জলার ধারে পদ্মপাতায় রোদ পোহাচ্ছিলো কোলা মিয়া, এমন সময় নীল পাখা রাজ্যের রাজকুমারী রাতাতা এলো তার কাছে এক বিপদে পড়ে। কিন্তু আলাপ করে রাতাতা জানলো, কোলা মিয়াও কম বিপদে নেই। তখন তারা ভেবে দেখলো তাদের সমস্যার সমাধান করতে হলে যাওয়া চাই ছোট্ট মেয়ে নিমিদের শহরে। কিন্তু সেখানে গিয়ে ওদের যে নতুন এক মস্ত ঝামেলায় পড়তে হবে সেটা ওরা ভাবেইনি। নিমির দাদু, পাশের বাড়ির মিনকু, পুলিশ অফিসার জাঁদরেল খা একে একে সবাই জড়িয়ে গেল সে ভজকটে। দুর্দান্ত শিকারী কর্নেল কাকন্দও কোথা থেকে যেন হাজির হল বন্দুক বাগিয়ে, ওদিকে রাতাতাদের পক্ষে টিটি আর ইন্দুমিয়ার দলবলও উঠেপড়ে লাগলো কিছু একটা করতে। শুরু হল বিরাট এক গোলমেলে ব্যাপার। কোলা মিয়া আর রাতাতার সে রোমহর্ষক অভিযানে তোমাকে স্বাগতম!
মাশুদুল হকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। এক দশকের বেশি সময় ধরে লিখছেন থ্রিলার, সায়েন্সফিকশন ও শিশু-কিশোর সাহিত্য, প্রকাশিত হয়েছে নিয়মিত ভাবে বাংলাদেশ ও ভারত থেকে।
সাহিত্য-পুরস্কার : এইচএসবিসি-কালিওকলম তরুণ কথাসাহিত্যিক পুরস্কার ২০১৩।
Masudul Haque is a contemporary writer from Bangladesh known for his works on thrillers, Sci-Fi, and children's literature. His works have been published in Bangladesh and India regularly for the last 12 years. He was awarded the Kali O Kalam Young Writer Award in 2013.
এটা বললে হয়ত অত্যুক্তি হবে না যে বাচ্চাদের জন্যে রচিত ২০১৬ এর সেরা বইটা পড়ে ফেললাম। মুগ্ধতার একটা সীমা থাকা উচিৎ, কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা ছাড়িয়ে গিয়েছে নি:সন্দেহে। হয়ত বইটা ভালো লাগার পেছনে বড় একটা কারণ হচ্ছে আমাদের দেশে মানসম্মত শিশু-সাহিত্যের অভাব। আর ইদানীং যা বের হচ্ছে!! (মোটু-পাতলু,কিরণমালা দ্রষ্টব্য )। সেদিক তুলোনায় ব্যতিক্রম মাশুদুল হক ভাইয়ার বইগুলো। একটা বাচ্চা কি দেখে কোন বই হাতে নিবে? রংচঙে প্রচ্ছদ, সুন্দর সুন্দর ছবি -এসবই তো? সব আছে বইটাতে। আর তার সাথে অসাধারণ এক আধুনিক রূপকথার কাহিনী । এক প্রজাপতি রাজকুমারী রাতাতা তার পাখার রঙ হারিয়ে, দুঃখ করতে যায় ব্যাঙ কোলা মিয়ার কাছে। তারপরর দু'জন মিলে রওনা দেয় নিমিদের বাড়িতে। সেখানে আবার কোলাকে আটক করে দুষ্টু ছেলে মিনকু। আর তখন তাকে উদ্ধার করতেই সব দৌড়ঝাঁপ। পড়তে পড়তে নিজের অজান্তেই জোরে জোরে হেসে উঠেছি কয়েকবার। :) মাশুদুল ভাইকে ধন্যবাদ এত যত্ন করে বইটা লেখার জন্যে। তবে আরেকটা কথা না বললে ভীষণ অন্যায় হবে। প্রতি পাতায় পাতায় যে মনোমুগ্ধকর ইলাস্ট্রেশন তার জন্যে মাহাতাব রশীদকে ধন্যবাদ। এই জীবন্ত ছবিগুলা না থাকলে আকর্ষণ কমে যেত নি:সন্দেহে।
ঝকঝকে রঙিন প্রচ্ছদ দেখেই ইচ্ছে করবে বইটা হাতে নিয়ে একটু নেড়েচেড়ে দেখি। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকা দুটো চোখে আছে রাজ্যের মায়া আর বিস্ময়! এরপর পাতা উল্টালেই অপেক্ষা করছে চমৎকার এক ফ্যান্টাসি জগৎ! হ য ব র ল কিংবা বুড়ো আংলা গল্পের সাথে কেবল এর তুলনা চলে।
নিমিদের শহরে কোলা মিয়া ও রাজকুমারী রাতাতা গল্পে ছোট শিশুদের ভালো লাগার সবগুলো উপাদানই আছে। মাহাতাব রশীদের মনছোঁয়া ইলাস্ট্রেশন, মাশুদুল হক এর দারুণ কল্পনাশক্তি আর সাবলীল ভাষা বিন্যাসের সমন্বয় বইটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে! পাতায় পাতায় আছে মজাদার ছড়া! চরিত্রের নামকরণও এতো মায়াময় - রাজকুমারী রাতাতা, কোলা মিয়া, নিমি, মিনকু, পুলিশ অফিসার জাঁদরেল খা, শিকারী কর্নেল কাকন্দ, ইন্দু মিয়া আর টিটি! এরা সবাই মিলে দুর্দান্ত এক অ্যাডভেঞ্চারের ঝাঁপি খুলে বসে আছে! রাজকুমারী রাতাতার পাখার হারানো নীল রঙ খুঁজতে গিয়ে বেচারা কোলা কি বিপদেই না পড়লো! তাকে উদ্ধার করতে গিয়েই তো এত হাঙ্গামা! কোলা মিয়া আর রাতাতার এই রোমহর্ষক অভিযানে অংশ নিয়ে বাড়ির ছোট্ট শিশুটি থেকে শুরু করে আমার মতো বিচ্ছিরি রকমের বড় হয়ে যাওয়া পাঠকেরাও নির্মল আনন্দ পাবে!
অনিমেষ মুগ্ধতা কাকে বলে জানেন? না জানলেও চলবে। গতকাল রাতে পড়তে বসেছিলাম নিমিদের শহরের কোলা মিয়া ও রাজকুমারী রাতাতা'র গল্প। স্বভাবতই আমার সুবিধা অসুবিধার তোয়াক্কা না করে ঘরের বাতি নিভিয়ে দেয়া হলো, আমিও বিছানায় আশ্রয় নিলাম। এবং ঘুমের চেষ্টা করলাম। ভোর পাঁচটায় ঘুম গেল ভেঙ্গে। এবারে আমি মশার আক্রমণের পরোয়া না করে বীরদর্পে চলে এলাম মশারির বাইরে। বিছানার এক কোণে রাখা বইটাকেও উদ্ধার করলাম। পড়তে পারি আর না পারি ওটা বগলদাবা করেই শুয়েছিলাম!
এরপর শুরু হলো পিনপিনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। চোখ দুটো বইয়ের দিকে স্থির রেখে দুই হাত ক্রমাগত হাতে পায়ে বুলাতে বুলাতে পড়ে চললাম বইটা। এবং ঘণ্টাদেরেকের মধ্যেই খতম দিলাম দুর্দান্ত কাহিনীটি। (তবে কামড় মশারা যথেষ্টই বসিয়েছে। বেচারা আমি!!)
এই বইটি নিয়ে বলার আগে লেখককে নিয়ে দুটো কথা বলা জরুরি। প্রতিটি লেখকেরই কিছু দিক থাকে যা অন্যদিকগুলোর থেকে একটু বেশি উজ্জ্বল। লেখক মাশুদুল হক সাইন্স ফিকশন লিখেছেন, থ্রিলার লিখেছেন, কমেডি লিখেছেন, কিন্তু আমার চোখে রূপকথায় তিনি সর্বাধিক উজ্জ্বল। এবং আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, লেখক যদি কেবল এই ধারাতেই থাকেন, একদিন দেশের অন্যতম পথিকৃৎ হয়ে উঠতে পারবেন।
নিমিদের শহরে কোলা মিয়া ও রাজকুমারী রাতাতা আদতে আধুনিক রূপকথা। যেখানে প্রাণী এবং কিট পতঙ্গের সাথে উঠে এসেছে মানুষের হুটোপাটির কাণ্ডকারখানা। এবং গল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চমৎকার সব হিউমার আর বুদ্ধিদীপ্ত বর্ণনায় ঠাসা। এছাড়াও শব্দের আড়াল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে মজা। যুক্ত হয়েছে ছোট ছোট অসংখ্য ছড়া যা গল্পে বাড়তি মাত্রা দিয়েছে। আছে উদ্ভট সব যুক্তির সমাবেশ, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক কিন্তু জরুরি!
বইটির আরও একটি দিক উল্লেখ না করলে অন্যায় হয়ে যায়, তা হলো দুর্দান্ত সব আর্টওয়ার্ক। পুরো বইতে ঠাসা রয়েছে অসংখ্য ছবি। যা আঁকা হয়েছে কেবল মাত্র এই কাহিনীর সাথে সঙ্গতি রেখে। নবীন চিত্রকর মাহাতাব সাহেবের অটোগ্রাফ মিলবে বইয়ের প্রচ্ছদের নিচে ডান কোণায়। এবং এই বইটি তাই কেবলমাত্র সাধারণত একটি গল্পের বই নয়, বরং এঁকে সহজেই ইলাস্ট্রেটেড এডিশন হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়। বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে রয়েছে একটি করে ছবি। ভেতরেও অনেক ক্ষেত্রে সেই শুরুর ছবিটির থেকে কিছু গ্রাফিক্স নিয়ে কিংবা আলাদা ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছে। ছবিগুলোতে যেন ভুলেও আগেভাগে চোখ বুলাবেন না। কেননা কাহিনী হুট করে বুঝে ফেলা যায় কয়েকটি ছবিতে।
বইটা পড়ার সময় আমার অনায়াসে মনে পড়ে গেছে বিখ্যাত এনিমেশন মুভি 'টয় স্টোরি'র কথা, কেননা গল্প অনেকটা ওই ধাঁচের। তবে কাহিনী বিন্যাসে হয়ে উঠেছে যথেষ্ট ব্যতিক্রম। গল্পের চরিত্ররা প��রো আলাদা এবং তাদের উপর ভিত্তি করেই বিশেষ বিশেষ কাহিনীক্রম এবং হাস্যরস উপস্থাপন হয়েছে।
বইটিতে যত্নের ছাপ স্পষ্ট, দুই একটি ছোট ভুল অনেক খুঁজলে চোখে পড়ে, তবে তা নিতান্তই নগণ্য। আমার মনে হয়েছে গতানুগতিক বইয়ের মত প্রতি প্যারার শুরুতে সামান্য ট্যাব দিয়ে স্পেস দিলে ভাল হত। তবে না দেয়াতেও তেমন একটা সমস্যা হয়েছে বলছি না। কিছু যায়গায় কিট-পতঙ্গ কিংবা প্রাণীদের 'লোক' বলে সম্বোধন করা হয়েছে, বিষয়টি হয়তো ঐচ্ছিক, কিন্তু এসব যায়গাতে লোক না বলে 'প্রাণী' বললে হয়তবা একটু বেশি যৌক্তিক হত। এছাড়া গল্পের শুরু এবং পরিণতি চমৎকার। ব্যক্তিগত ভাবে আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে দাদূ চরিত্রটি। রাতাতাও মন্দ নয়। হুট হটা করে ভুলে যাবার বিষয়টিও চমৎকার। তাছাড়া লেখকের বিভিন্ন প্রাণীকূলের নামকরণে দুর্দান্ত হয়েছে। যেমন - মশারা হয়েছে পিনপিন, তেলাপোকারা ফরফর, বিড়াল হয়েছে গুলটুমিয়াও, ইত্যাদি ইত্যাদি।
ভোরবেলাতে কিছু কিছু যায়গায় সশব্দে হাসি চাপতে গিয়ে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। পাছে কেউ ঘুম থেকে জেগে যায়!!
গল্পে রেফারেন্স আছে মেরি নর্টন -এর 'দ্য বরোয়ার্স' গল্পটির। পরিচিত রেফারেন্স দেখে দারুণ লেগেছে।
বলতে বলতে আসলে অনেক কিছু বলে ফেলেছি। সত্যি বলতে আমি লেখকের রূপকথার অনেক বড় ফ্যান, সেই বিলু, কালু ও গিলূর রোমাঞ্চকর অভিযান বইটি থেকেই। সবচেয়ে বড় ফ্যান কি না তা হয়ত লেখক বিচার করতে পারবেন, আমি না। তবে এই বইটি সম্পূর্ণ আলাদা বিলু-কালু থেকে। এই বইটি আধুনিক রূপকথা বলা যেতে পারে, আর ওটা ছিল চিরায়ত রূপকথার বই। কিন্তু দুটোই ভাল, নিজ নিজ স্থানে।
নিমিদের শহরে কোলা মিয়া ও রাজকুমারী রাতাতা নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার কাজ হয়েছে। লেখকের কাছে অনুরোধ থাকবে এই ধারাটিতে আরও বেশি সক্রিয় থাকুন, আরও চমৎকার সব গল্প উপহার দিন, আরও পাঠককে উৎসাহিত করুণ। আমাদের দেশে মানসম্মত রূপকথার বড্ড অভাব রয়েছে, মোটামুটি বিস্তৃত পরিসরে। আরও বড় পরিসরে রূপকথার গল্প লিখুন। আর কে কী করবে জানি না, তবে আমি আপনার প্রতিটি রূপকথার বই সমান আগ্রহ নিয়ে পড়ব আশাকরি।
নীল পাখা রাজ্যের রাজকুমারী 'রারাতা' ভয়ংকর বিপদে পরেছে। ছোট্ট এক মেয়ে তার পাখার নীল রঙ নিয়ে নিজের চোখে লাগিয়েছে। ব্যাপারটা হাল্কা মনে হলেও আসলে তা না, বরং রঙ তাদের রাজ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ওদের ভাষায়-
রঙেই মোরা চিনি একই জেনো মোদের কাছে চকের গুড়ো, চিনি কেরোসিন আর পানি রেশমি, জামদানি।
বুঝতেই পারছেন, রঙ হারানোর কারনে তার রাজ্যের কেউ তাকে রাতাতা বলে চিনতেই পারছে না। তাই মনের দুঃখে রাতাতা এলো জলায় কোলা মিয়ার কাছে, যেন পেটুক কোলা মিয়া তাকে খেয়ে ফেলে। এই জীবন আর সে রাখবে না!
কিন্তু কোলা মিয়াও কম বিপদে নেই। পেটুক স্বভাবের কারনে সে দিন দিন ফুলে যাচ্ছে, পদ্মপাতায় বসলেই এক পাশ ভারে ভাজ খেয়ে গলগল করে পানি উঠে, পা ভিজে যায়... কিন্তু তার চেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে পাজি ঝিমঝিমটা ওকে দেখলেই ছড়া কাটে-
কোলা মিয়া কোলা, হচ্ছে এমন ফোলা পদ্মপাতায় বসলে পরে ঝপাস করে পিছলে পরে জল হয় খুব ঘোলা কোলা মিয়া কোলা।
প্রেস্টিজ ইস্যু। তাই রাতাতা যখন কোলা মিয়াকে তাকে খেতে অনুরোধ করে, ভীষণ লোভ হওয়ার পরেও বেচারা মানা করে দেয়, কারন পরে হয়তো এতই মোটা হয়ে যাবে, যে কোন পদ্মপাতায় বসলেই ডুবে যাবে। রাতাতা ভেবে দেখলো আশংকাটা উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিন্তু তার মরারও খুব প্রয়োজন। তাই সে বুদ্ধি বের করে, কোলাকে নিয়ে শহরে যাবে, যে মেয়েটা তার রঙ চুরি করেছে, তার দাদু রোজ এক্সারসাইজ করে, তার কাছ থেকে এক্সারসাইজ শিখে নিলে কোলা মিয়ার ফোলা কমে যাবে। কোলাও রাজি হয় কমে গেলে রারাতাকে খেয়ে নিতে। আর তাই দুজনে মিলে রওনা হয় শহরে। কিন্তু শহরে যে এত বিপদ ওত পেতে আছে তার কি জানতো? ওদের বিপদে ফেলতে আছে পাজি ছেলে মিনকু আর ভয়ংকর শিকারি কর্নেল কাকন্দ। আর বন্ধু হিসেবে পেলো রাতাতা, তার দাদু আর ইন্দুমিয়া আর টিটির দলবল। কোলা মিয়া আর রাতাতা ভয়ংকর এই বিপদ থেকে কি করে উদ্ধার পেলো, মিনকু আর কাকন্দর হাত থেকে কি বেচে ফিরতে পারলো? আর রাতাতা পাখার রঙ কি ফেরত পেলো? এসব জানতে হলে আপনাকে পড়তে হবে দারুন মজার এই বইটি, নিমিদের শহরে কোলামিয়া ও রাজকুমারী রাতাতা।
২০১৬'র মেলায় কে কোন বইয়ের জন্যে অপেক্ষা করেছিলেন জানি না, তবে আমি এই বইটার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম অধীর আগ্রহে, এবং বইটা পড়ে মনে হচ্ছে আমার এই অপেক্ষা একদম বৃথা যায় নি। বইটা অসম্ভব মজার, দারুণ কাহিনীর সাথে সুন্দর সব ইলাস্ট্রেশন আর মজার মজার ছড়া বইটাতে বাড়তি আকর্ষণ যোগ করেছে। লেখকের লেখার ভঙ্গিটাও অসম্ভব প্রাঞ্জল। বইটা পড়ার সময় খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, এই চমৎকার বইটি নিয়ে যদি এনিমেশন ফিল্ম বানানো যেত, কি চমতকারই না হতো! দুর্ভাগ্যের বিষয় আমাদের দেশে সেরকম উন্নত প্রযুক্তি নেই। তবে, একদিন নিশ্চয় হবে...
যাই হোক, বইটা পড়ে আমি অসম্ভব মজা পেয়েছি। তবে এই বয়সে বাচ্চাদের বই কেনার বিড়ম্বনা আছে, আমার এক বন্ধুতো জিজ্ঞেসই করে বসেছে, এখনো 'পোলাপাইনের বই' পড়ি কেন। ভাগ্যিস বাসায় পিচ্চি আছে একটা, বলেছি ভাতিজার জন্যে নিয়ে যাচ্ছি। :p তবে এটা নিশ্চিত, ভবিষ্যতেও আমি বাচ্চাদের বই কিনবো, ঘরের কোনায় একটু লুকিয়ে লুকিয়ে পড়বো, আর হা হা করে হাসবো। :D
এবার খারাপ লাগার কথা বলি, বইটা খুবই ছোট। আরো বড় হলে বেশি ভালো লাগতো। এছাড়া আর তেমন অভিযোগ করার মত কিছু পাচ্ছিনা। ছড়া গুলো সুন্দর ছিল। আরো কিছু পেলে ভালো লাগতো। ছড়া লেখায় লেখকের হাত চমৎকার, তা বিলু কালুর মত এই বইটায়ও উনি দেখিয়ে দিয়েছেন, আশা করছি অচিরেই উনার কাছ থেকে ছড়ার বই পাবো। এখানে বইয়ের আরেকটা ছড়া দেবার লোভ সামলাতে পারছি নাহ। ব্যাঙরা কেন পোকামাকড় খায়, তার কি সুন্দর অজুহাত! পড়লে মনে হবে পোকামাকড় দের খেয়ে বরং তাদের কতই না উপকার করছে। এটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে-
" ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ যাসনে তোরা দৌড়ে অত করছে ব্যাথা ঠ্যাঙ। তোরা জিনিস খুবই ভালো খুবই সুস্বাদু জিবের জল গড়িয়ে পড়ে তোদের কি জাদু! আয়না তোদের খাই খেয়ে গান গাই গানের তালে তোরা তখন নাচবি আমার পেটে বাইরে তোদের কষ্ট কত মরছিস তো খেটে!
যারা আমার মত ধাড়ি বয়সেও 'পোলাপাইনের বই' পড়ার মত মন মানসিকতা রাখেন, তারা নিশ্চিন্তে এই বইটা নিয়ে ঘরের কোনায় বসে যান। হ্যাপি রিডিং
পূজোর পর নানা কারণে, মানসিক ভাবে দারুণ বিপর্যস্ত ছিলাম। কোন কাজ ভালো মত করতে পারি নি। বই পড়াও হয় নি। তবে মন শান্ত রাখার জন্য চেষ্টা করেছিলাম, বই পড়ার। কিন্তু কয়েক পেইজ পড়ে আর এগোনো সম্ভব হয় নি! ফলে দীর্ঘ একটা গ্যাপ ছিল,সেই পূজার শুরু থেকে পড়া বন্ধ ছিল,আজকে ১৩ তারিখ।
একটু ধাতস্থ হয়েছি,তাই "নিমিদের শহরে কোলা মিয়া ও রাজকুমারী রাতাতা " নিয়ে বসলাম। মন টা হালকা হলো,অনেক দিন পর বই ও পড়া হলো। এবার এটা কন্টিনিউ করতে পারি কিনা দেখি...
"নিমিদের শহরে কোলা মিয়া ও রাজকুমারী রাতাতা" একটি শিশু কিশোর পাঠ্য বই। অনেক টা রুপকথা ও বলা যায়। গল্পের শুরু কোলা মিয়া আর রাতাতা কে নিয়ে,এরপর কাহিনী ডাল পালা মেলে। সবশেষে সুন্দর একটা সমাপ্তি। আমার দারুণ লেগেছে। শুরু থেকে হাসিটা লেগেই ছিল। কোন জায়গায় স্থিরতা নেই,দারুণ গতিতে এগিয়েছে গল্প। কোন লেখার সার্থকতা তো এটাই যে পড়তে গিয়ে পাঠক বিরক্ত হবে না। সেদিক থেকে লেখক সফল। শিশুদের কিশোরদের নিয়ে লিখতে গিয়ে,লেখকরা ভাঁড়ামি শুরু করে। কিন্তু মাশুদুল হকের লেখা আমি সেটা পাই নি। বরং আমার মনে হয়েছে ভদ্রলোক এই বিষয় নিয়ে অনেক দূর এগোতে পারবেন।
সবশেষ কথা এই,এটা শিশু কিশোর পাঠ্য বলে,বড়দের ভালো লাগবে না এমন বই না। যাদের আমার মত বুড়ো বয়সেও কচি মন, তারা বই টা হাতে নিয়ে বসে পড়েন,দারুণ একটা সময় কাটবে।
২৫ খানা সায়েন্টেফিক পেপার লইয়া ধস্তাধস্তি করিতেছিলুম, সারা জীবনে যেখানে ২৫খানা পেপার ধরেও দেখি নাই সেখানে ২ দিনে ২৫খানা পড়ার চেষ্টা করা যে কতখানি যন্ত্রনাময় সে হিসাব বিধাতার কাছেই জমা রইল!! আর পাড়িতে না পারিয়া হাতে বহু দিন থেকে পরে থাকা বই খানা তুলে নিলুম। আহা জীবন !! ভাগ্যিস শিশু সাহিত্য বলে কিছু একটা ছিল, নয়ত এই বুড়ো খোলসে আটকে পড়া ছোট্ট বালিকাটার কি হইত।
মাশুদুল হক উড়িয়ে দিয়েছেন ভাই!!! এত সময় ধরে বইটা হাতে থাকার পর ও কেন যে পড়ি নাই কে জানে । :( বছরের শুরুতেই বুঝিয়াছিলু বছর কঠিন যাবে, ৫০ টার্গেট নিয়ে শেষ অবধি ১০টা বই পড়তে পারি কিনা নিজেরই সন্দেহ লাগছে, আহা আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম !! সপ্তাহে অন্তত একটা বই, গায়ে হাওয়া লাগায় ঘুরে বেড়ানো দিন আর নাই :(
N.B- ইহা বইয়ের রিভিউএর চাইতে নিজের দুক্ষ গাথাই বেশি হইয়া গিয়াছে :( বই অতি উপাদেয়!! দ্রুত ভক্ষন করার অনুরোধ জ্ঞাপন করিয়া বান্দা হাওয়া হইয়া গেলুম।
আমি বাচ্চাদের বই পড়তেই বেশী ভালোবাসি। এই বইগুলো নিয়ে আসলে ভাবতে হয় না ভালো নাকি খারাপ। বাচ্চারা যেমন সবকিছু ভালো দেখে, কোথাও না কোথাও সব লেখকই বাচ্চাদের বইয়ে ভালো ব্যাপারগুলোই লেখেন।
মাশুদুল হকের 'ভেন্ট্রিলিকুইস্ট' আর 'ঝিং এর শিং' পড়েছিলাম, ভালো লেগেছিলো। থ্রিলার লেখকের শিশুতোষ বই কেমন হবে ভেবে ভেবে গতবছর কেনাই হয়নি তাই পড়াও হয়নি।
আমার বইকেনা ব্যাপারটা যথেষ্ট অদ্ভুত। কোন বই কেনার কথা মনে হওয়ামাত্র সম্ভাব্য সব উপায় ভেবে নিই কেনার। তারপর সবচেয়ে দ্রুত উপায়ে সেটা কিনে এনে ফেলে রাখি- আপাতত শান্তি, পড়বো একসময়। পড়েই থাকে অনেকদিন, মাস, বছর।
বাচ্চাদের বইয়ের দোকান দিয়েছি অনলাইনে (নিজের ঢোল পেটাতে হয়), তাই বাচ্চাদের বই দেখলেই জড়িয়ে ধরা টাইপ অনুভূতি বেশী হচ্ছে আজকাল। এই বইটা হঠাৎ কেন কিনতে ইচ্ছা করলো বুঝতে পারছি না। স্বপ্ন দেখে থাকতে পারি বইটা নিয়ে, ফলশ্রুতিতে বৃহস্পতিবার অফিসে বসেই অর্ডার দেওয়া আর আজ হাতে পাওয়া। বাসায় এসে এক বসায় পড়ে ফেলা আর ভালোলাগায় ভরে ওঠা। সেই তো ভালোবাসা, বন্ধুতা, খারাপ কিছু না থাকা! কেমন যেন অবশ হয়ে আসে ভেতরটা বাচ্চাদের বই পড়লে। লেখকরাও আসলে শিশুদের নিষ্কলুষ মন বোঝেন বলেই এভাবে ভালোলাগায় ভরিয়ে তুলতে পারেন।
আমার কিছু ভালো লাগে না। কোলামিয়া আর রাজকুমারী রাতাতার কাছে গিয়ে বসে জলার পদ্মপাতা দেখতে ইচ্ছা করে। সব ইচ্ছে কি পূরণ হয়!?
ইতিপূর্বে লেখকের বিলু, কালু ও গিলুর অভিযানের গল্প পড়ে আমি হয়েছি লেখকের ঝুলন্ত পাখা আর আমার স্ত্রী হয়েছে হাত পাখা। এটি সম্ভবত লেখকের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা শিশু সাহিত্যে এবং এবারো তিনি দক্ষতার সাথে বল পাঠিয়ে দিয়েছেন সীমানার বাইরে। বাংলা সাহিত্যে শিশুদের জন্য লেখকদের সংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল। তাদের মাঝে মাশুদুল হক একজন বীর সৈনিক - উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় শোভিত করছেন বাংলা রূপকথার আকাশ। আশা করব তিনি যেন ভবিষ্যতে আরো বেশি করে লিখেন শিশু কিশোরদের জন্য। গল্পে নিমির দাদুর চরিত্র আমার কাছে সবচেয়ে ভাল লেগেছে। মনের মাঝে রাখি আশা, যেন হতে পারি নিমির দাদুর মত খাসা। আরো অনেক বেশি ভাল হত যদি কোলা মিয়া আর রাতাতার মত দেশের সব রঙিন পাখা আর কোলারা বন্ধু বনে যেত। আপসোস, বড়ই আপসোস।
কয়েকদিন আগেই পড়েছিলাম প্রান্ত ঘোষ দস্তিদারের লেখা "আষাঢ়ে গল্প" । সেখানেও ছিল নিমি নামের একটা মেয়ের কথা ৷ আজকের গল্পেরও অন্যতম একটি চরিত্র হচ্ছে নিমি । নিমি, নিমির দাদু, মিনকু, কোলা মিয়া, রাজকুমারী রাতাতা, পুলিশ অফিসার জাদরেল খাঁ - এরা আমাদের আজকের গল্পের মূল চরিত্র । রাজকুমারী রাতাতা আসলে প্রজাপতি । তার পাখার রঙ ভুল করে নিমির হাতে লেগে যাওয়ার পরে তার রাজ্যে কেউ তাকে চিনতে পারে না । মনের দুঃখে মরে যাওয়ার জন্যে রাতাতা আসে কোলা মিয়ার কাছে । কোলা মিয়া এদিকে দিন দিন মোটু হয়ে যাচ্ছে । রাতাতাকে না খেয়ে বরং সে জানতে চায়, কি করলে একটু ওজনটা কমবে । দু'জনে মিলে চলে আসে শহরে । দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, মিনকুর হাতে বন্দী হয় কোলামিয়া । তাকে উদ্ধার করতে লেগে পড়ে নিমি থেকে শুরু করে রাতাতা সহ সবাই । এরপরেই ঘটতে থাকে নানান রকম রোমাঞ্চকর ঘটনা । একদমই শিশুদের উপযোগী করে লেখা মাশুদুল হকের বই "নিমিদের শহরে কোলা মিয়া ও রাজকুমারী রাতাতা" । বাচ্চাকাচ্চা তো বটেই, বড়দের জন্যেও কিন্ত বইটি খুব মজার হবে ! সহজ ভাষা আর দারুণ বর্ণনাভঙ্গির কারণে এক বসায় বইটা পড়ে ফেলা যায় । আর ভেতরে অসম্ভব সুন্দর সুন্দর ইলাস্ট্রেশন করেছেন মাহাতাব রশীদ ৷ আমার তো ইচ্ছে করছে রঙপেন্সিল কিনে এনে ছোট্টবেলার মতো রঙ করি ৷ বইটা আমাকে ঈদে উপহার দিয়েছিলেন প্রান্তদা, তাকে ধন্যবাদ ।
ছোট্ট বই। খুব সুন্দর প্রচ্ছদ, সম্পূর্ণ রঙ্গীন বই, রূপকথার গল্প। অনেক অনেকদিন পর রূপকথা পড়ে আসলে ভালো লেগেছে। ফেব্রুয়ারীতে পড়েছিলাম, কি কারণে রিভিউ লেখা হয়নাই মনে নাই। কোন এক ছুটির দিনে বাসার ছোট্ট মানুষটার সাথে সুয় কাটাতে কাটাতে বইটি পড়া যেতে পারে। সুন্দর সময় কাটবে বলেই আমার বিশ্বাস। হ্যাপী রিডিং :)
বইটা ভালোই, লেখক মজা করে নতুনত্ব নিয়ে লিখেছেন। তাহলে ৩ কেন দিলাম সেটা আগে পরিষ্কার করা উচিত -
গল্পের শুরু প্রজাপতি রাজকুমারী রাতাতার মরে যাওয়ার ইচ্ছায় কোলা মিয়ার কাছে আগমন দিয়ে। সে ডিপ্রেসড, মরে যাওয়াই ভালো সমাধান হবে মনে করছে।
গল্পের মাঝে নানান অ্যাডভেঞ্চার আর মজা হলেও একদম শেষেও রাতাতা ডিপ্রেসড, সে আবারও কোলা মিয়া কে বলছে, মরে যেতে সাহায্য করতে।
ছোটদের গল্পে - আমি মরে যাবো, মরে যাওয়াই ভালো, মরে যাওয়াই সমাধান - এরকম ধারণার উল্লেখও খুব ভয়ঙ্কর জিনিস, তা যদি মাত্র একবার হয় তাহলেও!
বিশেষ করে স্কুলের চাপ, রেজাল্ট তথাকথিত "ভালো" না হওয়ার চাপ, বাবা-মা এর দুর্নামের ভয়, স্কুলে অ্যাডজাস্টমেন্ট/বুলিইইং, ইত্যাদি নানান কারণে সাম্প্রতিক সময়ে স্কুলশিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহননের বেশ কিছু ঘটনা আমাদের নজরে এসেছে। কোন কিছুতে ব্যর্থ হলেই ভাববো - মৃত্যুই শ্রেয়, এই চিন্তা কোনভাবেই ছোটদের একটা বইতে উপস্থিত করা সমর্থনযোগ্য মনে করি না আমি। মনোবিজ্ঞানীরা আরও ভালো বলতে পারবেন, আমি সাধারণ মানুষ এবং একজন শিক্ষক হিসেবেই আমার মতামত দিলাম।
হ্যাঁ, গল্পে কোলা মিয়া রাতাতার বন্ধু হিসেবে এগিয়ে এসেছে, ফোকাস আর সেখানে নাই, শেষের বার হাসি গল্পতে হালকা করে দিয়েছে তার এই ডিপ্রেসিভ ভাবনা। আর ডিপ্রেশন ছোটদেরও হতে পারে। কিন্তু মৃত্যু সংক্রান্ত ভাবনা তাদের মনে আসার কথা নয়, তাহলে গল্পে এমন ভাবনা ছোট একজনের মাথায় আসছে কেন? - সেখানেই আমার আপত্তি।
এবার বইয়ের বাকি আলোচনা করি - গল্প মজার। ছড়া কেটে, গানে গল্প আগানো ভালো লেগেছে। জাঁদরেল খাঁ আর কর্নেল কাকন্দের চরিত্রদুটি বিশেষভাবে মজার। দাদুও বেশ ইন্টারেস্টিং। ওদিকে ক্রমচলমান দীর্ঘ মিটিং নিয়ে হাস্যরস, নিমির Mary Norton -এর The Borrowers পড়ার কথা, এগুলো বেশ ভালো লেগেছে। ওবিসিটি বা মোটা হয়ে যাওয়া নিয়ে আর শরীর চর্চার উপকারিতা নিয়ে গল্পচ্ছলে করা আলাপ ভালো লেগেছে।
বানান বিভ্রাট প্রায় নেইই, এক জায়গায় অবশ্য পোশাক 'পরা' টা 'পড়া' হয়ে গেছে। আর লেখক কেন 'ভজঘট' শব্দটাকে বারবার 'ভজকট' লিখে গেছেন তা নিয়ে মনে সন্দেহ ছিলো, পরে বাংলা একাডেমির ছোটদের অভিধানে দেখলাম দু'টো শব্দই সঠিক। ইংরেজি শব্দ আরেকটু কম প্রয়োগ করলেও চলতো। 'অবিমৃশ্যকারি' বা 'বিতিকিচ্ছিরি' ব্যবহার করা গেলে আরও বাংলা শব্দ লেখাই যেত, 'টেনশন' কে 'দুশ্চিন্তা' লেখা যেত, ইত্যাদি।
তবে 'পেস্তাগুজিয়া' মিষ্টিটির বিবরণ গুগলেও না পেয়ে কিঞ্চিৎ হতাশ হলাম। একমাত্র রেজাল্ট এলো লেখকেরই ২০১৬ সালে 'কালের কণ্ঠ'-পত্রিকায় প্রকাশিত আরেকটি ছোটদের গল্পের "এক হাঁড়ি পেস্তাগুজিয়ার" রেফারেন্স। তা কাল্পনিক মিষ্টি হলে আরো বেশি ভালো হয় তার রূপ-স্বাদের বিবরণ থাকলে। তাতে করে বাচ্চাকাচ্চা "পেস্তাগুজিয়া কী? আমিও খাবো!" বায়না ধরলে বড়দের জন্যে সুবিধা হয়।
প্রচ্ছদ আর চিত্রকর্মের জন্যে শিল্পী মাহাতাব রশীদের কাজ ভালো লেগেছে, নতুনত্ব আর যত্ন আছে। গল্পের ভেতরের ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায় শিল্পী গল্পটা মন দিয়ে পড়েছেন, বিশেষ করে মিটিং চলাকালীন পিঁপড়েদের প্ল্যানিং-এর বিস্তারিত আঁক কষে দেখানোতে গ্রাফিক নভেলের স্টাইলে আঁকার ছোঁয়া মজা লেগেছে।
ওভার অল কাহিনির নতুনত্ব, হাসাতে পারার আর চিত্রকর্মের জন্যে ৩ দিলাম।
আমি যদিও এই বইয়ের টার্গেট রিডার না তবে বর্তমান শিশু-সাহিত্যের অবস্থা দেখতেই পড়া যেহেতু কিছুটা ধারণা ছিল যে লেখকের এই সেক্টর নিয়ে কাজের বেশ আগ্রহ আছে।
চমৎকার একটা বই! যেমন ভাষার ব্যবহার তেমন সুন্দর কাহিনীর গতি আবার সাথে দৃষ্টিনন্দন ইলাস্ট্রেশন তো আছেই। শিশু সাহিত্যে কিছু ব্যপারে ব্যালেন্স করা কঠিন হয়ে যায়, কোন ভুল মেসেজ যাচ্ছে কিনা আবার কোন কিছু oversimplify করলে ঠিক কতটুকু করা। লেখক এখানে বেশ গুছিয়েই ব্যালেন্স করেছেন বলবো। যখনই মনে হয়েছে এই কাজের কথা বলা ঠিক হচ্ছে কিনা তখনই কোন না কোন ভাবে তার বিরোধিতা এসেছে। শিক্ষামূলক ব্যাপারস্যাপার আছে কিন্তু বাচ্চাদের মন ভুলিয়ে শাক সবজি খাওয়ানোর মত করেই অনেকটা। পাঠকদেরকে বুদ্ধিমান হিসাবেই নিয়েছে মনে করি যে কারণে আমার নিজেরও আসলে পড়তে ভাল লেগেছে! এই কারণে টার্গেট রিডার একটা স্পেসিফিক গ্রুপে রাখার কথা বললেও হয়তো ভুলই হবে। সব মিলিয়ে ভাল সময় কেটেছে বইটার সাথে।
“চোখের আত্নবিশ্বাস?” “হ্যাঁ, নয়তো কী। আমাদের চোখ একদমই ভীতু। দূরের কিছু দেখতে খুব ভয়, যেন ও নিজেই দূরে গিয়ে দেখছে। কাঁচ দিয়ে ঘিরে দিলে অনেক সময় অনেক অনেক দূরে তাকায়, যে কারণে লোকে চোখে কম দেখা শুরু করলে চোখটাকে চশমার কাঁচ দিয়ে ঘিরে দেয়।” . . . “আর তুই কী তুই তুই..” দাদু কথা খুঁজে পায়না, “তুই একটা হারমোনিয়াম!” “হারমোনিয়াম?” “হ্যাঁ, মন্টি রোজ সকালে যেটা বাজায় আর কি!” “মানে আমাকেও বাজে বললে!” “কোথায় বললাম?” “হ্যাঁ, হারমোনিয়ামও তো বাজে, আর মন্টি আপার হাতে তো দারুণ বিশ্রীভাবে বাজে।”
মাশুদুল হকের লেখা “নিমিদের শহরে কোলা মিয়া ও রাজকুমারী রাতাতা” বইয়ের লাইন ওগুলো। দর্শন আর উইটি হিউমারের এমন মজার উপস্থাপন হরহামেশা চোখে পড়েনা।
রাজকুমারী রাতাতা তার পাখার রং হারিয়েছে। এখন তাকে আর চিনছেনা কেউ। সেই দুঃখে কোলামিয়ার কাছে আত্নহত্যা করতে গেল রাজকুমারী। কিন্তু কোলামিয়া তাকে কপাৎ করে গিলে খাবে, সে সুযোগ কি আর আছে? দিন বদলে গেছে না! কোলা মিয়া এখন ভীষণ ফোলা, তাইতো আয়েশ করে পদ্মপাতার ওপর আর বসা হয়না, যখন তখন ভোজন হয়না। রাতাতা ভেবে দেখলো, কোলামিয়ার দুঃখও কম নয়। তাই কোলা মিয়ার দুঃখ ঘোঁচাতে আর তার পাখার হারানো রং খুঁজে পেতে রাতাতা রওনা হল নিমিদের শহরে, কোলা মিয়াকে সাথে করে।
তাদের সে অভিযানে একে একে এল নিমি, দাদু, মিনকু, পুলিশ জাঁদরেল খাঁ, কর্ণেল কাকন্দ আর টিটি, গোলটু, ফরফর, ঝিমঝিম, জ্বলজ্বল, ইন্দু কত কি! শুরু হয়ে গেল এক মজার ভজকট।
কি মজা করেই না লেখা গল্পটা। সেই সাথে আঁকা কি দারুণ। মাশুদুল হকের লেখা আর মাহতাব রশীদের আঁকা সম্পূর্ণ করেছে একে অন্যকে। শিশুতোষ এই উপন্যাসটি শিশু-কিশোররা লুফে নেবে, আমার মতো বুড়ো-ধাড়িও যে কম আনন্দ পায়নি; সে তো বুঝতেই পারছেন। “সুখপাঠ্য বই” কিংবা “হ্যাপী রিডিং” শুভকামনা, “নিমিদের শহরে কোলা মিয়া ও রাজকুমারী রাতাতা”র সাথে খুব যায়। খুব।