বিভিন্ন বিষয়ের ওপর রচিত বুদ্ধদেবের বিশটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে এ বইতে।
সূচি: • উত্তরতিরিশ • নব বসন্ত • বড় রাস্তায় ছোট ফ্ল্যাট • খাকি • জিনিশ • ব্ল্যাক-আউট • প্রোফেসর • পড়া • কথা ও কথক • মতান্তর ও মনান্তর • মাত্রাজ্ঞান ও অতিরঞ্জন • এ যুগের কবিতা • মহুয়ার দেশে • ডাকঘর • স্পোর্টস-এর বিরুদ্ধে • মেক-অপ-এর বিপক্ষে • হরিবোল • আড্ডা • সবচেয়ে দুঃখের দু ঘণ্টা • নোয়াখালি
Buddhadeva Bose (also spelt Buddhadeb Bosu) (Bengali: বুদ্ধদেব বসু) was a major Bengali writer of the 20th century. Frequently referred to as a poet, he was a versatile writer who wrote novels, short stories, plays and essays in addition to poetry. He was an influential critic and editor of his time. He is recognized as one of the five poets who moved to introduce modernity into Bengali poetry. It has been said that since Tagore, perhaps, there has been no greater talent in Bengali literature. His wife Protiva Bose was also a writer.
Buddhadeva Bose received the Sahitya Akademi Award in 1967 for his verse play Tapaswi O Tarangini, received the Rabindra Puraskar in 1974 for Swagato Biday(poetry) and was honoured with a Padma Bhushan in 1970.
খেয়াল করেছি,কবিদের গদ্যশৈলী চমৎকার হয়। আমার প্রিয় গদ্যশিল্পীদের প্রায় সবাই কবি।কবিতার মতো স্বাদু গদ্যের স্টাইলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধের ভারবাহিতা আসেনা। বুদ্ধদেববাবু লেখেন এমন শৈলীতে যে তাঁর বিরুদ্ধমতে অবস্থান করেও ওসব যুক্তি মানতে ইচ্ছে করে।তাই কোন কোন জায়গায় মতোদ্বৈত থাকা সত্ত্বেও মুগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় থাকেনা! বইটির বিশটি প্রবন্ধ বিচিত্র বিষয়ের ওপর। অ্যাকাডেমিক জ্ঞানের বিষয় নিয়ে বক্তব্য নয় বরং দিন থেকে দিন কেটে যাওয়া জীবনের ছোট বড় খেয়াল না হওয়া কিন্তু অবধারিত কথাগুলোই উঠে এসেছে এখানে। ওগুলোর ব্যাপারে বুদ্ধদেবের নিজের দর্শন-ভাবনা বলা যেতে পারে, কিন্তু পাঠকের ওপর কিছুই চাপিয়ে দেয়া নয়। প্রথমটি বইটির শিরোনাম প্রবন্ধ, ত্রিশের পরবর্তী জীবনের জয়গান নিয়ে। ভাবনাটি সুন্দর,সবাই যেখানে আঠারো-পঁচিশের উদ্দাম তারুণ্যকে সেরা করে দেখেন সেখানে লেখক ত্রিশ থেকে চল্লিশের মাত্র স্থিরতাপ্রাপ্ত আনন্দময় প্রৌঢ়ত্বের শৈশবকে শ্রেষ্ঠতার মুকুট পরিয়েছেন। এখন পার করে চলা বয়েসটার অবশ্যম্ভাবী অস্থিরতা নিশ্চিন্তে মেনে নিলাম এই প্রবন্ধ পড়েই! আকারে খুব বড় নয়,কিন্তু চিন্তার মশলা এতো বেশি থাকে যে টানা দুটোর বেশি প্রবন্ধ শেষ করে উঠতে পারিনি।লেখা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এড়ায়নি; তবে শিক্ষিত-বুদ্ধিজীবি ,শান্তিপ্রিয় কিন্তু যুদ্ধকাতর কলকাতাবাসীর মনোভাব বুদ্ধদেবের এই বইয়ে আঁচ করা যায়। ভাল সময় কাটানোর জন্যে হলেও অবশ্যপাঠ্য এবই!
বই দাগিয়ে পড়ি না সাধারণত। তবে এই বইটার ওপর বেশ অত্যাচার করা হলো; অনেক দাগাদাগি, কাটাকুটি করলাম। বুদ্ধদেবের শব্দচয়ন, বাক্য বিন্যাস, ধীশক্তি এতটাই শক্তিশালী যে তার লেখা পড়ার পর নিজ থেকে কিছু লেখা বা লেখার চেষ্টা করতে গেলে অস্বস্তিতে পড়ে যেতে হয়!
এটা কি তবে সত্যিই যে, কবিদের গদ্যভাষা অপূর্ব সুন্দর হয়?
বুদ্ধদেবের সাথে আমার পরিচয় ঢাকার বুদ্ধদেব বসু বইটা দিয়ে। সেই বইতে বুদ্ধদেবের উদ্ধৃতিগুলো পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম, এবং এরপর যখনই ঢাকার ইতিহাস নিয়ে পড়তে গেছি, প্রায় সবখানেই বুদ্ধদেবের কোনো না কোনো লেখা উদ্ধৃতি হিসেবে পেয়েছি। প্রবল আবেগতাড়িত লেখাগুলো—প্রাণ ভরে যায় পড়তে পড়তে।
কাজেই ইচ্ছে করছিল আলাদা করে বুদ্ধদেবের একটা বই পড়তে। হাতের কাছে উত্তরতিরিশ পেয়ে সেটাই পড়া শুরু করলাম। এবং বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠাতেই বুদ্ধদেব আমাকে কিনে নিলেন।
আচ্ছা…মানে, বিশটা প্রবন্ধের মধ্যে আঠারোটা পড়েই যদি তোমার মনে হয়, লেখক দিব্যদৃষ্টিতে একেবারে তোমার ভেতরটা পর্যন্ত দেখে নিয়েছেন, এরপর মৃদু হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে কখনো শাসন, কখনো আদর করে যাচ্ছেন—তাহলে স্বীকার করতে-ই হবে, লেখকের মধ্যে কিছু একটা ছিলো।
আর বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কিছু বইয়ের কথা যে আমরা বলি—যাদের লম্বা লম্বা হাত থাকে—এ বইটা অমনই। মাঝখানে ‘পড়া’ নামের প্রবন্ধটা—কী আর বলবো—ও প্রবন্ধ পড়ে আমি গাল বরাবর চড় খেয়েছি, জিহাদকে পড়ানোর পর সে বিড়বিড় করে বলেছে, ভাই, মনে হইলো গালের মধ্যে থাবড়া মাইরা গেসে, আর রাত দুটোর সময় আরিফকে পড়তে দেয়ার পর সে রীতিমত ডাকাতি করে এ বই কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে।
প্রথমেই বলেছি, বুদ্ধদেবের ভাষা সুন্দর। এই ‘সুন্দর’-এর অর্থ কী—সেটা আমরা কিছুদিন ধরে বোঝার চেষ্টা করেছি। যেমন, বইয়ের এক জায়গায় বুদ্ধদেব লিখলেন, ‘এটাই যে দুঃখতম দুঃখ তাও নয়’!
আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবি, আমরা এটা কেমন করে লিখতাম? হয়তো লিখতাম ‘সবচেয়ে বড় দুঃখ’, হয়তো ‘বিশাল দুঃখ’—কিন্তু কখনই কি দুঃখতম দুঃখের মত সুন্দর একটা শব্দ ধরাধামে নামিয়ে আনতে পারতাম?
সেই সাথে একটা চমৎকার ব্যাপার হল, প্রবন্ধগুলো মেদহীন, ঝরঝরে। কখনই মনে হবে না লেখক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে একই কথা পেড়ে যাচ্ছেন। যা বলার, তিনি সরাসরি সেটুকুই আবৃত্তি করে ইতি টেনে দেন। হুম, বুদ্ধদেব বলেন না, আবৃত্তি করেন।
তবে এখানেই আমাদের সতর্ক হবার একটা ব্যাপার চলে আসে। কোনো প্রাজ্ঞ ব্যক্তি একবার বলেছিলেন, সত্য বক্তৃতার মতই শোনায়, মিথ্যা শোনায় কবিতার মত। উল্টোদিকে চিন্তা করলে, কবিতার মত শোনাতে চাইলে হয়তো দু-চারটে এমন কথা বলতেই হয়—সত্যের সাথে যার সম্পর্ক সুদূর।
হয়তো এ কাজটা করতে গিয়েই বুদ্ধদেব কিছু দুর্বল যুক্তি দিয়েছেন প্রবন্ধের মাঝে। বইটা শেষ করে মনে পড়লো, কিছুদিন আগে মোহাম্মদ আজম স্যারও তাঁর এক প্রবন্ধে একই কথা বলেছিলেন—ক্ষেত্রবিশেষে বুদ্ধদেবের যুক্তির দৌর্বল্যের কথা। আমরা যদি বুদ্ধদেবকে দেবতার কাতারে না বসিয়ে প্রিয় লেখকের সারিতে রাখতে পারি—তাহলে এ ব্যাপারটা সমস্যা করার কথা না।
শেষত, বইয়ের শুরুতে লেখা ভূমিকাটুকু আমার পড়া মলিনতম ভূমিকাগুলোর মধ্যে একটা। বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় ‘বুদ্ধদেবের অমুক বইটি সম্পর্কে বিস্তারিত লেখো’-জাতীয় প্রশ্ন আসলে বাচ্চারা এভাবে উত্তর দেয়। এত সুন্দর একটা বইয়ের ভূমিকা এভাবে লেখা হবে—তাও আবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে—এটা মেনে নিতে আমি রাজি নই।
এবং হুম, এই ঘোষণার পরেও পৃথিবীটা ঐ ওভাবেই ঘুরবে। কী এসে যায়, কার কী-ই বা এসে যায়!
শৈশব-কৈশোরের উচ্ছলতা কিংবা যৌবনের উদ্দামতা পেরিয়ে মধ্য তিরিশ আসার সাথে সাথে স্থৈর্য, ধৈর্য এসব গুণেরও সমাবেশ ঘটে থাকে জীবনে। এসময় চিন্তা-ভাবনা হয় আরেকটু পরিশীলিত, জীবন দেখার চোখ হয় আরো একটু পরিপক্ক। তাই এইসময়কার ভাবনাগুলো হয় বেশ সুচিন্তিত, আরো নবভাবনার উন্মেষ ঘটায়৷ লেখকের ভাষায়, 'আপাতত আমার নতুন-পাওয়া শিশু-বয়স্কতার গৌরবে শীতের ওই সকাল বেলার রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে আমি বসলুম- জীবনের স্রোত চোখের উপর দিয়ে ভেসে যাক, আমি চুপ করে দেখি।'
উত্তর তিরিশ প্রবন্ধগ্রন্থটিতে মোটমাট ২০ খানা প্রবন্ধের সংকুলান হয়েছে। বুদ্ধদেবের প্রবন্ধ বরাবরই হয় প্রাণোচ্ছল, সহজ ভাষায় লেখা কিন্তু বেশ গভীর চিন্তার উদ্রেককারী। এই বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়, বরং অনেকাংশে উৎকৃষ্ট৷ দৈনন্দিন জীবনের নানাবিধ বিষয় নিয়ে তাঁর নিজের উপলব্ধি এবং সেই উপলব্ধি থেকে উৎসারিত নতুন নতুন সব ধারণাই প্রবন্ধগুলোর বিষয়বস্তু।
উত্তর তিরিশের স্থিতধীসম্পন্ন সুলেখক এতে নানান আঙ্গিক থেকে বিশ্লেষণ করেছেন সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং সামাজিক নানা প্রচলিত ধ্যানধারণাকে। আড্ডার গুরুত্ব থেকে খেলা বা স্পোর্টস এর বাড়াবাড়ি, মেয়েদের মেক আপ নিয়ে খানিক অসন্তোষ, নরসুন্দরের হাতে ছেড়ে দেয়া সবচেয়ে ভয়ংকর দুই ঘণ্টা ইত্যাদি প্রবন্ধগুলোতে সামাজিক রীতিনীতি নিয়েই কথাবার্তা ���েশি।
আবার কথা ও কথক, মতান্তর ও মনান্তর, পড়া, প্রোফেসর ইত্যাদি প্রবন্ধে প্রাধান্য পেয়েছে সাহিত্য এবং শিক্ষা। রচনাগুলোকে প্রবন্ধ না বলে রম্যরচনা বললে হয়তো আরেকটু খোলাসা হয় এর চরিত্র। তবে পুরোপুরি রম্যও নয় এগুলো৷ রম্য এবং গুরুগম্ভীর প্রবন্ধের মাঝামাঝি কোন একটা ক্যাটাগরিতে ফেলা যেতে পারে, তবে দারুণ উপভোগ্য যে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্য নিয়ে প্রবন্ধ আমার খুব পছন্দের। এইবার ভিন্ন স্বাদের এই একগুচ্ছ রচনা তাঁকে আরেকটু বেশি করে চেনাল। তাঁর ভাবনাকে পড়তে পারলাম আরেকটু বেশি করে। সব মিলিয়ে উত্তর তিরিশ এর অভিজ্ঞতা সত্যিই অনন্য।