গগন শিক্ষিত লোক হওয়ায় পেটে ভাত না থাকলেও কামলা তো আর দিতে পারে না। বউ আর বোনের তাড়নায় বাড়ি ছেড়ে চলে যায় কাজের সন্ধানে। গিয়ে পরে বাদা অঞ্চলে। সেখানে গিয়ে হলুদ বড়ি বানিয়ে শুরু করে ডাক্তারি এরপর করে মাস্টারি তবুও যে চলে না। জগার বুদ্ধিতে এবার শুরু করে মাছের ঘের, বন কেটে বানায় বসত। রাতভর কাজ করো, দিনভর ঘুমোও, ঢোল পিটে গান গাও কিছুটা মনের সুখে আর কিছুটা বাঘের ভয়ে। চলছিল বেশ... এর মধ্যে এসে হাজির হয় গগনের বউ, বোন আর শালা... গেল এবার সব মনের সুখ। জগা যেখানে থাকে সেখানকার সবাইকেই মাতিয়ে রাখে। তবে সে বেশিদিন এক জায়গায় থাকতে পারে না, মন উদাস হয় ...তাতে আবার হাওয়া দিচ্ছে মহেশ। চলে যাবে আরো দক্ষিণে বাদাবন কেটে আবার বসত হবে। আবার স্বপ্ন দেখবে....
একটা অচেনা জনপদে নতুন করে জীবন গড়ে তোলা যতটা কঠিন, সেই জীবনকে নিজের মতো করে ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন। আর সেই জীবনযুদ্ধের সঙ্গে যদি মিশে যায় মানুষের লোভ, সামাজিক বাধা, সম্পর্কের টানাপোড়েন আর সুন্দরবনের দুর্বোধ্য প্রকৃতি, তাহলে সেই গল্প আর নিছক বসতি গড়ার গল্প থাকে না। মনোজ বসুর বন কেটে বসত উপন্যাসে এমনই এক জনপদের ছবি ফুটে উঠেছে, যেখানে প্রতিটি দিন কাটে সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা আর নতুন সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে।
উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র গগন। জীবনের নানা টানাপোড়েনে দিশেহারা গগনকে পাড়ি দিতে হয় অচেনা অঞ্চলে। সেখানে পৌঁছে কখনো চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে কাজ শেখার চেষ্টা, কখনো শিক্ষকতা, আবার কখনো নতুন মানুষের সঙ্গে মিশে নিজের জায়গা করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তার জীবন এগিয়ে চলে। কিন্তু গগনের কাহিনি শুধু জীবিকার সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো একজন মানুষের কাহিনি নয়। ধীরে ধীরে তার চারপাশে গড়ে ওঠে নতুন সম্পর্ক, নতুন কর্মক্ষেত্র এবং নতুন এক জীবনযাত্রা। মাছের ব্যবসা ও ঘেরিকে কেন্দ্র করে তার জীবনে আসে সাফল্যের সম্ভাবনা, আর সেই সম্ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে যায় নানা মানুষের স্বার্থ ও প্রত্যাশা।
এই উপন্যাসের বিশেষ আকর্ষণ এর চরিত্রগুলো। জগা, বলাই, চারুবালা, বিনোদিনীসহ অন্যদের কথাবার্তা, রসিকতা, অভিমান ও আচরণ কাহিনিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে চারুবালার দৃঢ়তা এবং জগার সঙ্গে তার খুনসুটি গল্পের মধ্যে আলাদা স্বাদ এনে দেয়। অন্যদিকে, মানুষের বসতি গড়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে পুরোনো পরিবেশ ও জীবনযাত্রা বদলে যায়, সেটিও কাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বন কেটে জমি তৈরি করা, জল-জঙ্গলের মধ্যে চলাচল, মাছ ধরা এবং ঘেরির বাঁধ সামলানোর বিবরণ পাঠককে সেই প্রতিকূল পরিবেশের খুব কাছে নিয়ে যায়।
তবে নতুন করে গড়ে ওঠা জীবন সব সময় শান্তিতে এগোয় না। মানুষের মধ্যে ক্ষমতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব, সামাজিক সংকীর্ণতা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির চাপ চরিত্রগুলোকে বারবার কঠিন অবস্থার মুখোমুখি করে। ফলে কাহিনিতে যেমন হাসি-আনন্দ আছে, তেমনি আছে অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তা।
একটি বসতি গড়ে তোলা মানে শুধু বন কেটে জমি তৈরি করা নয়; সেখানে মানুষের স্বপ্ন, পরিশ্রম, সম্পর্ক ও সংঘাতও একসঙ্গে শিকড় ছড়ায়। গগন ও তার চারপাশের মানুষগুলোর জীবন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেই কৌতূহলই উপন্যাসটির প্রতি পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখে। যারা চরিত্রনির্ভর কাহিনি, গ্রামীণ জীবন, জল-জঙ্গলের পরিবেশ এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প পড়তে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য বইটি হয়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় এক পাঠ-অভিজ্ঞতা।
মনোজ বসুর বই পড়ব পড়ব করেও আগে পড়া হয়নি। নিশিকুটুম্বও পড়া হয়নি। এই বইটি পড়ে মন ভরে গেল। সুন্দরবনের বাদা অঞ্চলের জলে জঙ্গলে মানুষের লড়াইয়ের গল্প চোখের সামনে ফুটে উঠলো।
আন্ডাররেটেড অথোর, যেমন তার যশোরের বাড়ি বর্তমানে যারা দখল করে আছে তারাও তার বই পড়ে দেখেনি। এই বই লেখকের থেকে আরো আন্ডাররেটেড, সবাই মনোজ বসু মানে 'নিশি কুটুম্ব' মনে করে। কিন্তু 'বন কেটে বসত' কম নয়! আমি এই বই পড়ে যারপরনাই আনন্দিত, বিস্মিত।
কিছুটা শিক্ষিত গগন নগেনের বোনকে বিয়ে করে, এবং তার একজন বিধবা বোন চারু আছে। সংকটে পড়েছে সংসার। সংসারে থাকা দায়,বউ আর বিধবা বোনের চাপে তাকে সন্ধ্যার একটি লগ্নে বাড়ির মূল চৌকাঠ পেরিয়ে যেতে হয়। কিন্তু রাতে যাবে কোথায়? তাই ওদিন বারান্দায়ই থাকে। বউকে কাছে বসতে বললে সে মুহূর্তকাল থেকেই ঘরে চলে যায়, গগন তো আর এখন ভিতরে ঢুকতে পারবে না তাহলে যাত্রা ভঙ্গ হবে। চারু একটু বুদ্ধি করে ভাই ও ভাবীকে বারান্দার এক রুমে আটকে দেয় কারণ ভোর থেকেই হবে বিরহ কালের শুরু। তা যাইহোক গগন প্রথমে এক ডাক্তারের বাড়িতে থেকে হোমিওপ্যাথি শেখে কিন্তু ওই বাড়িতে ডাক্তারের মেয়েকে বিয়ে করলে তাকে ডাক্তারির সকল বিদ্যা শিখিয়ে দেবে এই শর্তে গগন প্রথমে রাজী হয়। কিন্তু ডাক্তারের মেয়ে তার প্রথম বউর কথা জানতে পারে তাই ওই ডাক্তারের মেয়ে গগনকে নিয়ে তার পূর্ব প্রেমিক হরিদাসের কাছে পালিয়ে আসে। গগন এখান থেকে গ্রাম অঞ্চলে ঘুরতে থাকে ডাক্তারি করার জন্য কিন্তু সে কোন রোগী পায় না। বাধ্য হয়ে এক গ্রামে পাঠশালায় শিক্ষকতা শুরু করে। কিন্তু তাতে পেট চলে ধান কাটার মৌসুমে, বাকি সময় উপবাস।জগেনের সাথে বন্ধুত্ব হয় যে কিনা তাকে একবার ধোঁকা দিয়ে পালিয়েছিল। যাইহোক জগেনের যুক্তিতে চলে আসে বাদা অঞ্চলে। "যার নাই মূলধন সে যায় বাদাবন"।তার আদর্শ হয় কাঙালি চক্কোত্তি যে আগে গরীব ছিল কিন্তু বাদা অঞ্চলে মাছ চাষ করে ধনী হয়েছে। গগনও মাছ চাষ শুরু করে। কিন্তু হঠাৎই বহুকষ্টে ঠিকানা সংগ্রহ করে একদিন গগনের শালা নগেন গগনের বউ ও বোন নিয়ে চলে আসে গগনের আলায় বা আলয়ে। নগেন এসেই তার চাল শুরু করে, বিধবা চারুকে বিয়ে করে গগনের সম্পদ হজম করতে চায়। তখন গগনের সুহৃদ জগেন বিধবা চারুকে নিয়ে চোরা নৌকায় করে গহীন দক্ষিণ বনে পালিয়ে যায়। নগেন চারুকে বিয়ে না করতে পারলে খোঁড়া নগেন হয়তো আবার তার প্রথম স্ত্রীর কাছে চলে যাবে। । লেখক অনেক সুনিপুণ হাতে বনাঞ্চলের ছবি এঁকেছেন , অনেক অনেক বিশ্বাসের কথা পাওয়া যাবে যা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ বিশ্বাস করে। জয়নুল আবেদীন তো তার স্ত্রীকে মনোজ বসুর বই উপহার দিতেন এনিভারসারিতে। আমার একান্ত অনুরোধ আপনিও উপহার দিন আপনার প্রিয়জনকে এই উপন্যাস খানি।