আমি সত্যি এতদিন জানতাম না যে, বাবা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে এত সুন্দর একটা বই লেখা হয়েছিল। বাবার কথার মধ্য দিয়েই এইভাবে তাঁর প্রজ্ঞার কথা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসত। আমার সব চেয়ে যেটা ভাল লাগল তা হল সেই কতকাল আগে একটা ছোট্ট ছেলে এত মনোযোগ সহকারে এমন একটা কাজে হাত দিয়েছিল।' -লিখেছেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর, এ-বইয়ের ভূমিকায়। সত্যিই চমক-জাগানো এই বই। একদিকে আত্মকথা, অন্যদিকে উত্তমপুরুষে বর্ণিত এক উপন্যাস। সিরাজু ডাকাতের বংশধর কীভাবে হয়ে উঠলেন এক অসামান্য সংগীতসাধক, দুর্গম সাধনার কাঁটা-মোড়া সোপানপরম্পরা কী করে করলেন অতিক্রম, কী চোখে ইয়োরোপ দেখলেন এক সাতষট্টি বছরের যুবা-সেই ঘটনাবহুল ইতিবৃত্ত অকপট মজলিশী ভঙ্গিতে বলে গিয়েছেন এক শুদ্ধপ্রাণ সাধক, আরেক শিল্পপ্রাণ যুবক অনুলেখনে ধরে রেখেছেন সেই অভিজ্ঞতার বিবরণ। অন্বেষণ করেছেন সেই মহাজীবনের মূল সত্যটিকে। বিষয়ে বৈচিত্র্যময়, স্বাদে রমণীয়, আত্মায় শিক্ষাপ্রদ এই বই ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক দুর্লভ সংযোজন।
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এক সময় শান্তি নিকেতনে কিছুদিন ছিলেন। তখন তিনি আড্ডায় নিজের জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু বলেছিলেন যা শুভময় ঘোষ লিপিবদ্ধ করেন। সেটাই প্রকাশিত হয় “আমার কথা” নামে প্রথমে রত্নসাগর গ্রন্থমেলা থেকে, পরবর্তীতে আনন্দ প্রকাশনী থেকে। এটাকে আত্মজীবনী বলাই যায়।
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কোন রাখঢাক এর ধার ধরেছেন বলে মনে হয়নি। তিনি তার জীবনের নানা দিক সম্পর্কে বলে গেছেন দ্বিধাহীন ভাবে। ডাকাতের বংশধর ছিলেন, সেটা নিয়ে লুকাছাপা করেননি, বাড়ি পালিয়েছেন সঙ্গীতকে ভালবেসে, লঙ্গরখানায় খেয়েছেন, ওস্তাদ এর কাছে দীক্ষা নিতে এহেনও কাজ নেই করেননি, মাইহারের রাজসভায় অন্তর্ভুক্তি, বিলেত ভ্রমন, ছুড়ি- কাঁটাচামচে বিব্রত হওয়া, বাঙালী হওয়ায় মেছো হিসেবে অপমানিত হওয়া এরকম নানা দিক উঠে এসেছে তার বর্ণনায়।
বইটিতে ভুমিকা হিসেবে রয়েছে তার ছাত্র ও জামাই পণ্ডিত রবিশঙ্কর এর স্মৃতিচারণ যা আরো গভীরতা দিয়েছে বইটিকে। কারন পন্ডিত রবিশঙ্কর খুব কাছ থেকে দেখেছেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কে।
১৯৫২ সালে সুরসম্রাট উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন নাতি আশিস খাঁ (উস্তাদ আকবর আলী খানের পুত্র) কে সাথে নিয়ে। সেখানে উনি দুই মাস ছিলেন। সেই দুই মাসে তিনি দুই আসরে বসে গল্পচ্ছলে নিজের সমগ্র জীবনের একটা গতিময় বর্ণনা দিয়েছিলেন, সেটাই শান্তিনিকেকেতনের তৎকালীন ছাত্র—(অথবা কর্মী, শান্তিনিকেতে পড়া শেষ করে উনি সেখানেই উনার কর্মজীবন শুরু করেন) শুভময় ঘোষ অনুলেখক হিসেবে তা নথিভুক্ত করেন।
এই বই নিয়ে শুভময় ঘোষ নিজেই বলেছেন—‘এই বই ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনী নয়, তাঁর সঙ্গীত শিল্পের আলোচনাও নয়। তবে এখানে তাঁর জীবনের মূল সত্যটি প্রকাশ পেয়েছে, আর প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সঙ্গীত সাধনার ইতিবৃত্ত।’
এই বইয়ের প্রথম অংশটি উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পারিবারিক ইতিহাস থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাঁর শৈশব, সঙ্গীতের প্রেমে মাত্র দশ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতা আসা এবং এর পরে কীভাবে প্রায় চল্লিশ বছর সঙ্গীত সাধনা করে মাইহারের রাজার সঙ্গীতগুরু হন, এই দীর্ঘ পথে কত কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে তার এক সহজ সরল বর্ণনা পাওয়া যায়।
পরের অংশটুকু বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্করের নাচের দলের সাথে ইউরোপ ভ্রমণের সংখিপ্ত স্মৃতিকথা। শুধু স্মৃতি কথাই নয়, ইউরোপের কোন কোন দিকগুলো আমাদের থেকে ভালো তাও তুলনা করেছেন সহজ ভঙ্গিতে। বইয়ে উনার কথা বলার ধরনে পাওয়া যায় উনার রসবোধের পরিচয়।
পুরো বইটি যেহেতু গল্পচ্ছলে বলা এবং দুই একটি পরিচিত সাল ব্যতীত বিস্তারিত সালের উল্লেখ নেই, তাই ‘সময়রেখা’ বুঝতে কষ্ট হয়। তবে ১৯৩৫ সালে ইউরোপ ভ্রমণের সময় উনি বলেছেন উনার বয়স ছিল ৬৭ বছর, সেটা উনার জন্ম সালের সাথে হিসেব করলে মেলে না, তখন উনার বয়স হবার কথা ৭৩ বছর।
বইয়ের ভূমিকায় থাকা উস্তাদজী কে নিয়ে তাঁর প্রিয়শিষ্য ও জামাতা পণ্ডিত রবিশঙ্করের কয়েকপৃষ্ঠার প্রাঞ্জল লেখনী থেকেও উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সম্পর্কে জানা যায় বেশ কিছু তথ্য।
যাঁর হাত ধরে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভের শুরু হয়, যিনি শিক্ষা দিয়েছেন পরবর্তী প্রজন্মের বেশ কয়েকজন কিংবদন্তী বাদক/শিল্পীদের, সেই মহান সাধকের নিজ বয়ানে বইয়ের মোড়কে খুব অল্প কথায় তাঁর জীবনের নানাদিক নিয়ে সহজভাবে রচিত এই বইটি তাঁর গুণগ্রাহী ও যারা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভক্ত তাদের জন্য এই বইটি অবশ্যই পাঠ্য।
সুর ও সংগীত কিংবা মানব জীবনের অভিজ্ঞতার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কি অদ্ভুত ভাবে বর্ণিত হতে পারে তা শুভময় ঘোষ এখানে দেখিয়ে দিয়েছেন। আলাউদ্দিন খাঁ তার জীবনকে সংগীতজ্ঞ হিসেবেই ছায়িয়ে ফেলেছিলেন। সাধনা, ভক্তি নিদারুণ খাটনি দিয়েই যেটুকু পেয়েছিলেন সেটুকু দেখার মতন, মনে রাখার মতন। প্রথম আসরে তার সাধক সংগীত শিল্পী হয়ে উঠবার মারমুখো বর্ণনা 'কারন বেশ রাগ ছিলো তার'! দ্বিতীয় আসরে ইউরোপ যাত্রা নিজের সংগীত শিল্পের প্রতি আস্থার কথা বলেছিলেন তিনি। আমি অজ্ঞ মানুষ, সত্যি ই এতো রাগ রাগিণী, মূর্ছনা সারেগামার কথায় মিশে যেতে পারবো ভাবিনি। আমি এই বইটার কথা মনে রাখবো আবার আবার পড়বো।