"পথ থেকে পথে" সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দীনের ১৯৯০ সালে লেখা পেশাগত জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনা দিয়ে সাজানো। বেশিরভাগ লেখাই পত্রিকায় প্রকাশিত। প্রলয়ঙ্করী কোনো ঘটনা বইতে নেই। সরলভাবে লেখাগুলো "ফিচার" কিন্তু একবার পড়ে ভুলে যাওয়ার মতো নয়। কারণ লেখক হিসেবে মোনাজাত উদ্দীনের রয়েছে দুর্লভ একটি গুণ; বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে নির্মোহভাবে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ও তাদের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ। কতো বিচিত্র সব ঘটনা যে আছে বইতে! মুরগির পাইকারকে বাথরুমে যেতে দেওয়ার জন্য গাড়ি না থামানোয় হাতাহাতি, "ভিক্ষুক স্পেশাল" ট্রেন, প্রতিবাদী ভোলামীর এর জন্য গণজাগরণ, রোগীর ছদ্মবেশে কুমিল্লা মেডিকেলে যেয়ে গোপনে ছবি তোলা,করতকান্দি গ্রামে তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত নান্দনিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,এরশাদের পতনের পর ঢাকাসহ সারাদেশের মানুষের আনন্দ উল্লাসের বিস্ময়কর বিবরণ, খেতে না পেয়ে মানুষের মৃত্যু -সহ বহু বিষয়ে লিখেছেন মোনাজাত উদ্দীন। আর সবকিছু ছাপিয়ে লেখকের নিজের অক্ষমতা আর অপরাধবোধ আমাদেরও তাড়িত করে। ঝিনাইগাতীতে কার্তিকের আকালের খবর ও ছবি সংগ্রহ করে ফিরে এসে খেতে বসেন লেখক। এরপর তার অনুভূতি-
"আরও দেখি, টেবিলের উপর সাজানো বেশ কয়েক পদের তরকারি। টাকি মাছের ভর্তা, আলু দিয়ে ছোট মাছের চচ্চড়ি, রুইজাতীয় বড় মাছ, মুরগি, ডাল ইত্যাদি। আমার আবার খুব তাড়াতাড়ি লালা এসে পড়ে জিহ্বায়, এসে পড়ল, প্রায়-হালুম দিয়ে পড়লাম খাদ্যের স্তূপের ওপর। আমাদের সামনে তখন বাগেরভিটা গ্রামের অনাহারক্লিষ্ট শীর্ণ মানুষগুলো নেই। বেকার মজুর তমিজউদ্দিন, যার স্ত্রী সিন্দু বেগম কদিন আগে মারা গেছে না-খেতে পেয়ে, সেই তমিজের হা-হুতাশ নেই। বৃদ্ধ দিনমজুর ভাদু, একমাস থেকে কর্মহীন, একটানা সাতদিন অখাদ্য-কুখাদ্য খাবার পর এক মেম্বারের পায়ে ধরে মাত্র আধসের চাল 'সাহায্য' পেয়েছিল এবং সেই চালের ভাতটুকু সাত সদস্যের পরিবারের সবাই মিলে ভাগ করে খেয়েছে, সেই ভাদুর কাতরধ্বনি নেই। বৃদ্ধা কাঞ্চন বিবি, একটানা অনাহারে থাকবার পর গতকাল মাত্র ২টি কাঁচাকলা সেদ্ধ খেয়েছে, সেই কাঞ্চনের ‘একটু ভাত দ্যেও বাবা' বলে কান্না নেই ।
না, কিছু নেই, কোনো স্মৃতি নেই, কিছুক্ষণ আগের কোনো বেদনা নেই, আমি এক সাংবাদিক, নষ্ট সমাজের একজন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের গণমানুষের একজন, গোগ্রাসে গিলছি গরম ভাত। টেবিলে যেসব তরকারি সাজানো, যদিও দেখতে তা তমিজউদ্দিন, সিন্দুবিবি, ভাদু, কাঞ্চন বিবিদের রক্ত ও মাংসের মতো, তার সবকটিই আমার খুব প্রিয়।"