গগন শিক্ষিত লোক হওয়ায় পেটে ভাত না থাকলেও কামলা তো আর দিতে পারে না। বউ আর বোনের তাড়নায় বাড়ি ছেড়ে চলে যায় কাজের সন্ধানে। গিয়ে পরে বাদা অঞ্চলে। সেখানে গিয়ে হলুদ বড়ি বানিয়ে শুরু করে ডাক্তারি এরপর করে মাস্টারি তবুও যে চলে না। জগার বুদ্ধিতে এবার শুরু করে মাছের ঘের, বন কেটে বানায় বসত। রাতভর কাজ করো, দিনভর ঘুমোও, ঢোল পিটে গান গাও কিছুটা মনের সুখে আর কিছুটা বাঘের ভয়ে। চলছিল বেশ... এর মধ্যে এসে হাজির হয় গগনের বউ, বোন আর শালা... গেল এবার সব মনের সুখ। জগা যেখানে থাকে সেখানকার সবাইকেই মাতিয়ে রাখে। তবে সে বেশিদিন এক জায়গায় থাকতে পারে না, মন উদাস হয় ...তাতে আবার হাওয়া দিচ্ছে মহেশ। চলে যাবে আরো দক্ষিণে বাদাবন কেটে আবার বসত হবে। আবার স্বপ্ন দেখবে....
মনোজ বসুর বই পড়ব পড়ব করেও আগে পড়া হয়নি। নিশিকুটুম্বও পড়া হয়নি। এই বইটি পড়ে মন ভরে গেল। সুন্দরবনের বাদা অঞ্চলের জলে জঙ্গলে মানুষের লড়াইয়ের গল্প চোখের সামনে ফুটে উঠলো।
আন্ডাররেটেড অথোর, যেমন তার যশোরের বাড়ি বর্তমানে যারা দখল করে আছে তারাও তার বই পড়ে দেখেনি। এই বই লেখকের থেকে আরো আন্ডাররেটেড, সবাই মনোজ বসু মানে 'নিশি কুটুম্ব' মনে করে। কিন্তু 'বন কেটে বসত' কম নয়! আমি এই বই পড়ে যারপরনাই আনন্দিত, বিস্মিত।
কিছুটা শিক্ষিত গগন নগেনের বোনকে বিয়ে করে, এবং তার একজন বিধবা বোন চারু আছে। সংকটে পড়েছে সংসার। সংসারে থাকা দায়,বউ আর বিধবা বোনের চাপে তাকে সন্ধ্যার একটি লগ্নে বাড়ির মূল চৌকাঠ পেরিয়ে যেতে হয়। কিন্তু রাতে যাবে কোথায়? তাই ওদিন বারান্দায়ই থাকে। বউকে কাছে বসতে বললে সে মুহূর্তকাল থেকেই ঘরে চলে যায়, গগন তো আর এখন ভিতরে ঢুকতে পারবে না তাহলে যাত্রা ভঙ্গ হবে। চারু একটু বুদ্ধি করে ভাই ও ভাবীকে বারান্দার এক রুমে আটকে দেয় কারণ ভোর থেকেই হবে বিরহ কালের শুরু। তা যাইহোক গগন প্রথমে এক ডাক্তারের বাড়িতে থেকে হোমিওপ্যাথি শেখে কিন্তু ওই বাড়িতে ডাক্তারের মেয়েকে বিয়ে করলে তাকে ডাক্তারির সকল বিদ্যা শিখিয়ে দেবে এই শর্তে গগন প্রথমে রাজী হয়। কিন্তু ডাক্তারের মেয়ে তার প্রথম বউর কথা জানতে পারে তাই ওই ডাক্তারের মেয়ে গগনকে নিয়ে তার পূর্ব প্রেমিক হরিদাসের কাছে পালিয়ে আসে। গগন এখান থেকে গ্রাম অঞ্চলে ঘুরতে থাকে ডাক্তারি করার জন্য কিন্তু সে কোন রোগী পায় না। বাধ্য হয়ে এক গ্রামে পাঠশালায় শিক্ষকতা শুরু করে। কিন্তু তাতে পেট চলে ধান কাটার মৌসুমে, বাকি সময় উপবাস।জগেনের সাথে বন্ধুত্ব হয় যে কিনা তাকে একবার ধোঁকা দিয়ে পালিয়েছিল। যাইহোক জগেনের যুক্তিতে চলে আসে বাদা অঞ্চলে। "যার নাই মূলধন সে যায় বাদাবন"।তার আদর্শ হয় কাঙালি চক্কোত্তি যে আগে গরীব ছিল কিন্তু বাদা অঞ্চলে মাছ চাষ করে ধনী হয়েছে। গগনও মাছ চাষ শুরু করে। কিন্তু হঠাৎই বহুকষ্টে ঠিকানা সংগ্রহ করে একদিন গগনের শালা নগেন গগনের বউ ও বোন নিয়ে চলে আসে গগনের আলায় বা আলয়ে। নগেন এসেই তার চাল শুরু করে, বিধবা চারুকে বিয়ে করে গগনের সম্পদ হজম করতে চায়। তখন গগনের সুহৃদ জগেন বিধবা চারুকে নিয়ে চোরা নৌকায় করে গহীন দক্ষিণ বনে পালিয়ে যায়। নগেন চারুকে বিয়ে না করতে পারলে খোঁড়া নগেন হয়তো আবার তার প্রথম স্ত্রীর কাছে চলে যাবে। । লেখক অনেক সুনিপুণ হাতে বনাঞ্চলের ছবি এঁকেছেন , অনেক অনেক বিশ্বাসের কথা পাওয়া যাবে যা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ বিশ্বাস করে। জয়নুল আবেদীন তো তার স্ত্রীকে মনোজ বসুর বই উপহার দিতেন এনিভারসারিতে। আমার একান্ত অনুরোধ আপনিও উপহার দিন আপনার প্রিয়জনকে এই উপন্যাস খানি।