কথায় বলে, একে রামানন্দ তায় ধুনোর গন্ধ। আত্মজীবনী, তাও আবার সিনেমা নায়কের। বিশ বছর আগে হলে কল্পনা করাও মহাপাপ ছিল। আজ পৃথিবীর রং- হাওয়া বদলে গেছে। ঢিলে হয়ে গেছে তথাকথিত সামাজিক ও নৈতিক বাঁধনের শক্ত গেরোগুলো। আজ দর্শক শুধু পর্দার ছায়ার মায়ায় ভুলতে রাজি নয়। আজ তারা পর্দার অন্তরালের মানুষগুলোর দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি ঘটনা, সুখ-দুঃখ বিরহ- মিলনের বার্তা জানবার জন্যে উদগ্রীব, আগ্রহশীল। সে আগ্রহ মেটাবার সাহস থাকলেও সামর্থ্য নেই। দেশটা ভারতবর্ষ না হয়ে পৃথিবীর আর যে কোনও সভ্য দেশ হলে এত ভাবনা-চিন্তার কারণ থাকত না। ও দেশের নায়ক-নায়িকারা তাদের ব্যক্তিগত জীবনের সব কিছুই খেলোয়াড়সুলভ মনোবৃত্তি দিয়ে বিচার করে বলেই বুক ফুলিয়ে জীবনটাকে খোলা চিঠির মতো দর্শক-সাধারণের চোখের সামনে মেলে ধরে। উৎফুল্ল দর্শক হাসাহাসি করে, মাতামাতি করে, আবার দিনকতক বাদে সব ভুলেও যায়। কিন্তু এদেশের ভবি অত সহজে ভোলে না। ধরুন, বিশ বছর আগে রোমান্টিক আবহাওয়ায় কোনও এক দুর্বল মুহূর্তে একটি সুন্দরী নায়িকাকে প্রেম নিবেদন করেছিলাম, সাড়াও হয়তো কিছু পেয়েছিলাম। বর্তমানে সিনেমা জগৎ ছেড়ে স্বামীপুত্র নিয়ে তিনি হয়তো সুখের নীড়ে নিশ্চিন্ত আরামে দিন কাটাচ্ছেন। আজ খুঁচিয়ে ঘা করার মতো একযুগ আগের বিস্মৃতপ্রায় সেই ঘটনা যদি আমার নায়ক জীবনে উল্লেখ করে বসি, পরিণামটা একবার চিন্তা করে দেখুন।
এই বইয়ের আগে পড়তে হবে 'যখন পুলিস ছিলাম'। আগের বইটি পড়ে যে প্রাথমিক উচ্ছ্বাস আসে, এই বইটিতে সেটি অনেকখানি কেটে যায়। বইয়ে লেখক যতটুকু নিজের কথা বলেছেন, মনে হয়েছে এড়িয়ে গেছেন তার থেকে বেশি। একজন নায়ক শুধু ছবির গল্প বলবেন। সেটি স্বাভাবিক। বলেছেনও। কিন্তু পড়তে পড়তে একইরকম লাগতে পারে- ছবিতে নায়ক নির্বাচিত হওয়া, পত্রিকার সমালোচনা, সিনেমার কর্মীবাহিনীর বৈচিত্র্যহীন আচরণ। পুলিশের চাকরীতে থাকার সময়ে যে অভিজ্ঞতার কথা তিনি বলেছেন, তার তুলনায় সিনেমার জীবন যেন সাদামাটা। যা সিনেমা সম্পর্কে আমার পূর্ব ধারণার সঙ্গে অনেকাংশে যায় না। বইটি পড়তে পড়তে সিরাজগঞ্জে নৌকাডুবির চিত্ররূপ দেওয়ার জন্য যাত্রা কিছুটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। আর লেখকের বিয়ের পরে একান্ত পারিবারিক ব্যাপারগুলো যেন একদন মেঘে ঢাকা। বিয়ে ছাড়া দুই একজনের প্রতি মোহের যে উচ্ছ্বাস তিনি দেখিয়েছেন, নিজের স্ত্রীর প্রতি সেটি কতটুকু ছিল তা নায়ক জীবন পাঠ করে জানা যায় না। এই দিকটি লেখক একেবারেই এড়িয়ে গেছেন। নায়ক জীবন শেষ হওয়ার পর লেখকের ভিলেন জীবন শুরু হয়। লেখক যদি 'যখন ভিলেন ছিলাম' লিখতেন, পাঠকের অভাব হতো না নিশ্চিত করে বলা যায়। অন্য কেউ লেখকের এই সময় নিয়ে লিখেছেন কিনা, জানি না। জানার আশা রাখি। যারা সাফল্যের সঙ্গে ব্যার্থতা আর হতাশার খোঁজও রাখতে চান, তাঁদেরকে পড়তেই হবে এই বই।
প্রায় ২০০পাতার বই, ১২০/১৩০পাতার পর থেকে মন উঠে গিয়েছে... বেশি প্যাচিয়ে ফেলেছেন লেখক। অতিরিক্ত ডিটেইলিং, ভাল লাগতেছিলো না। এমনেই পাতা উল্টে মাফ চাইলাম বইটার কাছে।
যখন পুলিশ ছিলাম পড়ার পর থেকেই এই বইটা পড়ার জন্য ছটফট করছিলাম এবং একটানে পড়ে ফেললাম। এই বইটিও বেশ চমৎকার এবং বাংলা সিনেমার প্রথম দিকের অবস্থা কি ছিল তা ফুটে উঠেছে। নায়করা স্টুডিওতে বাধা বেতনের কর্মচারী ছিল!! চিন্তা করলেও অবাক লাগে এবং সামাজিক যে প্রতিকূলতা ঠেলে লেখক কে এগিয়ে যেতে হয়েছে তা খুব ঝরঝরেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই বইটিতেও তিনি নিজের অবস্থা, ভুল এবং দোষগুলো অকপটে স্বীকার করেছেন। সব মিলিয়ে পড়ার মত একটা বই।
ময়লা একটা গেঞ্জি গায়ে চেয়ারে বসে খবরের কাগজে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখছি, ধীরে ধীরে স্ত্রী এসে পাশে দাঁড়ালেন। কাগজ থেকে মুখ তুলে চাইলাম। "ইজ দেয়ার এনি হ্যাপি নিউজ?' আমি- "না, যাও বা একটা ছিপ, পাঁচশ টাকা সিকিউরিটি জমা দিতে হবে।" স্ত্রী- "ডোন্ট ওয়ারি ডার্লিং। ভেরি সুন দ্য ক্লাউডস উইল পাস।" ভড়কে যাওয়ার কিছু নেই। আমি এখনো অবিবাহিতই। এ হলো নির্বাক যুগের চলচ্চিত্র "কালপরিণয়" (১৯৩০) এর একটা খন্ড দৃশ্য। ধীরাজ ভট্টাচার্য্যের কথা মনে আছে তো? সেই যে টেকনাফে নিজের প্রেমকে পরিবারের যূপকাষ্ঠে বলি দিয়ে কলকাতায় পালানো সেই সাব ইন্সপেক্টর? সেই মথিনের কূপের গল্পগাঁথা? সেই ধীরাজই এই ছবির নায়ক। একটু দাঁড়ান আরেকটা শট নেয়া হবে.....শট নিতে হবে গোপনে। আশেপাশের লোক টের পেলে ভিড়ের জন্য ভালো ছবি নেয়া মুশকিল।শটটা এমন, সারাদিন চাকরির চেষ্টায় এ অফিস সে অফিস ঘুরে ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে বাড়িতে এসে নায়ক শুনে স্ত্রী-পুত্রকে ধনী শ্বশুর একরকম জোর করে তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেছেন। রাগে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে তখন হেঁটে শ্বশুরবাড়ির পানে নায়ক। কিন্তু আমহার্স্ট স্ট্রিটে পৌঁছে রিল আর বাস্তবে লেগে গেল তালগোল। ধীরাজবাবুর জবানিতেই তা শোনা যাক। কাছ থেকেই প্রশ্ন হলো, "ঠিক দুপুরবেলায় এমনভাবে কোথায় চলছিস?" কোনদিকে না চেয়ে জবাব দিলাম, "শ্বশুরবাড়ি।" "বেশ বাবা, তিন মাস ছিলুম না, এই ফাঁকে বিয়ে করে আমাদের ফাঁকি দিলি তো? প্রশ্নকর্তা আমার সহপাঠী নির্মল বোস। "-কই জবাব দিচ্ছিস না কেন?" "-কী জবাব দেব? বড়লোক শ্বশুর জোর করে আমার স্ত্রী আর ছেলেকে নিয়ে গেছে। সেইখানে একটা হেস্তনেস্ত করতে যাচ্ছি।' বিস্ময়ে দু'চোখ কপালে তুলে হাত ধরে আমায় একরকম জোর করে দাঁড় করিয়ে নির্মল বলল, " ছেলে! তিনমাসের মধ্যে বিয়ে করে তোর ছেলে হয়েছে? গাঁজা-টাজা খাচ্ছিস নাকি?..." ভাবছেন এনজি শট? মোটেও না এটাই নির্বাক সিনেমার মজা। নির্বাক ছবিতে ডায়লগ দর্শকরা শোনানো যেতো না পরিবর্তে দেখানো হতো। আর রাস্তায় পরিচিত মানুষের সাথে দেখা হওয়া তো বেশ স্বাভাবিক ঘটনায়!! "বিল্বমঙ্গল" এর নাম শুনেছেন? অবশ্য সিনেমার পাড় ভক্ত না হলে না শোনাটাই স্বাভাবিক। ১৯১৯ এ বিল্বমঙ্গল দিয়েই বাংলা সিনেমার যারা। এই ভূখন্ডের প্রথম সিনেমা "সুকুমারী" র অবশ্য একটা অস্পষ্ট ছবি ছাড়া কিছুই আর নেই। ধীরাজ ভট্টাচার্য্য নায়ক জীবনের যাত্রা শুরু ১৯৩০ নাগাদ। নির্বাক যুগের তখন জয়জয়কার। আর সবচে নামজাদা প্রতিষ্ঠান, জামশেদজী ফ্রামজী ম্যাডানের ম্যাডান থিয়েটার। নির্বাক যুগের শেষদিকে পূর্ণ থিয়েটার, গ্রাফিক আর্টস, নিউ থিয়েটার, ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন ফিল্মস, ইন্ডিয়ান সিনেমা আর্টস আরো অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। টকিজ শব্দটা অপরচিত বোধ করি। ইদানীং অবশ্য কম শোনা যায়। এতোদিন জানতাম এর অর্থ ছায়াছবি । জানায় বেশ একটু ভুল ছিল। এর অর্থ কথা কইয়ে সিনেমা, সবাক চলচ্চিত্র। ১৯৩১ নাগাদ আমেরিকা থেকে আমদানি করা R.C.A এ মেশিনের বদৌলতে নির্বাক যুগের সমাপ্তি টেনে যাত্রা করলো সবাক যুগের সিনেমা। "যখন নায়ক ছিলাম" ধীরাজ ভট্টাচার্যের আত্মজীবনীর বাইরে এই শিল্পের বেড়ে ওঠারও গল্প। "কৃষ্ণপক্ষের কালো ঘুটঘুটে আকাশ, নদীর বুকে তারই ছায়া। চেষ্টা করেও আর কিছু দেখা যায় না, শুধু ডেকের হ্যারিকেনের ছোট একটা আলোর ফালি কিছুদূরে স্রোতের ওপর অপরাধীর মতো থরথর করে কাঁপছে। যার কালো আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ চমকায় - কালো রাজ্যে ঐটুকু আলোর ঝিলিক আরও ভয়ানক দেখায়। বাতাসের একটানা সোঁ সোঁ আওয়াজ, নদীর গর্জন তালগোল পাকিয়ে এক অব্যক্ত রুপ নিয়ে কানে ভেসে আসছে।।" নাহ এটা সিনেমার দৃশ্য না। নৌকাডুবির শুটিংয়ে গিয়ে সিরাজগঞ্জের বন্যা কবলিত এলাকার রাতকে এভাবেই এঁকেছেন ধীরাজ। বই জুড়ে এমন অসংখ্য টুকরো টুকরো স্মৃতি আর ব্যক্তিজীবনের চড়াই-উতরাইয়ের কথা। এর সাথে সিনেমা শিল্পের যুগ পরিবর্তন, অপেশাদার যুগ থেকে পেশাদার যুগে প্রবেশ, আলোছায়ার মানুষদের হিংসা, দ্বেষ, পলিটিক্স বেশ ভালোভাবে এসেছে। তখনকার সমাজ অভিনয়কে কিভাবে দেখতো, কতটা সমালোচনা করতো পত্র-পত্রিকাগুলো তার একটা দলিল বইটি। সেসময় নায়িকা নির্বাচন করা হতো এংলো ইন্ডিয়ানদের থেকেই, তাদের সমাজের এক ঝলক দমকা হাওয়া দোল দিয়েছে আত্মজীবনীটিতে। "যখন পুলিশ ছিলাম" এর ধীরাজ ভট্টাচার��যের চাইতে "যখন নায়ক ছিলাম" এর ধীরাজ অনেক পরিপক্ক। তাঁর আত্মজীবনীর দ্বিতীয় কিস্তিটা শুধু নিজেকে নিয়ে আটকে থাকে নি৷ আশপাশের মানুষের কথা বলেছে, একটা সময়ের গল্প বলেছে। অবশ্য সময় পাল্টালেও ধীরাজ বদলান নি। শেকল ভাঙ্গার গান তুলে সুরভঙ্গ করেছেন বারবার। কে জানে হয়তো নিজেদের জীবনে আমরাও কখনো না কখনো ধীরাজ ভট্টাচার্য্য এর ভূমিকা নি। আরো একটা জিনিস বদলায় নি, স্কাই পাবলিশার্সের মুদ্রণপ্রমাদ। যারা সিনেমা শিল্পকে ভালোবাসেন বইটি নিসন্দেহে তাদের আনন্দময় সময় উপহার দেবে।
যখন পুলিশ ছিলাম পড়ার পর থেকেই এই বইটি পড়বো পড়বো ভাবছিলাম। সেই নভেম্বর থেকে বই পড়ায় খরা চলছে। টুক টুক করে একটু একটু করে পড়ছিলাম। আজ ট্রেন জার্নিতে পুরোটা একটানে শেষ করে ফেললাম। সিনেমা বিষয়ক আমার জ্ঞান বরাবরই কম, তাও এজেন্সিতে এসে ক্যামেরা, ফ্রেম ইত্যাদি সম্পর্কে টুকটাক জেনেছি। এই বইয়ে বর্ণনা শুরু হয়েছে নির্বাক যুগ থেকে। নির্বাক থেকে টকি (সবাক) যুগের যেই ট্রাঞ্জিশন, লেখন ওরফে নায়ক সেই সময়টিকেই তার লেখনিতে তুলে ধরেছেন সাবলীলভাবে। বাংলা সিনেমা তো বটেই, বিশ্বের সিনেমার এই আধুকায়নের সময়টার এডাপ্টেশন যেনো অন্য এক জগত! পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম সিনেমার এই ঝলমলে দুনিয়ায় তো বরাবরই নায়ক নায়িকারাই প্রাধান্য পেয়ে থাকেন, কিন্তু একটি সিনেমার পেছনে বাকিদের যেই অক্লান্ত শ্রম, তা নজরের আড়ালেই রয়ে যায়। ধীরাজ ভট্টাচার্য অসম্ভব সাবলিলভাবে চমৎকারভাবে তাদের অবদান, সেই সময়ের সেলুলয়েডের জগৎ তুলে ধরেছেন। যুদ্ধের কারণে সেই সময় কলকাতা জুড়ে চলা প্রাইজ হাইক, বাংলাদেশে সিরাজগঞ্জের বন্যা, সমাজ ধিক্কারও ফুটে উঠেছে দারুণভাবে। আফসোস বইটা একটু বেশিই তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেছে। উনি যদি আরেকটু ডিটেইলস লিখতেন, আরো ভালো লাগতো পড়তে। শেষে আরেকটু এন্ডিং টানা প্রয়োজন ছিলো, চট করেই শেষ হয়ে গেলো বইটা, মনটাও গেলো খারাপ হয়ে!
নির্বাক মুভি সম্পর্কে কিছুই জানতাম না! রিয়েল লোকেশন এ শুটিং হত! যে যার মত ডায়লগ দিত, বিভিন্ন ভাষায়! অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়েরা নায়িকা হত! ভ্যাসলিনের ওপর পাউডার দিয়ে মেকআপ হত! লিপস্টিক এর পরিবর্তে ঠোঁটে আলতা লাগানো হত! এখন মুভির নায়ক বললেই যেমন জমকালো গাড়ি বাড়ির ছবি ভেসে ওঠে চোখের সামনে, ধীরাজ ভট্টাচার্য এর সাথে তার কিছুই মিল নেই। পড়ে বিশ্বাস হয় না, মুভির নায়ক টিনশেড বাসায় থেকে ছেঁড়া জুতো পরে হাটতে পারে! তবে ভদ্রলোক এর প্রেমের ভাগ্য খারাপ। পুলিশ অবস্থায় নাথিনের সাথে বিয়ে হল না বাবার চিঠিতে। নায়ক অবস্থায় গোপার সাথে বিয়ে হল না ব্রাক্ষ্মণ না হওয়া আর নায়ক হবার কারণে! তারপর মা জোর করে বিয়ে দিল কিন্ত বৌয়ের নামটা পর্যন্ত বইয়ে লিখল না! বউকে নিয়ে সামান্য কথা আছে বইতে, তা হল, বৌ তার মুভিতে অভিনয় পছন্দ করে না! আর 'স্ত্রী দীর্ঘদিন বাদে পিত্রালয়ে গেছেন-সে-দিক দিয়ে খুব রক্ষে, নইলে এত বড় একটা পাথর বুকে চেপে মুখে হাসির অভিনয় করা অসম্ভব হত।' ধীরাজ ভট্টাচার্য মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মারা গেছেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে, তিনিও কি তার বাবার মত সবাইকে অকুল পাথারে ভাসিয়ে চলে গিয়েছিলেন,,,
❛বাড়িতে আধপেটা ডালভাত খেয়ে স্টুডিওতে এসে রাজা দুষ্মন্ত সেজে সোনার সিংহাসনে বসার মতো বিড়ম্বনা জীবনে আর কী থাকতে পারে বলুন তো!❜
একেবারে ভুল নয় কথাটা। কর্মক্ষেত্রে একরকম বেশভূষা করে যখন বাস্তবের দৈন্যতার জীবনে প্রবেশ করা হয তখন মুখ থেকে এ বাণী আসাটাই স্বাভাবিক। তবে এই বাণী যদি বেরোয় পরপর দারুণ সব চলচ্চিত্র উপহার দেয়া কোনো হিরোর মুখ থেকে তবে ভাবুন! একবিংশ এর শুরু বা বিংশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে একজন নায়ক বলতে আপনারা সুপার হিরো, সুপার স্টার দামি গাড়ি থেকে স্যুটেড-বুটেড, চোখে সানগ্লাস, ব্র্যান্ডে মোড়ানো কাউকেই হয়তো ভেবে থাকবেন বা ভেবে থাকি। কিন্তু অতীতের যুগে এই নায়কগিরি কে খুব নিচু কাজ হিসেবেই গণ্য করা হতো। থিয়েটারের সেই যুগে নায়ক-নায়িকাদের বাঁধা মাস মাইনেতে চুক্তিবদ্ধ করা হতো। কোম্পানি তথা ঐ থিয়েটারের হয়ে সিনেমা করতে হতো। ধীরাজ ভট্টাচার্য যে কি না ছয় বছরের পুলিসি চাকরি ছেড়ে নিজের আজন্ম লালিত স্বপ্ন নায়ক হবার যাত্রা শুরু করে। ক্যারিয়ারের শুরুতে ম্যাডন থিয়েটারের হয়ে ❛কালপরিণয়❜ (সতীলক্ষী প্রথম) সিনেমা দিয়ে যাত্রা শুরু করে একের পর এক দর্শক নন্দিত চলচ্চিত্র উপহার দেন। এরকম একজন নায়কের সম্পর্কে কেমন ধারণা হবে? টাকার বিছানায় শুয়ে থাকেন, লুছনির বদলে টাকা দিয়ে ভাতের পাতিল নামান হয়তো! কিন্তু ভাগ্যদেবী যেন ধীরাজ নামক এই ব্যাক্তির উপর কিছুতেই প্রসন্ন না। দুঃখের জোয়ার আর সুখের ভাটা-ই যেন তার নিত্যসঙ্গী। টেকনাফের ক্ষত না শুকোতেই অভিনয় জীবনেও যে নাম কুড়োতে কুড়োতে ছিটকে গেলেন। পর্দা থেকে হারিয়ে না গেলেও, পর্দায় থেকে আলোচনার বদলে সমালোচনার ভাগীদার হিসেবেই রইলেন। তার সুন্দর সুশ্রী চেহারা, ঐ সুন্দর চোখ নারীদের বুকে আলোড়ন তুলতে পারলেও সমালোচকদের কাছে সে সুন্দরী নায়িকার চরিত্রে-ই যেন মানানসই। এত কষ্ট করে আধপেটা খেয়ে, বাসে-ট্রামে চেপে চলাচল করছে হিরো, কল্পনা করা যায়? না গেলেও ধীরাজের জীবনে তাই ঘটেছে। তাইতো ❛নৌকাডুবি❜ তে রিয়েল টাইম টেক শটে পানিতে ডুবে চব্বিশ ঘন্টা জ্ঞানহীন থেকেও নাম কুড়োতে পারেননি। পারেননি ❛দক্ষযজ্ঞ❜ তে শিবের ভূমিকায় ভয় ডর গিলে আস্ত অজগর জড়িয়েও। সমালোচকেরা তাকে রাবারের সর্প বলেই খ্যামা দিয়েছেন। সেকালের নির্বাক যুগের ইতি ঘটে যখন সবাক যুগের সূচনা হচ্ছে তখনও প্রায় ফুরিয়ে যেতে বসেছিলেন ধীরাজ। বাবার আজীবনের সংসারের ঘানি টানা ধীরাজের ঐ সিনেমার পাট করেও শেষ হয়নি। বাবা চলে গেলেন কিন্তু ধীরাজের জীবনের দুঃখের শেষ হলো না। বরং আস্টেপৃষ্টে ধরলো। সংসার চালানোর জন্য বাবার স্কুলের মাস্টারী, টিউশনি, রঙমহল থিয়েটারে কাজ আর ম্যাডনের ঐ ষাট টাকা মাইনে এই নিয়ে নাভিশ্বাস হয়ে উঠছিল। তবুও পর্দায় কাজ চলছিল। সংসার শুরু করেও সেখানে কেমন ছিলেন তা আর গোচরে আনেননি। রোমান্টিক নায়ক থেকে খলনায়কের চরিত্রেও কাজ করেছেন। স্বপ্ন দেখেছিলেন যেমন তেমন হয়নি। পূরণ হয়নি বিখ্যাত হওয়ার বাসনা। বন্ধু নামক কিছু শ ত্রুর দেখা পেয়েছিলেন, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেছে ঠিকভাবে। এভাবেই কিছু বন্ধু আর শ ত্রুর মেলে জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝যখন নায়ক ছিলাম❞ একটি আত্মজীবনীমূলক লেখা। জীবনীর প্রথম অংশ ❝যখন পুলিস ছিলাম❞ পাঠক নন্দিত হওয়ায় একরকম সকলের অনুরোধে জোর করেই নায়ক জীবনের নানা টানাপোড়ন, ঘটনা নিয়ে এই বইটি লিখেছেন লেখক। প্রথম বইটি যতটা ভালো লেগেছিল, এই বইটা ততটাই নিরামিষ লেগেছে। জীবনকাহিনী যেহেতু মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে চটকদার করার কোনো উপায় নেই। করা গেলেও লেখক করেননি। ধীরাজ ভট্টাচার্য নামটাই যেন একটা দুঃখের নদীতে ভেসে যাওয়া নাম। যেখানে ক্ষণিকের সুখ আসল���, যুগের দুঃখ এসে হানা দেয়। নায়ক হয়ে জীবনে অনেক কিছু করে ফেলা, পরিবারের গর্ব হয়ে ওঠার স্বপ্নটা যেন স্বপ্ন-ই রয়ে গেলো। এই ছবি সেই ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেও যে খ্যাতি জুটেনি এর করুণ উদাহরণ তিনি। লেখক পুরো বইতে সেকালের ছবির ইতিহাস দারুণভাবে বলেছেন। সিনেমার নির্বাক যুগ থেকে সবাক যুগের বর্ণনা ছিল অসাধারণ। আগে সিনেমায় শব্দ রেকর্ড হতো না। নায়ক নায়িকারা নিজেদের মতো নিজের ভাষায় (বাংলা, ইংলিশ, হিন্দি, উর্দু) ডায়লগ বলে গেলেও সেটা রেকর্ড হতো না। স্টান ম্যানের এই যুগের ভয়ানক বিপদজ্জনক দৃশ্যগুলো সেকালে অভিনেতারা নিজের��ই করতেন। যদিও তখন এক কিল ঘুষিতে ধরণী প্রপাত করার ব্যাপার ছিল না। তবুও ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হতো। সবাক যুগে ❛টকিজ❜ এর আগমন এবং সেখানে বিভিন্ন থিয়েটারের উত্থান পতনের ঘটনা গুলো খুব সুন্দর স্থাপন করেছেন। শেষের দিকের লেখকের সংসার জীবনের অভাবের কথাগুলো বেশ দুঃখ দিয়েছে। তবে এখানে খারাপ লাগার বিষয় হিসেবে লেগেছে অযাচিত কিছু বর্ণনা যার বিষয় বুঝতে সমস্যা হয়েছে। হুট করেই একটা টপিকের শুরু শেষ কীভাবে হয়েছে বুঝতে বেগ পেতে হয়েছে। লেখক ভূমিকাতেই বলেছেন এখানে তাঁর নায়ক জীবনের (বইয়ের নামটাই যেহেতু তাই) বিভিন্ন ঘটনা আর ছবির কথা এসেছে, তাই পরবর্তী ভিলেনসহ অন্যান্য কিছু চরিত্রের ব্যাপারে বলবেন না সেটাই স্বাভাবিক। তবুও মনে হয়েছিল সংসার জীবন আর ভিলেন সময়ে কিছু আনলে মন্দ হতো না। লেখকের বিয়ের পূর্বের প্রেম ভালোবাসার গল্প সবই দুঃখের। হয়তো তিনি কাপুরুষ, সাহস নেই বিধায় নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। পিছিয়ে পালিয়ে এসেছেন। একজন নায়কের গ্ল্যামারাস জীবন তিনি পার করেননি। নিদারুণ দৈন্যতা, কষ্ট, ছেড়ে যাওয়ার ঘটনাই তার জীবনের সঙ্গী। পুলিস জীবন না চাইতেও বলা যায় উত্তেজক ছিল। কিন্তু নায়ক জীবন চাইতেও আলোকিত, উত্তেজক হতে পারে নি। নায়কের জবানীতে বর্ণিত বাস্তব চরিত্রগুলোর মধ্যে লেখকের বাবাকে আমার সবথেকে দারুণ লেগেছে। কী এক মৌন মানুষ যে ছেলের এবং পরিবারের জন্য কতটা নীরবে কষ্ট করে গেছেন। ভালো লেগেছে রুস্তমজী, মনমোহন এর মতো চরিত্রগুলো। রায়বাহাদুর সাহেবের ঘটনাগুলোও সুন্দর ছিল। একজনের স্মৃতিচারণ করতে করতে তার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো যেভাবে রোমন্থনের বর্ণনা ছিল সেসব দারুণ লেগেছে।
লেখকের বর্ণনার দক্ষতা বেশ বিধায় এই পার্ট পড়ে শেষ করা গেছে অনেক বিষয় একঘেয়ে, বিরক্তি লাগলেও। সিরাজগঞ্জের বন্যার কথা আর সেটার শুটিংয়ের অভিজ্ঞতার অংশ দারুণ ছিল। বাকি সব মিলে একটা বইয়ের প্রথম পার্ট পড়ছি, পরেরটায় আগ্রহ নিয়ে পড়েছি এবং হতাশ হয়েছি ধরনের অনুভূতি হয়েছে।
প্রোডাকশন:
উপকথাকে আগেই বলেছি, ❛দামে কম মানে সেই❜। এই বইটিও তাদের সুন্দর প্রোডাকশনের আরেকটি নমুনা হতে পারতো। কিন্তু বইয়ের শুরুতে হালকা ছাপা, একটু ছোটো ফন্ট (আমার তাই লাগলো) বইটির ভেতরের সৌন্দর্যকে কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। বইটির প্রচ্ছদ আমার ভালো লেগেছে। কিন্তু ন, ক, ম এর আগে পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের সমান যে ফাঁকা অংশ ছিল সেটা আমার জীবনের না পাওয়া জিনিসগুলোর মতো লেগেছে। একটা নায়কের ছায়া বসায় দিলেও ভালো লাগতো।
❛আশা মাত্র মরীচিকা। এই মরীচিকার জীবনে ধীরজের মতোন অকুলের পাথারকেই সবেধন নীলমণি ভেবে আমরা কতজন জীবন পার করে দিচ্ছি হিসেব নেই।❜
যখন পুলিস ছিলাম বইটা পড়ার পর পরই এটা পড়তে ইচ্ছে হল। সহজ সরল ভচনভঙ্গির মাধ্যমে লেখক তাঁর নায়ক জীবনের নানা ঘটনা এখানে উল্লেখ করেছেন। ভাবু সে সময় একটা সিনেমা তুলতে কত কষ্ট করতে হত। অাজ থেকে প্রায় নব্বই বছর অাগে যে এভাবে ক্যামেরায় বাংলা ছবি তোলা হত, তাই ত অবাক করার মত।
ধীরাজ ভট্টাচার্য্যের যখন পুলিশ ছিলাম পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। ঘটনা বৈচিত্র্য তো ছিলই তাছাড়া তিনি লিখেছিলেনও সততার সাথে, দোষগুলো লুকানোর চেষ্টা করেন নি। একই ধারায় তিনি লিখেছেন এই লেখাও, নিজের দূর্বলতাগুলোকে গোপন করেন নি। তবে এই বইয়ে বিষয় বৈচিত্র্য কম, তার নায়ক জীবনের কথাই বলেছেন তিনি, সময়ের ব্যাপ্তি যদিও গত শতকের ত্রিশের দশক আর চল্লিশের দশকের অর্ধেক, তবু স্থান বিবেচনায় বৈচিত্র্য তেমন নেই। ব্যক্তিগত জীবনে উত্থান পতন থাকলেও শুধু ব্যক্তিগত, পারিবারিক আর নায়ক জীবনের কথাই শুধু বলায় ঘটনাবহুল সে সময়ের রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক বিষয়াদি বিশেষ আসে নি, অবশ্য সেটা এই লেখার উদ্দেশ্য ও ছিল না। সিনেমার জগতটা বাইরে থেকে যতোই রঙিন লাগুক, পর্দার বা তার পেছনের মানুষগুলো আমাদের মতোই সাধারণ মানুষ, তাদের সুখ দুঃখগুলোও আমাদের মতোই সাধারণ। যে আমলে ধীরাজ ভট্টাচার্য্য সিনেমা জগতে ঢুকেছিলেন তখন ও উপমহাদেশে নির্বাক ছবিই তৈরি হচ্ছে, সবাক সিনেমা বা টকি তখনও আসে নি। সিনেমা তৈরি করা খুব ব্যয়সাধ্য না হলেও হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানই ছিল তখন এর সাথে যুক্ত। তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ম্যাডান কোম্পানির মাধ্যমে ধীরাজ ভট্টাচার্য্যের সিনেমা জীবনে পদার্পণ। ম্যাডান কোম্পানীর মালিকরা ছিলেন জাতে পার্সী, তাদের বহুবিধ ব্যবসার ক্ষুদ্র একটি অংশ শুধু ছিল এই ফিল্ম কোম্পানী। সেকালের নায়কেরা অভিনয়ের জন্য বিশেষ টাকা পয়সা পেতেন না, ফিল্ম প্রতি চুক্তির ব্যবস্থা যেমন ছিল, ছিল মাসিক বেতনের প্রথাও।। তখন কলকাতাতেই বাংলার পাশাপাশি হিন্দি,উর্দ্দুভাষী দর্শকের জন্যও ফিল্ম বানানো হতো। যেহেতু নির্বাক ছবি, ভাষার সমস্যা নেই, টাইটেল বদলে দিলেই হতো। ফিল্ম ইন্ড্রাষ্ট্রিতে বাঙালি নায়ক, পরিচালক, অভিনেতারা ছিলেন বটে, তবে সেকালের বেশিরভাগ অভিনেত্রী ছিলেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। সিনেমায় নামা অভিনেতা অভিনেত্রীদের সমাজের চোখে সম্মান একেবারেই ছিল না, নায়ক ধীরাজ ভট্টাচার্য্য ও তার সম্মুখীন হয়েছেন বারেবারে। তবে সুদর্শন নায়কেরা তখনও তরুণীদের আগ্রহের বস্তু ছিলেন, সেই সুখস্মৃতিও তার কম ছিল না। নির্বাক থেকে সবাক চলচ্চিত্রে পদার্পন ঘটলো উপমহাদেশের সিনেমার ধীরাজ ভট্টাচার্য্য নায়ক হবার সামান্য পরেই।সেই সাথে সাথে উর্দ্দু, হিন্দি ছবির কদর বেড়ে গেল, বেড়ে গেল উর্দ্দু, হিন্দী ভাষা জানা আর গান গাইতে পারা অভিনেতা, অভিনেত্রীদের চাহিদাও। ধীরাজ এর কোনটাই পারতেন না, তার উপর সবাক ছবির ভয়েস টেস্ট এ ফেল করায় তার ক্যারিয়ার প্রায় হুমকীর সম্মুখীন হলো।তবু কোনমতে টিকে গেলেন তিনি, রোমান্টিক সিনেমার নায়ক হিসেবে, আর তার কোনরকম সঙ্গীত প্রতিভা দিয়ে। ততোদিনে নতুন নতুন ফিল্ম কোম্পানী গজিয়ে উঠেছে কলকাতায়, সুযোগও বেড়েছে বেশ। এর মধ্যে তার পারিবারিক জীবনে ঘটে গেছে নানা উথ্থান পতন। তবে রোমান্টিক সিনেমায় অভিনয় করে খ্যাতি পেলেও প্রশংসা জোটে নি। লালটু টাইপ (এখন বোধহয় যাকে চকোলেট বয় বলে) চেহারার জন্য সিনেমায় অফার পেয়ে যেতেন, রোমান্টিক সিনেমায় অভিনয়ও করেছেন প্রচুর, সিনেমা হিটও হতো, গালি খেতেন শুধু তিনি। নিজেই নিজের চেহারার কথা বলতে গিয়ে বলেছেন একটা সিনেমার পোস্টারে নায়িকার সাথে তার ক্লোজআপ ছবি দেখে মনে হয়েছিল দুই জমজ বোন। তার মেয়েলি ধরণের চেহারার সমালোচনা করে এক সিনেমা দর্শক পত্রিকায় চিঠি লিখে তাকে উপদেশ দিয়েছিলেন সিনেমা ছেড়ে যাত্রায় নেমে উদাসিনী রাজকুমারী চরিত্রে অভিনয় করতে। এত এত সমালোচনায় বিরক্ত ধীরাজ চেয়েছিলেন রোমান্টিক সিনেমা ছাড়তে, ভিলেন কিংবা নিদেন পক্ষে পুরুষালি কোন চরিত্রে অভিনয় করতে, কিন্তু সে সুযোগটা তিনি পাচ্ছিলেন না। সে আশা তার পূর্ণ হয়েছিল পরবর্তী জীবনে, তবে এই বইয়ের শুধু তার নায়ক জীবনের কথা বলেই লেখার ইতি টানা হয়েছে। সেকালের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারের এক ঝলক, বা ত্রিশের দশকে সিরাজগঞ্জে যমুনার আশেপাশে হয়ে যাওয়া ভয়াবহ বন্যার প্রতক্ষ্যদর্শীর বিবরণও আছে এই বইয়ে, আছে তার প্রেমে ব্য��্থতারও গল্প। বাস্তবের নায়ক না হোন সিনেমার প্রথম যুগের এই নায়কের এই স্মৃতিচারণা না জানা এক জগতের পর্দা যেন খুলে দেয় পাঠকের কাছে। ভালো, মন্দ যাই লাগুক, অজানাকে জানার একটা সুযোগ তো পাওয়া গেল, সেজন্য তাকে ধন্যবাদ।
🕸️ ❝আমার জীবন নদীতে জোয়ার নেই,শুধু ভাঁটা। অনাদি-অনন্তকাল ধরে একঘেয়ে মিনমিনে জলস্রোত বয়ে চলবে লক্ষ্যহীন,উদ্দেশ্যহীন পথভোলা পথিকের মতো। বাঁকের মুখে ক্ষণিক থমকে দাঁড়াবে,আবার চলতে শুরু করবে গতানুগতিক রাস্তা ধরে। এ নদী শুকিয়ে চড়া পড়ে গেলেও জোয়ার কোনোদিন আসবে না, এই বোধহয় নিয়তির বিধান।❞
🕸️ পুলিশে থাকাকালীন সময়ের বর্ণনা নিয়ে রচিত "যখন পুলিশ ছিলাম" বইটির সাফল্যের পর পাঠকের অনুরোধে ধীরাজ ভট্টাচার্য এর পরবর্তী রচনা হলো "যখন নায়ক ছিলাম"। লেখক এখানে তার নায়ক জীবনের ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরেছেন। বাংলা সিনেমা কীভাবে নির্বাক চলচ্চিত্র থেকে সবাক চলচ্চিত্র হয়ে উঠলো তার একটি ধারণা বইটিতে পাওয়া যায়। এছাড়া লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের কিছু কিছু ঘটনা এবং তা লেখককে কীরুপে প্রভাবিত করেছে তা ও লেখক বইটিতে আলোচনা করেছেন।
🕸️বইটি নিয়ে কিছু কথাঃ
অনুরোধে ঢেকি গেলা বলতে একটি কথা আছে। এই বইটি পড়ে মনে হয়েছে " যখন পুলিশ ছিলাম" এর সাফল্যের পর লেখক অনুরোধে ঢেকি গিলতেই বাধ্য হয়েছেন। একটি আত্মজৈবনিক বই পড়ে আপনার তখন ই ভালো লাগবে যখন যাকে উপলক্ষ করে বইটি লেখা হচ্ছে তার জীবনী আগ্রহ জাগানিয়া হয়। যখন নায়ক ছিলাম বইয়ে এরুপ আগ্রহ জাগানিয়া বিষয়-বস্তুর অভাব বেশ প্রচন্ড। ২২৮ পৃষ্ঠার এই বইটি পড়তে গিয়ে বেশ কয়েকবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। লেখক কিছু কিছু ঘটনার ঝাপসা বর্ণনা দিয়ে গিয়েছেন যা পড়ে মনে হয়েছে লেখক এ ব্যাপারে জেনেও অনেক কিছুই বলছেন না। এর কারণ ও অবশ্য তিনি বইয়ের ভুমিকা তে উল্লেখ করে দিয়েছেন। আবার কিছু কিছু ঘটনার এত বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন যা পড়ার সময় বেশ বিরক্তির উদ্রেক করে। নায়ক জীবনের পাশাপাশি লেখক যদি তার পরবর্তীতে ভিলেন হবার সময়কার ঘটনাবলীকে তুলে ধরতেন তা বইটিকে আরো আগ্রহ জাগানিয়া করতো বলে আমার বিশ্বাস।
বইয়ে তুলে ধরা নির্বাক চলচ্চিত্র থেকে সবাক চলচ্চিত্রের জার্নিটা পড়ে মনে হচ্ছিল টাইম ট্রাভেল করে চলে গিয়েছি ওই সময়টায়।লেখকের বন্ধু মনমোহন চরিত্রটি বেশ হাস্যরসের যোগান দেয়। বিবাহ পূর্ব সময়ে ললিতা দেবী,গোপা প্রমুখ এর প্রতি লেখকের আকর্ষণ বইটি পড়ার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।
🕸️প্রোডাকশনঃ বইটির প্রডাকশন কোয়ালিটি আরো উন্নত মানের হতে পারতো বলে আমার মনে হয়। প্রথম দিকের বেশ কিছু পেজের কালি বেশ ঝাপসা। এছাড়া বইয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বানান ভূল রয়েছে। যেহেতু এটিই বইয়ের প্রথম এডিশন তাই আশা করা যায় পরবর্তী এডিশনে এসব সংশোধন করে নেয়া হবে।
স্রেফ আত্মকাহিনি নয়, এ-বই আসলে ইতিহাস। আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে, নির্বাক ও সবাক যুগের সন্ধিক্ষণে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অবস্থা কী ছিল, তা-ই তুলে ধরেছেন ধীরাজ ভট্টচার্য্য তাঁর নিখুঁত কলমে। ভাবতে অবাক লাগে, সেসময় সিনেমার অভিনয়টা ছিল একটা চাকরি, প্রতি মাসে বেতন দেয়া হতো নায়কদের, তাও আবার এতটাই কম যে, পিতার মৃত্যুর পর দু-তিনটি হিট ছবির নায়ক ধীরাজকে পাকা বাড়ি ছেড়ে উঠতে হয়েছিল ছাপরাতুল্য একটা ঘরে; স্টুডিওতে আসা-যাওয়া করতে হতো সাধারণ সব মানুষের মত ট্রাম-বাসে চড়ে; অভিনয়ের পাশাপাশি খরচ জোগানোর জন্য টিউশনি করেছেন তিনি, স্কুলে পার্ট-টাইম মাস্টারি করেছেন... ভাবাই যায় না! এসব অবস্থা বদলে গিয়ে কবে থেকে নায়ক-নায়িকারা আজকের মত ধনবান হতে শুরু করলেন, জানার ইচ্ছে হচ্ছে খুব।
"যখন পুলিশ ছিলাম" খুব উপভোগ্য বই ছিল। সেই তুলনায় এই বইটা মোটেও ভাল লাগেনি। শুরুটা অত্যন্ত সুন্দর হলেও বইয়ের মাঝপথে খুব বিরক্ত হয়েছি। অতিরিক্ত ডিটেইলিং তো ছিলই তার সাথে অনেক কিছু কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে তা বইটি পড়লেই বোঝা যায়। কাহিনী খুব ধীরগতিতে এগিয়েছে। তাও বইটি পড়লে আগেকার নির্বাক ছবির ব্যাপারে অনেক কিছু জানা যাবে। অবশেষে,এটাই বলব "যখন পুলিশ ছিলাম" এর মত বইটি আমার মনকে ছুতে পারেনি। রেটিংঃ২.৫