বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা মণি সিংহের অখন্ড আত্মজীবনী পড়লাম৷ মণি সিংহের আত্মকথা শুধুই আত্মপ্রলাপ কিংবা আত্মপ্রচার নয়। এই আত্মজবানির সাথে ব্রিটিশবিরোধী গণমানুষের ছবি, পাকিস্তান আমলের জাতীয় রাজনীতি এবং একই সাথে বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের দলিলও বটে। সেই হিসেবে ব্যক্তি মণি সিংহ নয়; কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহই মুখ্য হয়েছেন এই বইতে।নিখাদ আত্মকথা নয়, শতভাগ রাজনৈতিক আত্মজৈবনিক গ্রন্থই বলব কমরেড মণি সিংহর 'আমার সংগ্রাম'কে। যার ব্যপ্তি মণি সিংহের জন্মকাল হতে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত৷ কালের অঙ্ক কষলে, বছর গুণলে মনে হবে অনেক গোধূলি পেরিয়ে এসেছেন মণি সিংহ। কিন্তু সেইকথা লিখতে তত কালি খরচ করেন নি৷ তাই পৃষ্ঠাও বাড়েনি।
মণি সিংহ জন্মেছিলেন ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষে৷ মুখে সোনার চামচ নিয়ে জন্মানো বলতে লোকে যা বোঝায়, ঠিক তেমনই এক জমিদার পরিবারের ছেলে কমরেড মণি সিংহ।
বেশিরভাগ আত্মকথা লিখিয়ে নিজের বংশলতিকার গুণকীর্তনে শুরু করেন জবানি। সেই বংশস্তুতি প্রত্যক্ষ হতে পারে, হয়ে থাকে পরোক্ষও। কিন্তু মণি সিংহের লেখা একেবারেই স্বাতন্ত্র্যের দাবি রাখে। তিনি নিজের শৈশব থেকেই স্মৃতিচারণ করছেন বইতে। কিন্তু সেখানেও প্রাধান্য ভূস্বামী, জোতদারদের শোষণের শিকার মানুষদের কথা। কীভাবে নিজে জড়িয়ে পড়লেন নিজ জেলা বৃহত্তর ময়মনসিংহের এই দুঃখী, শোষিত মানুষদের সাথে সেই গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতির বয়ান করেছেন নিজেই। ময়মনসিংহের পাহাড়ি এলাকায় মণি সিংহের নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছিল টংক আন্দোলন। যেখানে শিক্ষার আলো পৈাছেনি। যেখানে নেই তথাকথিত সভ্যতার ঝিকিমিকি। সেই হাজং, বাঙালি মুসলমান কৃষকদের নিয়েই মণি সিংহ টংক আন্দোলন বেগবান করেছিলেন। হাজংরা মুখোমুখি হয়েছিল অন্ধকারের দুই প্রতিভূর সাথে। এক. স্থানীয় জমিদার, জোতদার৷ যারা কৃষকদের ফসলের তিনভাগের দুইভাগই নিয়ে নিত।সামন্তশক্তিকে প্রাথমিক মোকাবেলা করেছে কৃষকরা৷ দুই. সামন্তদের রক্ষাকর্তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। মণি সিংহের কমিউনিস্ট পার্টি যেখানেও কৃষক, শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলতে চেয়েছে, চাষীদের ন্যায্য হিসস্যার দাবি করেছে, সেখানেই দেখেছে অদ্ভুত এক মিল। কংগ্রেস ও মুসলিম লিগে সকলক্ষেত্রেই মতদ্বৈততা প্রবল। কিন্তু জমিদার, জোতদারদের নিয়ে নীতি এক৷ উভয়দলই সামন্তদের পৃষ্ঠপোষক ।
ব্রিটিশ আমলে পার্টি আত্মগোপন থাকতে বাধ্য হয়৷ বারবার মণি সিংহের কন্ঠে ঘোষিত হয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ব্যজস্তুতি।কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় সোভিয়েট ইউনিয়নের নীতিমাফিক কমিউনিস্ট পার্টিও সমর্থন শুরু করে সাম্রাজ্যবাদের। মণি সিংহের মতো বিচক্ষণ নেতাও ভালোমন্দ বিচার না করে চোখ বুঝে পার্টিলাইন মানতে থাকেন! এতো বুলি কোথায় যেন মিলিয়ে গেল! দেশভাগের ধাক্কা কমিউনিস্ট পার্টিতেও লাগে। একটু বুঝি বেশিই লাগে। কারণ বাঙালি মুসলমানের চেয়ে বাঙালি হিন্দুর অংশগ্রহণই চোখে বেশি পড়েছে৷ কেন বাঙালি মুসলমানের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানের ঘাটতি ছিল তা নিয়ে অবশ্য বিশ্লেষণ দেখিনি৷ এমনকি এইদিকে ইঙ্গিতও করেন নি তিনি।
বেশিরভাগ সদস্য ভারতে চলে গেল। কর্মী সংকটে পড়ল পার্টি। এদিকে ইলা মিত্রের তেভাগা আন্দোলন, সিলেটের নানকার আন্দোলন প্রভৃতি আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করে পাকিস্তানি সরকার।দল অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়৷ মুসলিম লিগ সরকারের জুলুম,নিপীড়নের বিরুদ্ধে আওয়ামী মুসলিম লিগ গঠিত হয়।
'৫৪ এর নির্বাচনের আগেই পার্টি সিদ্ধান্ত নেয় দলীয় কর্মীরা আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দিবে। কমিউনিস্ট পার্টির এই সিদ্ধান্তের বাস্তবিক ও আদর্শিক যৌক্তিকতা খুঁজে পাইনি৷ কাগমারী সম্মেলনের পর পররাষ্ট্র নীতি প্রশ্নে ভাসানীর সাথে সোহরাওয়ার্দীপন্থীদের বিভেদ চূড়ান্ত আকার নেয়। ভাসানী ন্যাপ প্রতিষ্ঠা করেন। ভেঙে গেল আওয়ামী লীগ। এই ন্যাপ প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের ভূমিকাই ছিল প্রধান৷ এরা নিজেদের দল বাদ দিয়ে অন্যদলে কাজ করার নীতিই ভাঙনের কারণ হয় আওয়ামী লীগের। তাতে মোটাদাগে লীগের ক্ষতি হয়নি বেশি। কিন্তু মওলানা ভাসানীর জাতীয় রাজনীতির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বামপন্থীরা ভাসানীর কাঁধে বন্দুক রেখে ইনকিলাব করতে চেয়েছেন। তাতে না এসেছে বিপ্লব, না কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পেরেছে বামরাজনীতি৷ পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে সাথে জাতীয় রাজনীতির অনেক ঘটনাই লিখেছেন মণি সিংহ৷ আওয়ামী লীগের সাথে একটি সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে শেখ সাহেব দলের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীনই। তিনি দলীয় সভাপতি হলে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে একমত হয় কমিউনিস্ট পার্টি ও আওয়ামী লীগ৷
১৯৬৬ সালের পরের ঘটনা কমবেশি সবাই জানেন। নতুন কিছু লিখেনি।
হতাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ। এই উত্তাল সময়ে তাঁর দলের কী ভূমিকা ছিল তা পরিষ্কার করেন নি তিনি। মুক্তিযুদ্ধের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়ার আশা করেছিলাম। সেখানেও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। মণি সিংহের লেখায় ঠিক যেন সুর পায়নি মুক্তিযুদ্ধ। তাড়াহুড়োয় শেষ করতে গিয়ে কমরেডের মুক্তিযুদ্ধের সুর হয়েছে বেসুর। যাঁরা একনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মী, তাঁদের জবানি হয়তো রাজনীতির বাইরে যেতে পারে না৷ বহুগামী হয়না। যা হয় তা হলো রাজনীতির অলিগলির ভ্রমণ। আত্মস্মৃতির চালে পড়া হয় ব্যক্তির রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচার।সেই সমর্থন অনেকসময় হয়ে ওঠে অযৌক্তিকতে ভরপুর। দলীয় চিন্তাধারায় আক্রান্ত হয়ে পড়া রাজনীতিকদের লেখাও আক্রান্ত হয়। মণি সিংহের আত্মকথাও তেমনি দোষেদুষ্ট । কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড মণি সিংহের ব্যক্তিত্বের মুখে দাঁড়াতেই পারেনি ব্যক্তি মণি সিংহ। তাতে পাঠক হয়তো কমিউনিস্ট কর্মী মণি সিংহকে পেয়েছে। কিন্তু আত্মস্মৃতির মানুষ মণি সিংহকে পায়নি। নিজের প্রতি আত্মজিজ্ঞাসা যেমন নেই। তেমনি অভাব পার্টিকে নিয়ে গঠনমূলক আলোচনার।