ধীরাজ ভট্টাচার্য্যের যখন পুলিশ ছিলাম পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। ঘটনা বৈচিত্র্য তো ছিলই তাছাড়া তিনি লিখেছিলেনও সততার সাথে, দোষগুলো লুকানোর চেষ্টা করেন নি। একই ধারায় তিনি লিখেছেন এই লেখাও, নিজের দূর্বলতাগুলোকে গোপন করেন নি। তবে এই বইয়ে বিষয় বৈচিত্র্য কম, তার নায়ক জীবনের কথাই বলেছেন তিনি, সময়ের ব্যাপ্তি যদিও গত শতকের ত্রিশের দশক আর চল্লিশের দশকের অর্ধেক, তবু স্থান বিবেচনায় বৈচিত্র্য তেমন নেই। ব্যক্তিগত জীবনে উত্থান পতন থাকলেও শুধু ব্যক্তিগত, পারিবারিক আর নায়ক জীবনের কথাই শুধু বলায় ঘটনাবহুল সে সময়ের রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক বিষয়াদি বিশেষ আসে নি, অবশ্য সেটা এই লেখার উদ্দেশ্য ও ছিল না।
সিনেমার জগতটা বাইরে থেকে যতোই রঙিন লাগুক, পর্দার বা তার পেছনের মানুষগুলো আমাদের মতোই সাধারণ মানুষ, তাদের সুখ দুঃখগুলোও আমাদের মতোই সাধারণ। যে আমলে ধীরাজ ভট্টাচার্য্য সিনেমা জগতে ঢুকেছিলেন তখন ও উপমহাদেশে নির্বাক ছবিই তৈরি হচ্ছে, সবাক সিনেমা বা টকি তখনও আসে নি। সিনেমা তৈরি করা খুব ব্যয়সাধ্য না হলেও হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানই ছিল তখন এর সাথে যুক্ত। তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ম্যাডান কোম্পানির মাধ্যমে ধীরাজ ভট্টাচার্য্যের সিনেমা জীবনে পদার্পণ। ম্যাডান কোম্পানীর মালিকরা ছিলেন জাতে পার্সী, তাদের বহুবিধ ব্যবসার ক্ষুদ্র একটি অংশ শুধু ছিল এই ফিল্ম কোম্পানী। সেকালের নায়কেরা অভিনয়ের জন্য বিশেষ টাকা পয়সা পেতেন না, ফিল্ম প্রতি চুক্তির ব্যবস্থা যেমন ছিল, ছিল মাসিক বেতনের প্রথাও।। তখন কলকাতাতেই বাংলার পাশাপাশি হিন্দি,উর্দ্দুভাষী দর্শকের জন্যও ফিল্ম বানানো হতো। যেহেতু নির্বাক ছবি, ভাষার সমস্যা নেই, টাইটেল বদলে দিলেই হতো। ফিল্ম ইন্ড্রাষ্ট্রিতে বাঙালি নায়ক, পরিচালক, অভিনেতারা ছিলেন বটে, তবে সেকালের বেশিরভাগ অভিনেত্রী ছিলেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। সিনেমায় নামা অভিনেতা অভিনেত্রীদের সমাজের চোখে সম্মান একেবারেই ছিল না, নায়ক ধীরাজ ভট্টাচার্য্য ও তার সম্মুখীন হয়েছেন বারেবারে। তবে সুদর্শন নায়কেরা তখনও তরুণীদের আগ্রহের বস্তু ছিলেন, সেই সুখস্মৃতিও তার কম ছিল না।
নির্বাক থেকে সবাক চলচ্চিত্রে পদার্পন ঘটলো উপমহাদেশের সিনেমার ধীরাজ ভট্টাচার্য্য নায়ক হবার সামান্য পরেই।সেই সাথে সাথে উর্দ্দু, হিন্দি ছবির কদর বেড়ে গেল, বেড়ে গেল উর্দ্দু, হিন্দী ভাষা জানা আর গান গাইতে পারা অভিনেতা, অভিনেত্রীদের চাহিদাও। ধীরাজ এর কোনটাই পারতেন না, তার উপর সবাক ছবির ভয়েস টেস্ট এ ফেল করায় তার ক্যারিয়ার প্রায় হুমকীর সম্মুখীন হলো।তবু কোনমতে টিকে গেলেন তিনি, রোমান্টিক সিনেমার নায়ক হিসেবে, আর তার কোনরকম সঙ্গীত প্রতিভা দিয়ে। ততোদিনে নতুন নতুন ফিল্ম কোম্পানী গজিয়ে উঠেছে কলকাতায়, সুযোগও বেড়েছে বেশ। এর মধ্যে তার পারিবারিক জীবনে ঘটে গেছে নানা উথ্থান পতন। তবে রোমান্টিক সিনেমায় অভিনয় করে খ্যাতি পেলেও প্রশংসা জোটে নি। লালটু টাইপ (এখন বোধহয় যাকে চকোলেট বয় বলে) চেহারার জন্য সিনেমায় অফার পেয়ে যেতেন, রোমান্টিক সিনেমায় অভিনয়ও করেছেন প্রচুর, সিনেমা হিটও হতো, গালি খেতেন শুধু তিনি। নিজেই নিজের চেহারার কথা বলতে গিয়ে বলেছেন একটা সিনেমার পোস্টারে নায়িকার সাথে তার ক্লোজআপ ছবি দেখে মনে হয়েছিল দুই জমজ বোন। তার মেয়েলি ধরণের চেহারার সমালোচনা করে এক সিনেমা দর্শক পত্রিকায় চিঠি লিখে তাকে উপদেশ দিয়েছিলেন সিনেমা ছেড়ে যাত্রায় নেমে উদাসিনী রাজকুমারী চরিত্রে অভিনয় করতে।
এত এত সমালোচনায় বিরক্ত ধীরাজ চেয়েছিলেন রোমান্টিক সিনেমা ছাড়তে, ভিলেন কিংবা নিদেন পক্ষে পুরুষালি কোন চরিত্রে অভিনয় করতে, কিন্তু সে সুযোগটা তিনি পাচ্ছিলেন না। সে আশা তার পূর্ণ হয়েছিল পরবর্তী জীবনে, তবে এই বইয়ের শুধু তার নায়ক জীবনের কথা বলেই লেখার ইতি টানা হয়েছে। সেকালের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারের এক ঝলক, বা ত্রিশের দশকে সিরাজগঞ্জে যমুনার আশেপাশে হয়ে যাওয়া ভয়াবহ বন্যার প্রতক্ষ্যদর্শীর বিবরণও আছে এই বইয়ে, আছে তার প্রেমে ব্যর্থতারও গল্প। বাস্তবের নায়ক না হোন সিনেমার প্রথম যুগের এই নায়কের এই স্মৃতিচারণা না জানা এক জগতের পর্দা যেন খুলে দেয় পাঠকের কাছে। ভালো, মন্দ যাই লাগুক, অজানাকে জানার একটা সুযোগ তো পাওয়া গেল, সেজন্য তাকে ধন্যবাদ।