লেখকঃ জন রাসেল প্রকাশনীঃ তৃণলতা প্রকাশ প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ পৃষ্ঠাঃ ৭৯ মুদ্রিত মূল্যঃ ১২৫
"পালক" জন রাসেলের দ্বিতীয় উপন্যাস। উপন্যাস'টির ইংরেজি অনুবাদ ও করা হয়েছে "Feather"। অনুবাদ করেছেন "রেদওয়ানুল হক মুন্না"। বইটি নিয়ে বেশ আলোচনা দেখেছিলাম। অবশেষে বইমেলা থেকে "পালক" বইটি এবং লেখকের প্রথম উপন্যাস "অবেলা" সংগ্রহ করলাম।
লেখকের প্রথম উপন্যাস "অবেলা" অর্ধেক পড়তে পেরেছি৷ ভালো লাগে নি এজন্য পুরোটা পড়ি নি এমন নয়! এটিও এক বিরাট ট্রাজেডি! "অবেলা" বইটি পড়ছিলাম... প্রায় শেষের পথে... ভালোও লাগছিল। তখন ধরা পড়ে যাই!
ধরা পড়ে যাই বলতে? আমি বইটি পড়ছিলাম কলেজে বসে, বাংলা ক্লাসে! বইটি পড়ার সময় ম্যাডাম আমাকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন এবং বইটি নিয়ে নেন। যা আমি আর ফেরত পায় নি। আফসোস!
এবার আসি, "পালক" বইটির কথায়৷ ৭৯ পেজের ছোট্ট বই৷ এক বসায় পড়ে ফেলার মত। এক ঘন্টার মত লেগেছে বইটি শেষ করতে।
গল্পটি জহির নামের এক ভাড়াটিয়ার। যে বাড়িওয়ালার মেয়ে "পুই" কে পছন্দ করে। গল্পটি "পুই" এর। যে তার গৃহশিক্ষক "আনিস" কে পছন্দ করে। গল্পটি আনিসের। গল্পটি হয়ত পুই এর বাবা বাড়িওয়ালা মফিজুর রহমান এবং তার স্ত্রী আলেয়া বেগমের।
এরকম কনফিউজ করছি কেনো? কারণ লেখক নিজেই হয়ত উপন্যাস লেখার সময় কনফিউজ ছিলেন। লেখার আগে কোনো স্টোরি লাইন নিয়ে ভেবেছেন বলে মনে হয় না। সুন্দর স্টার্টিং করেছেন। এরপর হয়ত উনার মনে হয়েছে থাকুক এসব গম্ভীর কথাবার্তা। সস্তা কমেডির দিকে চলে গেছেন তিনি তারপর। এভাবে অনেকক্ষন লেখার পর হয়ত ভাবলেন, "অনেক হলো এবার শেষ করি" তাই শেষে খানিকটা আবেগ মিশিয়ে সমাপ্তি টেনেছেন।
পাখি চলে যায়, পালক রয়ে যায়। মানুষ চলে যায়, স্মৃতি থেকে যায়। এই স্টোরি লাইন নিয়েই "পালক" লেখা।
বইয়ে হুমায়ুনীয় লেখার প্রভাব প্রচন্ড! এতটাই বেশি যে মাঝে বিরক্ত লেগেছে। গৃহশিক্ষক আনিসকে যেন জোর করে ধরে বেধে "শুভ্র" বানিয়ে দেয়া হয়েছে। শুদ্ধতম মানুষ, দৃষ্টি সমস্যা, অন্ধ হয়ে যাওয়া...! লেখক পুরো লেখা জুড়েই কিছু সস্তা কমেডি'র চেস্টা করেছেন। হাসির বদলে বিরক্তি এসেছে।
পুরো লেখা জুড়েই প্রচন্ড অসঙ্গতি। শুদ্ধতম মানুষ আনিসের বিনা কারণে ছাত্রী পুই'কে চড় মারা, আতাউল গণি'র মত চরিত্রের মানুষের শেষ মুহুর্তে আবেগী হওয়া.... এমন অসংখ্য ঘটনা! চরিত্রগুলো একদম ধারণ করতে পারেন নি লেখক। বইয়ের মাঝে পদার্থবিজ্ঞান এবং গণিত নিয়ে কিছুটা পান্ডিত্য দেখানোর চেস্টা করা হয়েছে। যেগুলা ছিল হাস্যকর। বিশেষ করে গণিতের অংশটুকু! বইয়ের বর্ণনা নির্ভর অংশগুলো ভালো ছিল। তবে সংলাপের মান ভালো ছিল না।
বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এই ৭৯ পেজের সকল ঘটনাই হুমায়ুন আহমেদের বইয়ে পড়ে এসেছি। সাধারণ হাস্যরস, বিচিত্র চরিত্র, দুনিয়াদারী কিছু না বুঝা গৃহকর্তী, গ্রাম থেকে উটকো লোক বাসায় অবস্থান নেওয়া, ছাত্রীর গৃহশিক্ষকের প্রেমে পড়া এবং তা প্রকাশ না করা, শিক্ষক ছাত্রীর আবেগ'কে পাত্তা না দেওয়া, বিজ্ঞানের কিছু বিষয় নিয়ে আসা.... এমন অসংখ্য ঘটনা। হুমায়ুন আহমেদ কাজগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বার্থকতার সাথে করেছেন। জন রাসেল তা পারেন নি।
সত্যি বলতে, আমি লেখকের নিজস্বতা বলতে বইয়ে কিছুই পাই নি!
হুমায়ুনীয় লেখায় আমার আপত্তি নেই। হুমায়ুন আহমেদের প্রভাব থাকাটাই বরং স্বাভাবিক। কিন্তু লেখক হুমায়ুনীয় লেখার সিকিভাগও ধারণ করতে পারেন নি।
এই বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ কি মনে করে করা হয়েছে, এর উত্তর আমার একেবারেই জানা নেই!
বইয়ের বাইন্ডিং এবং প্রিন্টিং ভালো। পেজ কোয়ালিটি সুন্দর। বানান ভুল চোখে পড়ে নি। বইয়ের দাম আকাশছোয়া রাখা হয় নি। এগুলো ভালো লেগেছে।
বইটি পড়ে আমি আশাহত হয়েছি৷ আমার ভালো লাগে নি বলে সবারই খারাপ লাগবে এমন না। একেকজনের স্বাদ একেকরকম। তবে কেউ বইটি কিনে পড়লে, নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
পাখি উড়ে যাওয়ার সময় পালক ফেলে যায়। সেই পরে থাকা পালক পাখিটার শূন্যতা প্রমাণ হয়ে থাকে। আমি চলে যাওয়ার বেশি কিছুদিন পর্যন্ত আমার ফেলে যাওয়া পালকগুলো পরে থাকবে এখানে। তবে এক সময় আর থাকবেনা। প্রকৃতি শূন্যস্থান পূরন খেলা খেলতে ভালোবাসে৷
ঢাকা শহরে বৃষ্টি হলে কোথা থেকে যেন একদল কাক এসে হাজির হয়। এরা কোন একটি বাড়ির কার্নিশে গিয়ে দল বেধে বসে। মফিজুর রহমান খেয়াল করে দেখেছেন এই কাকের সংখ্যাটা সব সময় বেজোড় হয়। প্রতিটি প্রাণীর সম্ভবত নিজস্ব হিসাব আছে। ক্রিকেট খেলায় মোট এগারোজন প্লেয়ার থাকে। এই কারণেই একজন অপরাজিত রয়ে যায় পুরো দল অলআউট হলেও। বেজোড় সংখ্যার মধ্যে ঝামেলা আছে। জোড়ায় ফেলে একে পুরোপুরি নিঃশেষ করা যায় না।
কিন্তু প্রকৃতি জোড়া পছন্দ করে। কাকের সেই দল থেকে হঠাৎ একটা কাক উড়ে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করে, বাকিরা কার্নিশেই বসে থাকে। তখন সংখ্যাটা হয়ে যায় জোড়। যে কাকটা ভিজছে তাঁর পাশে হঠাৎ আরেকটা কাক আসে, সেও ভিজতে শুরু করে। সেখানেও সংখ্যাটা হয়ে যায় জোড়। কাকদুটো ভিজতে ভিজতে তাদের গায়ের পালকগুলো এলোমেলো করে ফেলে। এই দৃশ্যটার মধ্যে কি কোন আবেগ আছে কিংবা মানুষের সাথে কোন মিল? এই অদ্ভুত ভাবনাগুলো ঘুরে ফেরে মফিজুর রহমানের মনে। জহির আর আনিসের মধ্যেও এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করে। পুই নামক মেয়েটি এই অস্থিরতার কেন্দ্রে। তবে এরা কেউই বেপোরোয়া নয়। ভালোবাসায় পাওয়াটা হয়তো বড় নয়, সম্পর্কের পবিত্রতাটাই বড়। প্রত্যেকটি পবিত্র সম্পর্ক এক অদৃশ্য পালক ফেলে যায় জীবনের গতিপথে। সেটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না, ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় লালন করতে হয়।
বই থেকে পছন্দের কিছু লাইন : ১) সুন্দর ভাবনা এক ধরনের স্বান্তনা যা বেঁচে থাকার প্রয়োজনকে বাঁচিয়ে রাখে৷ ২) মানুষ আসে নিয়ম মেনে চলে যায় নিয়ম নেমে৷ শুধু বেঁচে থাকা অবস্থায় কয়েকবার নিয়ম ভাঙ্গে। ৩) মানুষকে বিশ্বাস করবে সবসময়। অবিশ্বাস তোমাকে বাস্তববাদী করে তুলবে তবে সুখী নয়৷ সুখ আছে বিশ্বাসে৷ ৪) ফুলের মধ্যে কী রহস্যময় কোনো ব্যাপার আছে? সুগন্ধের কারনেই কী মন পবিত্র হয়ে যায়? সুগন্ধতো পারফিউমেও আছে৷ পারফিউম দিলে মন পবিত্র হয়? ৫) কিছু মানুষ উপকারের প্রতিদানে শুধু কৃতজ্ঞ হয় না, পাল্টা প্রতিদান দিতে চায়৷ না হলে এদের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করে। ৬) আবেগ যত দ্রুত মাটি চাপা দেওয়া যায় ততই ভালো৷ প্রিয়জনের মৃতদেহ আমরা কাঁধে নিয়ে ঘুরিনা, মাটি চাপা দেই৷ ৭) অভিমান যে দীর্ঘ সময় পুষে রাখে তার জীবন জটিল হয়৷
বইটা বেশ ছোট তবে সুন্দর। শেষ করতে দেড় ঘন্টার মতো সময় লেগেছে৷ বইয়ে লেখকের নাম যদি না থাকত তাহলে নিশ্চিত বলতাম হুমায়ূন স্যারের কোনো লেখা পড়ছি৷ তেমন কোন ভুলত্রুটি চোখে পরেনি৷ একটানা পড়ার মতো বই। পড়ে ফেলুন আশা করি খুব একটা হতাশ হবেন না৷