মোনাজাতউদ্দিন (১৮ জানুয়ারি ১৯৪৫ – ২৯ ডিসেম্বর ১৯৯৫) ছিলেন একজন বাংলাদেশী সাংবাদিক। আশির দশকে বাংলাদেশে তিনি মফস্বল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ চারণ সাংবাদিক হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। দৈনিক সংবাদে পথ থেকে পথে শীর্ষক ধারাবাহিক রিপোর্টের জন্য তিনি খ্যাতি লাভ করেন। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তাকে ১৯৯৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।
লেখক হিসেবেও সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ছিলেন অনন্য। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘শাহ আলম ও মজিবরের কাহিনি’, ‘পথ থেকে পথে’, ‘কানসোনার মুখ ও সংবাদ নেপথ্যে’, ‘পায়রাবন্দ শেকড় সংবাদ’ প্রভৃতি।
"পথ থেকে পথে" সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দীনের ১৯৯০ সালে লেখা পেশাগত জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনা দিয়ে সাজানো। বেশিরভাগ লেখাই পত্রিকায় প্রকাশিত। প্রলয়ঙ্করী কোনো ঘটনা বইতে নেই। সরলভাবে লেখাগুলো "ফিচার" কিন্তু একবার পড়ে ভুলে যাওয়ার মতো নয়। কারণ লেখক হিসেবে মোনাজাত উদ্দীনের রয়েছে দুর্লভ একটি গুণ; বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে নির্মোহভাবে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ও তাদের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ। কতো বিচিত্র সব ঘটনা যে আছে বইতে! মুরগির পাইকারকে বাথরুমে যেতে দেওয়ার জন্য গাড়ি না থামানোয় হাতাহাতি, "ভিক্ষুক স্পেশাল" ট্রেন, প্রতিবাদী ভোলামীর এর জন্য গণজাগরণ, রোগীর ছদ্মবেশে কুমিল্লা মেডিকেলে যেয়ে গোপনে ছবি তোলা,করতকান্দি গ্রামে তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত নান্দনিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,এরশাদের পতনের পর ঢাকাসহ সারাদেশের মানুষের আনন্দ উল্লাসের বিস্ময়কর বিবরণ, খেতে না পেয়ে মানুষের মৃত্যু -সহ বহু বিষয়ে লিখেছেন মোনাজাত উদ্দীন। আর সবকিছু ছাপিয়ে লেখকের নিজের অক্ষমতা আর অপরাধবোধ আমাদেরও তাড়িত করে। ঝিনাইগাতীতে কার্তিকের আকালের খবর ও ছবি সংগ্রহ করে ফিরে এসে খেতে বসেন লেখক। এরপর তার অনুভূতি-
"আরও দেখি, টেবিলের উপর সাজানো বেশ কয়েক পদের তরকারি। টাকি মাছের ভর্তা, আলু দিয়ে ছোট মাছের চচ্চড়ি, রুইজাতীয় বড় মাছ, মুরগি, ডাল ইত্যাদি। আমার আবার খুব তাড়াতাড়ি লালা এসে পড়ে জিহ্বায়, এসে পড়ল, প্রায়-হালুম দিয়ে পড়লাম খাদ্যের স্তূপের ওপর। আমাদের সামনে তখন বাগেরভিটা গ্রামের অনাহারক্লিষ্ট শীর্ণ মানুষগুলো নেই। বেকার মজুর তমিজউদ্দিন, যার স্ত্রী সিন্দু বেগম কদিন আগে মারা গেছে না-খেতে পেয়ে, সেই তমিজের হা-হুতাশ নেই। বৃদ্ধ দিনমজুর ভাদু, একমাস থেকে কর্মহীন, একটানা সাতদিন অখাদ্য-কুখাদ্য খাবার পর এক মেম্বারের পায়ে ধরে মাত্র আধসের চাল 'সাহায্য' পেয়েছিল এবং সেই চালের ভাতটুকু সাত সদস্যের পরিবারের সবাই মিলে ভাগ করে খেয়েছে, সেই ভাদুর কাতরধ্বনি নেই। বৃদ্ধা কাঞ্চন বিবি, একটানা অনাহারে থাকবার পর গতকাল মাত্র ২টি কাঁচাকলা সেদ্ধ খেয়েছে, সেই কাঞ্চনের ‘একটু ভাত দ্যেও বাবা' বলে কান্না নেই ।
না, কিছু নেই, কোনো স্মৃতি নেই, কিছুক্ষণ আগের কোনো বেদনা নেই, আমি এক সাংবাদিক, নষ্ট সমাজের একজন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের গণমানুষের একজন, গোগ্রাসে গিলছি গরম ভাত। টেবিলে যেসব তরকারি সাজানো, যদিও দেখতে তা তমিজউদ্দিন, সিন্দুবিবি, ভাদু, কাঞ্চন বিবিদের রক্ত ও মাংসের মতো, তার সবকটিই আমার খুব প্রিয়।"
সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন পত্রিকার সংবাদ সংগ্রহের জন্য চরকির মতন ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের উত্তরাঞ্চল। সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়ার ঘটনাগুলো নিয়ে ছোট পরিসরের এই বই। ভদ্রলোকের লেখনী চমৎকার। পড়ে ভাল্লাগছে খুব।
মোনাজাত উদ্দিনের লেখায় এক সারল্য আছে। সহজ ভাষায় লেখা, পত্রিকায় যেমন থাকে ঠিক তেমন। তবে এর মাঝে আঞ্চলিক ভাষাও আছে। মিছা, আগুন তাপানোর মতো শব্দের ব্যবহার দেখা যায় অহরহ।
আজকালকার পত্রিকায় যেমন দেখা যায় সাংবাদিকেরা কেবলমাত্র মূল সংবাদটুকুরই উল্লেখ করেন। কিন্তু মোনাজাত এমন নন। তিনি ভিন্ন। সংবাদ জানানোর চেয়ে তিনি বরং কেমন করে সেটি পেলেন সেই যাত্রায় আমাদের নিয়ে যেতে বেশি পছন্দ করেন। তাই তার সাথে আমরা উত্তরবঙ্গের লোকাল ট্রেনে চড়ে বসি, দোল খাই ট্রাক বলা যায় এমন বাসে।
যা নিয়ে প্রতিবেদন করেন তার মধ্যে এরশাদের পতনের পরের খবর ছাড়া অনেকটাই প্রচলিত অর্থে বড় ঘটনা নয়। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, কাজের অভাব, প্রভাবশালীদের ক্ষমতার অপব্যবহার এসব দেখতে দেখতে তো আমরা জন্মের পর থেকেই অভ্যস্থ। কিন্তু মোনাজাতের লেখা আমাদের মনে আবেগের জন্ম দেয়, দুঃখের জন্ম দেয় এমন সব মানুষদের জন্য যারা বেঁচে ছিল আজ থেকে কয়েক দশক আগে।
কোনো এককালে রুশ লেখক মায়াকোভস্কিকে নিরক্ষর একদল শ্রমিক প্রশ্ন করেছিল, "আপনি যে মেহনতি মানুষের পক্ষে লেখেন তার প্রমাণ কী?" জবাবে মায়াকোভস্কি ফর্সা হাত দুটোর কব্জি থেকে শার্টের বোতাম খুলে গুটিয়ে তাঁদের দেখিয়েছিলেন কড়া-পড়া প্রায় কালো হয়ে যাওয়া নিজের কনুই দুটো।
তাঁর মতোই আমাদের চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন তাঁর 'পথ থেকে পথে' বইতে বলেছেনঃ "আমি শ্রমিক, লিখে যাই। কর্তৃপক্ষ কিছু টাকার বিনিময়ে আমার শ্রম কেনেন।"
সাংবাদিকতার প্রতিটা শিক্ষার্থীকে জীবনের বড় একটা সময় ক্লাসে 'নিউজ ভ্যালু' নামক শব্দের সাথে যুদ্ধ করতে হয়। এই 'নিউজ ভ্যালুর' মধ্যে সাধারণত কুড়িগ্রামের কোনো কৃষকের 'তিনটাকা মজুরির' খবর জায়গা পায় না। কিন্তু দৈনিক সংবাদের এই প্রতিনিধি সাংবাদিকতাকে শহরের মধ্যে আটকে রাখার ধারণাটাই বদলে দিয়েছেন।
'পথ থেকে পথে' বইতে আবিষ্কার করেছি এক অন্য বাংলাদেশকে, অসাধারণ এক সংবাদ বাহককে যিনি বিচরণ করেছেন প্রান্তিকে, প্রান্তজনে।
সাংবাদিক মোনাজাতকে দেখলেই নড়েচড়ে বসতেন অধিকারিকগণ। জামালপুরে মোনাজাতকে দেখে সেখানকার জেলা প্রশাসক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ 'আপনি? জামালপুরে? কিছু একটা ঘটলো নাকি?" পরে জানা গেল, ঐ জেলার তিতিপল্লা গ্রামের ইজ্জ আলির ছেলে মারা গেছে অনাহারে।
পুরো বই জুড়ে রয়েছে তাঁর বিস্তর সব অভিজ্ঞতার কথার বর্ণনা। খবরের জন্য কোনোদিন তাঁকে হাঁটতে হয়েছিল মাইলের পর মাইল কাঁদার মধ্যে, আবার কোনোদিন অনুসন্ধানী খবরের জন্য ভুয়া রোগী সেজে ভর্তি হতে হয়েছিল হাসপাতালে। এরপর দেখা গিয়েছে, ডাক্তারের দেওয়া ঔষুধ খেয়ে কেলেঙ্কারি বাঁধাতে হয়েছে।
তিনি বলেন, "সাংবাদিকতা জীবনে ভালোমন্দ অনেক কিছু করতে হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরির স্বার্থে অনেক সময় ছোট হতে হয়েছে, হতে হয়েছে নিচু। যেমন একটা ইন্টার্ভিউর কারণে প্রফেসর গোলাম আজমকে কদমবুচি করতে হয়েছে। কী আর করা, এ ছাড়া উপায় ছিল না।"
এক কথায় অসাধারণ একটা বইয়ের সুবাধে আবিষ্কার করলাম অসাধারণ এক মানুষকে। আহ সাংবাদিকতা! আহ বাংলাদেশ! আহ মোনাজাত উদ্দিন!
উত্তরবঙ্গের মেহনতী মানুষের জীবন কেমন জানতে চান? একটু উঁকি দিয়ে দেখে আসতে চান তাদের জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনাকে? এই বইটি পড়ুন। লেখক বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য সাংবাদিক (না, বর্তমান জমানার ভূঁইফোঁড় "টেবলমেইড" সাংবাদিক নন - রীতিমতো সংগ্রাম করে সে আমলের সংবাদের মত দৈনিকের সাংবাদিক হতে হয়েছিল তাঁকে - সে ঘটনাও বইয়ে আছে)। সংবাদের সন্ধানে উত্তরবঙ্গের হাটেমাঠেঘাটে ছিল তাঁর নিত্য পদচারণা। সেই ঘটনাগুলোই তাঁর সুনিপুণ কলমে তুলে এনেছেন বইয়ের পাতায়। ঘটনার পেছনের ঘটনাগুলো এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন তিনি, আপনি মনে মনে প্রান্তিক এই মানুষ���ুলোর সাথে একাত্ম না হয়ে পারবেনই না। বাংলাদেশের দরিদ্র নিম্নবিত্ত অথচ অসাধারণ সহজ সরল মানুষগুলোকে জানার জন্য এর চেয়ে বাড়া বই আর হয় না।