দীপান্বিতা রায়ের ছোটবেলা কেটেছে শিল্পশহর বার্নপুরে। স্কুলের পাঠ সেখানেই। তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। দীপান্বিতা লেখেন নিজের চারপাশের জগৎ নিয়ে। দৈনন্দিন জীবনের কঠিন বাস্তব, অভ্যস্ত খুঁটিনাটিই তাঁর উপজীব্য। শিশুদের জন্য লেখায় তিনি পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। এ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী পুরস্কার, গজেন্দ্রকুমার মিত্র সুমথনাথ ঘোষ স্মৃতি পুরস্কার, নীল দিগন্ত পুরস্কার, দশভুজা পুরস্কার এবং সাধনা সেন পুরস্কার।
এই সময়ের সদাব্যস্ত শিশু-কিশোরদের জন্যে খুনখারাপি-বর্জিত, মূল্যবোধ-সমৃদ্ধ, অথচ সাবলীল গল্প লেখা যে খুবই কঠিন কাজ, সেই নিয়ে কোন সন্দেহ নেই| সেই কঠিন কাজটাই বেশ কয়েক বছর ধরে করে এসেছেন দীপান্বিতা রায় তাঁর আধুনিক রূপকথা আর অন্য গল্পের মাধ্যমে| আলোচ্য বইটিও সেই ধারাতেই লেখকের নবতম উপহার|
যে সব গল্প এই বইয়ে আছে, তারা হল: (১) জাদু নয়: শম্পার বাবা সুনীলবাবু ফুল বা গাছ দুচোখে দেখতে পারেন না| কিন্তু এক রকম জোর করেই শম্পা যখন এক গোছা অন্য রকম ফুল দিয়ে ফুলদানি সাজাল, তখন কী হল? (২) পরিতোষবাবুর পুষ্যি: একা মানুষ পরিতোষবাবু সময় কাটাতে ঘরে আনলেন রঙিন মাছে ভরা অ্যাকোয়ারিয়াম| কিন্তু তারপর যখন তাঁর খেয়ালবশেই তাতে যোগ হল এক অন্য প্রজাতির মাছ, তখন কী ঘটল? (৩) ঘোষের পো: নাটকের রিহার্সাল সেরে সাইকেলে চেপে নিজের কোয়ার্টারে ফেরার সময় কী দেখল মনোময়? (৪) প্রিয়াংশুর সকাল: দেশ আর পরিবারের সঙ্গে সব পিছুটান কাটিয়ে ফেলা প্রিয়াংশু কি পারবে দেশের বাড়ি বেচে, পুরনো ড্রাইভার আর তার পরিবারকে দূরে সরিয়ে দিতে? (৫) ভ্যাবলার চশমা: নন্দন, ওরফে ভ্যাবলার চোখে মাইনাস পাওয়ার হল; কিন্তু ফ্যাশনেবল চশমা ভেঙে যাওয়ায় তাকে যখন পাড়ার অনামা দোকান থেকে একটা পুরনো চশমা দেওয়া হল, তখন কী দেখল সে? (৬) অখিলেশ্বরের মৃত্যুভয়: স্বপনবাবুর মামা অখিলেশ্বর তাঁর সন্ন্যাসী বন্ধুর কাছ থেকে জেনেছেন যে সত্তর পেরোলেই তাঁর মৃত্যু হবে, আর তাই তিনি মৃত্যুর জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করছেন; স্বপনবাবু কি পারলেন তাঁকে নিরস্ত করতে? (৭) কাজলগড়ের মাস্টারমশাই: শহরের ছেলে সৌরভের প্রাণ হাঁপিয়ে উঠলো প্রত্যন্ত এলাকার এক স্কুলে টিচারের চাকরি পেয়ে; সেই চাকরি ছেড়ে শহরেই একটা কাজ করার সিদ্ধান্ত যখন সে নিয়েই ফেলেছে, তখন কী জানল সে এক রাতে? (৮) ডুপ্লিকেট চাবি: বাংলার অধ্যাপক দিগন্ত দেব-এর একটি বুদ্ধিদীপ্ত রহস্যভেদের এই উপাখ্যানটি ভালো, কিন্তু এই বইয়ের গল্পগুলোর থেকে একেবারে আলাদা গোত্রের|
ভালো বাঁধাই, বেশ কিছু অলংকরণ, এবং ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের চমত্কার প্রচ্ছদে সমৃদ্ধ এই বইটি হাতে নিয়েই পড়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়| শুধু একটাই আক্ষেপ, বাংলায় রহস্য গল্পের বিপুল চাহিদার কথা ভেবেই কি লেখক “আঁধারে মানিক জ্বলে” এবং “কর্পূর কাঠের বাক্স”-র সমগোত্রের গল্পসমৃদ্ধ বইটির এমন নামকরণ করলেন যাতে গোয়েন্দা আর রহস্য গল্পের অনুরাগী পাঠক বইটি কেনেন?