বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কি জানতেন, তাকে হত্যা করার জন্য একটা বিরাট চক্রান্ত চলছে? তিনি কি জানতেন, এই চক্রান্তে বিদেশীরা যেমন আছে, তেমনি আছে তার নিজ দলের লোক? নিজের দেশের লোক? এই চক্রান্তের উদ্দেশ্য কি? শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা? না, বাংলাদেশেরও সর্বনাশ করা? মুজিব হত্যার জন্য কি শুধু কয়েকজন মেজর দায়ী? নাকি এর পেছনে ছিল আন্তর্জাতিক চক্রান্ত? মোশতাকের দল কতটা দায়ী এই হত্যাকাণ্ডের জন্য? কতটা দায়ী জিয়াউর রহমানের ভূমিকা? মুক্তিযুদ্ধের আরও চার জাতীয় নেতাকে জেলের ভেতর কেন নৃশংসভাবে হত্যা করা হল? সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্র এই হত্যা চক্রান্তে কতটা জড়িত? এইসব প্রশ্নের প্রেক্ষিতে লেখকের নিজস্ব ডায়েরির তথ্য ও অভিজ্ঞতা ভিত্তি করে রচিত এই স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বইটির নাম দিয়েছেন "ইতিহাসের রক্তপলাশ: পনেরই আগস্ট পঁচাত্তর" নামই ইঙ্গিত করছে বইটির বিষয়বস্তু কি হবে। বর্ণিল সাংবাদিক জীবনে দেখেছেন অনেক, ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করেন আওয়ামী লীগের। সাংবাদিক হিসেবেও ছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য।
তাই যৌক্তিকভাবে আশা করেছিলাম বইটি বেশ ভালো হবে। অথচ মূল ট্র্যাক থেকে সটকে পড়ে জনাব চৌধুরী পঞ্চাশ, ষাটের দশকে চলে গেলেন। মোটামুটি উধাও হয়ে গেল পনেরই আগস্ট সংক্রান্ত ঘটনাবলি। তার বদলে পাকিস্তান আমলের রাজনীতির অলিগলি নিয়ে বিস্তর বাতচিৎ করলেন চৌধুরী সাহেব। জানলাম পাকিস্তান আমলে সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী আর হক সাহেবদের রাজনীতিট স্বরূপ। শেখ মুজিবের বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠার গৌরবজ্জ্বল অতীতের কথা বলতে গিয়ে বিশেষভাবে গাফ্ফার চৌধুরী মুজিবের গুরু সোহরাওয়ার্দীর আপোষমূলক চরিত্রের কিছু নমুনা পেশ করেছেন। জানা দরকার তা।
বইটির নামকরণের সাথে বিষয়ের সাদৃশ্য সামান্যই। বরং পাকিস্তানি রাজনীতি সম্পর্কিত যেকোনা নাম ঢের প্রাসঙ্গিক হত।
১৭৫ পাতার বইটি পড়তে তত সময় লাগে নি। গতি ভালো।
গাফ্ফার চৌধুরী আওয়ামী লীগকে সুরক্ষা দিতে কলম ধরেছেন,ধরছেন, ধরবেন। তাতে সমস্যা নাই। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শাসনামলের সাফাই গাইতে গিয়ে উদোরপিন্ড বুদোর ঘাড়ে চাপানোর খেলাটা খেলতে চেয়েছেন। তবে আনাড়ি যুক্তি দিয়ে পাঠক হিসেবে আমাকে ততটা মুগ্ধ করতে পারেন নি। বরং বিরক্ত লেগেছে অযৌক্তিক পক্ষপাতিত্বের লক্ষণ প্রকাশ্য হওয়াতে।
জ্যোৎস্না প্রকাশনীর এই বইতে যেন বানান ভুলের উৎসব করা হয়েছে। বাক্য ঠিক নাই, নামের বানান ওলট-পালট।যেমনঃ লিডার হয়ে গেছে লীভার!
ভয়ের কথা হল এই ভুলেভরা বইটি বাংলাদেশ সরকার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠ্যাভাস বাড়াতে পুরস্কার হিসেবে দেয়!
ট্র্যাক থেকে সরে অনেক কিছু বলে ফেললেও বেশি দোষ দিই না কিন্তু এটাকে তিনের বেশি দেয়া যায় না। আর একটা কথা, হোসেন আলীর সম্বন্ধে বলা হয়েছে, লোকটা ভেতরে ভেতরে প্রো-পাকিস্তানি। ব্যাপারটা ঠিক হজম করতে পারছি না। এই প্রথম পড়লাম এ সম্পর্কে।
বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি দৃঢ় হওয়ার আগেই জাতীয়তাবাদী বিপ্লব সমাপ্ত হয়েছে বলে তাঁর দল মনে করে। আসলে পাকিস্তানী শাসকদের বৈষম্য-নীতির বিরুদ্ধে বাঙালিদের যে আন্দোলন, তাকেই শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বলে ভুলবশত ভাবা হয়েছে। বাঙালি এলিট ক্লাস নিজের স্বার্থ ও সুবিধার জন্য পাকিস্তানী শাসকদের হাতের ধর্মীয় জাতীয়তার প্রবল শক্তিশালী হাতিয়ারকে ভোঁতা করার জন্য বাঙালি জাতীয়তার পাল্টা শ্লোগান তুলে ধরেছিল। এটা শ্লোগান থেকে কখনো আদর্শ হয়ে উঠেনি। সাধারণ জনসমাজেও তেমন বিস্তার লাভ করেনি। স্বাধীনতার পরে মুজিব যদি কেবলমাত্র ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও ক্যারিসমার উপর নির্ভর না করে জাতীয়তাবাদকে জনসমাজে প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠা ও সংহত করার কাজে তাঁর দলকে রাজনৈতিক কর্মসূচী প্রণয়নে ও বাস্তবায়নে বাধ্য করতেন, তাহলে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ পাল্টা আঘাত ও তার সাফল্য সম্ভবত এত তাড়াতাড়ি সম্ভব হতো না।
উপসংহারের এক জায়গায় এই কথাটা আছে। খুব ভালো লেগেছে এটা। আসলে ব্যাপারটা তো অনেকটাই সত্যি বিশেষত '৬৫ 'র পরের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে।
প্রসঙ্গ ভিন্ন হলেও, ... আসলে আমাদের কী শেখানো হয়? আমরা কেন পাকিস্তান থেকে আলাদা হলাম? বলা হয়, সেনাবাহিনিতে ওদের এত লোক আমাদের এত কম, ওদের কত আমলা আর আমাদের কত কম, ওদের কত দালান আমাদের .... হ্যাঁ বৈষম্য একটা ফ্যাক্টর। কিন্তু এটাকেই কেন বড় করে, একমাত্র কারণ হিসেবে দেখানো হয়, বিশেষ করে পাঠ্যবইগুলোতে? সেনাবাহিনি, আমলাগিরিতে কম লোকই যদি কারণ হয়, তবে তো যুদ্ধের দরকার ছিলনা। আমরা তো পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রীয় যন্ত্রটাকেই ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছি। ওদের সাথে মৌলিক ব্যাপারগুলোতেই তো কোন মিল নেই। এই ব্যাপারটাকে কেন পারফেক্টলি আলোকপাত করা হচ্ছে না?
০৮ ইতিহাসের রক্ত পলাশ পনেরই আগস্ট পঁচাত্তর আবদুল গাফফার চৌধুরী জ্যোৎস্না পাবলিশার্স
পাঠ প্রতিক্রিয়া
পনেরই আগস্ট উনিশশ পঁচাত্তর সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যার মাধ্যমে অস্তমিত হয়ে যায় সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে স্বাধীন হওয়া নব্য-দেশের একটি স্বপ্নের। সেই সঙ্গে লেখক মিল খুঁজে পান ২৩ শে জুন ১৭৫৭ সালের নবাব সিরাজুদ্দৌলার পলাশীর প্রান্তরের পরাজয়ের ফলশ্রুতিতে বাঙলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার ঘটনা। কাকতালীয় ভাবে দুটি ঘটনার মাঝে অনেক কিছুর মিল পাওয়া যায়। ১। সিরাজ ও মুজিবের দয়ালু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশ্বাসঘাতককে বার বার ক্ষমা করে দেওয়া। ২। চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র ৩। ষড়যন্ত্রের নীলনক্সার মিল। শেরে বাংলা থেকে শেখ মুজিব বাংলার ইতিহাসে একই বিশ্বাসঘাতকতার বিয়োগান্ত নাটকের বার বার অভিনয় হয়েছে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতা। '৫৭ অক্ষর দু'টিকে উল্টিয়ে সাজালেই পাই ৭৫ সাল। ১৯৭৫ সালে বাংলার বুকে আবার হল পলাশীর পুনরভিনয়। কীভাবে? " নতুন পলাশীর পুরানো কথা। হ্যা, পলাশীর বটে। তবে পলাশীর বদলে এবার স্থান রমনা। ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই তারিখটি আবার অভিনীত হল বাংলার ইতিহাসে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট রাত্রে। এবার সিরাজদৌল্লার বদলে শেখ মুজিব। মােহাম্মদী বেগের বদলে ফারুক-রশীদ-ডালিমের দল। মোহাম্মদ বেগ শিশুকালে সিরাজের মা আমিনা বেগমের কোলে মানুষ হয়েছিল। আর ডালিম সামরিক বাহিনী থেকে চাকরি হারানাের পর শেখ মুজিবের অনুগ্রহে লাখ লাখ টাকার ব্যবসায়ের লাইনেন্স আর পারমিট পেয়েছেন। মীরজাফরের স্থানে এবার মোশতাক ও জিয়াউর রহমান। মীর কাশেমের মতই অল্পদিনে নিজের ভুল বুঝতে পেরে আত্মদান করলেন খালেদ মােশাররফ। বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বদলে মার্কিন সি, আই, এ, ॥ ক্লাইভের বদলে বােস্টার। জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ আর উর্মি চালের দল? না তারাও আছেন ভিন্ন নামে, ভিন্ন পরিচয়ে। সিরাজ ও মুজিব হত্যার চরিত্র উদ্দেশ্যগত কোন পার্থক্য নেই। আছে ঘটনার সামান্য হের ফের । সিরাজ হত্যার চক্রান্তে জড়িত হয়েছিল একটি মাত্র বিদেশী শক্তি- বৃটিশ। মুজিব হত্যার চক্রান্তে জড়িত হয়েছে দু'টি বিদেশী শক্তি আমেরিকা এবং পাকিস্তান। সমর্থন জুগিয়েছে এশিয়ায় মার্কিন জংগি চক্রান্তের নতুন দোসর চীন।" "পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতা ছিল সামরিক। রমনার বিশ্বাসঘাতকতা রাজনৈতিক। সিরাজকে হত্যার জন্য তার পরিবার থেকেই ঘসেটি বেগম এবং সেনাপতি মীরজাফরকে হাত করা হয়েছিল । মুজিবকে হত্যার জন্য তার নিজেরই দল আ��য়ামী লীগ থেকে মােশতাকের গ্রুপ এবং সামরিক বাহিনী থেকে বিতাড়িত কর্নেল ও মেজরদের সংগ্রহ করা হয়েছে।" [পৃ. ৩৪] যার দরুন এই বইয়ের নামকরণ করা হয়েছে ইতিহাসের রক্ত পলাশ পনেরই আগস্ট পঁচাত্তর।
এই বইটি পড়লে কী কী জানতে পারবেন? ১। শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে লেখকের অনেক অন্তরঙ্গ অনেক কিছু। ২। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত? কেন জড়িত? ৩। পাকিস্তানের তৎকালীন রাজনৈতিক সংকট ৪। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতা হয়ে উঠার মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারার ক্রমগতি বিশ্লেষণ। ৫। রাজনৈতিক বিভিন্ন কূট কৌশল অবলম্বন কেন করা হয়েছে তাঁর বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কি জানতেন, তাকে হত্যা করার জন্য একটা বিরাট চক্রান্ত চলছে? তিনি কি জানতেন, এই চক্রান্তে বিদেশীরা যেমন আছে, তেমনি আছে তার নিজ দলের লোক? নিজের দেশের লোক? এই চক্রান্তের উদ্দেশ্য কি? শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা? না, বাংলাদেশেরও সর্বনাশ করা? মুজিব হত্যার জন্য কি শুধু কয়েকজন মেজর দায়ী? নাকি এর পেছনে ছিল আন্তর্জাতিক চক্রান্ত? মোশতাকের দল কতটা দায়ী এই হত্যাকাণ্ডের জন্য? কতটা দায়ী জিয়াউর রহমানের ভূমিকা? মুক্তিযুদ্ধের আরও চার জাতীয় নেতাকে জেলের ভেতর কেন নৃশংসভাবে হত্যা করা হল? সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্র এই হত্যা চক্রান্তে কতটা জড়িত? এইসব প্রশ্নের প্রেক্ষিতে লেখকের নিজস্ব ডায়েরির তথ্য ও অভিজ্ঞতা ভিত্তি করে রচিত এই স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ।
বইটি পড়ে অনেক তথ্য জানতে পারলাম। পলাশীর সাথে রমনার তুলনাবাচক বর্ণনাটা ভালোই লেগেছে যদিও কিছুটা পার্থক্য এতেও বর্তমান । আমি বইটি পড়া শুরু করার আগে যতটুকু আশা নিয়ে শুরু করেছিলাম, শেষ অবধি বইটি সেই আশার পারদটি ধরে রাখতে পারে নি। বইটিতে পনেরই আগস্টের চেয়ে পঞ্চাশ ষাট দশকের সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনাই প্রাধান্য পেয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। সর্বোপরি, কিছু তথ্য জেনে রাখার জন্য এবং অনেকগুলি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাথে ১৫ই আগস্টের যোগসূত্র সম্পর্কে ধারণা নেয়ার জন্য বইটি আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে ভালোই মনে হয়েছে।
বইটি পড়ে অনেক তথ্য জানতে পারলাম। পলাশীর সাথে রমনার তুলনাবাচক বর্ণনাটা ভালোই লেগেছে যদিও কিছুটা পার্থক্য এতেও বর্তমান । আমি বইটি পড়া শুরু করার আগে যতটুকু আশা নিয়ে শুরু করেছিলাম, শেষ অবধি বইটি সেই আশার পারদটি ধরে রাখতে পারে নি। বইটিতে পনেরই আগস্টের চেয়ে পঞ্চাশ ষাট দশকের সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনাই প্রাধান্য পেয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। সর্বোপরি, কিছু তথ্য জেনে রাখার জন্য এবং অনেকগুলি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাথে ১৫ই আগস্টের যোগসূত্র সম্পর্কে ধারণা নেয়ার জন্য বইটি আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে ভালোই মনে হয়েছে।
বইয়ে প্রাসঙ্গিক কথা কম হলেও পড়তে ঠিকঠাক লেগেছে। লেখকের বারবার অপ্রাসঙ্গিক কথায় খানিকটা বিরক্তি এবং দৃষ্টিকটু লেগেছে। তবে বইটি থেকে নতুন কিছু তথ্য জেনেছি যা আমার আগে জানা ছিল না।