Nrisingha Prasad Bhaduri (Bengali: নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি Nr̥sinha Prasād Bhāduṛi; born 23 November 1950) is an Indologist and a specialist of Indian epics and Puranas. He is also a writer.
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর জন্ম ২৩ নভেম্বর, ১৯৫০ অধুনা বাংলাদেশের পাবনায়। কৈশোর থেকে কলকাতায়। মেধাবী ছাত্র, সারা জীবনই স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা। অনার্স পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে পেয়েছেন গঙ্গামণি পদক এবং জাতীয় মেধাবৃত্তি।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃত সাহিত্যে এম-এ। স্বর্গত মহামহোপাধ্যায় কালীপদ তর্কাচার্য এবং সংস্কৃত কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অধ্যাপক বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্যের কাছে একান্তে পাঠ নেওয়ার সুযোগ পান। নবদ্বীপ বিদ্যাসাগর কলেজের অধ্যাপনা দিয়ে কর্মজীবনের সূচনা। ১৯৮১ থেকে ২০১০ পর্যন্ত অধ্যাপনা করেছেন কলকাতার গুরুদাস কলেজে। বর্তমানে মহাভারত-পুরাণকোষ সংক্রান্ত গবেষণায় ব্যাপৃত। ১৯৮৭ সালে প্রখ্যাত অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করে ডক্টরেট উপাধি পান। বিষয়— কৃষ্ণ-সংক্রান্ত নাটক। দেশি-বিদেশি নানা পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ‘দেশ’ ও ‘বর্তমান’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক। প্রিয় বিষয়— বৈষ্ণবদর্শন এবং সাহিত্য। বৌদ্ধদর্শন এবং সাহিত্যও মুগ্ধ করে বিশেষভাবে। বাল্যকাল কেটেছে ধর্মীয় সংকীর্ণতার গণ্ডিতে, পরবর্তী জীবনে সংস্কৃত সাহিত্যই উন্মোচিত করেছে মুক্তচিন্তার পথ।
নিঃসন্দেহে ভাদুড়ীর অন্যতম সেরা বই। সেই উবর্শী থেকে শুরু করে কুন্তী, দ্রৌপদী হয়ে উত্তরা পর্যন্ত মহাভারতের প্রভাবশালী আঠারোজন নারী চরিত্রের অসাধারণ বিশ্লেষণ। প্রত্যেকটা চরিত্রের আলোকিত অংশের পাশাপাশি তাদের অন্ধকার দিক নিয়েও ভাদুড়ী বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে উর্বশী, দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা, সত্যবতী, গান্ধারী, হিড়িম্বা, উলূপী এবং চিত্রাঙ্গদা এই কয়টা চমকপ্রদ চরিত্র বিশ্লেষণের জন্য এ বই কেনার পয়সা ষোল আনাই উসুল হয়ে যাবে।
মহাভারতের দুই কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র কুন্তী আর দ্রৌপদীকে নিয়েও ভাদুড়ী সুন্দর আলোচনা করেছেন, কিন্তু এ দুই চরিত্র সম্পর্কে আরো ভালো আলোচনা পাওয়া যাবে একই লেখকের কৃষ্ণা কুন্তী কৈন্তেয় বইয়ে। মহাভারতের ফোকাস সাধারণতঃ দ্রৌপদী আর কুন্তীর উপরেই বেশি পড়ে, আমরাও বাদবাকি চরিত্রের গভীরে যাই না। ভাদুড়ীর লেখা এ বই সে দোষ মুক্ত, তিনি দেখিয়েছেন কুন্তী দ্রৌপদী বাদেও মহাভারত লেখক ব্যাস আরো অসংখ্য জটিল মনস্তত্বসম্পন্ন নারীচরিত্র সৃষ্টি করেছেন, যার প্রতিটাই মনোযোগ আকর্ষণের দাবী রাখে। ভাদুড়ীর এ বইয়ের বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি শুধু চরিত্রগুলোর পরিচয়, কর্মকান্ড বর্ননাতেই সীমিত থাকেন নাই, তিনি চরিত্রগুলোর মনোজগত আর তাদের নিয়ে ঘটনাগুলোর গভীরে ঢোকার চেষ্টা করেছেন, এবং মূল মহাভারতের শ্লোক বিশ্লেষণ করে ব্যাস কি অর্থ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, সেটা বুঝে আমাদেরও সহজ ভাষায় বুঝানোর চেষ্টা করেছেন। সত্যিই প্রশংসনীয় তার এ প্রয়াস।
অসাধারণ এ বই যে কোন মহাভারত অনুরাগী পাঠককে অতি অবশ্যই পরিতৃপ্ত করবে।
ছোটবেলায় একটানে মহাভারত লেখা শিখেছিলাম। একটানে মহাভারত পড়া সম্ভব হয়নি। কারণ, যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে! কথাটা ভীষণভাবে সত্যি। যত ধরনের মানুষ এবং মনস্তত্ত্ব যা আছে, সবই বোধহয় এক মহাভারত বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যাবে। আমি অতি সাধারণ এক পাঠক। বেদ-পুরাণ-গীতা পড়ে মহাভারত বোঝার ধৈর্য্য, ইচ্ছে বা সময় কোনটাই আসলে নেই। সাহিত্য, ইতিহাস ইত্যাদি আমার বিষয় ও নয়। পড়ি জানার জন্য, মনের আনন্দে। মহাভারত এমনিতেই গল্পের পর গল্পের পর গল্প। প্রতিটা কাহিনী সাদা চোখেই যথেষ্ট রোমাঞ্চকর। কিন্তু সেটা তাহলে গল্প হয়েই থেকে যায়। একটু গভীরভাবে ভেবে এবং বুঝে পড়লে তবেই মহাভারত পড়া ফলপ্রসূ হয়। এই বইটি রচিত হয়েছে মহাভারতের গুরুত্বপূর্ণ সকল রমণীদেরকে উপজীব্য করে। শুরু হয়েছে ঊর্বশী দিয়ে, শেষ হয়েছে উত্তরাতে। এতেই বোঝা যায় কতটা আকর্ষণীয় বইটি। দীর্ঘ এক মাস যাবৎ অল্প অল্প করে বইটি পড়েছি আমি। নিজের চিন্তার সাথে মিলিয়েছি মহাভারতের কবি এবং বইটির লেখকের চিন্তা। সবকিছু অত তলিয়ে ভাবিনি, কিছু ভাবনা মিলে গেছে, কিছু নতুনত্ব গভীরভাবে আলোড়িত করেছে। ব্যক্তিত্ব, মনুষ্যত্ব, প্রজ্ঞা, সাহসিকতায় দ্রৌপদী ধরা দিয়েছেন নতুনভাবে, কুন্তী হয়েছেন আরো মানবিক, সত্যবতী এবং সত্যভামার ব্যক্তিত্ব যুগপৎভাবে মুগ্ধ এবং বিস্রস্ত করেছে ভাবনা। সবচেয়ে ভালো লেগেছে কোন ধরনের কল্পনা বা সুদূরপরাহত কোন ভাবনা না ভেবে, একেবারেই মহাভারতের আলোকেই প্রতিটি আলোচনা হয়েছে। যতই অষ্টাদশী নাম হোক না কেন, যেহেতু নারীর জীবনে পুরুষ, রাজ্য, তপস্যা, সমাজ সবই ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, ফলে গোটা মহাভারতটাই আসলে আলোচিত হয়েছে এখানে। মহাভারত পড়ে রাজনীতি, কূটনীতি, মনস্তত্ত্ব, পুরুষতান্ত্রিকতা, তৎকালীন সমাজব্যবস্থার আলোকে বর্তমান সমাজ সবই ভালো করে বোঝা যায়।
লেখনশৈলী সুললিত, সুরসিক এবং চিত্তাকর্ষক। লেখকের কেবল একটি বই পূর্বে পড়া ছিল, আরো অনেক বই আছে তাঁর। মহাভারত-রামায়ণ কে উপজীব্য করে। যেহেতু তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল এসব এবং তিনি কাজ করেছেন প্রখ্যাত মনীষী সুকুমারী ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে। এমন একেকটি বই পড়লে মনন আলোকিত হওয়ার সাথে সাথে চিন্তার গভীরতা আরেকটু বাড়ে, দেখার চোখ আরেকটু খুলে। আরো অনেক পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
মোটামুটি দায়িত্ব নিয়েই বলা যায়, "মহাভারতের ভারতযুদ্ধ"-র পর এটিই নৃসিংহপ্রসাদের শ্রেষ্ঠ কাজ। এই আঠেরোটি চরিত্রের মধ্যে কুন্তী এবং দ্রৌপদী ইতিপূর্বেই "কৃষ্ণা, কুন্তী এবং কৌন্তেয়"-তে আলোচিত হয়েছিলেন। সেই দু'টি অংশকেই আরও পরিমার্জিত এবং তীক্ষ্ণ করে এই বইয়ে পরিবেশন করা হয়েছে। তার সঙ্গে থেকেছে আরও ষোলোজন নারীর কথা। এই ষোলোজনের মধ্যে সত্যবতী, অম্বা-শিখণ্ডিনী, গান্ধারী এবং মাদ্রীর প্রসঙ্গ যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়েছে "মহাভারতের ছয় প্রবীণ"-এ ভীষ্ম ও ধৃতরাষ্ট্রের চরিত্রকে প্রস্ফুটিত করার সময়েই। তবু এখানে স্বতন্ত্রভাবে এই চরিত্রদের বিকশিত হতে দেখে ভালো লাগে। তবে এই বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হল অন্য চরিত্রদের বর্ণনা ও বিশ্লেষণ৷ উর্বশী, হিড়িম্বা, রুকমিনী, সত্যভামা এবং মাধবীকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সে-যুগের ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং তার মধ্যে চলা ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত ক্ষমতার দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটেছে অনন্য ভঙ্গিতে। দারুণ বই। সর্বার্থে অ্যাসেট বলে বিবেচিত হওয়ার মতো বই।
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি তাঁর প্রবন্ধ সমূহে একটি কথার বারংবার পুনরাবৃত্তি করেন যে মহাভারতকে বুঝতে গেলে মহাভারতের কবির হৃদয় দিয়ে বুঝতে হবে। কথাটা বলা যত'টা সহজ, বোঝার কাজটা করা ততধিক দুরূহ। এক, আমি পাঠক হিসেবে নিজেকে এই মহাকাব্য-পুরাণ পরিসরে স্বল্পজ্ঞ মনে করি। দ্বিতীয়ত, আমার জীবনবোধ এতই অনুন্নত - যে কোনটা মহাকাব্যের চরিত্র বিশ্লেষণ ও কোনটা 'জাস্ট অ্যানাদার ওপিনিয়ন' - তাঁদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি না। ফলে যে বোধ হয়, তা অনেকটাই "আত্ম-হৃদয়ের প্রতিফলন", এবং যা অবশ্যই মহাভারতের কবির হৃদয়ের নয়।
এই স্থলে আমার মতন পাঠকদের ত্রাতা হলেন প্রাবন্ধিক স্বয়ং। লেখক যে স্বর্ণকারের নিপুণতায় মহাভারতের নারী চরিত্রগুলোর - তাঁদের সাথে ঘটে চলে জীবনপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে - বিশ্লেষণ করেছেন, তা প্রশংসনীয় ও শিক্ষণীয়'ও বটে। প্রাবন্ধিক কুশলী লেখক ও শব্দের জাদুকর; তাই নিজের রচনায় আগ্রহী পাঠককে 'এঁটকে' রাখতে পারেন। রূক্মিনী ও সত্যভামার প্রবন্ধে দুই সপত্নীর মাঝে কৃষ্ণের অপ্রতিভ দেখে হাসির উদ্রেক হয়, তেমনই 'উত্তরা'তে অভিমন্যুর মৃত শরীরকে জড়িয়ে বৈরাটির বিলাপ মনকে আর্দ্র করে তোলে।
শুধু মহাভারত নয় - প্রাবন্ধিক তাঁর 'উর্বশী' ও 'শকুন্তলা' প্রবন্ধে এনেছেন কালিদাসের প্রসঙ্গ, 'সুভদ্রা'তে এসেছেন কাশিরাম দাস, 'শর্মিষ্ঠা' বা 'উলূপী ও চিত্রাঙ্গদা'তে শোভা বর্ধন করেছেন কবিগুরু, স্বয়ং। 'লোপামুদ্রা' প্রবন্ধে বৈদর্ভী অগস্ত্যভার্যা যে ব্যঞ্জনায় নারী-পুরুষের যৌন ব্যবহারকে ঋগ্বেদীয় সূক্তে ব্যক্ত করেছেন, তা'ও খ্রিষ্টের জন্মের দ্বিসহস্র বছর পূর্বে, ভাবলেও আশ্চর্য হতে হয়। অন্যতম ট্র্যাজিক চরিত্র হিসেবে উঠে আসে 'অম্বা-শিখণ্ডিনী'। তবে সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট সম্ভবত 'কুন্তী', 'গান্ধারী' ও 'দ্রৌপদী' শীর্ষক প্রবন্ধত্রয়। বিশেষত 'কুন্তী' - এই প্রবন্ধটি এই অলঙ্কারস্বরূপ বইয়ের বৈদুর্যমণিস্বরূপ।
সহৃদয় পাঠকদের অনুরোধ, তাঁরা যেন অবশ্যই এই বইয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
মহাভারতের আঠারো জন বিশিষ্ট নারীকে নিয়ে লিখা এই বইটি এক কথায় অনন্য। মহাভারত বিশাল এক গ্রন্থ সেখান থেকে আঠারো জনকে তুলে এনে তৎকালীন সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশের প্রেক্ষাপটে তাদের চরিত্রের বিচার করার মত দুরহ কাজটি দক্ষতার সাথেই করেছেন বলে মনে হয়েছে আমার। মহাভারত নিয়ে আমার পড়া কম। পূর্ণ মহাভারত সবিস্তারে আমার পড়া হয়নি। তারপরেও একথা বলতে পারি নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীকে এই বইটি লিখতে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছে।
অনেকে মহাভারতকে একটা দর্শন হিসেবে ভাবেন বলেই মহাভারতের প্রতি প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা অভিমত থাকে। সেই মতগুলোকে বিচার বিশ্লেষণ করে সেখানে থেকে তিনি নিজের মতো করে সত্যকে বের করে এনেছেন। কখনো কোনো বিখ্যাত টীকাকারকে বাতিল করে দিয়েছেন আবার কখনো গ্রহন করেছেন।
তিনি দেখিয়েছেন সত্যবতী কিভাবে রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্যে জীবনের অন্য অধ্যায়কে উন্মুক্ত করেছেন। হিড়িম্বা কিভাবে আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের প্রেম প্রকাশ করেছে৷ কুন্তি যেভাবে দ্রৌপদীতে প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠলো। নারীদের নিয়ে লেখা হলেও মহাভারতের বিশাল অংশ জুড়ে কৃষ্ণের রাজনৈতিক কূটকৌশলের কারণে ক্ষণে ক্ষণে তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। লেখক মহাভারতকারকে টিপ্পনী করেছেন কৃষ্ণর সাথে কৃষ্ণার (দ্রৌপদী) নামগত মিল দিয়ে।
প্রতিটি চরিত্রই যার যার মতো করে অনন্য, নিজ নিজ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল। সব মিলিয়ে আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে।
এই বইটা সম্পর্কে যত কম বলা যায় ততই ভাল। এটি একটি অসাধারণ বই। মহাভারতের চরিত্র নিয়ে যারা নিয়মিত পড়াশোনা করে চলেছেন, তারাই বুঝতে পারবেন এই বইটার মাধুর্য...