১৯৫২ সালে সুরসম্রাট উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন নাতি আশিস খাঁ (উস্তাদ আকবর আলী খানের পুত্র) কে সাথে নিয়ে। সেখানে উনি দুই মাস ছিলেন। সেই দুই মাসে তিনি দুই আসরে বসে গল্পচ্ছলে নিজের সমগ্র জীবনের একটা গতিময় বর্ণনা দিয়েছিলেন, সেটাই শান্তিনিকেকেতনের তৎকালীন ছাত্র—(অথবা কর্মী, শান্তিনিকেতে পড়া শেষ করে উনি সেখানেই উনার কর্মজীবন শুরু করেন) শুভময় ঘোষ অনুলেখক হিসেবে তা নথিভুক্ত করেন।
এই বই নিয়ে শুভময় ঘোষ নিজেই বলেছেন—‘এই বই ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনী নয়, তাঁর সঙ্গীত শিল্পের আলোচনাও নয়। তবে এখানে তাঁর জীবনের মূল সত্যটি প্রকাশ পেয়েছে, আর প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সঙ্গীত সাধনার ইতিবৃত্ত।’
এই বইয়ের প্রথম অংশটি উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পারিবারিক ইতিহাস থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাঁর শৈশব, সঙ্গীতের প্রেমে মাত্র দশ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতা আসা এবং এর পরে কীভাবে প্রায় চল্লিশ বছর সঙ্গীত সাধনা করে মাইহারের রাজার সঙ্গীতগুরু হন, এই দীর্ঘ পথে কত কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে তার এক সহজ সরল বর্ণনা পাওয়া যায়।
পরের অংশটুকু বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্করের নাচের দলের সাথে ইউরোপ ভ্রমণের সংখিপ্ত স্মৃতিকথা। শুধু স্মৃতি কথাই নয়, ইউরোপের কোন কোন দিকগুলো আমাদের থেকে ভালো তাও তুলনা করেছেন সহজ ভঙ্গিতে। বইয়ে উনার কথা বলার ধরনে পাওয়া যায় উনার রসবোধের পরিচয়।
পুরো বইটি যেহেতু গল্পচ্ছলে বলা এবং দুই একটি পরিচিত সাল ব্যতীত বিস্তারিত সালের উল্লেখ নেই, তাই ‘সময়রেখা’ বুঝতে কষ্ট হয়। তবে ১৯৩৫ সালে ইউরোপ ভ্রমণের সময় উনি বলেছেন উনার বয়স ছিল ৬৭ বছর, সেটা উনার জন্ম সালের সাথে হিসেব করলে মেলে না, তখন উনার বয়স হবার কথা ৭৩ বছর।
বইয়ের ভূমিকায় থাকা উস্তাদজী কে নিয়ে তাঁর প্রিয়শিষ্য ও জামাতা পণ্ডিত রবিশঙ্করের কয়েকপৃষ্ঠার প্রাঞ্জল লেখনী থেকেও উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সম্পর্কে জানা যায় বেশ কিছু তথ্য।
যাঁর হাত ধরে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভের শুরু হয়, যিনি শিক্ষা দিয়েছেন পরবর্তী প্রজন্মের বেশ কয়েকজন কিংবদন্তী বাদক/শিল্পীদের, সেই মহান সাধকের নিজ বয়ানে বইয়ের মোড়কে খুব অল্প কথায় তাঁর জীবনের নানাদিক নিয়ে সহজভাবে রচিত এই বইটি তাঁর গুণগ্রাহী ও যারা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভক্ত তাদের জন্য এই বইটি অবশ্যই পাঠ্য।