শিমুলডাঙা গাঁয়ে দুটো পাখি ছিলো; সুখপাখি আর দুখপাখি। তাদের নিয়েই উপন্যাস, ভাঙা জোছনা। জোছনা কেন ভাঙবে? এটা বলতে আসলে কী বোঝায়? সে একেক জনের একেক অনুভূতি। আমি শুধু বলতে পারি একজন অতি সাধারণ জহিরের কথা। যার প্রিয়তম মানুষটিকে ছুঁয়ে জোছনা পূর্ণতা পেয়েছিলো। শেষ অব্দি কেন তার মনে হলো, জীবনের অনেক অনুভূতিই পূর্ণতাকে স্পর্শ করে অপূর্ণ থেকে যায়। ভরা জোছনা এক সময় রুপান্তরিত হয় ভাঙা জোছনায়, সে কেই বা জানে। জানা নেই মনা পাগলা কেন চন্দ্ররাতে অপার দুঃখ নিয়ে দৌড়ে চলে কোন এক হাহাকারে। জানা নেই এই এক জনমে কেন কিছু মানুষ ভুল ঠিকানায় বসত করে জীবনভর।
এভাবেই কতশত অনুভূতি এক চান্নিপসর রাতে গিয়ে মেশে চন্দ্রআলোয়। যাকে ওরা নাম দিয়েছে, ভাঙা জোছনা।
Tania Sultana (Bengali: তানিয়া সুলতানা) is a fiction writer. At 1999, she went to Rome, Italy with her family and started living there. She had gratuated in Tourism from the university of Cristoforo Colombo. She is also passionate about painting and writing poetry.
শেষ যে কবে গ্রাম বাংলাকে এভাবে কোন বইয়ের পাতায় দেখেছিলাম মনে করতে পারছিনা। শহরে বড় হয়েছি বিধায় খুব কমই সময় কাটানো হয়েছে গ্রামে, কিন্তু এমন বর্ণণা পড়ার পর আফসোস এসেই যায়। বইটার কলেবর ছোট, কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন প্রতিটা চরিত্রের সাথে নিগূঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধ্য করেছেন লেখিকা । কাহিনী আবর্তিত হয়েছে রানু ও লিলি নামের অষ্টাদশী দুই তরুণী ও তাদের পরিবারকে ঘিরে। প্রতিটা ঘটনাই দাগ কেটে গিয়েছে, একদম শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটানা পড়তে বাধ্য হয়েছি। মানুষে মানুষে সম্পর্কের পবিত্রতাও ফুটে উঠেছে সুন্দর ভাবে। সহজ সাবলীল ভাবে লিখিত একটা চিরায়ত উপন্যাস। লেখিকাকে ধন্যবাদ এবং শুভকামনা। :)
অনুভূতি আর কী প্রকাশ করব! আমি অবাক! হতভম্ব! মুগ্ধ! এমন লেখা আমি আসলে কয়টা পড়েছি - নিজেও জানিনা।
শুরুর দিকের গ্রামীণ চিত্রটা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল 'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসটাকে। এরপর ধীরে ধীরে 'ভাঙা জোছনা'র আলো আলোকিত করে গেছে বইটাকে। স্বরূপটা ফুটিয়ে তুলেছে।
শুরুটা যেমন - শেষটা পুরোটাই অন্যরকম। এমনকি শেষ পৃষ্ঠার শেষ দৃশ্যায়নটার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত সেটা আঁচ করা যায়নি। হঠাৎই কেমন করে যেন এসে গেল।
প্রতিটা চরিত্রই স্বরূপে ফুটে উঠেছে। প্রতিটা চরিত্রের সাথে ঘটা তাদের ঘটনাগুলোও।
সত্যি বলতে - বইয়ের প্রতিটা পাতা মন কেড়ে নিয়েছে। প্রতিটা ঘটনাও।
তবে সবচেয়ে বেশি মনটা কেড়েছে 'মনা পাগলা' আর 'রাবেয়া'র আড়ালে থাকা ভালবাসাটা। হয়তো, এটা আশাই করিনি। তাই বেশি ভাল লেগেছে।
গল্পের ফাঁকে ফাঁকে থাকা গীতগুলো উপন্যাসটাকে কাব্যিক মাত্রা দিয়েছে। পড়তে শুরু করলে শেষ না করা পর্যন্ত শান্তিও নেই।
খুবই সরল-সহজ লেখনী! এইটা এখন বলতে গেলে বিরলই। এতটা সহজভাবে কেউই লিখে না। বলা যায়, লিখতে পারে না। লেখিকা এই কাজটা খুব সু নিপুণভাবেই করে দেখিয়েছেন। প্রতিটা বাক্যেই কাব্যিক ধারাটা ছিল। যেইটা একটা আলাদা অনুভূতি দিয়ে গেছে - শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।
বাক্যগুলো যে খুব ব্যতিক্রম কিছু তা নয়। খুবই সাধারণ বাক্য। কিন্তু এগুলোই অন্যরকম ভাবে ধরা দিয়েছে।
যেমন - 'একসময় দিনকে কথা দেয়া সন্ধ্যা ধীর পায়ে নেমে এলো পৃথিবীর গায়ে' (পৃঃ ২২) খুব সাধারণ বাক্য। কিন্তু কাব্যিক রূপকতার সাথে ভাবলে কিছুটা মুগ্ধতা এসেই যায়!
সুজন মতি চরিত্রটা খুব বেশিই ভাল ছিল। হয়ত উপন্যাসে তার বিস্তৃতি এতটা না। কিন্তু পুরোটাতেই অলক্ষ্যে সে রয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে তার কথাগুলোর আবেশটা।
লিলি - চরিত্রটা নামের মতই পদ্মফুলের সদৃশ! কিন্তু কিছুটা চাপা স্বভাবের। যেন বাঙালী ঐতিহ্যবাহী মেয়েদেরই প্রতীক।
রানু - সাহসী কন্যা। সমাজ মেয়েদেরকে কিছুটা চেপে দূরেই রাখতো আগের সময়ে। কিন্তু এসবের মাঝেও কিছু কিছু মেয়ে সাহস নিয়েই এগুতো। ভাল থাকার জন্য, ভাল রাখার জন্য। রানু চরিত্রটা তাদেরকেই তুলে ধরেছে।
আরো অনেক চরিত্রই আছে। যাদের প্রত্যেককে নিয়েই অনুভূতি প্রকাশ করা যায়। সেইটা করব না। স্পয়লার হয়ে যেতে পারে।
উপন্যাসটায় সবই ছিল। একটা বাচ্চার দুনিয়াতে আসার মুহূর্তে মায়ের কষ্টের বর্ণনাটাও।
কী করে এতটা পরিপূর্ণতা একটা উপন্যাসে থাকতে পারে - তা ভেবেই অবাক। যেইখানে লেখিকার এইটাই প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস!
উপন্যাসের সবচেয়ে সেরা দৃশ্য-কল্পটা, আমার মনে হয় এটাকে অনেকেরই সেরা মনে হবে... রানু তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল, 'এত্ত কষ্ট করছ তুমি, মা। কত্ত কষ্ট দিছি তোমারে, মাফ কইরা দিও...'
লেখিকা যেভাবে ঐতিহ্যের সেই গ্রামীণ বাঙলাকে ফুটিয়ে তুলেছেন - সেইটা এখনকার যুগে সম্ভব না। এখন সবই বদলে গেছে বাঙলার। তাই লেখক-লেখিকাদের লেখা থেকেও বাঙলার সেই রূপটা হারিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে এমন একটা লেখা সত্যিই দরকার ছিল।
লেখিকা দেশে না থাকাতেই হয়ত - কল্পনায় বাঙলাটাকে সেই আগের মত করে ধরে রেখেছেন। ভাগ্যিস! নাহলে এত সুন্দর লেখাটা পেতাম না আমরা।
আত্মার আত্মীয়তা থেকেই সম্পর্ক তৈরি হয়... রক্তের সম্পর্ক থেকে আত্মীয়তা নয়। কথাটা কত সাধারণ তাইনা? অথচ, এই একটা সাধারণ কথার মাঝেই যে অসাধারণ অনেক কিছু লুকিয়ে আছে...সেটা শুধুমাত্র অনুভবের মাধ্যমেই বোঝা সম্ভব। মানব জীবন আবর্তিত হচ্ছে যে জিনিসটিকে ঘিরে...তা আর কিছু না...বরং সম্পর্ক। যে যেভাবেই দেখুক, বলুক কিংবা ভাবুক...কখনও না কখনও মানুষ কারও ছায়াতলে, কাউকে আঁকড়ে ধরে কিংবা কারও সংস্পর্শে বাঁচতে চায়। সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে কেউ বটবৃক্ষ হয়...আবার কেউ মাধবিলতা। গল্পটা এমনই কিছু সম্পর্কের যেখানে অভিমান আছে, ক্ষোভ আছে, চাপা কিছু কষ্ট আছে, সেই সাথে খুব প্রিয় কারও জন্য হাহাকারও আছে। গল্পটা...সম্পর্কের দায়েরা ভুলে গিয়ে নিঃস্বার্থভাবে কারও প্রতি গভির টানেরও। আকর্ষণের জন্য হয়ত কারণের প্রয়োজন হয়, মায়ার ক্ষেত্রে ব্যাপারগুলো নিরর্থক...মায়া মানব অনুভূতির এমন একটা দিক যা ব্যাখ্যাতীত। আবেগী মন নিজের সীমারেখাটা হয়ত এভাবেই টানে...যুক্তিহীন সে, কাউকে কারণ দর্শানোর প্রয়োজন বোধ করে না। গল্পটা মায়ার.....যেখানে লিলি ,রানু, মনা মিয়া, তপু, জহিরের মতো চরিত্রগুলোর মধ্যে দিয়ে এই ব্যাখ্যাতীত জিনিসটারই কাব্যিক কোন রুপ তুলে ধরা হয়েছে। এর মাত্রা অনির্ণেয়...ছত্রে ছত্রে প্রাণের ভাবটা প্রখর। চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও কেন জানি আবেগ, অনুভূতির ব্যাপারগুলো মনের গভিরে গিয়ে লেগেছে। হ্যা আমিও তো দেখেছি এমন...কিংবা এই চরিত্রগুলোর কেউ কেউ তো আমার পরিচিত ছিল! এতে থাকা আবেগগুলো বড় বেশি বাস্তব। ভাঙা জোছনা...পূর্ণতার মাঝে শুন্যতার গল্প, ভালোবাসার মাঝে অভিমানের গল্প, অপেক্ষার প্রহরে ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাসের গল্প যার প্রতিটা অংশ খুব তীব্রভাবে অনুভব করেছি। অনুভূতিগুলোর মধ্যে কষ্টের একটা ভালো দিক আছে জানেন? কষ্ট অন্য অনেক অনুভুতিকে রাঙিয়ে তুলতে সাহায্য করে। এই বইটাতে শুধু যে কষ্ট আছে তা না...কষ্টের আবডালে এত সুন্দর কিছু ছোট বড় অনুভূতি আছে যেটা মাত্র কয়েকটা শব্দের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। আর এতে থাকা গীতগুলো...ভীষণ ভীষণ ভালো লেগেছে। <3
আহারে মোর চন্দ্র আলো সেই দূরেতে ওড়ো তুমিই আবার কেমন কইরা গায়ের মাঝে ঝরো?
বড় বেশি অর্থপূর্ণ এর কথাগুলো...বড় বেশি তাৎপর্যপূর্ণ এর আবহ। অতিরঞ্জিত কিছু নাই, কিন্তু তারপরেও গল্পের ক্যানভাসটা শৈল্পিক। নামকরণের পেছনেও একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি... অনেকে মেঘে�� মাঝে হরেক রকমের অবয়ব দেখতে পায়... কেউ দেখে শুধু কুন্ডলিকৃত অংশ, কেউ বা তেড়ে আসা ঘোড়া। পার্থক্য...দৃষ্টিভঙ্গি। বইটাও ঠিক তাই...আশা- নিরাশা, ম্লান হতে থাকা স্নিগ্ধ কিছু অনুভূতির গল্পই...ভাঙা জোছনা।
কাছে আছে দেখিতে না পাও, তুমি কাহার সন্ধানে দূরে যাও। মনের মতো কারে খুঁজে মরো, সে কি আছে ভুবনে-- সে তো রয়েছে মনে। ওগো, মনের মতো সেই তো হবে, তুমি শুভক্ষণে যাহার পানে চাও। তোমার আপনার যে জন, দেখিলে না তারে। তুমি যাবে কার দ্বারে। যারে চাবে তারে পাবে না, যে মন তোমার আছে, যাবে তাও॥
ব্যাপারটা অনেকটাই হয়ত এমন...কাছে থাকলে অনেক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় আমাদের নজর আসে না। কিছু কিছু সম্পর্কের গুরুত্ব মানুষ দূরে চলে গেলে বোঝে কিংবা অভাববোধটা প্রখর হয়। ভাঙা জোছনা এই অভাববোধেরও গল্প। বইয়ের প্রত্যেকটি অংশ মনে থাকবে মেলাদিন...লেখকের সরল কিন্তু মন ছুঁয়ে যাওয়া লেখনী মুগ্ধ এবং দগ্ধ দুটোই করেছে।
আহারে মোর চন্দ্র আলো সেই দূরেতে ওড়ো তুমিই আবার কেমন কইরা গায়ের মাঝে ঝরো লেখিকা তানিয়া সুলতানার লেখালেখির সাথে পরিচয় শুধুই গল্পের মাধ্যমে। শুধুই গল্প সংকলন ৩ এ তার লেখা গল্প পড়ে তার ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম। গত বছর যখন তার প্রথম উপন্যাস 'ভাঙা জোছনা'র ঘোষণা দেন, তখন থেকে বইটার জন্য অসীম আগ্রহ ছিল। তাই বইটা মেলায় আসার পর কিনতে দেরি করিনি। লেখিকা তানিয়া সুলতানার লেখার মূল আকর্ষণ হলো-তার পুরো লেখা জুড়ে এক অদ্ভুত মায়া জড়িয়ে থাকে। কলমের ডগা দিয়ে কিভাবে এত মায়া ঝরে পড়ে, বুঝতে পারি না। ভাঙা জোছনায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। শিমুলডাঙ্গা গ্রামের পটভূমিতে গড়ে উঠছে এই উপন্যাস। দুই কিশোরী লিলি আর রানুর বন্ধুত্বকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যেতে থাকে কাহিনি। প্রেম-ভালবাসা, চাওয়া-না পাওয়া, আনন্দ-বিষাদ, হাহাকার-সব মিলিয়ে এক চমৎকার সামাজিক উপন্যাস ভাঙা জোছনা। আমি বেশি কিছু লিখছি না, স্পয়লার হয়ে যাবে। চলুন দেখি, লেখিকা তার বই নিয়ে কী বলছেন। জোছনা কেন ভাঙবে? ভাঙা জোছনা বলতে আসলে কী বুঝায়? একেকজনের অনুভূতি একেকরকম। তবে আমরা শুধু বলতে পারি জহিরের কথা, যার প্রিয়তম মানুষটিকে ছুঁয়ে পূর্ণতা পেয়েছিল জোছনা। তবুও কিভাবে ভরা জোছনা একসময় পরিণত হয় ভাঙা জোছনায়, তা কেই বা জানে। মনা পাগলাই বা কেন অপার দু:খ নিয়ে চন্দ্ররাতে দৌড়ে চলে, তাও জানা নেই। জানা নেই, এই এক জনমে কেন কিছু মানুষ ভুল ঠিকানায় বসত করে জীবনভর। এভাবেই শত অনুভূতি মিলেমিশে রুপান্তরিত হয় ভাঙা জোছনায়। ব্যক্তিগত মতামত বলতে গেলে, বইটি শেষ করার পর অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। রেশ রয়ে গেছে, সেই সাথে এক ধরণের হাহাকার। হুমায়ুন আহমেদের সব উপন্যাস শেষ করার পর এমন অনুভূতি আর কখনোই হয়নি।
বইটা ভালই ছিল। অগণিত হাসি কান্নার মাঝে মায়াময় এক উপাখ্যান। চিরচেনা পরিবেশ, তবুও ভিন্ন আবেশ। লেখিকার তুলিতে জীবন্ত এক চিত্র। মনা মিয়া কিংবা সুজন মতি চরিত্র আমাকে স্পর্শ করেছে, লিলি এবং রানুর বন্ধুত্ব অনুপ্রাণিত করেছে। মোটামুটি সবটাই ভাল লেগেছে।
সামাজিক উপন্যাস সাধারণত খুব বেশি পড়া হয় না, ব্যাপারটার প্রতি ব্যক্তিগত ভাবে পুষে রাখা এক প্রকার অনীহা রয়েছে। তবুও কেবলমাত্র লেখিকার লেখনীর লোভে পড়ে বইটা পড়ে ফেলেছি। এবং বেশ করেছি।
অষ্টাদশী দুই তরুণী রানু আর লিলিকে নিয়ে ভাঙা জোছনা উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। শিমুলডাঙা গ্রামে ওদের বাস, গ্রামের প্রাণ যেন ওরা দুজন। নিজেদের চপলতা আর উচ্ছ্বলতা দিয়ে পুরো গ্রাম মাতিয়ে রাখতে ওরা ওস্তাদ। সবকিছু ঠিকঠাক ভাবেই চলছিল কিন্তু হঠাৎ করেই সব যেন উলট পালট হয়ে গেল।
রানুর বাবা মনা মিয়া, আপনজনদের দ্বারা প্রতারণার স্বীকার হয়ে সেই যে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে, আর কখনো সুস্থ হতে পারেনি। এখন সবাই তাকে মনা পাগলা বলে ডাকে। বছরের একটা নির্দিষ্ট সময় তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা লাগে। অভাব অনটন লেগেই আছে তাদের ঘরে। তাদের এই দুরাবস্তার সুযোগ নিয়ে বৃদ্ধ বারেক মাতাব্বর নাতনীর বয়সী রানুকে নিজের তিন নাম্বার বউ বানাতে চায়।
লিলি ভালবাসে তাদেরই আশ্রয়ে বেড়ে উঠা পিতৃ-মাতৃহীন অনাথ ছেলে জহিরকে, কিন্তু বাবা মায়ের ভয়ে তাকে কখনো মনের কথা জানাতে পারেনা। এদিকে লিলির মায়ের মনে ভীষণ ভয়, মেয়ের চোখে জহিরের জন্য কি যেন এক অদ্ভুত মায়া কাজ করে, সে মায়ায় তিনি তিনি মেয়েকে জড়িয়ে পড়তে দিতে চান না। তাই লিলির জন্য যখন শহুরে পাত্র তপুর সম্বন্ধ এল, তখন মেয়ের মতের তোয়াক্কা না করে তাকে বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লাগেন। বিয়ে হয়েও যায়, চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া লিলির আর কিছু করার থাকে না।
সুজন মতি গায়েন মানুষ। আশেপাশে দশ গ্রাম জুড়ে তার খ্যাতি। যে কোন অনুষ্ঠানে গানের জন্য তার ডাক পড়ে। নিজের গানের কথা আর অদ্ভুত সুরে তিনি মানুষকে ডুবিয়ে রাখেন। অথচ কেউ জানে অকৃতদার এই মানুষটির মনে কত কষ্ট লুকিয়ে আছে। তার প্রতিটি গানের কথার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে জীবনের একমাত্র ভালবাসাকে না পাওয়ার গভীর বেদনার কথা, সবাই মুগ্ধ হয়ে সেসব গান শুনে, কিন্তু অনুধাবন করতে পারেনা কেউই।
বারেক মাতাব্বরের হাত থেকে বাঁচতে রাতের আঁধারে ঘর ছাড়ে রানু। ভাগ্যক্রমে কিংবা দূর্ভাগ্যক্রমে জহিরের সাথে তাকে ধরে ফেলে গ্রামের লোকজন। সালিশে বিচার হয়, দুজনের বিয়ে পড়ানো হবে! কি অদ্ভুত! কোনদিন তারা একে অপরকে সেভাবে কল্পনা করেনি, অথচ কিনা ভালবেসে ঘর ছাড়ার অভিযোগে ধরেই কিনা তাদের বিয়ে দিয়ে দেয়া হচ্ছে! দুজনেই বিব্রত, তবে রানুটা কিঞ্চিত খুশি! বারেক মাতাব্বরের হাত থেকে বেঁচেছে সে, এতেই খুশি সে।
তপু বুঝতে পেরেছিল তাদের বিয়েতে লিলির মত ছিল না। তাই সে স্ত্রীর উপর কোন ধরনের জোর খাটায় নি। নীরবে ভালবেসে অপেক্ষায় থেকেছে লিলি কখন তাকে মন থেকে স্বামী হিসেবে মেনে নিবে। লিলি কি আদৌ তার ভালো মানুষ স্বামীটার নীরব ভালবাসাকে বুঝতে পারবে কখনো? ভালবাসার বিনিময়ে ফেরৎ দিতে পারবে ভালবাসা?
সত্যি বলতে কি, বাতিঘর বিপ্লব শুরু হওয়ার পর থেকে গত দুই বছরে টান টান উত্তেজনার থ্রিলার পড়া আর কিছুই পড়িনি আমি। তাই ভাঙা জোছনা বইটি প্রথমে যখন হাতে নেই, পড়া শুরু করতে কিছুটা কষ্ট হয়েছিল। দুই দিনে মিলে পাঁচ পৃষ্ঠার বেশি পড়তে পারিনি। কিন্তু তারপরেই এক অদ্ভুত ঘোরে পেয়ে বসে আমাকে। বাদবাকি পুরোটা এক টানে পড়ে শেষ না করে উঠতে পারিনি।
বইটি আমার কেমন লেগেছে- খুব কমপ্লিকেটেড প্রশ্ন। যে ব্যাপারগুলো আমার খুব পছন্দের- প্রতি পাতায় পাতায় টানটান উত্তেজনা, মাথা খারাপ করে দেয়া কোন টুইস্ট, ইতিহাসের সাধারণ কোন ঘটনাকে বর্তমানের কোন ঘটনার সাথে জুড়ে দেয়া... কিছুই নেই এতে। কিন্তু তারপরেও বইটি পড়ে আমি মুগ্ধ। কিন্তু কেন?
বইটির পাতায় পাতায় টানটান উত্তেজনা না থাকুক, আছে গভীর মায়া। লেখিকা পরম মমতায় গল্পটির প্রতিটি শব্দ গেঁথেছেন। খুব সাধারণ এই কাহিনীতে এতটা মায়া ঢেলে দিয়েছেন, তা আপনাকে ছুঁয়ে যাব���ই। প্রতি অধ্যায়ের শেষে সাসপেন্স হয়ত নেই, ক্লাইম্যাক্সে নেই মাথা খারাপ করা কোন টুইস্টও। কিন্তু লেখিকার সাবলীল বর্ণনাভঙ্গির কারণে আপনার চোখে ভাসবে সাধারণ কিছু মানুষের সাধারণ জীবন যাপন। তাদের ছোট ছোট সুখ-দুঃখগুলো আপনাকে হাসাবে, মন খারাপ করে দেবে। শেষটায় গভীর বেদনায় ভরে দেবে বুকটা। তখন চরিত্রগুলোকে আর কোন উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্র মনে হবেনা আর, মনে হবে এই মানুষগুলো আপনার কত না আপন, কত দীর্ঘ সময়ের পরিচিত। আর এখানেই উপন্যাসটির স্বার্থকতা।
বইয়ের প্রথম দিকে যতি চিহ্নের ব্যবহারে কিছুটা ভুল আছে। সম্পাদেকের আরো যত্ন নিয়ে সম্পাদনার কাজটা করা উচিত ছিল। এত চমৎকার একটি বইয়ে ছোটখাট এসব ভুল পড়ায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে এটা মানা যায় না। আর উপন্যাসটির যে বিষয়টিতে আপনি অভিভূত না হয়ে পারবেন না, সেটি হচ্ছে ভাষার ব্যবহার। এত চমৎকার শব্দচয়ন বহুদিন কোন উপন্যাসে পড়ি না। আদৌ কি পড়েছি কখনো, তাও মনে পড়ে না।
সবশেষে বইটি যারা পড়বেন তাদের প্রতি আমার একটা অনুরোধ- হাতে তিন ঘন্টার কম সময় নিয়ে বইটি পড়তে বসবেন না। না, বইটি পড়তে এতটা সময় লাগবে না। আপনি যদি একজন মধ্যম গতির পড়ুয়া হন, তাহলে দুই ঘন্টার ভেতরেই বইটি আপনার পড়া হয়ে যাবে। তাহলে বাকি এক ঘন্টা সময় কিসের জন্য? ঝিম মেরে বসে থাকার জন্য! এটা এমন একটা উপন্যাস, যেটা পড়ার পর আপনি যদি চিন্তাহীন ভাবে চোখ বন্ধ করে কমপক্ষে এক ঘন্টা ঝিম মেরে বসে থাকতে না পারেন, তাহলে উপন্যাসটির স্বাদ আপনি কখনোই পুরোপুরি আস্বাদন করতে পারবেন না। :)