ইফতেখার মাহমুদের “শিকড়ে শাখায় মেঘে” থেকে দেখা জীবনের গল্প
আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত কত-শত বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনাই না ঘটে। গড়ে উঠতে দেখি যেমন অনেক সম্পর্ককে, তেমনি ভাঙার গানও তো শুনতে হয় প্রচুর। অন্যের দোষ ধরে, নিজেদের প্রিয়জনের পক্ষ নিয়ে, নিজেরাই তখন নিজেদের মনকে প্রবোধ দিই। মূল কারণ কিন্তু থেকে যায় অগোচরেই। জানা যায় না কেন ঐ দু’জন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখল না আর।
দুই দেহে একই আত্মা হয়ে থাকার প্রতিজ্ঞা করার পরেও কেন আলাদা হয়ে যায় দুজন? কেন দুজন মানুষ একসাথে আর থাকে না, থাকতে চায় না বা থাকতে পারে না? এই না থাকার পিছনে অযুত নিযুত কারণ আমি আপনি উদ্ঘাটন করলেও সেই দুজন কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারে, “যে জানে না ধুলোয় আর মেঘেয় কি তফাৎ, কিবা আসে যায় তার প্রিয়তায়”। আর তাই হয়তো এই সরে যাওয়া।
“শিকড়ে শাখায় মেঘে” উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের নাম রাশেদ হাসনাইন, পরশপাথরের মতন এক ব্যক্তিত্ব, যেখানেই হাত দিয়েছেন তিনি সেখানেই ফলিয়েছেন রাশি রাশি সোনা। গায়ক, গান গেয়ে জয় করেছেন অজস্র মানুষের হৃদয়, শিক্ষকতাতেও একইরকমের জনপ্রিয় ছাত্রদের মাঝে। অথচ ভেতরে ভেতরে কী তুমুল নিঃসঙ্গতা, কী অসীম একাকীত্ব বুকে করে বেড়িয়েছেন তিনি। কেউ জানে নি কখনো। “সকলের কি দায় সুরের দহন বহনের?” স্ত্রী গুলশান আরার সাথে বিচ্ছেদ অতঃপর উঠতি এক গায়িকাকে বিয়ে। চলে সমালোচনার ঝড়। অথচ ওরা কি জানে না যে ভালোবাসা বদলে যায়? “একটা মানুষের পরের প্রেম আগেরটার মত সত্য নয়? শৈশবের মার্বেলের মত, কৈশোরের ভিডিও গেমের মত, কলেজের কবিতার মত... জীবনের স্তরে স্তরে বন্ধু বদলে যাবার মত... প্রেমও কি বদলায় না? তবু নানাজন এই ঘটনাকে দেখতে থাকে নানাভাবে। সময় বয়ে যায়, জীবন এগিয়ে চলে।
কোন ঘটনার ঘনঘটা নয়, এই একটি মাত্র ঘটনা নিয়েই কতকগুলো আলাদা আলাদা মানুষের চিন্তার ছেঁড়া ছেঁড়া সুর, গত হয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি নিয়ে এলোমেলো নাড়াচাড়া আর অন্তর্গত বিহ্বলতায় অবশ হয়ে থাকা কিছু স্থির উপলব্ধির সমন্বয় এই বই। যা আমাদের চেনা সম্পর্কগুলো নিয়ে আরেকবার ভাবায়, ফিরে দেখায়। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে মনে হয়, জীবনকে ভালোবাসার দিক থেকেও দেখা যায়। কিন্তু বড় অদ্ভুত এক বেদনায় মেশানো আমাদের এই মানবজীবন। যখন শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা নামে তখন ফেলে আসা কোন এক স্মৃতির বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে কোনোকিছুই না দেখে আমরা ভাবতে থাকি আমাদের না-করা, না-জানা ভুলের কথা, ভেবে ভেবে ব্যথা পাই, আরও আরও ব্যথা পাই। অথচ প্রিয়জনদের কাছে যাওয়া হয় না। রাশেদ হাসনাইনের মতন তখন আমরাও ভাবি- “ভালোবাসা হল গতিময়তা, অনন্তের দিকে অনন্ত যাত্রা। একটু ভালোবাসা কম থাকাই ভালো। একসাথে থাকা যায়। অপেক্ষা করা যায়। একসাথে থাকতে হলে অপেক্ষা করতে হয়।”
লেখক ইফতেখার মাহমুদ আমাদের পরিচিত বাক্যরীতিতে লিখলেও এক অপরিচিতের সুর পাওয়া যায় তার লেখনীতে। অনেকটা ঠিক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালের মতন। চারপাশে প্রিয়জনেরা থাকলেও যেমন দেখা যায় না অপরের মুখ, খুবই কাছ থেকে দেখতে হয়, গভীর মনোনিবেশ করতে হয়, দিতে হয় প্রয়োজনীয় শ্রম তখনই কেবল দেখা মেলা পরিচিতের প্রিয় মুখ। ঠিক তেমনই ইফতেখার মাহমুদ বাক্যের ভেতরে বাক্য লেখেন, যার প্রতিটি শব্দে থাকে আলাদা অর্থ, আলাদা সুর। গভীরভাবে পড়লে সেই সুরের ঝংকার ধরা পড়ে। কয়েকটা বাক্য পড়ি-
“হাত ধরে রাখতে গেলে নিজের হাতটাও আটকা পরে থাকে। জীবনকে যেতে দিতে হয়। প্রেমে অপ্রেমে মানুষ বারবার ক্ষমার বাড়ি যায়। কড়া নাড়ে। দরোজা খুলে প্রসাদ দিয়ে যায় জীবন। ভালোবাসা মানে চিরদিনের জন্যে ক্ষমা করা।”
যদিও এটি লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই তবুও পড়ার পর বোধ হয় এটা লেখকের প্রথম লেখা নয়। বোঝা যায় এই লেখার পেছনে রয়েছে লেখকের অজস্র রাত্রির নির্ঘুম শ্রম, দীর্ঘ দিবসের লেখালেখি চর্চার ক্লান্তি। অনেক লেখকই জানেন না কোথায় থামতে হয়, অথচ লেখক ইফতেখার মাহমুদ জানেন কোথায় দিতে হয় দীর্ঘ অনুচ্ছেদ, আর কোথায় দিতে হয় শেষ তুলির আঁচড়। সংযমই যে একটি লেখার বড় গুণ সেটা জানা যায় তার এই লেখা পড়ার মাধ্যমে।
তবে পড়ার সময় বারবার মনে হচ্ছিল লেখক বড় বেশি আশাবাদী মনোভাবের। হতাশাবাদীদের লেখা যেমন আমি সহ্য করতে পারি না তেমনি খুব বেশি আশাবাদীদের লেখাও আমার জন্যে বেশ অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যেমনটা শীর্ষেন্দুর বই পড়ার ক্ষেত্রে হয় আর কি। তখন ভাবতে থাকি, পৃথিবী কি ভালো মানুষে ভরে গেল? পুরো উপন্যাস জুড়ে একটি চরিত্রকেও পাওয়া যায় নি যে এই ঘটনাটির বিপক্ষে কথা বলছেন। সব চরিত্রই কেমন যেন এই ঘটনাটির পক্ষে যুক্তি খুঁজছে। হয়তো এই খুঁজতে থাকাটাই উপন্যাসের মূল সুর।
আমার কাছে মনে হয়েছে উপন্যাসটি মৃদু লয়ে গেয়ে যাওয়া কোন গানের মতন, হৃদয়ের গভীরে বেদনা জাগায়, আচ্ছন্ন করে রাখে এক অজানা দুঃখবোধে। আর কে না জানে বই পড়ে দুখী হয়েই একজন বইপোকা সবচেয়ে বেশি সুখী হয়।
উপন্যাসটি জীবনকে দেখতে শেখায় নানান দিক থেকে। কখনো শিকড়ে, কখনো শাখায় আবার কখনোবা মেঘে।
Light helps us to see objects, whereas shedding light upon one, inevitably creates dark shades on its back. Love to listen and read Mr. Mahmud, also respect him a lot. May Allah bless him, amin.