এই মাত্র পড়া শেষ করলাম রাসয়াত রহমান ওরফে জিকো ভাই এর ৫ম বই “যে প্রহরে নেই আমি”। এই উপন্যাস টি এইবার মানে ২০১৬ বই মেলায় আদী প্রকাশন (স্টল নম্বর ৫০০) থেকে প্রকাশিত হইসে। বইটা শেষ করতে আমার চারদিন লাগসে যদিও বইটা মাত্র ১১১ পৃষ্ঠার। এর একটা কারণ হইতে পারে আমি একজন স্লো রিডার। আর আরেকটা কারন হইতে পারে বইটা এই ভাবে পইড়াই পুরাপুরি স্বাদ টা নেয়া সম্ভব। এক নিঃশ্বাসে পুরাডা পইড়া লাইলাম, এক দম এ সব বুইঝা লাইলাম ক্যাটাগরির বই এইটা না। এই বই পড়তে হবে নিয়মিত বিরতি তে। প্রত্যেক্টা অধ্যায় এর পর অন্তত পাচ মিনিটের একটা বিরতি নিতে হবে। টানা পইড়া গেলে এই বইটা ঠিক উপভোগ করা যাবে না।
এই বই এ মুক্তিযুদ্ধ এর কথা আছে। কিন্তু এই টা মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক একটি ইতিহাসের বই না। এর ভিত্তি অনেকগুলা । এই বই এর ভিত্তি পারিবারিক বন্ধন, এই বই এর ভিত্তি মুক্ত চিন্তা, এই বই এর ভিত্তি নিজের সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে যাওয়া। এই উপন্যাস ইতিবাচকতা কে সেলিব্রেট করে। ভাল দের সাথে ভাল হয়, খারাপ রা শেষ এ গিয়ে ভালর রাস্তায় চলে আসে।
এর চরিত্রগুলো শুরু তে আমাদের সাথে যেভাবে পরিচয় করিয়ে দেন লেখক শেষ হতে হতে তারা আর শুধু তারা থাকেন না, আকাশের তারা দের মত কিছু একটা হয়ে যান। গৃহবধু নায়লা সারা বাংলাদেশের গৃহবন্দি, পরিবারবন্দি নারীদের সিম্বল হিসাবে আমাদের কাছে ইন্ট্রোডিউসড হলেও তার শেষ টা কিন্তু আমেরিকায় তুষার পাত কে পিছনে রেখে সেলফি তে।
২য় মূল চরিত্র রাজু নদীর পারে হারিয়ে যাওয়া দিয়ে আমাদের কাছে আসলেও শেষ দৃশ্যে তাকে দেখা যায় সফলতার অশ্রুসিক্ত অবস্থা তে। এভাবে প্রত্যেটা চরিত্র কে যদি আলাদা আলাদা ভাবে দেখা যায় , তাহলে দেখা যাবে , পৃষ্ঠা পরিক্রমায় যা কিছু অশুভ এসেছিল, তারা কাউকে শেষ পর্যন্ত জিততে দেন নি লেখক।
শেষ পর্যন্ত এই চারদিন এর জন্য “যে প্রহরে নেই আমি” একটি উপভোগ্য বই ছিল। লেখকের এর আগের সবগুলো বই ই আমার পড়ার সৌভাগ্য হইসে। আগের গুলোর চেয়ে এই বই এ লেখকের তীক্ষ্ণ রস বোধের ছোয়া খুব কম পাওয়া যায়, যেটা তার কিছু কিছু ভক্ত এবং পাঠক কে মন খারাপ করাবে মনে করি। আশা করছি এই মন্দা জিকো ভাই আমাদের আগামি বই এর মাধ্যমে পুষিয়ে দেবেন।
উপন্যাসের শুরুটা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ঘটনা। গল্পটা যাকে দিয়ে শুরু হয় সে এক আমেরিকান। নাম তার এন্ডারসন, এক ভবঘুরে আমেরিকান। ভাবছেন তার সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কি সম্পর্ক? উপন্যাসটায় একটার পর একটা ঘটনা যখন মোড়ে মোড়ে বাঁক নিবে তখন ঠিক তখন গল্পের কোন এক গলির মুখে এসে এই আমেরিকানের কোন আত্মীয় এসে হাজির হবে, গল্পটা শুরুর মতো শেষটায় এসে কোন এক বিদেশীর সামান্য ছোঁয়ায় হয়তো পূর্ণতা পাবে! (স্পয়লার দিচ্ছি না কিন্তু!)
রহস্য বাদ দিয়ে উপন্যাসের মূল অংশে আসা যাক। গল্প আমাদের এই প্রজন্মের। মানুষ স্বপ্ন দেখে, স্বপ্নই মানুষকে বড় করে তোলে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগে কোন কোন দুর্ঘটনা জীবনের স্বপ্নটাকে দূর আকাশের তারাতে রূপান্তর করে। নায়লা তেমনই এক চরিত্র। অল্প বয়সে স্বপ্নভঙ্গ হয়ে এক ব্যাংকারের ঘরণী। দুই সন্তান, জেরিন আর নাফি। জেরিনের বন্ধু তারিফ। শহুরে উচ্চবিত্ত বলতে যা বোঝায় সেই বিত্তবান কোন এক পরিবারের সন্তান। গল্পের এক মোড়ে এসে তারিফের পাশে দাঁড়াবে তার চাচা-চাচী জামিল আর সামান্থা। সামান্থা আর নায়লা স্কুল জীবনের সহপাঠী। মফস্বলের স্কুলে একসাথে পড়াশোনা ছিলো। দুইজনের জীবন দুই বাঁকে বেঁকে যায়। সামান্থা আইবিএর টিচার। সামান্থার স্বামী জামিলও নায়লার পূর্বপরিচিত, একই শহরে বেড়ে ওঠা। কিন্তু এই পরিচয়ের মাঝে কিন্তু ছিলো। কিন্তুটা উপন্যাসে লেখক খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বাকী রইলো রাজু। বাগেরহাটের ছেলে। খুলনায় পড়ালেখা করেছে, এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় এসেছে। পিওর টেলেন্ট যাকে বলে তেমন মেধাবী। প্রথমেই যে বলেছি উপন্যাসে ঘটনা শুধু বাঁক নেয়, আসলে বাঁক নেয় না। এই রাজু ছেলেটা বাঁক খাওয়ায়। ক্রিকেটে যেমন স্পিনার বল করার সময় বলের বাঁক নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তেমন এই ছেলেটা উপন্যাসের অনেকাংশ জুড়ে বাঁক খাওয়ায়। এই ছেলেকে এক একবার এক এক জায়গায় দেখা যাবে। কখনো ঢাকার কোন মেছে, আবার কখনো জামিল-সামান্থার বাসায় আশ্রিত হতে, আবার কখনো নায়লার বাসায় অতিথি হিসেবে আর কখনোবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ হলে।
জীবনটা অদ্ভূত। আর অদ্ভূত জীবনটার রহস্যগুলো আবিষ্কার করে বসে জীবনটা সহজ করে রাজুর মতো মানুষেরা। স্বপ্ন হারানো মানুষের স্বপ্নকে খুঁজে দেয়া, চরম বিপর্যস্ত মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে হলেও বিপদমুক্ত করা -এসব তার মতো সাধারণ মানুষের অসাধারণ কাজ। লেখক এই কাজটা খুব সুন্দরভাবে ফুঁটিয়ে তুলেছেন।
বাকী রইলো মুক্তিযোদ্ধা জলিল চাচা। এই চরিত্রটা উপন্যাসকে সম্পূর্ণতা দিয়েছেন।
বইছিলাম লেখক Rashat Rahman Zico ভাইয়ের নতুন উপন্যাস 'যে প্রহরে নেই আমি'। বইটা কিনে কখন যে পড়তে বসে শেষ করে ফেলেছি টের পাইনি। খুব চমৎকারভাবে একটার পর একটা ঘটনার সিকোয়েন্স বর্ণনা। লেখক যতই দাবি করুক তিনি সময় দিয়ে লিখতে পারেননি, তবে আমার পড়া তার সেরা বই এটি। তুলনা দেয়া ঠিক হবে কিনা জানিনা, তবে গল্প শেষ করে মনে হলো 'আরেহ্! এতো দেখি চেতন ভগতকেও হার মানানো গল্প লিখলো!' (আমি খুব চেতনের লেখার ভক্ত, তাই এভাবেই বললাম)।
কিছু জিনিস কল্পনাতেই বেশি ভাল লাগে বাস্তেবে নয়। যেহেতু সবকিছুই কাল্পনিক তাই কোন প্রশ্ন করার অবকাশ নাই তবে ভাইজান আপনি একটা শব্দ ব্যাবহার করছেন যেটা আমার জন্য কাল্পনিক ছিল না কিছুটা নস্টালজিক ছিল, যাইহোক এক বসাতে পইরা শেষ করছি। ভাল লাগছে ভাই। শুভকামনা আরো ভাল লিখেন।
প্রতি বই মেলাতেই এমন একটা কিংবা কয়েকটা বই পড়ার পর আফসোস হয় । কেন বইটা কিনলাম আর পড়লাম । আসলে বই কিনার সময় আমি টাকার দিক টা কখনও চিনতা করি নি কিন্তু কিছু কিছু বই কিনে মনে হয় টাকাটা এবং সময়টাই জলে গেল । এই বইটাও ঠিক তেমনই । আগের বছরের লেখকের রাফখাতা প্রথম দিকে ভাল না লাগলেও শেষের দিকে এসে ভাল ছিল কিন্তু এই বইটা পড়ে আমি পুরোপুরি হতাশ । সত্যি বলতে কি প্রথম থেকে পড়তে গিয়ে কেবল বিরক্তিই লেগেছে । যে কোন উপন্যাস ভাল লাগার ভেতরে সব থেকে বেশি দরকার একটা চমৎকার কাহিনী আর লেখকের সেই কাহিনীটাকে সফল ভাবে প্রকাশ করাটা । এই বইতে দুইটার একটাও ছিল না । এমন অনেক গল্প আছে যেখানে কাহিনী খুবই সামান্য কিন্তু লেখক সেটা এমন ভাবে প্রকাশ করেন যে অসামান্য হয়ে যায় কিন্তু এখানে আিম সেটা খুজে পাই নি । অথচ রাসায়াত রহমানের ২০১৪তে বের হওয়া ছোট গল্প সংকল টা পড়ে কি চমৎকারই না লেখেছিল । প্রতিটা গল্পই ছিল চমৎকার । কিন্তু এবারের উপন্যাস পড়ে খুবই হতাশ হয়েছি ।
কাহিনী সংক্ষেপঃ চারজনকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন............ এই অংশে এসে নায়লা কেমন জানি পুরনো কথায় হারিয়ে গেলো , মফস্বল শহরের এক পাশে আছে নদী, সেই নদীতীরে ঘুরছিল সে আর জামিল, কলেজে পড়া দুইজন, হাত ধরে হাঁটছিল , জামিল বলেছিলো যখন আমরা বুড়োবুড়ি হয়ে যাবো, যেখানেই থাকি না কেনো ,এখানে ফিরে আসবো , হাত ধরে এভাবেই হাঁটবো............
# "যে প্রহরে নেই আমি" রাসয়াত রহমান এর লেখা ,আমার পড়া দ্বিতীয় বই । বইয়ের জনরা টা জীবনধর্মী । লেখক একই সাথে অনেকগুলো চরিত্র এর সমাবেশ ঘটিয়েছেন এই উপন্যাসে , মূল চরিত্র গুলোর সাথে এসেছে তাদের লতা-পাতা চরিত্র গুলো! প্রধান চরিত্রের একজন নায়লা , তার সাথে এসেছে মেয়ে জেরিন, ছেলে নাফি , স্বামী বকুল, ভাই হাসান, বান্ধবী সামান্থা , বান্ধবীর স্বামী জামিল এবং মেয়ের বয়ফ্রেন্ড তারিফ! সেই সাথে আরেক টি প্রধান চরিত্র "রাজু" , সে একজন প্রডিজি । তার সাথে গল্পে এসে ঢুকেছে দাদা জলিল সাহেব, হাসেম মুন্সী, ইদ্রিস খান , ইদ্রিস খাঁ , সতী , রাবু, কাদের , ৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় !
এতোগুলো চরিত্র এক ফ্রেমে আনতে গিয়ে মূল কাহিনীর ফ্লো হারিয়ে ফেলেছেন লেখক অনেক জায়গায় , সেই সাথে টাইমলাইন, হুটহাট করে টাইমলাইন চেঞ্জ করাটা দৃস্টিকটু লেগেছে , যেটা পাঠক কে দ্বিধায় ফেলে দেয় ! মূল কাহিনীর সাথে লতা-পাতা কাহিনী যোগ করায় আরো একটু কেমন যেনো হয়ে গেছে গল্প টা ।
গল্পটা জীবনধর্মী হলেও , জায়গায় জায়গায় মেলোড্রামাটিক মনে হয়েছে , একটা মেজর অংশে তো সাম্প্রতিক সময়ে আমার দেখা একটা হিন্দী মুভির কথা মনে পরে গেলো , যেটায় মূল চরিত্রে ছিলেন "শ্রীদেবী" । এই মেলোড্রামা গুলোর কারনেই উপন্যাস টা সার্থক হতে গিয়েও হয়ে ওঠে নি ।
উপন্যাস এর ভালো লাগার দিকটা ছিলো এর ভেতরের সম্পর্কের গল্পগুলো , গাঁথুনি গুলো (মেলোড্রামা বাদ দিয়ে বলছি) । উঠে এসেছে হীনমন্নতার গল্প , সম্পর্ক থেকে পালানোর গল্প , পিছুটানের গল্প , যুদ্ধের গল্প , জীবনযুদ্ধের গল্প ! সে সাথে এসেছে সম্পর্ক রক্ষার গল্প , মরচে পরা সম্পর্কগুলোকে নতুন করে চেনার গল্প ! এই জিনিসটাই বইটাকে একেবারে খারাপ লাগার হাট থেকে বাঁচিয়েছে !
লেখক নিজেই বইয়ের শুরুতে স্বীকার করেছেন যে ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারনে উপন্যাস টায় তিনি তার সবটুকু দিতে পারেন নি । তাকে সাধুবাদ জানাই তবুও তার এই শ্রমের কারনে । আর আমি অবশ্য এগিয়ে রাখবো তার লেখা "রাফখাতা" কে ,এটার তুলনায়। জীবনধর্মী গল্প, উপন্যাস যারা ভালোবাসেন , তারা পড়ে দেখতে পারেন , খুব একটা খারাপ লাগবে না আশা করি।
আশা করি তিনি সামনে আরো ভালো ভালো কিছু জীবনধর্মী উপন্যাস উপহার দেবেন আমাদের , শুভকামনা রইলো !
এক নজরে- যে প্রহরে নেই আমি রাসয়াত রহমান আদী প্রকাশন প্রথম প্রকাশ - ফেব্রুয়ারি ২০১৬ মুদ্রিত মূল্য -২০০ টাকা রেটিং - ৩/৫
বইয়ের কাহিনীবিন্যাস ভাল (যদিও একটু বেশিই সিনেমাটিক)। লেখকের লেখার ধরণ একটু অগোছালো, কোথাও কোথাও খুব ভালো কিছু কথা বলেছেন। আবার কোথাও কোথাও মনে হয়েছে খুব তাড়াহুড়া করে শেষ করতে চাচ্ছেন। সব মিলিয়ে ভালো খারাপের মিশেল ছিল বইটি।