বিজ্ঞানের জগতে ‘ক্রিপ্টোলজি’ এত চমৎকার এক নাম যার মোহে একবার আটকে গেলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা খুব কষ্টকর। সহজ করে বলতে গেলে, মূল তথ্যকে অর্থহীন অন্য কিছুতে রূপান্তর করাই হলো ক্রিপ্টোলজির মূল উদ্দেশ্য। তথ্য গোপন করার এ পদ্ধতিকে বলা হয় এনক্রিপশন এবং গোপন করা তথ্য থেকে আবার মূল তথ্যটি ফিরে পাবার প্রক্রিয়াকে বলে ডিক্রিপশন। ক্রিপ্টোলজির অসাধারণ সেই জগতটির সাথে রহস্যপ্রিয় মনগুলোকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যেই এ বইটি লেখা। পুরো বইটিকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমেই তুলে ধরা হয়েছে ক্রিপ্টোলজি নামক মহীরুহের একেবারে শেকড়ের কিছু কথা। প্রতিটি কৌশল নিয়ে আলোচনার পর আছে অনুশীলনী, যাতে পাঠক তার অর্জিত জ্ঞানকে ঝালিয়ে নিতে পারেন। সবার শেষে স্থান পেয়েছে ইতিহাসে বিভিন্ন সময় শুধুমাত্র ক্রিপ্টোলজিকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলোর কিছু অংশ।
যুদ্ধ কিংবা অন্যান্য কূটনৈতিক তথ্য আদান প্রদানের সময় ৩য় পক্ষ যেন তথ্যের কোনো কিছু জানতে না পারে সেজন্য সাংকেতিকভাবে বার্তা আদান-প্রদান করা হয়। আবার অত্যন্ত সংবেদনশীল কোনো তথ্যকে গোপনে আগলে রাখতেও সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করা হয়। এক পক্ষ অন্যদের কাছে তথ্য গোপন রাখতে চায়, অন্য পক্ষ আবার সেই তথ্য উদ্ধার করতে চায়। এটাও সত্য যে, বার্তা যতই কঠিন সাংকেতিক ভাষায় লেখা হোক না কেন, তার মর্ম আগে হোক পরে হোক উদ্ধার করা সম্ভব। এই তথ্য গোপন করা ও তথ্য উদ্ধার করার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হয় গণিতের শাখা ক্রিপ্টোলজিতে।
গোপনীয় কোনো কিছুর রহস্য কিংবা গোপন কিছুর রহস্যভেদ নিয়ে মানুষের আদিম আগ্রহ। ড্যান ব্রাউনের 'দ্যা ভিঞ্চি কোড' বইটি পড়ার কথা মনে পড়ে যায়। কেমন করে যে এইচএসসি পরীক্ষার আগের রাতে এই বই পড়ায় মত্ত ছিলাম তা ভাবতেই অবাক হই! এমন আগ্রহোদ্দীপক ক্রিপ্টোলজির এদিক ওদিক নিয়ে চমৎকার একটি বই লিখেছেন মুহাইমিনুল ইসলাম (অন্তিক)। অন্তিক ভাই অনেকদিন ধরে মাসিক গণিত সাময়িকী 'পাই জিরো টু ইনফিনিটি'তে কোড ব্রেকিং তথা ক্রিপ্টোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করছেন। ম্যাগাজিনে প্রকাশিত লেখাগুলোর একত্রিত ও পরিমার্জিত রূপ হচ্ছে এই বইটি। এটি 'জিরো টু ইনফিনিটি গণিত সিরিজ' এর ৩য় বই। আমার মতে এই সিরিজের আওতায় প্রকাশিত ৩ টি বইয়ের মাঝে সেরা বই হচ্ছে এটি।
অন্তিক ভাইয়ের লেখার হাতও অনেক দারুণ। উনার লেখা খুব সাবলীলে পড়া যায়। তাই এই বইটি পড়লে পাঠক কিছুটা আরাম পাবেন। বইতে ৩ টি অধ্যায়ে উঠে এসেছে ক্রিপ্টোলজির ঐতিহাসিক উৎপত্তি, ক্রিপ্টোলজির প্রকারভেদ তথা কোড প্যাচিং ও কোড ব্রেকিং এর নানা সিস্টেম, এবং সবশেষে ক্রিপ্টোলজির কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা।
বইটা মাত্র ৮০ পৃষ্ঠায় শেষ হয়ে গিয়েছে, যার কারণে বইতে কিছুটা অসম্পূর্ণতা রয়ে গিয়েছে। ক্রিপ্টোলজির খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় একদমই উল্লেখ পায়নি। এই টপিক নিয়ে কম করে হলেও ৩০০ পৃষ্ঠার বই হওয়া চাই। আশায় আছি লেখক তার বইয়ের পরবর্তী খণ্ডে বাকি থাকা বিষয়গুলো তুলে ধরবেন। এই বইটা প্রথম খণ্ড।
বইটার প্রতি স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি ভালোবাসা, কারণ এই বিষয়টা খুব আগ্রহোদ্দীপক হওয়া সত্ত্বেও বাংলা ভাষায় এ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো বই নেই। লেখক তার সাবলীল লেখনী দিয়ে এমন আরো আরো বই উপহার দিবেন এই প্রত্যাশায় রইলাম। হ্যাপি রিডিং। :)