কলকাতা নগরীর পত্তন করেছিলেন জব চার্নক, এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু কীভাবে হয়েছিল সেই পত্তন? জানলে অবাক হতে হয়, জব চার্নক বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের ঠাকুরদালান সংলগ্ন আটচালায় বসে মাত্র ১৩০০ টাকার বিনিময়ে কিনে নিয়েছিলেন কলকাতা, সুতানুটি আর গবিন্দপুর অঞ্চল। তারপর এই তিনটি অঞ্চল একত্রে মিলেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আজকের কলকাতা। কিন্তু এই জমিদার পরিবারের লোকেরা যদি জানতো যে, একদিন এই কলকাতাকে কেন্দ্র করেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গোটা উপমহাদেশকে গ্রাস করে নেবে, তাহলে কি তারা বিক্রি হতে দিতো ওই অঞ্চলগুলি?
বইতে উঠে এসেছে কীভাবে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের জমিদার কেশবরাম রায়চৌধুরীর হাত ধরে কালীক্ষেত্র, অর্থাৎ আজকের কালীঘাট হয়ে উঠলো।
চোরবাগানের মিত্রবাড়ির প্রসঙ্গে উঠে এসেছে আজ থেকে ১০০ বছর আগে সেই বাড়ির ছেলে অলকেন্দ্রনাথের আশীর্বাদ অনুষ্ঠানের ভোজনের মেনু। যেখানে নিরামিষ পদই রয়েছে ১১৭ টি। অবশ্য শুধু তাই নয়, রঞ্জি ট্রফিতে বিজয়ী রাজ্যকে যে 'মোনা মিত্র মেমোরিয়াল চ্যালেঞ্জ কাপ' দেওয়া হয়, সেই মোনা মিত্র, এই মিত্র বাড়িরই ছেলে।
ভেবে অবাক হতে হয়, ঘোড়ায় টানা নয়, পাথুরিয়াঘাটের যদুলাল মল্লিকের ছোট ছেলে মন্মথনাথ মল্লিকের ছিল জেব্রা টানা গাড়ি। আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে তিনি ৬ হাজার টাকা দিয়ে দুটো জেব্রা কিনেছিলেন, যা কেবলমাত্র বৈচিত্র্যের জন্য।
না বেশি দূর না, এই ঘটনা মাত্র কয়েক দশক আগের, ১৯৩৫ সালের।
জানা যায় কলকাতার প্রথম থিয়েটারের উৎপত্তির কথা। 'কলিকাতা ন্যাসনেল থিয়েট্রিক্যাল সোসাইটি' মাসিক ৪০ টাকা ভাড়া নিয়ে মধুসূদন সান্যালের বাড়ি বা ঘড়িঅলা বাড়ির উঠোনেই টিকিট বিক্রি করে প্রথম কমার্শিয়াল থিয়েটারের পত্তন করেছিলেন।
এরকম নানান অজানা তথ্যের সাথে উঠে এসেছে এই সকল বনেদি বাড়িগুলির সংস্কৃতি, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যশৈলীর বর্ণনাও। সাথে রয়েছে একাধিক আলোকচিত্রও, যা এককথায় মুগ্ধকর।
যেকোনো স্থাপত্যের বাইরের সৌন্দর্যই তার একমাত্র পরিচয় নয়। তার ভেতরের মানুষজনের ইতিহাস, জীবনচর্যা ও সংস্কৃতিও স্থাপত্যেরই অঙ্গ। তাই প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে বনেদি কলকাতার মানুষজনের কথা। কলকাতার প্রত্যেকটি বনেদি পরিবারের আচার-আচরণ, শখ, শিক্ষা ও সমৃদ্ধির ইতিহাস তাদের নিজ বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।
গত চারদিন ধরে স্বাক্ষী হয়ে রইলাম এক অভিনব ইতিহাসের, যার রেশ চিরকাল থেকে যাবে। কারণ এই বই তো, কেবল শুধু বই না। এই বই খোলা চোখে টাইম ট্রাভেল করায়। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, আমি নিজে সেই সময়তে পৌঁছে গেছি। চোখের সামনে ভেসে উঠছে এক অন্য জগত, এক অন্যরকম কলকাতা।
কলকাতার ইতিহাস তথা বনেদি পরিবারের ঘরবাড়ির ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে, এই বই অত্যন্ত মূল্যবান এবং দুস্প্রাপ্যও। দুস্প্রাপ্য কারণ, কালের নিয়মে অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেমন এই সকল পুরনো বনেদি বাড়ির অনেকেই আজ কালের করালগ্রাসে ধ্বংস হয়েছে, আবার কোথাও বা প্রগতির প্রয়োজনে উঠেছে বহুতল বাড়িও। তাই এই বইয়ের ছবিগুলি এখন তার ইতিহাসের একমাত্র সাক্ষী।
ভীষণই ভালো লাগলো এই বইটি। বনেদি কলকাতার ইতিহাস নিয়ে যারা আগ্রহী, তারা অবশ্যই এই বই পড়ে দেখতে পারেন। আশা করি ভালো লাগবে।