ওয়েবজিনে, এবং আরও নানা ‘ই-লেখার’ মাধ্যমে আমরা কেয়া মুখোপাধ্যায়-এর নরম, সুরেলা, পশ্চিমের রোদ-রঙা গদ্যের সঙ্গে সুপরিচিত| তেমনই ১৪টি নরম লেখার সংকলন এই বইটি আজ পড়ে ফেললাম| কেমন লাগল সে কথা বলার আগে বইয়ের বিষয়বস্তুর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক|
একটি অতি সংক্ষিপ্ত প্রাককথনের পর মূল বইটি দুটি পর্বে বিন্যস্ত, যাতে আছে: (ক) দেখা না-দেখায় মেশা... ১. তোমার রবি আমার রবি (সেই মানুষটি, আর তাঁর গান) ২. নিবিড় সুখের মধুর দুখের অনিরুদ্ধ সঙ্গীত (জর্জদা) ৩. গানের জলসাঘরে (মান্না দে) ৪. ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা (সলিল চৌধুরী) ৫. ফিরে আসার রূপকথা (পঞ্চম) ৬. সুনীলদা – দেখা না-দেখায় মেশা (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়) ৭. জাদুকরের কলম (হুমায়ূন আহমেদ) ৮. ঋতুরঙ্গ (ঋতুপর্ণ) (খ) মনের আনাচে কানাচে... ৯. শরতে আজ কোন অতিথি (স্মৃতির পুজো) ১০. গানের ভিতর দিয়ে যখন... (স্মৃতির গান) ১১. শিউলি মাখা পুজোর লেখা (স্মৃতির শারদীয়া) ১২. দেবীপক্ষে ঘরের মেয়ের কথা (বাস্তবের ‘নারী বাদ’ স্থিতি) ১৩. সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যা (পুজোর গান) ১৪. শোনার সোনালি দিন (স্মৃতির রেডিও)
বিষয়সূচি থেকে এটা স্পষ্ট হবে যে কেয়া সেই সব মানুষ আর প্রসঙ্গ নিয়ে তাঁর স্মৃতির ঝাঁপি উজাড় করে দিয়েছেন এই বইয়ে, যেগুলো আপামর বাঙালির খুব কাছের, খুব ভালোবাসার, আর যাদের সঙ্গে অনেক অস্ফূট বেদনা, অনেক অব্যক্ত আনন্দ জড়িয়ে আছে| তাঁর নম্র এবং নির্ভার লেখা পাঠককে নস্ট্যালজিক করে তুলবেই, তবে আমার কিছু আক্ষেপ রয়ে গেল লেখাগুলো নিয়ে, যথা:
(১) লেখাগুলো সব ধরণের তিক্ততা (জীবনের মহাভোজে উচ্ছে-করলাও কিন্তু আমাদের প্রচুর খেতে হয়) পরিহার করেছে| স্মৃতির পৃথিবীকে প্রায়শই এমন একটা দূরত্ব থেকে দেখা হয় যেখানে সব কিছু মোলায়েম আর মসৃণ হয়ে যায়| এখানেও কি তাই ঘটেছে? (২) যে মানুষদের কথা এসেছে তাঁদের নিয়ে কিংবদন্তী ও মিথ প্রচুর, কিন্তু যথার্থ বিশ্লেষণ বড়ো কম| এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা যেতেই পারত এই লেখাগুলোয়: - ঠিক কেন মান্না দে-কে সম্রাট না হয়ে রাজপুত্র হয়েই থেকে যেতে হল আজীবন? ঠিক কী হয়েছিল দেবব্রত বিশ্বাস আর বিশ্বভারতীর মধ্যে? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অতিপ্রজ স্বভাবের ফলে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাঁর (এবং বাংলা) সাহিত্য? হুমায়ূন আহমেদ তাঁর শেষ দশকে নিজের জীবনে ও সাহিত্যে যা ‘করেছেন’ তা কি তাঁর জনপ্রিয়তার সিঁড়ি বেয়ে পদস্থলনের নমুনা? আর.ডি-র ঐতিহ্য বলতে ঠিক কী রয়ে গেছে আমাদের কাছে? পরিচালক হিসেবে ঋতুপর্ণর শেষ এক দশকের কাজ কি তাঁর আগের কাজগুলোকেও ধ্বংস করেছে? (৩) কেয়ার লেখায় রেডিও একটা বিশাল জায়গা জুড়ে রয়েছে, যা বাদ দিলে সত্যিই আমাদের ছোটোবেলার কথা ভাবাই যায় না| এফ.এম-এর মাধ্যমে রেডিও যখন কলকাতায় ফিরে আসতে শুরু করল, তখন শ্রোতার রুচিবদলের ফলে তাকে কিন্তু অন্য স্ট্র্যাটেজি নিতে হয়েছিল| কী ছিল সেই কৌশল, সেটা জানার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু..|
সামগ্রিকভাবে এটাই লেখার যে এই সুমুদ্রিত, স্লিম, সুলভ, অথচ বিষয় আর ভাষার ঐশ্বর্যে মনমোহক বইটি যেমন সুপাঠ্য, তেমনই অপ্রাপ্তি-উদ্রেককারী| পাঠক যদি এই বইটি পড়ে ফেলেন তাহলে লেখক হয়তো পরের বইয়ে উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তরগুলো দিতে সচেষ্ট হবেন| সেই আশা নিয়েই লেখা থামালাম| পড়ে ফেলুন!