প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত এর 'মহাসিন্ধুর ওপার থেকে-ধর্মীয় সংগীতের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আর বিবর্তন' বইটা সংক্ষিপ্ত হলেও আসলে একই সাথে ধর্ম, প্রথা, সমাজব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়কেও গ্রহণ করেছে। আর এটা খুবই স্বাভাবিক, কারণ ধর্মের পটভূমিটা না বুঝলে সংগীত কীভাবে তার সাথে সম্পর্কিত তাতো বোঝা যাবে না। সংক্ষিপ্ত না হয়ে আরো বড় কলেবরে এই ধরনের গ্রন্থের প্রয়োজন আসলে৷ কারণ স্বল্প পরিসরে লেখক কেবল ছুঁয়ে গেছেন কিছু দিক। অনেক কিছুই বাকি রয়ে গেছে। ব্রাহ্মসংগীতসহ আরো নানা ঘরানার কথা উল্লেখ রয়েছে মাত্র। এরপরেও বইটির বিষয়বস্তু যথেষ্ট আগ্রহোদ্দীপক। অন্তত খোঁজার আগ্রহ জাগিয়ে দেয়। এই যেমন রাস্তাফারিদের সম্পর্কে একটা আবছা ধারণা ছিল। কিন্তু এর পেছনের দর্শন এবং ইতিহাস কিছুই জানতাম না। পার্সিদের সবসময়ই রহস্যময় জাতি মনে হয় আমার। অগ্নির উপাসক! তাদের নিজস্ব ধর্মীয় দর্শনের সাথে সংগীতের সম্পর্কটা ইন্টারেস্টিং। ইসলাম ধর্মে মোটা দাগে সংগীত নিষিদ্ধ হলেও সুফিবাদ যে একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ইসলামি আধ্যাত্মের, যেখানে আমীর খসরু, নিজামুদ্দিন আউলিয়া প্রমুখের নাম জড়িত, সেই দিককে বাদ দেয়া চলে কি? সুফিবাদের সাথে বাউল দর্শনের একটা সহজাত সাদৃশ্য রয়েছে। দুটোই খুব সহজভাবে ঈশ্বর ভজনা এবং মানুষের কথা বলে৷ হিন্দু ধর্মের সাথে সংগীত তো ওতোপ্রোতভাবেই জড়িত। চারবেদের একটি সামবেদ, যেখানে সাম মানেই গান। এছাড়াও রামানন্দ, তস্য শিষ্য কবির, শিখ গুরু নানক প্রমুখের উদার ধর্মীয় ভাবনা এবং সংগীত দুটোই দর্শন হিসেবে দারুণ সমৃদ্ধ। খ্রিস্টান, ইহুদি, বৌদ্ধ প্রতিটা ধর্মেই সংগীতের স্থান এবং প্রভাব রয়েছে। পাশাপাশি প্রথা এবং সংস্কৃতিও উঠে এসেছে গানের মাধ্যমে৷ রেড ইন্ডিয়ানের লোকাল মিউজিক বা আমাদের ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া ধর্মীয় সংগীত না হোক প্রকাশ করে আঞ্চলিক রীতিনীতি, মানুষের জীবনযাত্রা, সহজ সংস্কৃতি। ধর্ম-সংগীত এবং মানুষ এর এক চমৎকার মেলবন্ধন রয়েছে এই গ্রন্থে৷