হাবু ভাই আমাদের ওয়ান্ডার বয়েজ ক্লাবের তেতলা ক্লাব ঘরে প্রায়ই যেসব গল্প বলেন, বা নিন্দুকের ভাষায় যেসব গাল-গল্প করে বেড়ান সেসবই যে সত্যি সেটা হলফ করে বলতে পারছি না, তবে সেগুলো যে একেবারেই বাগাড়ম্বর তাই বা জোর দিয়ে কি করে বলি ! মাঝে-মধ্যেই কয়েক সপ্তাহ’র জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যান তিনি, আর এসেই আমাদের সবাইকে একেবারে তাক লাগিয়ে দেন তার ভ্রমণের বিচিত্র বৃত্তান্ত শুনিয়ে । দেশের ভেতরে যত অদ্ভূত লোক আর জায়গা আছে সব তার নখদর্পণে, তাই তার ঝোলায় আছে অবিশ্বাস্য আর উদ্ভট সব ঘটনা । আর শুধু গল্প বলাতেই নয়, অভাবনীয় নানা কাণ্ড ঘটাতেও তার জুড়ি নেই । সেসবেরই কয়েকটি আজ তোমাদের বলবো এ বইয়ে ।
মাশুদুল হকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। এক দশকের বেশি সময় ধরে লিখছেন থ্রিলার, সায়েন্সফিকশন ও শিশু-কিশোর সাহিত্য, প্রকাশিত হয়েছে নিয়মিত ভাবে বাংলাদেশ ও ভারত থেকে।
সাহিত্য-পুরস্কার : এইচএসবিসি-কালিওকলম তরুণ কথাসাহিত্যিক পুরস্কার ২০১৩।
Masudul Haque is a contemporary writer from Bangladesh known for his works on thrillers, Sci-Fi, and children's literature. His works have been published in Bangladesh and India regularly for the last 12 years. He was awarded the Kali O Kalam Young Writer Award in 2013.
মাশুদুল হক কী লেখেন? এ প্রশ্নের উত্তর বেশ দুরূহ। থ্রিলার থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, রম্য, রূপকথা, শিশু কিশোর উপযোগী গল্প - সব ঘরানাতেই তার অবাধ বিচরণ।আ
ওপার বাংলার টেনিদা, ঘনাদা , পিন্ডিদা চরিত্রগুলোর সাথে বাঙ্গালি পাঠকের ঘনিষ্ঠতা বহুদিনের। আমার মত আরো হাজারো পাঠকের কৈশোরের সুখস্মৃতিতে শক্তপোক্তভাবে জড়িয়ে আছে এই চরিত্রগুলো। যেখানে দুরন্তপনা, রসবোধ আর অভিযানের আনন্দ মেশানো বর্ণনা গুলো রঙিন হয়ে উঠে মুল চরিত্রের গল্প বলার ঢঙ্গে আর "গালগপ্পে"। তেমনি এক চরিত্র হাবু ভাই, ওয়ান্ডার বয়েজ ক্লাবের তেতলা ক্লাব ঘরে বসে যিনি আজব আজব সব গল্প শোনান। বিলু, মিন্টূ, জিতু দের সাথে নিয়ে জড়িয়ে পড়েন মজার মজার কান্ডে। ঝিং এর শিং মূলত শিশু-কিশোর উপযোগী বই হলেও যে তা সব বয়সী পাঠককে আনন্দ দিতে সক্ষম, এ বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। হাবু ভাই ও তার দলবলের অবিশ্বাস্য আর উদ্ভট কান্ডকাহিনী নিয়ে সাতটি অসাধারন ছোট গল্পের সংকলন। হাস্যরসাত্মক ভঙ্গির লেখনী আরো বেশি পূর্ণতা পেয়েছে আহসান হাবীবের চমৎকার অলংকরণে। হাবু ভাইকে নিয়ে আরো অনেক অনেক গল্প আসবে সামনে, বই হাতে পাবার আগে থেকেই এই আশায় বসে আছি।
একটা আক্ষেপের কথা না বলতেই নয়, শিশু কিশোরদের জন্য লেখালেখি আজকাল তেমন হচ্ছে না বললেই চলে। হাজারো ব্যস্ততার মাঝে মাশুদুল হক যে অসাধারণ উদ্যোগ নিয়েছেন তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
আশাহতই হলাম বেশ। কিশোরকাহিনি হিসেবে বইটির গল্পগুলোর উপস্থাপনা, লেখনির রসবোধ, শিবরাম চক্রবর্তী-নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়দের মতো শব্দ নিয়ে খেলা করা, সূক্ষ্ণ বিদ্রুপের সাথে আপাতঃ ইতিবাচকীয়তায় ঘটনাবলির সুস্পষ্ট নেতিবাচক বিভিন্ন দিক তুলে ধরা - সবই যথাযথ ছিলো, মজাদার ছিলো, আনন্দদায়ক ছিলো... ছিল না শুধু গল্পগুলোতে তেমন কোন আকর্ষণীয় কাহিনি, আর মূল চরিত্রগুলোর যথার্থ চারিত্রিক চিত্রায়ণ ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের উজ্জ্বলতা। যেকোন বইয়ের সৃজনশীল প্লট আর স্মরণীয় চরিত্রই সেটাকে স্ব-মহিমায় ভাস্বর করে তুলে পাঠকের মনে, তাই ঘটনার ঘনঘটায় ঘাটতি থাকলে তাতে দম না পেয়ে উল্টো দমেই যেতে হয়, যতই শব্দের শাব্দিকতায় গল্পের সবদিক সচকিত সচেষ্ট থাকুক পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখায় (আমিও লেখকের মতো লেখা নিয়ে একটু খেলার অপচেষ্টা করলাম আর কি!)।
প্রতিটা গল্পেরই মূল ঘটনা অনুমেয় ও কমবেশি চমকহীন, আর শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় চরিত্র 'হাবু ভাই'ই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের অমর 'টেনিদা'র মতো সকল ফোকাস পেয়েছে আর নাটকীয়তার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সফল হয়েছে; তবে টেনিদার গল্পে যেমন টেনিদা ছাড়াও অন্য প্রধান চরিত্রগুলি, প্যালারাম-হাবুল সেন-ক্যাবলা, প্রত্যেকেই নিজ নিজ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও নিজস্বতার মাধ্যমে পাঠকের মনে ছাপ ফেলতে সক্ষম হয়েছিল, গল্পের প্রয়োজনে সমানভাবে দৃষ্টিগোচর হয়েছে, এখানে হাবু ভাইয়ের সাঙ্গপাঙ্গ হিসেবে বাকি চার চরিত্রই চরম ভাবে ব্যর্থ। কে জিতু কে মিন্টু কে বিলু আর কে গল্পকথক (গল্পে তো তার নামই নেই!) তারা কে-কি-কেমন, একজনের সাথে অপরজনের মানুষ হিসেবে তফাতটা কোথায়, তার কিছুই আমরা জানতে পারি না বইয়ের শেষেও। নতুন প্রজন্মের একজন প্রতিভাবান নবীন লেখকের সাথে হয়তো নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো কালজয়ী কিংবদন্তীর তুলনা করাটা অন্যায় হয়ে যায়, কিন্তু লেখক নিজে টেনিদা দ্বারা বোধকরি এতটাই অনুপ্রাণিত - অন্তত পড়তে গিয়ে যা মনে হলো; গল্পে এমনকি "ডাক্তারবাবু", "দারোগাবাবু" সম্বোধনও চলে এসেছে, যদিও প্রেক্ষাপট-পটভূমি আমাদের বর্তমান সময়ের এই ঢাকা শহর - আর ঘটনা-চরিত্রবিন্যাসে কাঠামোগতভাবে মিল পাওয়া যায়, না চাইতেও একটা তুলনা চলেই আসে।
সুখের বিষয়, মাশুদুল হকের দুর্দান্ত লেখনির ক্ষুরধার আঁচড় ও বাচনভঙ্গিমার সুচিন্তিত সূক্ষ্ণ রসবোধ, ভাষার পূর্ণ অভিনব ব্যবহার সেসব কমতিকে কিছুটা হলেও ঢেকে দিয়েছে, এবং যেহেতু তিনি ভূমিকায় বলেছেন চরিত্রগুলোকে নিয়ে ভবিষ্যতে আরও লেখার ইচ্ছা আছে, তাই আশা করছি এই অনন্যসাধারণ লেখা ও ভাষার সাথে তাল মিলিয়ে আগামী গল্পের কাহিনি ও চরিত্রায়ণও সমপর্যায়ের হবে, আর হাবু ভাই অ্যাণ্ড কোং বাংলাদেশি কিশোরপাঠকদের মনে স্থান করে নিবে। আর কিছু হোক না হোক, বর্তমানে বাংলাদেশি সাহিত্যে কিশোরোপযোগী গল্প-উপন্যাসের চরম আকালের সময়ে যে মাশুদুল হক বড়দের জন্য থ্রিলার ও শিশুতোষ রূপকথার পাশাপাশি চিরউপেক্ষিত কিশোরদের মনে রেখে তাদের জন্যও লেখালেখি করছেন, সে কারণে তাকে জানাই আন্তরিক সাধুবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
বিঃদ্রঃ মেহেদী হকের করা বইটির প্রচ্ছদ খুবই দৃষ্টিনন্দন অপূর্ব সুন্দর হয়েছে, তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে সারাক্ষণ... কিন্তু আহসান হাবীবের অলংকরণ একেবারেই অনাকর্ষনীয় ও নিষ্প্রভ লেগেছে, কোন ডিটেইলিং-এর কাজ নেই কোন দৃশ্য সুচারুভাবে ফুটিয়ে তোলার বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই, দুয়েকটানে এক-দুটা ফিগার আর অবজেক্ট কোনরকমে এঁকে দিয়েই শেষ! আহসান হাবীবের অবিস্মরনীয় সব কার্টুন আর ইলাস্ট্রেশনের ভক্ত আমি সেই নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে উন্মাদ-এর স্বর্ণযুগের সময় থেকে, তাই তাঁর মত প্রতিভার কাছ থেকে এহেন যেনতেন দায়সারা অলংকরণ কোনমতেই আশা করি না।
কেউ যদি এখন পর্যন্ত টেনিদা-ঘনাদা-কাঠিমামা-শিব্রাম কিছুই পড়ে না থাকেন, তার কাছে হয়তো ভাল লাগতেও পারে। কিন্তু যারা পড়েছেন, তারা কিছুই পাবেন না। এরকম অসংখ্য গল্প লেখা হয়ে গেছে, এতটাই বেশি যে, ক্লিশের বাবা। প্রতিটা চরিত্র রিপিটিং। এই বই লিখে লেখক নিজেরই এনার্জি নষ্ট করলেন।
হাহাহাহ... ঘনাদা টেনিদা এদের পরে আসল হাবু ভাই! ওয়ান্ডার বয়েজ ক্লাবের মধ্যমনি হয়ে বলে যান একের পর এক গপ্প! রম্য গল্প বরাবরই ভালো লাগে। মাশুদুল হক ভাইয়ের লেখনি আসলেই চমৎকার, বিশেষ করে এই ধরনের লেখাগুলা।