কোন কোন বই অবশ্যপাঠ্য হয় লেখনীর গুণে নয়, বরং বিষয়বস্তু এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে। হরিপ্রভা তাকেদা'র 'বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা' সেরকম একটি বই। মাত্র ৩৩ পৃষ্ঠার একটি বই যে কতরকম ভাবনার জন্ম দিতে পারে, এবং আরো কত উত্তর না জানা প্রশ্ন মনে ভিড় করে, সেটা বোঝার জন্য এই বইটা পড়া যে কোন বাঙালির জন্য আবশ্যক।
হরিপ্রভা মল্লিক ছিলেন ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের মেয়ে; তাঁর মা নগেন্দ্রবালা মল্লিক ছিলেন নেতৃস্থানীয় সমাজসেবিকা, উদ্ধার আশ্রমের পরিচালক। ১৯০৬ সালে হরিপ্রভা বিয়ে করেন, বোধ করি ভালবেসেই, জাপানি ছেলে উয়েমন তাকেদাকে, যিনি এদেশে এসেছিলেন একটি সাবান ফ্যাক্টরিতে চাকরি নিয়ে, এবং পরে নিজেই 'ঢাকা সোপ ফ্যাক্টরি' নামে একটি সাবান কোম্পানি খুলে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীতে পরিণত হন। এখানে অনেকগুলো ইন্টারেস্টিং তথ্য চলে আসে। সেসময়কার জাপানের অর্থনৈতিক অবস্থা অত ভাল ছিল না, যদিও জাপান তখন একটি পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথে। কাজেই সেসময় জাপানিরা ভাগ্যান্বেষণে নানা দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, এবং ব্রিটিশ ইন্ডিয়া তাদের কাছে একটি আকর্ষণীয় জায়গা। মনজুরুল হকের ভূমিকা এবং কাজুহিরো ওয়াতানাবের একটি প্রবন্ধ থেকে আমরা জানতে পারি, সে সময় কলকাতা ও ঢাকায় অনেক জাপানি চাকুরিজীবি ও ব্যবসায়ী ছিলেন। হরিপ্রভার নিজের লেখাতেও সিমেজ সান ও হাতোরি সান সহ তাঁর স্বামীর কয়েকজন ভারতপ্রবাসী জাপানি বন্ধুবান্ধবের উল্লেখ পাই, যারা সপরিবারে এখানে ব্যবসা করতেন। এখনো ঢাকায় জাপানি ও অন্যান্য উন্নত দেশের নাগরিক কম নেই, কিন্তু তাদের মাঝে ভাগ্যান্বেষী খুবই কম, বেশিরভাগই কূটনীতিবিদ বা সাহায্য সংস্থার লোকজন। আরেকটা ব্যাপার হলো, আমাদের দেশে এখনো কোন ছেলে বিদেশি মেয়ে বিয়ে করলেই সেটা বেশ একটা হৈচৈ-এর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, আর যদি কোন বাংলাদেশি মেয়ে বিদেশি ছেলে বিয়ে করে তাহলে যে কতরকম কথা ওঠে তার কিছু আমার নিজের কানেই শোনা আছে--"আরে গেল গেল, মেয়ের চরিত্র, বিদেশে কি না কি করছে, বেলেল্লা" ইত্যাদি। এটা কিন্তু ২০২০ সালের কথা বলছি, যখন আমরা দাবী করি যে, ইন্টারনেট আর কেবল টিভি'র কল্যাণে সারা বিশ্বই নাকি 'কানেক্টেড'। এরপরও সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির দু'জন মানুষ পরস্পরকে বিয়ে করে সংসার করতে চাইলে শুধু যে সমাজ ও পরিবারের বাধাকেই অতিক্রম করার মত দুঃসাহসী হতে হয় তা-ই নয়, একই সাথে নিজেদের উদারতাও আকাশসম হতে হয়, পারস্পরিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যবধান অতিক্রম করার জন্য। সেখানে আজ থেকে ১১৪ বছর আগে, যখন হাতে গোনা কিছু লোক এবং তারচেয়েও কম মহিলা কোনমতে পড়তে জানতো, সে সময় আশপাশের দেশ নয়, একেবারে মহাদেশের উল্টো প্রান্তের এক যুবককে ভালবেসে বিয়ে করতে হরিপ্রভা'র যে উদারতা, প্রবল সাহস ও অগ্রসরমানতা ছিল এবং তার পরিবারেরও যে মানসিকতা ছিল, সেটা ভেবে একদিকে যেমন তাদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানাতে হয়, অপরদিকে নিজের ভেতর সেই সাহস (উঁহু, ভুল বুঝবেন না, বিয়ে করার নয়, বরং ভিন্ন একটা মত বা সংস্কৃতিকে গ্রহণ করার সাহসের কথা বলছি) ও উদারতার অভাব দেখে হরিপ্রভাকে ঈর্ষা ও নিজেকে খানিকটা করুণাও হয়।
তো, হরিপ্রভা সেই রূপকথার নায়িকার মত স্বামীর দেশ দেখতে রওনা দিলেন ১৯১২ সালের ২ নভেম্বর। পুরো ভ্রমণটা ছোট একটা ডায়েরির মত লেখা। জাপান যেতে লেগেছিল ৪০ দিন, ঢাকা থেকে নারায়নগঞ্জ-গোয়ালন্দ-কলকাতা হয়ে জাহাজে রেঙ্গুন-পেনাং-সিঙ্গাপুর-সাংহাই থেকে জাপানের 'মোজি' (নাকি মুজি?) বন্দর। এরপর কোবে হয়ে শ্বশুরবাড়ি, নাগোয়ার কাছাকাছি কোন গ্রাম। যাত্রাপথের বিবরণ আছে, কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো তাঁর শ্বশুরবাড়ি, সেখানকার প্রতিবেশীদের কাজকর্ম, জীবনযাত্রা, তাদের আচার-আচরণ, তাঁকে কিভাবে সবাই আপন করে ঘরের মানুষ করে নিয়েছিল সেসব অন্তরঙ্গ আলাপ। লেখনী আহামরি কিছু নয়, কিন্তু মনে হবে সেসময়কার জাপানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে। জাপানে দু'বছরের বেশি ছিলাম, কাজেই মিলিয়ে নিতে পারি যে, এসব জীবনাচরণ বা রীতিনীতি এখনো কিছু কিছু একই রকম আছে। টোকিওর সেই শতবর্ষী উয়েনো পার্কেও ঘোরার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ওয়াতানাবে সানের ভাষ্যমতে, কোন কোন ক্ষেত্রে রবিঠাকুরের 'জাপান যাত্রী'-র চেয়েও হরিপ্রভা তাকেদার এই বিবরণ ঐতিহাসিকভাবে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ রবিগুরু গিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে, তার সাথে একদম সাধারণ জাপানিদের মিথষ্ক্রিয়ার তেমন সুযোগ ছিল না। কিন্তু হরিপ্রভা জাপানকে দেখেছেন একদম মাটির কাছ থেকে, এবং সেহেতু উভয় দেশের সাংস্কৃতিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও এই বিবরণ এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। রবিগুরুর ৪ বছর আগে তিনি জাপান গিয়েছিলেন, সম্ভবত প্রথম বাঙালি মহিলা হিসেবে, এবং তাঁর এই বিবরণও বহুদিন পর্যন্ত কোন বাঙালি বা ভারতীয় মহিলার লেখা একমাত্র জাপানের বিবরণ। কাজেই তাঁর লেখায় জাপানের ঘর-গেরস্থালির যে বর্ণনা আমরা পাই, সেটাও আর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়।
আফসোস একটাই, তিনি পেশাদার লেখিকা ছিলেন না, কাজেই বিবরণটা একদমই ছোট। আরো অনেক কিছু জানার ছিল, হলো না। এমনকি হরিপ্রভা বা তাকেদা বা তাঁদের বংশধররা কোথায় এখন, সে সম্পর্কিত কোন হদিসও আর পাওয়া যায় না। পেলে যে সামাজিক ইতিহাসের আরেকটা দিক নিয়ে জানা যেত, (যেমন ধরুন, বাংলার প্রথম জাপানি-বাঙালি সন্তানদের কি হলো বা তাদের ভাবনাটাই বা কেমন), সেটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তারপরেও, অবশ্যপাঠ্য, ৫/৫। বইটা প্রকাশ করার সাহিত্য প্রকাশকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা, আর বইমেলায় কিনে ফেলেছিলাম বলে নিজেরই পিঠ চাপড়াচ্ছি। গত ক'দিনে দুই বাংলার তথাকথিত নতুন 'হিট' থ্রিলার লেখকদের ৫-৬টা অতি অখাদ্য ৩০০-৪০০ পৃষ্ঠা মিলে আড়াই হাজার পৃষ্ঠার কুখাদ্য ভক্ষণের পর এই বইটা সেই বদহজম থেকে মুক্তি দিল বলে স্বর্গত হরিপ্রভা সান ও তাকেদা সানের প্রতিও ধন্যবাদ জানাই।