকে।

শুরুতেই যা আকৃষ্ট করেছে তা হলো সাবলীল এক ভূমিকা যা বাধ্য করবে বইটির ভেতরে ঢুকতে। প্রথম গল্প 'একটু জীবনের বর্ণনা' বাস্তবকে চিনিয়েছে খুব সুন্দরভাবে, মনটা সত্যিই ভার হয়ে যাবে এই গল্পের শেষে। সত্যিই, কালকেই যা এক জলজ্যান্ত সম্পর্ক ছিল, আজকে তা নিতান্তই একটা 'বডি'। লেখকের আলোচনায় জানতে পেরেছি যে গল্পটি নিছকই গল্প নয়, তিনি এই ঘটনা প্রত্যক্ষও করেছেন। দ্বিতীয় গল্প 'শূন্যস্থান' বড়োই চমকপ্রদ ; খুব অভিনব পদ্ধতিতে জীবনের এক আঙ্গিককে তুলে ধরা হয়েছে এই গল্পে।

কর্মস্থলের কিছু নীতি থাকে, তা সে কালো হোক কিংবা সাদা। এই নীতিকে দারুনভাবে জীবন্ত করে তুলেছে 'দুই- পুরুষ' এবং আমি নিশ্চিত যে কর্মজীবনে কেউ না কেউ একজন সমীর দা'র সম্মূখীন হয়েছেনই।

বেশ সুন্দর একটি কল্পনার আশ্রয়ে গড়া 'ডানা' গল্পটি স্বাধীনতার মানে শেখায় নবরূপে। ডানা আমাদের সকলেরই আছে, স্রেফ চিনে নেওয়ার অপেক্ষা। 'একটি দ্বীপের দু-চারজন' সহজ ভাষায় দুঃখের মধ্যেও, অপারগতার মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নিতে শেখায়।

খুব বেশী করে ছুঁয়েছে 'আত্মবিষ'। সত্যিই, আজকে যদি জন্মদিনের উপহারগুলো হঠাৎ করে পাল্টে না যেতো তাহলে জীবনটা হয়তো অন্যরকম হতেও পারতো।

চমকের দিক থেকে মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে 'এক মানুষ, ছাই', 'ডানাকাটা পরী' এবং 'প্রতি রবিবার'। ডানাকাটা পরীতে চমক সেই অর্থে না থাকলেও গল্পের রূপকধর্মী উপস্থাপনা অতুলনীয়।

দ্বৈত সত্ত্বাকে খুব সহজেই বুঝিয়েছে 'যে জীবন আমাদের' এবং চোখের কোণে প্রকৃতই যে গল্প জল এনে দিয়েছে তা হলো 'চক্ষুদান', পৈতৃক ভিটের আবেগটা আরো বেশী করে বুঝি বলেই হয়তো এমন অনুভূতি।

কিন্তু এসবের মধ্যে খানিকটা হলেও ম্লান লেগেছে 'দৃষ্টি বদল' এবং 'একটি প্রলাপের জন্ম'। 'মানুষীর কথা' বেশ সুন্দর ভাবেই এগিয়েছে তবে মনে করি গল্প শেষে সন্ধ্যার স্বামী দুলালকে আনা যেতে পারতো।

এবারে আসি সেই কাহিনীতে, যার নামে এই বইয়ের নাম। আজ্ঞে হ্যাঁ, 'ডানাওলা মানুষ'। এক সুন্দর জগতে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে এই কাহিনী, বড়ো কাছের চরিত্র বানিয়ে তুলেছে চন্দ্রশেখরকে। তার চিন্তাধারা সত্যিই বড়ো মধুর এবং গল্পে না হলেও, বাস্তবে চন্দ্রশেখররা অনেকেই খাদ থেকে পড়েই যায় ইঁদুর দৌড়ের এই জোরালো ধাক্কা সামলাতে না পেরে।

প্রতিটা গল্পের সাবলীল ভাষা খুবই আরামপ্রদ।

নানান পত্র পত্রিকার বাছাই করা লেখার সংকলন এই বই। আমার মতো এখন যারা এই বই পড়বেন, হয়তো এখনকার লেখকের সাথে এই বইয়ের সময়কে মেলাতে শুরুতে একটু কষ্ট হবে, একটু কষ্ট হবে খানিক পরিণত লেখার সাথে আজকের অতি-পরিণত লেখাকে মেলাতে, কিন্তু তবুও বলবো জীবনের নানান দিককে গল্পের আকারে অনুভব করানোর জন্য এই বই অবশ্যই পুষ্টিকর।
Profile Image for Mohana.
100 reviews8 followers
August 15, 2023

বই - ডানাওলা মানুষ
লেখক - Binod Ghoshal
প্রকাশনা - পত্রভারতী
মুদ্রিত মূল্য - ২৫০/- (পুরোনো)

বইটার প্রথম গল্প "একটু জীবনের বর্ণনা"র প্রথম লাইন "খাটে শোয়ানো মাকে কাঁধে নিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেটের কাছে দাঁড় করানো ম্যাটাডোরে...." প্রথম লাইন যদি এটা না হত তাহলে আমি লাইব্রেরী থেকে বইটা কোনোদিন বাড়ি নিয়ে আসতাম কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

"আজকে সবাই কেমন যেন রমিতকে একটা বিশেষ খাতির করছে। মা মারা গেলে মানুষ কি হিরো হয়ে যায়? অটোগ্রাফ চায়?"

গত ২৯শে জুন নিজের মা কে হারিয়েছি। হয়তো এতটা ব্যক্তিগত একটা কথা একটা বইয়ের রিভিউতে বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না কিন্তু লেখকেরা বড় নিষ্ঠুর। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষত ছাড়খাড় করে দেওয়াই মনে হয় তাদের কাজ। নয়তো এমনভাবে অন্তর্যামী হয়ে এই লেখাটি ২০০৩ সালে লিখে ফেললেও ২০২৩ এ এসেও প্রত্যেকটা বর্ণ আমার বাস্তবের সাথে মিলে যায় কি করে? নিমতলা শ্মশান থেকে পরিবার, পরিবার থেকে রমিতের মনের অবস্থা সমস্তটা যেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মিলে গেছে আমার সেদিনের অবস্থার সাথে। ঠিক যে কান্নাটা আমি সেদিন থেকে কাঁদতে পারিনি, ঠিক রমিতের মতোই আমারও যে জলটা চোখ দিয়ে বেরোয়নি, কিছুতেই ভেতরের যে যন্ত্রণাটা জল হয়ে বেরিয়ে আসেনি, সেটা অদ্ভূতভাবে এই গল্পটা পড়ে বেরিয়ে এসেছিল। যে নিস্তব্ধতাকে আমার মনে হয়েছিল কেউ বুঝবেনা, সেই নিস্তব্ধতা লেখক বুঝেছেন, রমিত বুঝেছে, হয়তো বাকি পাঠকরাও বুঝেছেন।

একটা গল্পের উপর ঝুঁকে পড়ে সমগ্র বইয়ের বিচার করবো না আমি নিশ্চয়ই তবে "একটু জীবনের বর্ণনা" চিরকাল আমার কাছে আমার জীবনকে বলে দেওয়া একটা গল্প হিসেবে হৃদয়ে থেকে যাবে।

বইয়ের বাকি গল্পগুলোর প্রসঙ্গে আসি। বইটিতে মোট ১৫টি গল্প আছে, এবং সবকটিই লেখকের লেখা গল্প যেগুলি কোনো না কোনো পত্রিকাতে আগে প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলিকেই একত্র করে এই সংকলন। ১৫ টির মধ্যে সবকটি গল্পই বিভিন্নভাবে আমাদের নাড়া দিয়ে যায়। যা আমার বেশ ভালো লেগেছে। কেবল "ডানা" ও "প্রতি রবিবার" এই দুটি গল্প আমার ভালো লাগেনি। দুটি গল্পই আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি, বা আমায় সেভাবে প্রভাবিত করেনি যেরকম ভাবে বাকিগুলো করেছে। তবে প্রত্যেকটি গল্পই আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে, যেটা প্রত্যেক ছোট গল্পের আদর্শ ধর্ম। লেখকের লেখনী নিয়ে আর আলাদা করে কি বলব? সবরকমের লেখাতেই লেখক সিদ্ধহস্ত। তবে লেখকের কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থেকে যাবো "একটু জীবনের বর্ণনা" গল্পটি লেখার জন্য।

আপনি যদি ছোটগল্প পড়তে ভালোবাসেন তবে এই বই আপনার জন্য আদর্শ। এটি একটি অবশ্যপাঠ্য।
Profile Image for SOHAM GANGULY.
4 reviews
January 4, 2022
প্রথমত সরাসরিই বলি....... বইটা যতটা আশাবাদী হয়ে কিনেছিলাম, ঠিক ততটাই আশাহত হয়েছি। এককথায় বলতে গেলে হতাশ হয়েছি। 2011 সালে সাহিত্য অকাদেমি যুবা পুরস্কারে পুরস্কৃত গ্রন্থ " ডানাওলা মানুষ"। পুরস্কৃত গ্রন্থ বলেই হয়তো আগ্রহ টা বেশি হয়েছিলো। কিনেওছিলাম অনেকটা তার জন্যই। এবার আসি গল্প গুলোর কথায়।
1) প্রথমত বেশ কিছু গল্প সম্পূর্ণভাবে আমার মা��ার উপর দিয়ে গেছে। গল্পের অর্থ আদৌ কতটা অর্থবহ তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছি একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে। বিশেষ করে কিছু কিছু গল্পের শেষ টা তো একদম মাথার ঠিক 16 ফুট ওপর দিয়ে বাউন্সার গেছে।। স্পয়লার দিলাম না। যাদের যাদের বইটা অলরেডি পড়া হয়ে গেছে তারা তারা আশা করছি ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন যে কোন কোন গল্প গুলোর কথা বলছি আমি!! এক্ষেত্রে একান্তভাবে কেউ যদি ঐ গল্পগুলির অর্থ অনুধাবন করতে পারেন তাহলে আমাকে জানিয়ে যাবেন।

2) কিছু কিছু গল্প পড়ে অত্যন্ত সাধারণ এবং চিরায়িত বহু পুরোনো বলে মনে হয়েছে। অর্থাৎ গল্প শেষ হওয়ার আগেই তার পরিণতি সম্পর্কে আপনি অনুধাবন করে ফেলতে পারবেন।
3) মোটের ওপর 15 টার মধ্যে খানচারেক গল্প বেশ ভালো।। এটুকুই স্বার্থকতা।। বইটা যে শেষ করতে পেরেছি এই জন্য ঈশ্বর কে অশেষ ধন্যবাদ জানাই।।



সবশেষে আসি একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথায়।। সাহিত্যিক বিনোদ ঘোষালের সম্ভবত জীবনের প্রথম প্রকাশিত বই " ডানাওলা মানুষ"। সে হিসেবে ধরতে গেলে একটা বইয়ের নিরিখে সাহিত্যিকের লেখনীর সামগ্রিক মাপকাঠিকে আশা করছি কেউ বিচার করবেন না। বিনোদ ঘোষালের বেশ কয়েকটি উপন্যাস দুর্ধর্ষ!! তবে এই বইটি বড্ড বেশি overrated.......... এড়িয়ে চলবেন কিনা আপনার দায়িত্ব।। অবশ্য আমি নিজে একজন পাঠক হিসেবে অবশ্যই ভালো খারাপ নির্বিশেষে সব বইই সমান ভাবে পড়ার জন্য বলবো!! ধন্যবাদ।।
Profile Image for Sushanto Kumar Saha.
93 reviews9 followers
May 31, 2020
খুবই তীব্র লেখা, পড়ার পরে তীব্র কিছু অনুভূতি হয়। কে জানে, হয়ত মানব জীবনও তার চেয়েও বেশি তীব্র!
7 reviews2 followers
May 5, 2019
বিনোদ ঘোষালের এই প্রথম গল্পসংকলনটির নায়ক নায়িকারা সব শহর কলকাতা-মফস্বলের আমাদের চারপাশে দৈনন্দিন দেখা মানুষরা। সেই পরিচিত মানুষগুলোর অপরিচিত মুখকে তুলে এনে পাঠকদের নাড়িয়ে দেন লেখক। আমার ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে প্রতি রবিবার, যে জীবন আমাদের, একটি প্রলাপের জন্ম, চক্ষুদান, ডানাওলা মানুষ গল্পগুলি। প্রসঙ্গত বইটি 2011 সালের সাহিত্য একাডেমি যুবা পুরস্কারে সম্মানিত।
Profile Image for সৌম্য বিশ্বাস.
25 reviews3 followers
May 16, 2022
২০১১সালে প্রথম যুব সাহিত্য অ্যাকাদেমি পায় বলেই পড়ার আগ্রহ জন্মায়।
নামই কীরকম একটা জাদু-বাস্তবতার ছোয়া আছে। আদতেও কিছু গল্পে সেটা দেখা যায়।এখানে প্রত্যেকটা কাহিনীই আমাদের অথবা আমাদের আপনজনের। গল্পগুলো বোঝার জন্য দৈহিক নয়, মানসিক দিক থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হতে হতে হবে।১২টি ছোটোগল্প না পড়ে ব্যাখা করা যাবে না। আমার বিশেষ করে ভাল লেগেছে- ডানাওলা মানুষ,শূন্যস্থান,ডানা, ডানাকাটা পরী, একটি মানুষীর কথা
Displaying 1 - 13 of 13 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.