শীর্ষেন্দুকে লেখক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই,নাম-ই যথেষ্ট।তবে ফিকশন লেখক শীর্ষেন্দুকে যেমনটা ভেবে এসেছি,এই বই পড়ার পর ব্যক্তি শীর্ষেন্দু সম্পর্কে ধারণা একদম বদলে গেছে।তিনি নিজেকে ভবঘুরে না বলে বলেছেন ভবকুঁড়ে।
ব্যক্তি শীর্ষেন্দু একদমই অন্যরকম,ধর্মানুরাগী,প্রচন্ড রক্ষণশীল,অনেকক্ষেত্রে বায়াসড কিন্তু নিজেই আবার ধর্মের যুক্তিখন্ডন করেন,কট্টর নিরামিষাশী কিন্তু বিলাসবহির্ভূত জীবনযাপন করেন ও ঘুরতে গিয়ে যেখানেই রাইত সেখানেই কাইত নিয়মে রাত কাটিয়ে ফেলেন।তার কোন লেখায় আজ পর্যন্ত হাস্যরস না পেলেও বাস্তবে রসবোধ প্রখর।তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে যা তা হলো আত্মসমালোচনা গ্রহণ করে সেটা বইতে তুলেও ধরেছেন,মতামত খন্ডন করতে যান নি,তার সাথে বাংলাদেশের ঢাকা তার আদিবাড়ি হওয়ায় বাংলাদেশিদের প্রতি টান।
বইয়ের অর্ধেক উত্তর প্রদেশ ভ্রমণ নিয়ে আর দ্বিতীয়ার্ধ আমেরিকা ভ্রমণ নিয়ে।
★রামায়ণের সেই বনবাসের পথেঃ লেখক এলাহাবাদের সরযূ নদীর তীরের অযোধ্যা গেছেন সেখানকার সবচেয়ে বড় উৎসব রামনবমীর সময়।বলা হয় যে অযোধ্যার পথে রামচন্দ্র সীতা ও লক্ষ্মণকে নিয়ে বনবাসে গিয়েছিলেন,সেই পথ ধরে অযোধ্যায় গড়ে উঠেছে প্রচুর মন্দির।লেখক মাথা গুজলেন রামঘাটের এক মন্দিরে।বর্ণনা করেছেন এখানকার উৎসব,বিশ্বাস,সাধুসঙ্গ।তুলে ধরেছেন রামায়ণের কাহিনী ও নিজের আধ্যাত্মিক মতামত।
রামনবমী উৎসব শেষ করে গেলেন প্রায় ২০০ কিমি দূরে শৃঙ্গবেরপুরে (sringverbur).বলা হয় এখানে মাটি খুঁড়ে নিষাদরাজের রাজ্য পাওয়া গেছে।বনবাসের প্রথম তিনদিন রথে যাবেন বলে দশরথকে কথা দিয়েছিলেন রাম।সেই তেরাত্রি পোহালো শৃঙ্গবেরপুরে।রামের সাথে নিষাদরাজ গুহের মিলন ও সখ্য হল এখানে।প্রায় ২০০০ বছর পুরোনো কুষাণ রাজত্বের সময়ের বিশাল এক জলাধারও পাওয়া গেছে।ভারতবর্ষে আবিস্কৃত জলাধারের মধ্যে এটিই সবচেয়ে পুরোনো।
সেখান থেকে গেলেন চিত্রকূট,এলাহাবাদ থেকে ১৩০ কিমি।এই সেই চিত্রকূট যার কথা মেঘদূত ও রামায়ণে আছে,বলা হয় যে বনবাসের ১৪ বছরের মধ্যে ১২ বছর রাম-সীতা-লক্ষ্মণ চিত্রকূটের পাহাড়েই কাটান,তারপর ভরত রামকে ফেরত আনতে এখানে আসেন।তাই এই পাহাড়ের উপর সারি সারি মন্দির এখন তীর্থস্থান।রাম ও ভরতের মন্দির পাশাপাশি,বলা হয় এটাই ছিলো তাদের মিলনস্থল।
★প্রয়াগ মহাকুম্ভ
গঙ্গাদ্বীপে অষ্টপ্রহর কীর্তন
সাধুদের খাওয়া দেখে তাক লাগে
সাধুর কাতার গৃহী কম
৪ টি গল্পই মহাকুম্ভ বা কুম্ভমেলার সময় প্রয়াগ ভ্রমণের স্মৃতিচারণ।আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক হয়ে কুম্ভমেলা কাভার করতে গিয়েছিলেন।পুরাণে উল্লিখিত আছে বর্তমান প্রয়াগ হলো আদিকালের কৌশাম্বি।রাম,সীতা ও লক্ষ্মণ বনবাসে গমনকালে দক্ষিণাভিমুখী পথে এই মহাসঙ্গম (এখানে গঙ্গা,যমুনা ও ভূতপূর্ব সরস্বতী নদীর সঙ্গম হয়েছে,যাকে বলা হয় ত্রিবেণী সঙ্গম) পার হয়ে যান।এই স্থান দিয়েই রামানুজ ভরত গিয়েছিলেন রামকে ফিরিয়ে আনতে।আর এই সঙ্গমস্থলেই ঋষি ভরদ্বাজের আশ্রমে তারা বিশ্রাম করেন।সঙ্গমের কাছে এলাহাবাদ শহর প্রতিষ্ঠা করেন সম্রাদ আকবর,এলাহাবাদ শব্দের অর্থ আল্লাহর স্থান,যমুনাতীরে এখনো আকবরের কেল্লা দাঁড়িয়ে আছে।
প্রয়াগের বিখ্যাত কুম্ভমেলার নাম অনেকেই শুনেছি।মৎস্যপুরাণে আছে জয়ন্তর অমৃত বহন করে নন্দনকাননে নিয়ে যেতে লেগেছিল বারো দিন।দেবতাদের একদিন সমান মানুষের এক বছর,তাই বারো বছর পরপর পূর্ণকুম্ভের যোগ আসে।পৃথিবীর প্রাচীনতম ও বৃহত্তম তীর্থ সম্মেলনগুলির একটি এই পূর্ণকুম্ভ।হাজার হাজার সাধু সন্ন্যাসী এই সঙ্গমে স্নান করতে আসেন।প্রধান স্নানের দিনগুলিতে অসাধারণ এক মিছিল করেন সব আখড়ার সাধু,মিছিলের দুপাশে জড়ো হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ।
★বাঙালের আমেরিকা দর্শন
বঙ্গ সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে আমেরিকা যাওয়া পড়ে লেখকের।নিউইয়র্কে প্রথমেই দেখতে গিয়েছিলেন east river তীরে UN সদরদপ্তর।এই অংশটা পড়ে UN থেকে কাউকে চিঠি লিখতে ইচ্ছে হলো যেন একটি UN seal ওয়ালা খাম থাকে।ঘুরে দেখেছেন এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং,এবং ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার যার লিখটে বাংলা লেখা দেখে পুলকিত হয়েছেন,আমাদের তো আর সেই লেখা দেখার সৌভাগ্য কোনদিন হবেনা।দেখতে গিয়েছিলেন বুশকিল জলপ্রপাত তবে বলেছেন যে আহামরি কিছু না,সরকার রক্ষণাবেক্ষণ করে দেখেই এসব ছোটখাটো প্রাকৃতিক স্পট থেকেও পর্যটন খাত হয়ে টাকা তোলা সম্ভব হচ্ছে।
আসল অনুষ্ঠান বঙ্গ সম্মেলন আয়োজিত হয়েছে নিউজার্সির সমারভিলে র্যাবিটান ভ্যালি কলেজে।তবে বেশি মুগ্ধ হয়েছেন সুপারশপ ও নিউইয়র্কের 14th street এর সস্তার বাজার দেখে। দেখেছেন museum of modern art.
washington DC তে ঘুরেছেন লাইব্রেরি অফ কংগ্রেস,স্মিথসোনিয়ান,ওয়াশিংটন টাওয়ার,লিঙ্কন মেমোরিয়াল,পোটোম্যাক নদীর ধারে মূর্তি "Awakening" এবং বিশ্ববিখ্যাত Air and space museum যেখানে আছে wright ভ্রাতাদের বিমান এবং নীল আর্মস্ট্রং এর প্রথম lunar module.
Ohio রাজ্যে গিয়েছিলেন native american দের স্মৃতিবিজিড়িত ওলানটাঙ্গি গুহায়।