রবীন্দ্রনাথের 'জাপানযাত্রী' প্রকাশেরও আগে ঢাকার উদ্ধার আশ্রমের হরিপ্রভা মল্লিকের জাপান সফরের বিবরণী প্রকাশিত হয়েছিল এই ঢাকা থেকেই। বাংলা ভাষায় জাপান-বিষয়ক সেটাই প্রথম গ্রন্থ। ঢাকায় আগত জাপানি ভাগ্যাম্বেষী যুবক উয়েমন তাকেদার সঙ্গে হরিপ্রভার বিয়ে হয়েছিল ১৯০৬ সালে। বিয়ের ছয় বছর পর ১৯১২ সালে স্বামীর সঙ্গে জাপান-যাত্রা করেন হরিপ্রভা তাকেদা। সেই ভ্রমণ ও চার মাসকাল জাপানবাসের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেন তাঁর 'বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা' গ্রন্থে।
কোন কোন বই অবশ্যপাঠ্য হয় লেখনীর গুণে নয়, বরং বিষয়বস্তু এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে। হরিপ্রভা তাকেদা'র 'বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা' সেরকম একটি বই। মাত্র ৩৩ পৃষ্ঠার একটি বই যে কতরকম ভাবনার জন্ম দিতে পারে, এবং আরো কত উত্তর না জানা প্রশ্ন মনে ভিড় করে, সেটা বোঝার জন্য এই বইটা পড়া যে কোন বাঙালির জন্য আবশ্যক।
হরিপ্রভা মল্লিক ছিলেন ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের মেয়ে; তাঁর মা নগেন্দ্রবালা মল্লিক ছিলেন নেতৃস্থানীয় সমাজসেবিকা, উদ্ধার আশ্রমের পরিচালক। ১৯০৬ সালে হরিপ্রভা বিয়ে করেন, বোধ করি ভালবেসেই, জাপানি ছেলে উয়েমন তাকেদাকে, যিনি এদেশে এসেছিলেন একটি সাবান ফ্যাক্টরিতে চাকরি নিয়ে, এবং পরে নিজেই 'ঢাকা সোপ ফ্যাক্টরি' নামে একটি সাবান কোম্পানি খুলে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীতে পরিণত হন। এখানে অনেকগুলো ইন্টারেস্টিং তথ্য চলে আসে। সেসময়কার জাপানের অর্থনৈতিক অবস্থা অত ভাল ছিল না, যদিও জাপান তখন একটি পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথে। কাজেই সেসময় জাপানিরা ভাগ্যান্বেষণে নানা দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, এবং ব্রিটিশ ইন্ডিয়া তাদের কাছে একটি আকর্ষণীয় জায়গা। মনজুরুল হকের ভূমিকা এবং কাজুহিরো ওয়াতানাবের একটি প্রবন্ধ থেকে আমরা জানতে পারি, সে সময় কলকাতা ও ঢাকায় অনেক জাপানি চাকুরিজীবি ও ব্যবসায়ী ছিলেন। হরিপ্রভার নিজের লেখাতেও সিমেজ সান ও হাতোরি সান সহ তাঁর স্বামীর কয়েকজন ভারতপ্রবাসী জাপানি বন্ধুবান্ধবের উল্লেখ পাই, যারা সপরিবারে এখানে ব্যবসা করতেন। এখনো ঢাকায় জাপানি ও অন্যান্য উন্নত দেশের নাগরিক কম নেই, কিন্তু তাদের মাঝে ভাগ্যান্বেষী খুবই কম, বেশিরভাগই কূটনীতিবিদ বা সাহায্য সংস্থার লোকজন। আরেকটা ব্যাপার হলো, আমাদের দেশে এখনো কোন ছেলে বিদেশি মেয়ে বিয়ে করলেই সেটা বেশ একটা হৈচৈ-এর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, আর যদি কোন বাংলাদেশি মেয়ে বিদেশি ছেলে বিয়ে করে তাহলে যে কতরকম কথা ওঠে তার কিছু আমার নিজের কানেই শোনা আছে--"আরে গেল গেল, মেয়ের চরিত্র, বিদেশে কি না কি করছে, বেলেল্লা" ইত্যাদি। এটা কিন্তু ২০২০ সালের কথা বলছি, যখন আমরা দাবী করি যে, ইন্টারনেট আর কেবল টিভি'র কল্যাণে সারা বিশ্বই নাকি 'কানেক্টেড'। এরপরও সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির দু'জন মানুষ পরস্পরকে বিয়ে করে সংসার করতে চাইলে শুধু যে সমাজ ও পরিবারের বাধাকেই অতিক্রম করার মত দুঃসাহসী হতে হয় তা-ই নয়, একই সাথে নিজেদের উদারতাও আকাশসম হতে হয়, পারস্পরিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যবধান অতিক্রম করার জন্য। সেখানে আজ থেকে ১১৪ বছর আগে, যখন হাতে গোনা কিছু লোক এবং তারচেয়েও কম মহিলা কোনমতে পড়তে জানতো, সে সময় আশপাশের দেশ নয়, একেবারে মহাদেশের উল্টো প্রান্তের এক যুবককে ভালবেসে বিয়ে করতে হরিপ্রভা'র যে উদারতা, প্রবল সাহস ও অগ্রসরমানতা ছিল এবং তার পরিবারেরও যে মানসিকতা ছিল, সেটা ভেবে একদিকে যেমন তাদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানাতে হয়, অপরদিকে নিজের ভেতর সেই সাহস (উঁহু, ভুল বুঝবেন না, বিয়ে করার নয়, বরং ভিন্ন একটা মত বা সংস্কৃতিকে গ্রহণ করার সাহসের কথা বলছি) ও উদারতার অভাব দেখে হরিপ্রভাকে ঈর্ষা ও নিজেকে খানিকটা করুণাও হয়।
তো, হরিপ্রভা সেই রূপকথার নায়িকার মত স্বামীর দেশ দেখতে রওনা দিলেন ১৯১২ সালের ২ নভেম্বর। পুরো ভ্রমণটা ছোট একটা ডায়েরির মত লেখা। জাপান যেতে লেগেছিল ৪০ দিন, ঢাকা থেকে নারায়নগঞ্জ-গোয়ালন্দ-কলকাতা হয়ে জাহাজে রেঙ্গুন-পেনাং-সিঙ্গাপুর-সাংহাই থেকে জাপানের 'মোজি' (নাকি মুজি?) বন্দর। এরপর কোবে হয়ে শ্বশুরবাড়ি, নাগোয়ার কাছাকাছি কোন গ্রাম। যাত্রাপথের বিবরণ আছে, কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো তাঁর শ্বশুরবাড়ি, সেখানকার প্রতিবেশীদের কাজকর্ম, জীবনযাত্রা, তাদের আচার-আচরণ, তাঁকে কিভাবে সবাই আপন করে ঘরের মানুষ করে নিয়েছিল সেসব অন্তরঙ্গ আলাপ। লেখনী আহামরি কিছু নয়, কিন্তু মনে হবে সেসময়কার জাপানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে। জাপানে দু'বছরের বেশি ছিলাম, কাজেই মিলিয়ে নিতে পারি যে, এসব জীবনাচরণ বা রীতিনীতি এখনো কিছু কিছু একই রকম আছে। টোকিওর সেই শতবর্ষী উয়েনো পার্কেও ঘোরার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ওয়াতানাবে সানের ভাষ্যমতে, কোন কোন ক্ষেত্রে রবিঠাকুরের 'জাপান যাত্রী'-র চেয়েও হরিপ্রভা তাকেদার এই বিবরণ ঐতিহাসিকভাবে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ রবিগুরু গিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে, তার সাথে একদম সাধারণ জাপানিদের মিথষ্ক্রিয়ার তেমন সুযোগ ছিল না। কিন্তু হরিপ্রভা জাপানকে দেখেছেন একদম মাটির কাছ থেকে, এবং সেহেতু উভয় দেশের সাংস্কৃতিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও এই বিবরণ এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। রবিগুরুর ৪ বছর আগে তিনি জাপান গিয়েছিলেন, সম্ভবত প্রথম বাঙালি মহিলা হিসেবে, এবং তাঁর এই বিবরণও বহুদিন পর্যন্ত কোন বাঙালি বা ভারতীয় মহিলার লেখা একমাত্র জাপানের বিবরণ। কাজেই তাঁর লেখায় জাপানের ঘর-গেরস্থালির যে বর্ণনা আমরা পাই, সেটাও আর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়।
আফসোস একটাই, তিনি পেশাদার লেখিকা ছিলেন না, কাজেই বিবরণটা একদমই ছোট। আরো অনেক কিছু জানার ছিল, হলো না। এমনকি হরিপ্রভা বা তাকেদা বা তাঁদের বংশধররা কোথায় এখন, সে সম্পর্কিত কোন হদিসও আর পাওয়া যায় না। পেলে যে সামাজিক ইতিহাসের আরেকটা দিক নিয়ে জানা যেত, (যেমন ধরুন, বাংলার প্রথম জাপানি-বাঙালি সন্তানদের কি হলো বা তাদের ভাবনাটাই বা কেমন), সেটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তারপরেও, অবশ্যপাঠ্য, ৫/৫। বইটা প্রকাশ করার সাহিত্য প্রকাশকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা, আর বইমেলায় কিনে ফেলেছিলাম বলে নিজেরই পিঠ চাপড়াচ্ছি। গত ক'দিনে দুই বাংলার তথাকথিত নতুন 'হিট' থ্রিলার লেখকদের ৫-৬টা অতি অখাদ্য ৩০০-৪০০ পৃষ্ঠা মিলে আড়াই হাজার পৃষ্ঠার কুখাদ্য ভক্ষণের পর এই বইটা সেই বদহজম থেকে মুক্তি দিল বলে স্বর্গত হরিপ্রভা সান ও তাকেদা সানের প্রতিও ধন্যবাদ জানাই।
আপাতদৃষ্টিতে জাপান ভ্রমণ নিয়ে লেখা প্রথম ভ্রমণকাহিনী বলা হয় রবীন্দ্রনাথের "জাপান যাত্রী" বইকে। উল্লেখ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৬ সালে জাপান ভ্রমণ করেছিলেন এবং তার ভ্রমণকাহিনী ১৯১৯ সালে সর্বপ্রথম পুস্তাকারে বের হয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ও আগে জাপান ভ্রমণ নিয়ে " বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা" নামক বই লিখেছিলেন আমাদের ঢাকার ই মহিলা হরিপ্রভা মল্লিক।
জাপানি তরুণ উয়েমন তাকেদা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভাগ্যান্বেষনে ভারতবর্ষে আসেন। পরবর্তীতে বুলবুল সোপ ফ্যাক্টরিতে চাকরি পান তাকেদা। পরবর্তীতে নিজেই ফ্যাক্টরি করেন। পরবর্তীতে ঢাকা ব্রাহ্মণ সমাজে যাতায়াত শুরু করার দরুন হরিপ্রভা মল্লিক নামের এক বঙ্গ কন্যার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন উয়েমন তাকেদা।
বিয়ের ৬ বছর পরে ১৯১২ সালের নভেম্বর মাসে প্রথমবারের মতো শ্বশুরবাড়ি জাপানের উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করেন হরিপ্রভা তাকেদা দম্পতি। কলকাতা, রেঙ্গুন, পেনাং, সিঙ্গাপুর, হংকং, সাংহাই হয়ে জাপানে পৌঁছে চার মাস অবস্থান করেছিলেন তাকেদা দম্পতি। তারই ভ্রমণকাহিনী ১৯১৫ সালে বই আকারে বের হয় যা কিনা রবীন্দ্রনাথের "জাপান যাত্রী" বইয়ের চার বছর আগে প্রকাশিত। তবে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তায় জন্যই কি তার বইকে প্রথম জাপান ভ্রমণকাহিনী হিসেবে উল্লেখ করা হয়? উল্লেখ্য হরিপ্রভা তাকেদা আর তাই বই ইতিহা��ের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়।
ভূমিকা, প্রবন্ধ সহ মাত্র ৫৯ পেজের এই ভ্রমণকাহিনীটা আমার অনেক ভালো লেগেছে। হরিপ্রভা প্রফেশনাল লেখক না হওয়াতে তার ভ্রমণকাহিনী সাধু ভাষায় লিখলেও তা সহজপাঠ্য। কঠিন কোন শব্দ না থাকায় বইটা পড়তে অনেক ভালো লেগেছে। ভ্রমণকাহিনী হিসেবে নিঃসন্দেহে অনেক সুন্দর একটা বই " বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা " বইটা।
রাত ৩টায় ঘুমাতে যাওয়ার আগে হঠাৎ এই বইটা দেখে ফেললাম।।এনিমে দেখার সুবাধে জাপান দেশটার প্রতি আমার দুর্বলতা অনেক বেশি।।তাই নিজেকে আর সামলাতে না পেরে পড়ে ফেললাম ৫৮ পৃষ্টার এই ছোট, সুন্দর বইটি।।আহ কি আকর্ষণীয় ভঙ্গিমায় লেখা এই বইটি।।৩০ মিনিটের মাথায় আমিও হরিপ্রভা সান আর তার স্বামীর সাথে ৪মাসের জাপান ভ্রমণ করে এলাম।।কত সুন্দর একটা দেশ।। খুবই ভালো লাগলো,আমার সকল বইপ্রেমী বন্ধুদের আমি অবশ্যই এই বইটা পড়তে বলবো 😊 আর এনিমেপ্রেমীদের আলাদা করে কিছু বলার নেই।।💜💜
এখন আমরা অনেকেই জাপানে কাজের খোজে পাড়ি জমাই। কিন্তু ১৯০০ সালের দিকে চিত্রটি উল্টো ছিলো। জাপানীরা ভারতীয় উপমহাদেশে কাজের খোজে আসতো। এরকম একজম জাপানী ওয়েমন তাকেদা ঢাকা শহরে এসে সাবানের ফ্যাক্টরীতে কাজ শুরু করে। তার সাথে পরিচয় হয় বাঙালী মেয়ে হরিপ্রভা মল্লিকের। এরপর তারা বিয়ে করে। হরিপ্রভা হয়ে যান হরিপ্রভা তাকেদা। হরিপ্রভা তাকেদার ১৯১২ সালে চার মাসের জন্য জাপানে যাবার সুযোগ হয়। সেই অভিজ্ঞতাই তিনি এই বইয়ে তুলে ধরেছেন। একজন সাধারণ রমনীর জাপান যাত্রার গল্প এটি। সময়কাল বিবেচনা করলে বেশ অবাক হতে হয়।
কোন কোন বই পড়তে হয় জানার জন্য। এই বইটি প্রকাশের প্রায় ৯০ বছর পর এই অধম জাপানে গমন করেছিলেন। বই পড়ার সময় প্রতি বাক্যেই আমি তুলনা করেছি ২০০৫ এর ঢাকাবাসী আর ১৯১৫ এর ঢাকাবাসী আর ২০১৫ আর ১৯১৫ এর জাপানবাসী আর চিন্তা করেছি what we have done and what they have done?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাপানযাত্রী বইয়ের কথা অনেকেই জানেন। ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথ জাপান ভ্রমণ করেছিলেন। তবে তারও বছর চারেক আগে একজন বাঙালি মহিলা জাপান ঘুরে এসেছিলেন তা অনেকেই হয়তো জানেন না। সে ভ্রমণকাহিনী প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৫ সালে। এটিই বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম জাপান ভ্রমণ কাহিনী। তারচেয়েও গর্বের ব্যাপার হরিপ্রভা তাকেদা নামের এই নারী ছিলেন ঢাকার বাসিন্দা। হরিপ্রভা মল্লিকের সাথে জাপানের নাগরিক উয়েমন তাকেদার বিয়ে হয়েছিলো নবসংহিতা রীতি অনুসরণ করে ১৯০৬ সালে। হরিপ্রভা ছিলেন ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের মেয়ে। আর উয়েমেন ছিলেন ভাগ্যান্বেষী এক জাপানী যুবক যিনি কাজ করতেন ঢাকার বুলবুল সোপ ফ্যাক্টরীতে। বিয়ের কিছুদিন পর তিনি নিজেই ঢাকা সোপ ফ্যাক্টরী নামে একটি সাবান তৈরির কারখানা চালু করেন। বিয়ের ছয় বছর পর ১৯১২ সালের এই নভেম্বর মাসেই উয়েমেনের সাথে হরিপ্রভা তার শ্বশুরবাড়ির দেশ জাপান ভ্রমণে যান। তখন এদেশ থেকে জাপানে যেতে হতো জাহাজে চেপে। এই সমুদ্রযাত্রায় সময় লেগেছিলো প্রায় মাস দেড়েক। পথে পড়েছিলো রেঙ্গুন, পেনাং, সিঙ্গাপুর, হংকং, সাংহাই। দিনলিপির আকারে হরিপ্রভা তার ভ্রমণের বর্ণনা দিয়েছেন। জাপানে পৌছে হরিপ্রভা কোবে, টোকিও, ওসাকা এমন বড় শহরগুলোতে যেমন গিয়েছিলেন তেমনি তার শ্বশুরবাড়ির গ্রামেও কাটিয়েছেন দীর্ঘসময়। হরিপ্রভার লেখাটি আকারে খুব বড় নয়। এই সংক্ষিপ্ত বিবরণীতেই তিনি জাপানের তখনকার সমাজ, রাস্তাঘাট, ধর্ম, কৃষি, বাড়িঘর, পোশাক, খাদ্য ও মানুষ সম্পর্কে চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। জাপান তখনও উন্নয়নশীল একটি দেশ। তবে সে সময়কার টোকিও শহরের একটি মেয়ে স্কুলের যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তাতে বোঝা যায় জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা তখনই অনেক এগিয়ে ছিল। হরিপ্রভা লিখেছেন জাপানের মানুষ মূলত শিন্টো ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও জাপানে তখন খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। তার শ্বশুরের পরিবার ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বর্হিবিশ্বের সাথে তখনও পর্যন্ত জাপানীদের যোগাযোগ কমই ছিল। একজন বিদেশি ও ইন্দোজিন বা ভারতীয় এবং গৌতম বুদ্ধের দেশের মানুষ হওয়ায় হরিপ্রভা যেখানেই যেতেন সেখানেই মানুষের কৌতুহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যেতেন। এমনকি হরিপ্রভা ও উয়মেন এর বিয়ে ও জাপানে পদার্পনের খবর ছাপা হয়েছিলো তখনকার জাপানী পত্রিকাতেও। চার মাস ভ্রমণের পর তাকাদা দম্পতি ঢাকায় ফিরে এসেছিলেন। বইটি সংগ্রহ ও সম্পাদনা যিনি করেছেন, জনাব মনজুরুল হক তার ভূমিকায় লিখেছেন বইটি হারিয়ে গিয়েছিলো বিস্মৃতির আড়ালে। বইটির একটি মাত্র কপিই ছিল লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে। সেই বইয়ের মাইক্রোফিল্মের কপি সংগ্রহ করে ১৯৯৯ সালে বইটি পুনঃপ্রকাশ করেন তিনি। তার লেখা হরিপ্রভার জাপান ভ্রমণ নিয়ে একটি পর্যালোচনা ও জাপানি গবেষক কাযুহিরো ওয়াতানাবের লেখা একটি প্রবন্ধ এই বইয়ের সাথে যুক্ত আছে। তাতে বইয়ের কলেবর সামান্য বৃদ্ধি পেলেও পাঠকের পক্ষে হরিপ্রভার ভ্রমণকালীন সময়ের জাপানকে জানতে পারা সহজ হবে।
বইটি কবে কোথা থেকে সংগ্রহ করেছিলাম আজ আর মনে নেই। দীর্ঘদিন না পড়েই ফেলে রেখেছিলাম ঘরের এক কোণে। হঠাৎ করেই পড়ার মতো কোন বই না পেয়ে বইটা হাতে নেই, ছোট বইটা শেষ করতেও সময় লাগে নি। আশা করি বইটা এখন আর দূর্লভ না, যে কেউই একটু খুঁজলে পেয়ে যাবেন।
পুনঃশ্চ- হরিপ্রভা তাকাদার পরবর্তী জীবন, সন্তান সন্ততি সম্পর্কে এই বই থেকে কিছু অবশ্য জানা যায় না। তবে গুগল ঘেটে জানলাম তাকাদা দম্পতি পরেও আরেকবার জাপান গিয়েছিলেন গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে। হরিপ্রভা তখন আজাদ হিন্দ ফৌজের হয়ে টোকিও রেডিওতে বাংলায় সংবাদ পাঠিকার কাজ নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশে ফিরলেও ততদিনে দেশভাগ হয়ে যাওয়ায় ঢাকায় আর না ফিরে তারা পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে চলে যান এবং তাকাদা দম্পতির দুজনেই ভারতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২০১২ সালে হরিপ্রভার প্রথম জাপান যাত্রার শতবর্ষে বাংলাদেশের খ্যাতনামা চিত্র পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল জাপান ফাউন্ডেশনের সহায়তায় হরিপ্রভার জীবনের উপর নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন যার নাম জাপানী বধূ।
পুরো বইটি আমার কাছে একদম ঘোরের মত লেগেছে। একজন হিন্দু মেয়ের জাপানি ছেলেকে বিয়ে করা সেটাও আবার ১৯১২ সালের দিকে। এটা ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ করে বেঙল প্রভিন্সে একদম কল্পনা করা যায় না । বাঙালি মেয়ে হরিপ্রভা মল্লিক জাপানি ছেলে তাকেদা সানকে বিয়ে করে হয়ে গেলেন হরিপ্রভা তাকেদা। তাকেদা সানের ভারতে আসার কারনটাও বিষ্ময়কর। এখন যেমন জীবিকার তাগিদে কিংবা লেখাপড়ার জন্য বাংলাদেশী ও ভারতীয়রা জাপানে গিয়ে থাকেন তখন জাপানীরা ভারতে আসতেন জীবিকার তাগিদে। তাকেদা সান ঢাকার একটি সাবানের কারখানায় কাজ করতেন।পরবর্তীতে তিনি নিজেই একটি সাবানের কারখানা দেন। হরিপ্রভাকে বিয়ে করে তিনি পূর্ববাংলা তখা ঢাকায় বসবাস করতে থাকেন।
হরিপ্রভা তাকেদা সানকে বিয়ে করার পর থেকে জাপানে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকেন। তার শ্বশুর-শ্বাশুরী ও অন্যা্ণ্য আত্মীয়দের সাথে মিলিত হওয়ার বাসনা তার মধ্যে ছিল। অবশেষে তার সামনে সেই সুয়োগ এসে যায়। ১৯১২ সালে তিনি তার স্বামী তাকেদা সানের সাথে জাপানের উদ্দেশ্যে রওয়ান হন। ঢাকা থেকে কোলকাতা তারপর জাহাজে করে জাপানের কোবে শহরে গমন.....। হরিপ্রভার ভ্রমনকাহিনীতে জাহাজ ভ্রমণের সুখকর ও যন্ত্রনাদায়ক কাহিনীগুলোও উঠে এসেছে।
তিনি জাপানে প্রায় ৪ মাস অবস্থান করেন। জাপানের মানুষের অতিথিয়তা,পোশাক,খাবার,শিক্ষা-দীক্ষা,সততা,অন্তরিকতা ও জাপাানের প্রাচীন রীতিনীতি তার লেখনিতে জায়গা পেয়েছে।তবে তার বইতে জাপানিদে ঐতিহ্য নিয়ে বেশকয়েকটি ভুল তথ্যও এসেছে, সেগুলো অবশ্য বইয়ের শেষের দিকে জাপানি লেখক কাযুহিরো ওয়াতানাবে’র ‘হরিপ্রভার দেখা জাপান’ নামক প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে।
রবী ঠাকুরের ‘জাপানযাত্রী’রও আগে ঢাকার মেয়ে হরিপ্রভা তাকেদার ’বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। তাকেদা ১৯৪১ সালে পুনরায় জাপান যান। তাকে নিয়ে নির্মিত তানভির মোকাম্মেলের তথ্যচিত্রটিও চমৎকার।
যারা কমবেশি রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন সবার সম্ভবত রবীঠাকুরের জাপান ভ্রমণকে কেন্দ্র করে জাপান দেশের প্রতি উৎসাহ জমেছে।আমিও রবীন্দ্র পাঠক, কিন্তু এ বিষয়টি আমার ক্ষেত্রে ঘটেনি।জাপানকে ঘিরে আমার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে বেশ কিছু ব্যাপার নিয়ে।এর মধ্যে সহজ সাধারণ বিষয় হলো একটা ফুল,নাম ক্রিসানথেমাম।ছবিতে বইয়ের পাশে যে ফুল দেখা যাচ্ছে এই ফুলের নাম ক্রিসানথেমাম,বাংলাতে বলা হয় চন্দ্রমল্লিকা।জাপানের রাজকীয় প্রতীক বলা হয় এই চন্দ্রমল্লিকা ফুলকে।কেন বলা যায় সে বিষয়ে অন্যদিন আলোচনা করা যেতে পারে।আরেকটি বিষয় বলা যেতে পারে জাপান কে ঘিরে,জাপানের সংস্কৃতি আমাকে ভীষণ মুগ্ধ করে।জাপানের জাতীয় ফুল সাকুরাও আমার ভীষণ পছন্দের। অপর্ণা সেন পরিচালিত 'দ্য জাপানিজ ওয়াইফ' সিনেমাটি যারা দেখেছেন জাপান সম্পর্কে খুব সাদামাটা ধারণা জানবেন।বিশেষ করে মিয়াগির পাঠানো বড়বড় ঘুড়ি৷
এ বইয়ের লেখিকা হরিপ্রভা তাকেদা ছিলেন জাপানের নাগরিক উয়েমন তাকেদার স্ত্রী।ব্যবসায়িক কাজে জাপান ছেড়ে উনার ভারতে আসা।তিনি ঢাকায় একটা টাইপরাইটার কোম্পানিতে কাজ করতেন।বিয়ের পর তিনি ১৯১২ সালে হরিপ্রভাকে জাপানে নিয়ে যান এবং হরিপ্রভা তাকেদা'ই প্রথম বাঙালি নারী যিনি জাপান ভ্রমণ করেছিলেন এবং একই সঙ্গে এই বইটিও তিনি লিখেন। জাপানে তার শ্বশুরবাড়ি ছিল নাগোয়া শহরের কোন ছোট একটা গ্রামে।ঢাকা থেকে জাপান যাওয়ার বর্ণনা,জাপানে গিয়ে তাদের সংস্কৃতি,খাবার এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক অনেক বিষয় নিয়ে হরিপ্রভা তার বইয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।